সাদিক ফারহান
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, ২০০১-২০০৬ সালের চারদলীয় জোট সরকারের আমলে শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) এবং মুফতী ফজলুল হক আমিনী (রহ.)-এর মতো প্রভাবশালী নেতারা সরকারে থাকা সত্ত্বেও কেন কওমি সনদের স্বীকৃতি চূড়ান্ত হয়নি? কেন আমাদের আরও ১২ বছর অপেক্ষা করতে হলো?
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এই ব্যর্থতার পেছনে বাইরের ষড়যন্ত্রের চেয়ে আমাদের 'অভ্যন্তরীণ বিরোধ' ও 'মতভিন্নতা' ছিল অনেক বড় প্রতিবন্ধক। বিশেষ করে বেফাক-এর তৎকালীন নীতিনির্ধারণী মহলে যে টানাপোড়েন ছিল, তা আজ ইতিহাসের অংশ।
কেন সেই উদ্যোগ ভেস্তে গিয়েছিল?
১. সরকারি নিয়ন্ত্রণের আতঙ্ক: বেফাকের একটি বড় অংশ মনে করত, সরকারের কাছ থেকে স্বীকৃতি নেওয়া মানেই মাদরাসার স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দেওয়া। তাদের ভয় ছিল, স্বীকৃতি নিলে সরকার মাদরাসার সিলেবাস, শিক্ষক নিয়োগ এবং অর্থায়নে হস্তক্ষেপ করবে। ফলে 'আযাদ' বা স্বাধীন মাদরাসাগুলো সরকারি আমলাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।
২. সিলেবাস আধুনিকায়ন নিয়ে দ্বিমত: সরকার শর্ত দিয়েছিল ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো সাধারণ বিষয়গুলো সিলেবাসে বাধ্যতামূলক করার। শাইখুল হাদিস (রহ.)-এর মতো নেতারা নমনীয় হলেও, বেফাকের একটি কট্টরপন্থী অংশ 'দরসে নিজামী'র এক চুল পরিবর্তনও মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। এই অনড় অবস্থান সরকারকে পেছনে হটার অজুহাত করে দেয়।
৩. স্বীকৃতির কৃতিত্ব ও নেতৃত্বের লড়াই: তৎকালীন কওমি অঙ্গনে নেতৃত্বের একটি সূক্ষ্ম লড়াই ছিল। শাইখুল হাদিস তখন রাজপথের হিরো। বেফাকের একটি অংশ আশঙ্কা করেছিল, এই স্বীকৃতি অর্জিত হলে এককভাবে শাইখুল হাদিসের প্রভাব কওমি সমাজে আকাশচুম্বী হয়ে যাবে। এই রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব আলেমদের এক টেবিলে বসতে দেয়নি।
৪. জামায়াতের কৌশলী চাল: এ কথা অনস্বীকার্য যে, জোটের শরিক হয়েও জামায়াত কওমি স্বীকৃতিতে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারা একদিকে মন্ত্রিসভায় স্বীকৃতির বিরোধিতা করত, অন্যদিকে বেফাকের রক্ষণশীল আলেমদের কানে এই মন্ত্র দিত যে—"স্বীকৃতি নিলে মাদরাসাগুলো এনজিও বা সরকারি স্কুলে পরিণত হবে।" এই দুমুখী নীতিতে আলেমদের মধ্যে আস্থার সংকট চরম আকার ধারণ করে।
৫. শেষ মুহূর্তের সেই চিঠি: ২০০৬ সালের মে মাসে যখন খালেদা জিয়া চূড়ান্ত ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন বেফাকের একটি প্রভাবশালী অংশ থেকে সরকারকে জানানো হয়—"আমাদের স্বীকৃতির দরকার নেই, আমরা যেমন আছি তেমনই থাকতে চাই।" আলেমদের এই স্ববিরোধী অবস্থানের সুযোগ নিয়ে তৎকালীন আমলারা ফাইলটি লাল ফিতায় বন্দি করে ফেলেন।
ইতিহাস আমাদের কী শেখায়?
মূলত জোট সরকারের আমলে আলেমরা 'স্বীকৃতি'র প্রশ্নে নিজেদের মধ্যে ঐক্যের চেয়ে অনৈক্যই বেশি লালন করেছিলেন। সেই অনৈক্যের সুযোগ নিয়েছিল জামায়াত, আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কওমি সমাজ। কিন্তু ২০১৮ সালে সেই একই আলেমদের যখন শেখ হাসিনা 'ঐক্যবদ্ধ' করলেন এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল সংবর্ধনা নিলেন, তখন কি আমরা ভেবেছিলাম এর পরিণতি কী হবে?
