
তারাবি- হাফেজ জীবনের এক অনন্য অধ্যায়। এ যেন আত্মার ভেতর জেগে ওঠা এক আলোকিত ঋতু। সুখ-দুঃখ, হাসি-উল্লাস, ক্লান্তি-তৃপ্তি আর গভীর ইবাদতমুখর মুহূর্তের এক অপূর্ব সমাহার। রমজানের নীরব রাতগুলোতে কুরআনের সুরেলা তিলাওয়াত যখন মসজিদের দেয়াল ছুঁয়ে আকাশের দিকে উড়ে যায়, তখন হাফেজের হৃদয়েও বেজে ওঠে এক অদৃশ্য অনুরণন- এ অনুভূতি ভাষায় ধরা কঠিন।
তারাবিকে নিয়ে লেখা যেতে পারে হাজার পৃষ্ঠা, অগণিত স্মৃতিচারণ। তবুও তারাবির রাতগুলোর আবেশ, সেই দীর্ঘ কিয়ামের ক্লান্ত-সুন্দর অনুভূতি, সিজদায় গড়িয়ে পড়া অশ্রুর স্বাদ- এসব কখনোই পূর্ণভাবে শব্দে ধরা যায় না। এটি শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি এক আত্মিক যাত্রা, এক নীরব সাধনা, এক ভালোবাসার বন্ধন- হাফেজ ও কুরআনের মাঝে।
যুবকণ্ঠের পাঠকদের জন্য সেই অনুভূতির কিছু ঝলক তুলে ধরছেন- হাবীবুল্লাহ সিরাজ।
হাফেজ জাকির বিন কাসেম
মসজিদ : হাজিপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, নরসিংদী
হাফেজ জাকির বিন কাসেম শুধু একজন হাফেজ নন, তিনি একজন নওজোয়ান আলেমও বটে। তেলাওয়াত যেমন মধুর, অনুবাদ-তাফসিরেও তেমনি প্রভাবক। তার তেলাওয়াতে মুসল্লিরা যেমন আত্মিক শান্তি লাভ করে, তাফসিরেও পায় আলোর দিশা। আজ প্রায় ২০ বছর প্লাস তারাবি পড়াচ্ছেন।
হাফেজ জাকির বিন কাসেম নিজের তারাবির অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, তারাবি তো আমাদের [হাফেজ সাহেবদের] সারা বছরের অপেক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। এ দিনগুলোর জন্য প্রত্যেক হাফেজ সাহেব অপেক্ষা করেন। যদি আমি এভাবে বলি—মনে হয় না বাড়িয়ে বলা হবে—কুরআন শরিফ ইয়াদ (মুখস্থ) রাখার এক অপার্থিব মাধ্যম তারাবি। এই কারণে কখনও তারাবি ছাড়তে চাইনি। যদিও তারাবি পড়ানোটা বিশাল পেরেশানি, আমানতদারি ও কঠিনতর দায়িত্বের কাজ। তারাবি না পড়িয়ে থাকাও যায় না।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তারাবি পড়ানোর অভিজ্ঞতা থেকে বলছি—আমাদের বাঙালি সমাজে তারাবি পড়ানো যেমন সুখ, তেমন দুঃখও আছে। দুঃখের কারণ হলো কিছু অবুঝ মুসল্লি। তারা না জানে কুরআন, না জানে তেলাওয়াতের মান-মর্যাদা। এরা সুরের পাগল। সুর হলে শত ভুলও তাদের চোখে কিছু না। ধীরে পড়ালে বলবে দ্রুত পড়ান; দ্রুত পড়ালে বলবে ধীরে পড়ান। এই স্মৃতিগুলোও কিন্তু হাফেজ সাহেবদের জীবনে কম যায় না। তবে সব ছাড়িয়ে, ছাপিয়ে তারাবির মহান দায়িত্বের সাথে কুরআনকে জীবন্ত করার মহান মিশনই হলো আমাদের তারাবির ইমামতি।
আহমাদ উল্লাহ (ইউশা)
মসজিদ : সালিম বিন আব্দুর রহমান মসজিদ, রিয়াদ, সৌদি আরব
