যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় সান ডিয়েগোর ইসলামিক সেন্টারে বন্দুকধারীদের হামলায় তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনায় শোকাহত মুসলিম আমেরিকানরা। তবে কমিউনিটি নেতারা বলছেন, এই শোককে শক্তিতে পরিণত করে ইসলামভীতি ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে হামলায় সম্প্রদায়ের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
বাল্টিমোরে অনুষ্ঠিত নর্থ আমেরিকার ইসলামিক সার্কেল (ICNA)-এর বার্ষিক সম্মেলনে এ আহ্বান জানানো হয়। শনিবার (২৩ মে) ও রবিবার (২৪ মে) অনুষ্ঠিত দুই দিনের এই সম্মেলনে প্রায় ২৫ হাজার মুসলিম।
সম্মেলনে বক্তারা সাম্প্রতিক হামলার প্রসঙ্গ তুলে নিহত তিনজনের সাহসিকতাকে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে তুলে ধরেন। কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (CAIR)-এর আইনজীবী লেনা মাসরি বলেন, “আমরা শুধু সমবেদনা জানালেই দায়িত্ব শেষ নয়। আমাদের দৃঢ় অবস্থানও নিতে হবে।”
তিনি জানান, নিহতরা ছিলেন একজন নিরাপত্তাকর্মী, একজন তত্ত্বাবধায়ক এবং একজন প্রতিবেশী। হামলার সময় নিরাপত্তাকর্মী আমিন আবদুল্লাহ বন্দুকধারীদের সঙ্গে পাল্টা গুলি চালান। অন্য দুইজন—মানসুর কাজিহা ও নাদির আওয়াদ—অন্যদের সাহায্যে এগিয়ে যান এবং জরুরি সেবায় যোগাযোগ করেন।
মাসরি বলেন, “তারা আমাদের কমিউনিটির শারীরিক স্থান—মসজিদ, স্কুল, শিশু, শিক্ষক ও মুসল্লিদের রক্ষা করেছেন। এখন আমাদের দায়িত্ব নাগরিক পরিসর রক্ষা করা—ইবাদতের অধিকার, মতপ্রকাশের অধিকার, সংগঠিত হওয়ার অধিকার এবং ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলার অধিকার।”
সম্মেলনের মূল বার্তাই ছিল—মুসলিম আমেরিকানদের আর নিষ্ক্রিয় থাকার সুযোগ নেই। ইসলামভীতি ও ঘৃণার বিরুদ্ধে সংগঠিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। বক্তারা ভোটদান, সংগঠিত হওয়া এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের পক্ষে থাকা প্রার্থী ও প্রতিষ্ঠানকে সহায়তার ওপর জোর দেন। একইসঙ্গে ফিলিস্তিনে ইসরাইলের হামলা বন্ধে চাপ বাড়ানোর আহ্বানও জানান।
মাসরি বলেন, “গাজার জন্য শুধু শোক প্রকাশ যথেষ্ট নয়। গাজার পক্ষে এমনভাবে সোচ্চার হতে হবে, যাতে ভয় দেখিয়ে কাউকে চুপ করানো না যায়।” সম্মেলনজুড়ে ফিলিস্তিনের প্রতীক ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকের হাতে ছিল তরমুজের প্রতীক ও ফিলিস্তিনি পতাকা অঙ্কিত ব্যাগ, কেফিয়াহ নকশার স্কার্ফ, পোশাক ও পানির বোতল।
সম্মেলনের একটি বাজারে অংশগ্রহণকারীরা সংহতির বার্তা লিখে দেন একটি তাঁবুতে, যা পরে গাজায় পাঠাবে দাতব্য সংস্থা লাইফ ফর রিলিফ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (LIFE)।
বক্তারা যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষ এবং গাজা, পশ্চিম তীর ও লেবাননে ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।
তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামভীতির সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ সমর্থকদের মধ্যে রয়েছেন ডানপন্থি ভাষ্যকার লরা লুমার এবং কংগ্রেস সদস্য র্যান্ডি ফাইন। তারা দুজনই সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র।
ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তারা ইসরাইলবিরোধী অবস্থান নেওয়া অ-নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের অভিযান চালাচ্ছে।
হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলতাফ হোসেন বলেন, ‘ফিলিস্তিনপন্থী কণ্ঠগুলোকে ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দিতে চায় একটি মহল। আইসিএনএর সম্মেলনে বিপুল মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে মুসলিম সম্প্রদায় ভয় পায়নি এবং পিছু হটবে না’।
সান ডিয়েগোর হামলার পর কমিউনিটি নিহতদের পরিবারের জন্য ৩৫ লাখ ডলারের বেশি তহবিল সংগ্রহ করেছে এবং মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করেছে বলেও জানান তিনি।
আইসিএনএর সভাপতি সাদ কাজমি জানান, সম্মেলনের নিরাপত্তায় তিন স্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল—নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী, একটি বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তিনি বলেন, “আমরা কৃতজ্ঞ যে আমরা এমন একটি দেশে বাস করি, যেখানে সংবিধান ও আইনের শাসন রয়েছে।”
কাজমির মতে, সান ডিয়েগোর হামলা মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষার সংকল্প আরও জোরদার করেছে। হামলার পরও ইসলামিক সেন্টারটি বন্ধ হয়নি।
তিনি বলেন, “বরং এখন মসজিদে মানুষের উপস্থিতি বেড়েছে। মানুষ বিশ্বাস করছে যে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ হলো নিজেদের ও নিজেদের কমিউনিটিকে আরও শক্তিশালী করা।”
নিউ জার্সির ইমাম টম ফাচিনে বলেন, “অধিকারকে এমন একটি ভূখণ্ড হিসেবে ভাবতে হবে, যা আপনাকে ধরে রাখতে হবে। আপনি যদি সক্রিয়ভাবে তা রক্ষা না করেন, তাহলে তা আপনার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হবে।”
সম্মেলনে বক্তব্য দেন ফিলিস্তিনি অভিবাসী লেকা করদিয়াও। গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হাতে আটক হন এবং এক বছরের বেশি সময় আটক থাকার পর চলতি মার্চে মুক্তি পান। তবে বহিষ্কারের আশঙ্কা এখনো কাটেনি। তারপরও তিনি বলেন, নিজের অবস্থানের জন্য তার কোনো অনুশোচনা নেই।
করদিয়া বলেন, “কথা বলার মূল্য আছে। এতে আমার স্বাস্থ্য, জীবন, এমনকি স্বাধীনতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবুও আমি চাই মানুষ রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকুক এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলুক।”