মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল ২০২১, ০৭:৩৮ অপরাহ্ন

শিরোনাম:
রাবেতাতুল ওয়ায়েজীন বাংলাদেশ মাওলানা মামুনুল হকের পাশে থাকবে। গ্রেফতার ঝুঁকিতে হেফাজত নেতৃবৃন্দ : করণীয় কি? সৈয়দ শামছুল হুদা মসজিদে তারাবির নামাজে ২০ জনের বেশি নয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে কুরআন নাজিলের মাসে হিফজুল কুরআন ও ক্বেরাত বিভাগ খুলে দিন -আল্লামা মুফতি রুহুল আমীন ২৯শে মে জাতীয় ওলামা মাশায়েখ সম্মেলন গণগ্রেফতার ও হয়রানী বন্ধ করুন: মামুনুল হক মানহানী ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করতে পারবেন: সুপ্রিমকোর্ট আইনজী ৩১৭ বছরের পুরনো মসজিদ উদ্বোধন করলেন আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী পাথরের ট্রাকে ২কোটি টাকার হেরোইন উদ্ধার – আটক২ সাংসদ বেনজীর আহমেদ করোনায় আক্রান্ত সাভারে জোর করে বের করে দেয়া ভাড়াটিয়াদের রক্ষা করলো পুলিশ

ভোট কাটোয়া আব্বাস সিদ্দিকী ‘জঙ্গি’! সৈয়দ শামছুল হুদা

রাজনীতিকে রাজনীতির ভাষায় বুঝতে হবে। এখানে সরলতার কোন সুযোগ নেই। রাজনীতিতে সাধারণত: দয়া-মায়া দেখানো হয় না। প্রতিপক্ষকে নিষ্ঠুর হাতে দমনই রাজনীতির অন্যতম খেলা। আর এজন্যই পশ্চিমবঙ্গের শওকত মোল্লা তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আব্বাস সিদ্দিকীকে নিয়ে এমন কিছু মন্তব্য করেছেন যা বুঝা আমাদের দেশের তরুন আলেম রাজনীতিকদের জন্য খুব বেশি প্রয়োজন। রাজনৈতিক খেলা বুঝার জন্য তার বক্তব্যটা প্রাসঙ্গিক।

রাজনীতিকে যারা সবসময় ধর্মীয় নিক্তিতে মাপতে চান তারা প্রায়শই ভুল করেন। আর এ জন্যই এরদোয়ানকে আমাদের বুঝা কখনো খুব সরল হয়ে যায়, আবার কখনো খুব জটিল হয়ে যায়। কেউ খুব সহজেই তাকে সুলতান বলে ফেলেন, আবার কেউ তাকে কাফের মুশরেকদের দোসর বলতেও সামান্য দেরি করেন না। এক কথায় রাজনীতিতে সোজা হিসাব চলে না ভাই।

পশ্চিমবঙ্গের আলোচিত রাজনীতিক, মমতা ব্যানার্জির লাঠিয়াল, মুসলমানদের ভোটের অন্যতম ব্যবসায়ি, শওকত মোল্লার একটি ভিডিও দেখলাম। তিনি কী ভাষায় তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আব্বাস সিদ্দিকীকে কী কী অভিধায় অভিসিক্ত করছেন এই বিষয়গুলো আমাদের বুঝা খুব প্রয়োজন। শওকত মোল্লার কথায় আবারও পরিস্কার হলো যে, পৃথিবীতে জঙ্গিবাদ বলতে কিছু নেই। জঙ্গিবাদ দুই ধরণের। একটা হলো, প্রকৃত মুসলিম যারা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলাম কায়েমের জন্য জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকে। আর এক জঙ্গিবাদ হলো, দুনিয়ার তাবৎ সুবিধাবাদি গোষ্ঠী, শাসক মহল ইসলামপন্থীদের দমন করার জন্য যে নোংরা রাজনৈতিক গেইম খেলে সেটা। এর বাইরে তৃতীয় কোন পথ নেই।

