নতুন সরকার গঠনের এক দিনের মাথায় গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ঘটনায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা গেছে বিভিন্ন সাংবাদিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনকে। গণভোট ও সংস্কারের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশের অভিযোগে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এখন টিভি–এর চার সাংবাদিককে শোকজ করা হয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। একই সময়ে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদকে অপসারণের দাবিতে একদল বিএনপিপন্থী ব্যক্তি মব সৃষ্টি করেছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানায়, এখন টিভির চার সাংবাদিককে সাত দিনের জন্য শোকজ করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তাঁদের অফিসে না আসতে বলা হয়েছে। মানবসম্পদ (এইচআর) বিভাগ থেকে দেওয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে জুলাই আন্দোলনের পক্ষে দেওয়া স্ট্যাটাসের বিষয়ে কারণ দর্শাতে হবে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অনানুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের চাকরি আর বহাল রাখা হবে না—এমন বার্তাও দেওয়া হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখন টিভি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জুলাই আন্দোলনে আহত-নিহত সাংবাদিকদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘মুক্ত গণমাধ্যম মঞ্চ’-এর সভাপতি আব্দুল্লাহ মজুমদার বলেন, গণভোট ও সংস্কারের পক্ষে নিজের মতামত প্রকাশ করার কারণে কোনো সাংবাদিককে শোকজ বা চাকরিচ্যুত করা গ্রহণযোগ্য নয়। দ্রুত এ ঘটনার সুরাহার দাবি জানান তিনি।
বাসসে অনাস্থা, এমডির কার্যালয় ত্যাগ
এদিকে বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদের বিরুদ্ধে অনাস্থা জ্ঞাপন করেছেন সংস্থাটির ৯১ জন সাংবাদিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী। বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) তাঁরা বৈঠক করে তাঁর অধীনে কাজ না করার সিদ্ধান্ত নেন বলে ‘বাসস সাংবাদিক, কর্মচারী ঐক্য পরিষদ’ জানিয়েছে।
পরিষদের পক্ষ থেকে বলা হয়, নির্বাচনের কভারেজ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এ বিবেচনায় আগে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। নির্বাচন শেষে বৈঠকে অনাস্থা জানানোর সিদ্ধান্ত হয় এবং তা মাহবুব মোর্শেদকে জানানো হয়। পরে তিনি কার্যালয় ত্যাগ করেন।
তবে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে মাহবুব মোর্শেদ লেখেন, তাঁকে অপসারণের স্বীকৃত পদ্ধতি থাকা সত্ত্বেও অফিসে মব সৃষ্টি ও তালা দেওয়ার মাধ্যমে সরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনাগুলোকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে দলটি দাবি করে, সরকার গঠনের পরদিনই সাংবাদিকদের কোণঠাসা করার চেষ্টা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক ইঙ্গিত বহন করে।
এনসিপি শোকজপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের কর্মস্থলে ফিরিয়ে নেওয়া এবং বাসসের সম্পাদককে স্বপদে বহাল রাখার আহ্বান জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিটি পাঠিয়েছেন দলের দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনা।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর ভিপি সাদিক কায়েম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এসব ঘটনাকে ‘গণমাধ্যমের জন্য কালো দিন’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের ‘জোরপূর্বক চাকরিচ্যুতের’ চেষ্টা করা হয়েছে।
নেত্র নিউজের স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট বীথি সপ্তর্ষিও সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, এখন টিভির শোকজের ঘটনায় সরকারের চেয়ে মালিকপক্ষের ভূমিকাই বেশি প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর বিষয়ে সরকার বা বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া এখনও পাওয়া যায়নি। গণমাধ্যম অঙ্গনে চলমান এ পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলো তীব্র সমালোচনা করছে।