এক মাসে ১০ বার ভূমিকম্প, জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঝারি মাত্রার ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার এ কম্পন অনুভূত হয়। তবে এতে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪ এবং উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা। এ নিয়ে চলতি মাসেই ১০ বার ভূমিকম্পে কাঁপল দেশ। এতে জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানার দেওয়া বুলেটিনে বলা হয়, দুপুর ১টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে এ ভূকম্পন অনুভূত হয়। কয়েক সেকেন্ড এই কম্পন স্থায়ী হয়। রাজধানীর আগারগাঁও আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব ১৮৮ কিলোমিটার। অক্ষাংশ ২২ দশমিক ৫১ ডিগ্রি উত্তর এবং দ্রাঘিমা ৮৯ দশমিক ১৭ ডিগ্রি আগে সাতক্ষীরার আশাশুনি।

ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াৎ কবীর বলেন, এটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প। যেখানে ভূমিকম্পটি হয়েছে, সেটি কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এর আগেও এখানে ভূকম্পন হয়েছে। এ নিয়ে আশঙ্কার কোনো কারণ নেই।

এ অঞ্চলে ঘনঘন ভূমিকম্প সম্পর্কে তিনি বলেন, এ ধরনের ভূমিকম্প ন্যাচারালি মাঝেমধ্যে হয়ে থাকে। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে সবাইকে ভূমিকম্প সম্পর্কে এবং করণীয় নিয়ে সচেতন থাকতে হবে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস বলছে, উৎপত্তিস্থলে কম্পনের মাত্রা ৫ দশমিক ৩। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক হুমায়ূন আখতার গণমাধ্যমকে জানান, পরপর দুই দফা এই কম্পন অনুভূত হয়। উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরা বলে তিনিও জানান।

সাতক্ষীরার বাসিন্দারা ভূমিকম্পে জোরে ঝাঁকুনি অনুভব করে। অনেকে আতঙ্কিত হয়ে বাসাবাড়ি থেকে রাস্তায় নেমে আসে। ভারতীয় গণমাধ্যম বলছে, পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাসহ অন্যান্য জেলায়ও এ কম্পন অনুভূত হয়। সেখানে রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল ৫।

এর আগে গত বুধবার রাতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূকম্পন অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ১। বুধবারের ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমার। এটিও ছিল মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প।

এ নিয়ে চলতি মাসের ২৭ দিনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১০ দফা ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। অধিকাংশ কম্পনের মাত্রা মৃদু থেকে মাঝারি হলেও জনমনে আতঙ্ক বাড়ছে।

ইউএসজিএস ও ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় সিসমোলজিক্যাল সেন্টারের (ইএমএসসি) তথ্যমতে, এ মাসের ২৭ দিনে ভূমিকম্প হয়েছে ১০ বার।

এর আগের দিন ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টা ৪ মিনিট ৫ সেকেন্ডে আরেকটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দেশ। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৬ এবং উৎপত্তিস্থল ভারতের সিকিম অঞ্চলে, যা ঢাকা থেকে প্রায় ৪৫৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে।

চলতি মাসের প্রথম দিনও ভূকম্পন অনুভূত হয়। সেদিন ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় মৃদু ভূকম্পন হয়। রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৩। এর উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেট শহর থেকে পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্বে।

গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে পরপর দুটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দেশের বিভিন্ন এলাকা। ওই দুই কম্পনের মাত্রা ছিল যথাক্রমে— ৫ দশমিক ৯ এবং ৫ দশমিক ২, যার উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমার। একই দিন ভোরে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ৪ দশমিক ১ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয়।

এছাড়া ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেটের গোয়াইনঘাটে দুটি কম্পন অনুভূত হয় (মাত্রা ৩ দশমিক ৩ ও ৪)। ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতকে ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পও রেকর্ড করা হয়।

ঘনঘন ভূমিকম্পের প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বড় ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় ভবন নির্মাণে বিধিমালা মেনে চলা এবং প্রস্তুতি জোরদার করা জরুরি।

তারা বলছেন, মৃদু কম্পনগুলো বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস কি নাÑতা নিশ্চিত না হলেও সতর্কতা অবলম্বন ও সচেতনতা বৃদ্ধি এখনই প্রয়োজন।

এর আগে গত বছরের ২১ নভেম্বর শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে রাজধানীসহ দেশের অনেক জেলা। ইউএসজিএসের মতে, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির তীব্রতা ছিল ৫ দশমিক ৭, কেন্দ্রস্থল নরসিংদী। যা বিগত বছরগুলোতে অনুভূত হওয়া ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে অন্যতম তীব্র। ওইদিনের ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুরে তিন শিশুসহ ১১ জন নিহত, শতাধিক আহত এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়।

ওইদিন ভূমিকম্প শুরু হতেই শহরের বিভিন্ন বহুতল ভবন থেকে মানুষজন দ্রুত নিচে নামতে গিয়ে বহু আহত হয়। বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অনেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, এমন তীব্র ভূমিকম্প এর আগে কখনো দেখিনি।

ওইদিনের ভূমিকম্প সম্পর্কে মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা শায়লা পারভীন বলেন, ‘আমি রান্নাঘরে ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো মেঝে দুলছে, প্রথমে বুঝিনি। যখন দেখি জিনিসপত্র পড়ে যাচ্ছে, তখন দৌড়ে নিচে নামি। জীবনে এমন কাঁপন দেখিনি।’

গুলশানের একটি বহুতল ভবনের নিরাপত্তাকর্মী রফিক মিয়া জানান, বিল্ডিংটা এতো জোরে দুলছিল, আমরা সবাই ভয়ে জমে গিয়েছিলাম। সবাই চিৎকার করতে করতে নিচে নামছিল।

Jubokantho24 Ad
এ জাতীয় আরো সংবাদ
এ জাতীয় আরো সংবাদ