আসুন সারা পৃথিবীতে জঙ্গিবাদ বলতে কী বুঝানো হয় তা শওকত মোল্লার ভাষাতেই কিছুটা জেনে নিই। শওকত মোল্লা তার এক নির্বাচনী ভাষণে বলেন, আব্বাস সিদ্দিকী সাহেব, আপনি আলেম হয়ে আসেন, আমরা আপনাকে সম্মান করবো, আপনি পীরজাদা হিসেবে আসেন, আমরা আমাকে সম্মান করবো, আপনি মুসলমানদের ধর্মীয় নেতা হিসেবে আসেন, তাহলেও আমরা আপনাকে সম্মান করবো, আপনি দাদাজান হুজুরের প্রজন্ম হিসেবে আসেন, তাহলেও আপনাকে আমরা সম্মান করবো, কিন্তু আপনি রাজনীতিবিদ হিসেবে আসবেন, আর আমরা আপনাকে সম্মান করবো এই আশা আপনি কীভাবে করেন? রাজনীতিতে আপনাকে জায়গামতো ঔষধ দেওয়ার নামই রাজনীতি। আপনি একজন জঙ্গি। আপনি জঙ্গির ভাষায় কথা বলছেন। সুতরাং জঙ্গির সাথে যে আচরণ করা দরকার সেটাই আমরা আপনার সাথে করবো।”

সুতরাং বন্ধুরা! বুঝতেই পারছেন জঙ্গিবাদ বলে আসলে কী বুঝানো হয়। শাসকগোষ্ঠী হুজুরদেরকে যত নরম পাবে, যত রাষ্ট্র নিরপেক্ষ পাবে, ততই ভালো। হুজুররা খুব ভালো বলে প্রশংসিত হবেন। ইসলামপন্থীরা রাষ্ট্র থেকে যত দূরে থাকবে, শাসকদের কাছে তারা ততই ভালো। মহামানব। যেই না আপনি অধিকারের কথা বলবেন, ভাগ-বাটোয়ারার কথা বলবেন, এমনিতেই আপনি জঙ্গি হয়ে যাবেন। বাংলাদেশে যত বড় বুজুর্গই হোক, সরকারের কাছে যত প্রিয়ই হোক, তিনি অধিকারের কথা বললেই সাথে সাথে তিনি জঙ্গি হয়ে যাবেন। সুতরাং জঙ্গি হলো একটি রাজনৈতিক পরিভাষা। এখানে যতই মিউ মিউ করবেন, ততই আপনাকে এই শব্দের ভয় ঘিরে ধরবে। জাতিসংঘের মাধ্যমে সারা পৃথিবীর ক্ষমতা অমুসলমানদের হাতে। আর এ জন্যই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সেই সকল মুসলমান যারা মনে করে, ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নিয়ে যাওয়া দরকার, তারা পৃথিবীর সকল মিডিয়ার কাছে জঙ্গি। মৌলবাদি। ফান্ডামেন্ডালিস্ট।

আব্বাস সিদ্দিকী একজন পীর বংশের মানুষ। তার অসংখ্য ভুল থাকতে পারে। ধর্মীয় আলোচনায়ও যে সে খুব ভালো, তা আমার কাছে মনে হয় না। একটু পাগলামি তার মধ্যে আছে। আর এমন পাগলামি আছে বলেই তিনি রাজনীতিতে এসেছেন। রাজনীতি এক ধরণের পাগলামিই বটে।

রাজনীতিতে অনেক সময়ই যোগ-বিয়োগ মিলে না। শত্রু-মিত্র’র কোন ঠিক-ঠিকানা থাকে না। আমাদের দেশের কিছু ভাই আছেন, যারা রাজনীতি করেন, আর মনে করেন, আমরা তার সাথেই মিশবো যে আমাদের চেয়েও বড় ফিরিশতা।ফিরিশতা ছাড়া ভুল-ত্রুটি মুক্ত কোন দল, গোষ্ঠী পাওয়া যাবে না। এই জন্যই এরদোয়ান কখনো রাশিয়ার সাথে মিশে, কখনো ইসরাইলের সাথেও হাত মেলায়। কখনো মুসলিম বিশ্বের একেবারে নিবেদিতপ্রাণ কর্মী বনে যায়।

