সাংবাদিক আকবর হোসেন বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের তিন মাসের সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘ডাউন টু আর্থ অ্যাটিটিউড’ ছাড়া বিএনপির আর কোনো উল্লেখযোগ্য অর্জন আমি দেখছি না। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর আচরণ নিয়ে তীব্র সমালোচনাও করেছেন তিনি।
সম্প্রতি বেসরকারি যমুনা টেলিভিশনের টকশোতে অংশ নিয়ে আকবর হোসেন এসব কথা বলেন।
আলোচনায় তিনি ঝিনাইদাহে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীর ওপর হামলার ঘটনা তুলে ধরে বলেন, পুলিশ প্রথমে মামলা নিতে গড়িমসি করলেও পরে মামলা নেয়। একই ঘটনায় ছাত্রদল পাল্টা মামলা করার পর পুলিশ আরও সক্রিয় ভূমিকা নেয়।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হবে না। কিন্তু বিরোধী দলের সঙ্গে পুলিশের আচরণ বিশ্লেষণ করলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
আকবর হোসেন বলেন, ‘ঝিনাইদাহে যে ঘটনাটা ঘটেছে, মিডিয়ায় যতটুকু দেখেছি, যদি সেটাই সত্যি হয় তাহলে সেখানে নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীর কোনো দোষ দেখি না। তিনি কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে কথা বলে থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি মানহানির মামলা করতে পারতেন। কিন্তু তাকে ‘বেয়াদব’ আখ্যা দিয়ে থানা ঘেরাও করা বিএনপির ইমেজের জন্য ভালো হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে ‘মব কালচার’ তৈরি হয়েছে, তার পেছনে কারা ছিল তা একে একে উল্লেখ করা সম্ভব। ফলে প্রশ্ন ওঠে, পরিবর্তনটা কোথায় হলো?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মব বা বিশৃঙ্খলা হবে না বলে সরকার জোরালো অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু থানা ঘেরাও করে কাউকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা এবং সেখানে হামলার উদ্দেশ্যে লাঠিসোঁটা নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় সরকারের কী জবাব আছে, সেটি তিনি জানেন না।
তিনি বলেন, বিষয়টিকে শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি হিসেবে দেখলে হবে না, এর পেছনে রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে। এসময় তিনি অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশি গবেষক মোবাশের হাসানের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের উল্লেখ করেন।
আকবর হোসেন বলেন, মোবাশের হাসান লিখেছেন— বিএনপির কিছু মানুষ ইউনুস সরকার, এনসিপি ও জামায়াতকে সমালোচনা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগকে এমনভাবে ‘নরমালাইজ’ করছে, যেন গত ১৫ বছরের দমন-পীড়ন এসব গোষ্ঠী করেছে। অথচ গুম, জেল ও নির্যাতনের জন্য দায়ী ছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু বিএনপির অনেকে এখন সেসব প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান, এমনকি জুলাই আন্দোলন নিয়েও ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেন।
তার ভাষ্য, বিএনপির ভেতরে দুটি ধারা রয়েছে। একটি অংশ গণঅভ্যুত্থানকে সমর্থন করে এবং মনে করে এটি না হলে অনেক কিছুই সম্ভব হতো না। অন্যদিকে আরেকটি অংশ ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। এখন কোন ধারা প্রাধান্য পাচ্ছে, সেটি বিএনপিকেই নির্ধারণ করতে হবে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আকবর হোসেন। তিনি বলেন, সম্প্রতি সিলেটে এক র্যাব সদস্য ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক বলা যায় না।
তিনি বলেন, “আমি যদি ২৫ বছর আগের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে মনে হচ্ছে ২০০১ সালের পরবর্তী পরিস্থিতির সম্ভাবনা আবারও উঁকি দিচ্ছে।”
বিএনপির তিন মাসের কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে গিয়ে আকবর হোসেন বলেন, “এই তিন মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ডাউন টু আর্থ অ্যাটিটিউড ছাড়া বিএনপির আর কোনো অর্জন দেখি না। তার সাদাসিধে চলাফেরা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ ইতিবাচক। কিন্তু সেই আচরণ বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে পৌঁছেছে কি না, তার কোনো লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না।”
তিনি আরও বলেন, নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীর ওপর হামলার ঘটনায় ছাত্রদলের কিছু নেতার উল্লাস প্রকাশের বিষয়টি উদ্বেগজনক। তার দাবি, রাজনৈতিক বিতর্কে জবাব দিতে না পেরে ভিন্নভাবে প্রতিপক্ষকে ‘ব্র্যান্ডিং’ করার চেষ্টা হচ্ছে।
আকবর হোসেন বলেন, “সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির চিন্তার রেখা একটা জায়গায় গিয়ে মিলে যাচ্ছে। নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীকে মারলে আওয়ামী লীগের লোকজন যেমন খুশি হয়েছে, বিএনপির অনেকেও খুশি হয়েছে।”
শেষে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত আচরণে আশাবাদী হওয়ার কিছু উপাদান থাকলেও বিএনপির নেতাকর্মীদের আচরণ তাকে খুব বেশি আশাবাদী করতে পারছে না।