জোট সরকারের আমলে আলেমদের আপত্তির মুখেও সরকার ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো সিলেবাসে যুক্ত করার শর্ত দিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল কওমি শিক্ষার্থীরা যেন আধুনিক কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে। কিন্তু শেখ হাসিনা কোনো শর্ত বা সংস্কার ছাড়াই 'মাস্টার্স সমমান' দিয়ে দিলেন। ফলাফল? কাগজে-কলমে 'মাস্টার্স' ডিগ্রি থাকলেও ব্যবহারিক জ্ঞান ও ভাষাগত দক্ষতার অভাবে কওমি ছাত্ররা বিসিএস বা বড় কোনো করপোরেট চাকরিতে প্রবেশ করতে পারছে না। এই 'অসম্পূর্ণ স্বীকৃতি' কওমি সমাজকে শিক্ষিত সমাজে হাসির পাত্রে পরিণত করেছে।
শেখ হাসিনা খুব ভালো করেই জানতেন, কওমি সমাজকে বাগে আনতে হলে তাদের সেন্টিমেন্ট নিয়ে খেলতে হবে। তিনি 'কওমি জননী' উপাধি নিলেন এবং বিনিময়ে আলেমদের একটি বড় অংশকে রাজপথ থেকে সরিয়ে ড্রয়িং রুমে বন্দি করলেন। যে আলেম সমাজ ছিল ন্যায়ের পক্ষে আপসহীন কণ্ঠস্বর, তাদের একটি অংশকে তিনি ক্ষমতার মধু দিয়ে এমনভাবে বশ করলেন যে, গত দেড় দশকে ইসলামের ওপর এত আঘাত আসার পরও জোরালো কোনো প্রতিবাদ দেখা যায়নি।
২০১৮-এর সেই বিশাল সংবর্ধনা ছিল মূলত নির্বাচনের আগে কওমি ভোটব্যাংক এবং আলেমদের প্রভাবকে নিজের পক্ষে নেওয়ার একটি সাজানো নাটক। স্বীকৃতি দেওয়ার নাম করে তিনি আলেমদের দিয়ে নিজের রাজনৈতিক বৈধতা আদায় করে নিয়েছিলেন। আলেমদের এক টেবিলে বসানোর ক্রেডিট নিয়ে তিনি বিশ্বকে দেখালেন—"দেখো, কট্টরপন্থীরাও আমার নিয়ন্ত্রণে।"
কোনো পরীক্ষা পদ্ধতি বা মানদণ্ড ছাড়াই হঠাৎ 'মাস্টার্স' মর্যাদা দেওয়ায় সাধারণ শিক্ষিত সমাজের একটি বড় অংশ কওমি শিক্ষার্থীদের মেধা নিয়ে ট্রল করার সুযোগ পেয়েছে। অথচ কওমি মাদরাসায় ১০-১২ বছর যে হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে ছাত্ররা ইলম অর্জন করে, তার যথার্থ সম্মান পাওয়ার বদলে তারা আজ 'রাজনৈতিক করুণার পাত্র' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে
লীগ সরকার যে রাজনীতি করে গেছে, তা ছিল মূলত 'বিভাজন' এবং 'ব্যবহার'-এর রাজনীতি। তারা আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের শিক্ষিত করেনি। তারা আমাদের সম্মান দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের কণ্ঠস্বর কেড়ে নিয়েছে।
সংস্কার ছাড়া নিস্তার নেই
আজ নয় বছর পরও কি ভাবার সময় হয়নি এই প্রহসনের স্বীকৃতি আমাদের কী দিয়েছে? সংস্কার ছাড়া যে এই স্বীকৃতির মুলাসমান মূল্য নেই, তাও কি বুঝতে পারছি না? শিক্ষিত লোকজনের সামনে দাওরাকে মাস্টার্স বলতে লজ্জা লাগে। বামরা আমাদের আঘাত করে বলে, ফ্যাসিষ্টদের সহযোগী। হাসিনাপক্ষের লোক। হাসিনা কওমিওয়ালাদের সব দিয়েছে।
আচ্ছা বলুন তো, স্বীকৃতি পাইনি বলে আজ জোট সরকারকে দোষ দিলে, লীগের দেয়া স্বীকৃতির কারণে হাসিনাতোষণের সুযোগ কি আছে? কেন নেই? কারণ আমরা পরিবর্তন হইনি। প্রকৃতপক্ষে আমরা আজও স্বীকৃতি পাইনি। যেদিন সংস্কার ও নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত মেনে নিব, সেদিন স্বীকৃতির আলাপ সামনে আনা ভালো। নতুবা এ দিসে ও দেয়নি আলাপ তুললেই আঠারো সালের শোকরানা মাহফিল চোখের সামনে ভেসে উঠবে। যা আমাদের জন্য কলঙ্কের কালি আরও কালোই করেছে শুধু।
আজ নির্বাচনের আগমুহূর্তে বিএনপি জোট সরকারের আমলে স্বীকৃতি কেন হয়নি সেই ইস্যু তুলে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইল, অমনি আমরা একতরফা জামায়াতবিরোধিতার খাতা খুলে বসলাম। আমি শুধু একটা প্রশ্ন করতে চাই, নিজেদের কি আপনারা এক করতে পেরেছিলেন? যে আমিনি ও শাইখুল হাদিস বিক্রি করে খাই, তাদের কথা কি মেনেছিলেন?
নূন্যতম সংস্কার ও নীতিমালা না মানলে আপনাকে কেউ কেন স্বীকৃতি দিবে? হাসিনা তো নিঃশর্তে দিয়ে তার খেলা খেলে চলে গেল, আপনাদের ফায়দা হলো কী? সংস্কার না করলে ফায়দা হবেও না, লিখে রাখেন। তাই একতরফা কাউকে দোষ দিয়ে অন্যের খেলার গুটি না হয়ে নিজেদের সংশোধন করুন, পরিবর্তনের প্রত্যয় নিন।