রাজনীতিতে একটি লক্ষ্য থাকে, সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কখনো শত্রুর সাথে গলাগলি করতে হয়। কখনো মিত্রের সাথে হয় ধ্বস্তাধস্তি। আমাদের অনেক প্রিয় ভাই, এ কথাটি বুঝতে চান না। আরতুগরোল এবং কুরুলুস উসমান যারা দেখেছেন, তারা জানেন যে, কীভাবে শত্রুর সাথে আপোষ করতে হয়, কীভাবে বিশ্বাসঘাতকদের সাথে নিয়েও চলতে হয়। এটাতো আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূল সা. এরই শিক্ষা। তিনি মুনাফেকদের চিনেও তাদের নিয়েই চলেছেন। ঘাড় ধরে বের করে দেননি। মদীনার সব কাফের-মুশরেকদের নিয়েই মদীনা সনদ তৈরি করেছেন। মূলত: এর মাধ্যমে নিজের প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। আমাদের দেশের ইসলামপন্থী রাজনীতির যারা দাবি করেন, তারা এই জায়গাটায় খুব দুর্বল বলেই আমার কাছে মনে হয়। সবকিছুতেই ছুঁয়াছে রোগ। রাজনীতিতে কারো সাথে ছুঁয়া লাগলেই জাত যায় অবস্থা। কিন্তু আব্বাস সিদ্দিকীর জাত যায় না। এরদোয়ানের জাত যায় না। এজন্যই মানুষ তাদের জন্য এত পাগল।

আব্বাস সিদ্দিকীকে কেউ কেউ ভোটকাটোয়া বলেও ব্যঙ্গ করেন। আব্বাসের কারণে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় চলে আসবে বলে মন্তব্য করেন। আসলে, ভারতীয় রাজনীতির নোংরামি সম্পর্কে যারা খোঁজ-খবর রাখেন তারা জানেন যে, পশ্চিমবঙ্গে যে কোন মূল্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার টার্গেট নিয়ে কাজ করছে। কাশ্মীর ওদের টার্গেট ছিল। নরেন্দ্র মোদি যখন মন্দিরে মন্দিরে ঘুরে পুঁজা করতো, তখন থেকেই তার এটা স্বপ্ন। ক্ষমতায় এসে কাশ্মীরকে সে সাইজ করেছে। কাশ্মীরবাসির কিছুই করার ছিল না। পশ্চিমবঙ্গে যে কোন মূল্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসবে। এতে যত টাকাই লাগুক আর যত ইভিএম মেশিনই ব্যবহার করা লাগুক তারা সেটা করবে।

এতে লাশের সারি পড়লেও বিজেপির কিছুই যায় আসে না। কারণ ওরা লাশের রাজনীতিই করে। রক্তের রাজনীতিই করে। গুজরাট থেকে তারা সেই প্রশিক্ষণ নিয়েই এসেছে। ওদের দূরতম টার্গেট বাংলাদেশ। বাংলার মুসলমানদেরকে কঠিন বিপদে ফেলানোর জন্যই ‍ওরা রাজনীতি করছে। আসামে তাদের রাজনৈতিক নোংরামিতেও এটা পরিস্কার হয়েছে।

সুতরাং যারা আব্বাস সিদ্দিকীর রাজনীতিতে আসাকে খুব খারাপ দৃষ্টিতে দেখছেন, তাদের সাথে আমি মোটেও একমত নই। আমি মনে করি, এর মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের একটি নিরাপত্তা দেওয়াল তৈরি হয়ে গেলো। সেখানে বামরা ৩৪বছর ক্ষমতায় ছিল। কংগ্রেস ১০বছর ক্ষমতায় ছিল। তাদের সাথে সে জোট করে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। সে জোট করে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে ক্ষমতায় আসার সহজ পথ বন্ধ করে দিয়েছে বলেই আমার কাছে মনে হচ্ছে।সে যদি একা একা লড়তো, তাহলে তার ব্যাপারে আমারও সন্দেহ থাকতো। বাকী আপনার হিসাব আলাদা। হয়তো আমার সাথে আপনার বিশ্লেষণ মিলবে না। বনবে না। এমনটাই হওয়া স্বাভাবিক।

