জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় মুখ্য সমন্বয়কারী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নিজের রাজনৈতিক দর্শন ও আদর্শের কথা জানিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার দাবি, তিনি কখনো ক্ষমতা, সম্পদ বা কোনো ব্যক্তির সামনে মাথা নত করেননি এবং শুধু আল্লাহর কাছে নতি স্বীকার করেন। তার রাজনৈতিক চেতনা গড়ে উঠেছে তাওহীদের ভিত্তিতে বলেও জানান তিনি।
রবিবার (২৪ মে) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড একাউন্ট থেকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লেখেন, আমি কখনো রাজনৈতিক পদপ্রার্থী ছিলাম না। ব্যক্তিগত লাভ বা বিশেষ কোনো সুবিধার আশায় আমি কারও চাটুকারিতা করিনি। আমার বিবেক কখনো ক্ষমতা, সম্পদ বা মানুষের সামনে মাথা নত করতে শেখেনি। আমি একমাত্র আল্লাহ, বিশ্বজগতের প্রতিপালকের সামনেই সিজদা করি। আমার রাজনৈতিক ও আদর্শিক যাত্রার শুরু থেকেই আমি একটি গভীর ও শক্ত বিশ্বাস বুকে ধারণ করেছি এমন বিশ্বাস যা কোনো স্লোগানের চেয়ে গভীর, আর ভয়ের চেয়েও শক্তিশালী। সেটি হলো: মানুষের মর্যাদা তখনই শুরু হয়, যখন সে স্রষ্টা ছাড়া আর কারও কাছে আত্মসমর্পণ করে না। কোরআনের এই ঘোষণা সব সময় আমার অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল: "নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সবকিছুই বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহর জন্য।"
তিনি আরো বলেন,আমার কাছে রাজনীতি কখনো লেনদেনের বাজার ছিল না। এটি ছিল বিশ্বাস, ত্যাগ এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ভিত্তিতে গড়া একটি নৈতিক দায়িত্ব। কখনো আমি ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সান্নিধ্য দিয়ে নিজের সাফল্য মাপিনি। বরং আমি মাপি সেই সক্ষমতায়, যে সক্ষমতা দিয়ে লাভজনক আপোস বা নিরাপদে চুপ থাকার সুযোগ পেয়েও আমি নিজের নীতিতে অটল থাকতে পেরেছি। ২০১৩, ২০১৮ সালের আন্দোলনগুলোতে, এমনকি ২০২৪ সালের গভীর অন্ধকার ও অনিশ্চয়তার সময়েও আমার নির্ভরতা কখনো কোনো পার্থিব কর্তৃপক্ষের দিকে যায়নি। যখন ভয় মানুষকে গ্রাস করেছিল, আর সুযোগসন্ধানীরা ক্ষমতাধরদের আড়ালে আশ্রয় খুঁজছিল, তখন আমার হৃদয় কেবল একটি ঘোষণাতেই নিশ্চয়তা পেয়েছিল: "তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ" আমি একমাত্র আল্লাহর ওপরই ভরসা করি।
রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে তিনি বলেন, আমি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের প্রতি অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাস করি না। মানুষকে অস্পৃশ্য প্রতীকে পরিণত করায়ও আমি বিশ্বাসী নই। ইতিহাস বারবার শিখিয়েছে, যখন নীতির চেয়ে ব্যক্তি বড় হয়ে ওঠে, আর সত্য ও ন্যায়ের প্রতি দায়িত্বের চেয়ে ব্যক্তির প্রতি অনুগতিকে বড় করে দেখা হয়, তখনই জাতির পতন ঘটে। আমার রাজনৈতিক চেতনা গড়ে উঠেছে তাওহীদের ভিত্তিতে এই বিশ্বাসে যে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহরই। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্ব ছিল দয়া, ন্যায়বিচার, দায়িত্ব ও নৈতিক সাহসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই আমি তাঁর ছাড়া আর কোনো নেতার কাছে আত্মসমর্পণ করি না। কারণ তাঁর বাইরে প্রতিটি মানুষই দায়বদ্ধ, ভুলপ্রবণ এবং ক্ষণস্থায়ী। আমি বিশ্বাস করি, প্রকৃত স্বাধীনতা শুরু হয় তখনই, যখন একজন মানুষ নিজেকে অন্য কারও ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করে শাসকের ভয় থেকে, পদের লোভ থেকে, পৃষ্ঠপোষকতার প্রলোভন থেকে। কোনো সমাজ ন্যায়পরায়ণ হতে পারে না, যদি তার মানুষ মুখে স্বাধীনতার কথা বললেও অন্তরে ক্ষমতার পূজা করে। প্রকৃত রাজনৈতিক সংস্কার শুরু হয় আধ্যাত্মিক স্বাধীনতার মাধ্যমেই।‘রুবুবিয়্যাহ’ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও প্রভুত্ব স্বীকার করার জন্য আমি আমার সময়, সংগ্রাম, ত্যাগ ও ইবাদত উৎসর্গ করেছি। আমার যাত্রা কখনো শুধু রাজনৈতিক ছিল না; এটি ছিল অস্তিত্ববাদী। এটি ছিল সেই যুগে আত্মাকে রক্ষা করার সংগ্রাম, যেখানে অনেকেই স্বীকৃতি, নিরাপত্তা কিংবা প্রভাবের বিনিময়ে নিজেদের বিবেক বিকিয়ে দিচ্ছে।
সবশেষ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, আমি যদি দাঁড়াই, তবে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়েই দাঁড়াই।আমি যদি কথা বলি, তবে আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ থেকেই কথা বলি। আর আমি যদি সংগ্রাম করি, তবে এই নিশ্চিত বিশ্বাস নিয়েই করি সম্মান ক্ষমতার সান্নিধ্য থেকে আসে না, বরং আসে আন্তরিকতা, ত্যাগ ও সত্যের ওপর অটল থাকার মাধ্যমেই।