বামফ্রন্ট এবং জাতীয় কংগ্রেসের সাথে জোট করা, মীমকে সতর্কতার সাথে এড়িয়ে চলা আব্বাস সিদ্দিকীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রমাণ বহন করে। বিজেপিতে আছে রাজনৈতিক গোঁয়ার। কিন্তু বামে আছে বুদ্ধিজীবি। যারা মুসলমানদের সাথে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ লাগিয়েই থাকে। বামে আছে হাজার হাজার শিল্পী, কলামিষ্ট। তাদের সাথে জোট করে আব্বাস সিদ্দিকী এক ধরণের বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। ওদের কলম, ওদের মুখ, মুসলমানদের ব্যাপারে সহনশীল হবে। আর বিজেপির সরাসরি আক্রমণ টেকাতে তখন ওরাও মুসলমানদের পাশে দাঁড়াবে।

সমাজে অস্থিরতা ছড়ায় লেখকরা। মিডিয়াবাজরা। আজকের বাংলাদেশে রাজনৈতিক নীরবতা কেন? কারণ, সরকার দেশের লেখক, কলামিষ্ট ও মিডিয়াকে শতভাগ নিয়ন্ত্রনে নিতে পেরেছে। এখন কারো কান্নাতেই কিছু যায় আসে না। জনগণ মাতেও না, মুতেও না। পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবিদের যদি দমিয়ে রাখতে পারে আব্বাস সিদ্দিকী, তাহলে বিজেপির সরাসরি আক্রমন থেকে মুসলমানদের রক্ষা করা আমি মনে করি অনেকটা সহজ হবে। মিডিয়া মানুষের মনে ঘৃণার সৃষ্টি করে। ওরাই ক্ষোভ উস্কে দেয়। আবার ওরা নীরব থাকলে অনেক কিছুই নীরব হয়ে যায়।

একবার বাংলাদেশের দিকে চোখ রাখুন। নিক্সন চৌধুরীদের হুঙ্কারে মুসলমানদের তেমন কোনই ক্ষতি নাই। কিন্তু একজন ইনু, একজন মেনন ওরা ইসলামপন্থীদের রক্ত-মাংসে শত্রু মনে করে। এই যে আজকে কিছু হলেই মিডিয়া হুজুরদের উপরে ঝাপিয়ে পড়ে এর কারণ হলো, বামদের মিডিয়া নিয়ন্ত্রন। আমি এর আগে একটি লেখায় আবেদন রেখেছিলাম, বাংলাদেশে কট্টর বাম ও কট্টর ডানের মধ্যে কোনভাবে কোন প্রকার দূরতম মিত্রতা তৈরি করা যায় কী না? আমার এ লেখায় তেমন কেউ গুরুত্ব দিয়েছেন বলে মনে হয় না। আমি মনে করি, আব্বাস সিদ্দিকীকে তৃণমূলের যারা ভোট কাটোয়া বলে ব্যঙ্গ করছে তারা ক্ষমতা হারানোর ভীতি থেকেই এসব বলছে। যা শওকত মোল্লার কথা থেকে আরো বেশি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।

হে প্রিয় বন্ধুরা! আসুন, রাজনৈতিক শিল্পকে আমরা আরো বেশি করে চর্চা করি। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গভীরে আমরা প্রবেশ করতে চেষ্টা করি।আামাদের চিন্তাজগতের বিকাশ ঘটাই। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে ইসলামকে, মুসলমানদের জান ও মালকে আরো বেশি আকারে কী করে নিরাপদ করা যায় তার দূরদর্শী ফর্মুলা বের করি। রাজনৈতিক শিল্প নিয়ে বেশি বেশি আলোচনা করি। বিভিন্ন মতামত তুলে ধরি। বিভিন্ন নেতাদের কর্মকান্ডকে সামনে রেখে কর্মসূচী প্রনয়ণ করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন।

জেনারেল সেক্রেটারী
বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট ‘বিআইএম’
20.03.2021

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved ©2020 jubokantho24.com
Design & Developed BY Masum Billah