হাফেজ আহমাদ উল্লাহ এখনও পড়াশোনার গণ্ডি থেকে বের হননি। আজকে তারাবি পড়াচ্ছেন প্রায় পনেরো বছর। সেই শৈশব থেকে তারাবির জার্নি শুরু। আজ দেশের বাইরে সুনামের সাথে তারাবি পড়াচ্ছেন সৌদি আরবের রিয়াদে। আলেম বাবার সন্তান হওয়ার সুবাদে তারাবির ইমাম বনে গেছেন অন্যদের থেকে একটু আগেই। অতীতস্মৃতির অ্যালবাম হিসেবে জীবনের বুকশেলফে জমা হয়েছে হাজার ভালোলাগা আর কুরআনপ্রেমের অমলিন স্মৃতিসম্ভার।
আহমাদ উল্লাহ বলেন, তারাবি তো কুরআন দ্রুত তেলাওয়াত করে শেষ করা নয়; এই তারাবি আমাকে তাদাব্বুরে কুরআনের পথ দেখায়। সৌদিতে তারাবি হওয়ায় সেই সুযোগটি বেশ উপভোগ করছি। এই সময়টির জন্য সারাটা বছর অপেক্ষা করি—কখন আসবে রমজান, কখন শুরু হবে তেলাওয়াতের অপার্থিব আয়োজন, সালাতুত তারাবিহ। অনেকে এই তারাবিকে বোঝা মনে করেন, কিন্তু আমার কাছে মনে হয়—আল্লাহপ্রেমের বেহেশতি সুখ তারাবি। তারাবিতে আমি কুরআনকে যেভাবে জড়িয়ে ধরি, বছরের অন্য সময় তা হয়ে ওঠে না। তেলাওয়াত হলেও আল্লাহপ্রেমের অপার্থিব সুখটা অনুপস্থিত থাকে। সেহরি, রমজান, ইফতার ও তারাবি আরও সুখের হয় কেন জানেন? এতে আছে পিতামাতার মুখ উজ্জ্বল করার মহান ব্রত, আত্মীয়-স্বজনদের ভালোবাসা, মুসল্লিদের ছোট ছোট ভালোবাসা-মুসাফাহা। কখনও কখনও সকলের অগোচরেই চোখ থেকে শোকরিয়ার পানি বেরিয়ে আসে—এত সম্মান আল্লাহ আমাকে দিলেন! তারাবির অনুভূতি নিয়েই আরেকটা তারাবির অপেক্ষা করি। যতদিন বাঁচব, আল্লাহ সুস্থ রাখবেন, ততদিন তারাবির জার্নিটা চালিয়ে যাব।
হাফেজ ফেরদাউস সা’দী
মসজিদ : আল্লাহর দান জামে মসজিদ, বরিশাল সিটি
প্রায় এক যুগ ধরে তারাবির ইমামতি করছেন হাফেজ ফেরদাউস সা’দী। প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের রৌশনিতে উজ্জ্বল এ তরুণ কুরআনের ভালোবাসা থেকে তারাবির সাথে লেগে আছেন সেই কিশোর বয়স থেকেই। বরাবরের মতো এবারও বরিশাল সিটির সবচেয়ে আলোচিত মসজিদ—আল্লাহর দান জামে মসজিদে তারাবি পড়াচ্ছেন। তারাবির ইমামতির পাশাপাশি তিনি প্রতিদিনকার তেলাওয়াতকৃত আয়াতগুলোর কিছুটা অনুবাদ করে মুসল্লিদের শোনান। ফলে তেলাওয়াতের সুবাসের সাথে কুরআনের অর্থের সুবাসও ছড়িয়ে পড়ে মুসল্লিদের মাঝে।
হাফেজ ফেরদাউস সা’দী বলেন, তারাবি পড়ানোর সুখটাই এখানে—হাজারও মুসল্লি আমার জন্য অপেক্ষা করে, আমার সাথে মুসাফাহা করার জন্য খোঁজ করে, আমাকে দূর থেকে দেখে বলে, ‘ওই যে আমাদের হাফেজ সাহেব।’ এই সুখগুলো সারাবছর আমাকে তাড়িত করে; আবার এগুলোর জন্য পীড়িতও করে। ফলে আমি রমজানের অপেক্ষায় কাটাই পূর্ণ বছর। যখনই রজব, শাবান ও শবে বরাত আসে, তখন থেকেই আরও আবেগী হয়ে উঠি কুরআনের জন্য—এই তো কুরআনের মাস আমাকে ডাকছে। এই হাফেজ সাহেব তাঁর দীর্ঘ তারাবির অভিজ্ঞতা থেকে অন্যদের পরামর্শ দিচ্ছেন—লোকমা দেওয়া ও গ্রহণটা স্বাভাবিক হওয়া উচিত। যদি এতে কারও ভয় বা জড়তা থাকে, তাহলে খতম না হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। ‘লোকমা গেলেই হাফেজ সাহেব দুর্বল’—এই কনসেপ্ট পাল্টাতে হবে। সৌদিসহ আরববিশ্বে লোকমাকে একেবারেই স্বাভাবিক ধরা হয়। আস্তে-ধীরে তেলাওয়াত হলে অর্থের প্রভাব পড়ে মুসল্লিদের মধ্যে; তখনই তারাবির প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।
হাফেজ আশরাফুজ্জামান
মসজিদ : বায়তুর রহমান জামে মসজিদ, মৌলভীবাজার
হাফেজ আশরাফুজ্জামান কওমি মাদরাসায় মেশকাত জামাত পড়েন। তারুণ্যের উচ্ছ্বলতা চোখেমুখে। এবারের তারাবি সপ্তম তারাবি। তারাবি নিয়ে তার অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি বিস্তর—সবগুলো বলা যায় না, লেখাও যায় না। তার মতে, হাফেজ হওয়ার অন্যতম সুখ হলো নিয়মিত তারাবির ইমাম হওয়া। অনেক হাফেজ সাহেব আছেন, সুযোগ থাকার পরও তারাবির ইমামতি করেন না। মুরুব্বিরা বলেন, এটা হাফেজ সাহেবদের জন্য অসুন্দর, অনুচিত কাজ।
হাফেজ আশরাফুজ্জামান নিজের অনুভূতি শেয়ার করেন এভাবে—সারা বছর কুরআনকে যেভাবে তেলাওয়াত করি, রমজানে সেই তেলাওয়াত দ্বিগুণ হয়ে যায়। না, দ্বিগুণ বললে ভুল হবে—কতগুণ বেড়ে যায়, আল্লাহই ভালো জানেন। রমজানে আমার ব্যস্ততার নাম হয় তেলাওয়াতে কুরআন; সাথে যুক্ত হয় মুসল্লিদের আত্মিক ভালোবাসা, ভালোলাগা। ভাবি, হায়! যদি আমি হাফেজ না হতাম, যদি কুরআন তেলাওয়াত করতে না পারতাম! অনেক বয়সী মুসল্লি এসে জড়িয়ে ধরে কাঁদেন। আফসোস করে বলেন, ‘আহ! যদি হাফেজ হতে পারতাম। নিজেও হতে পারলাম না, সন্তানকেও বানাতে পারলাম না।’ এই বলে আবার জড়িয়ে ধরেন। বাসাবাড়ি থেকে মহিলারা হাদিয়া পাঠান, আবেগমথিত কথা, দোয়া ও আবেদন পাঠান; দোয়া চান। প্রতি বছরই এমনসব দৃশ্যের মুখোমুখি হই। কুরআন মানুষকে সম্মানিত করে; এর সামান্যতম ঝলক দেখি নিজের সাথে, আর আল্লাহর শোকর আদায় করি।
হাফেজ মুহাম্মাদ খালিদ বিন আতিক
মসজিদ : বাইতুর রিয়াদ- কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, ভুলতা, নারায়ণগঞ্জ
এই হাফেজ সাহেবের বয়সের ঘর এখনও ১৮ পার হয়নি। জীবনস্মৃতির সামিয়ানায় সেঁটে আছে তারাবির অভিজ্ঞতা অনেক। এবারও তারাবি পড়াচ্ছেন বড় এক মসজিদে—ভরপুর মুসল্লি আর স্পিকারের শব্দে সুন্দর আবহ। সাহস, সুখ, ভয়—মিলেমিশে একাকার।
হাফেজ মুহাম্মাদ খালিদ সাইফুল্লাহ সাইফ নিজের স্মৃতি আর অনুভূতি জানান—রমজান তো কুরআনের মাস। সেই কুরআনের তেলাওয়াত নিয়ে মুসল্লিদের সামনে দাঁড়ানো মানে শুধু শব্দ উচ্চারণ করা নয়; বরং আল্লাহর কালামের বাহক হয়ে দাঁড়ানো। প্রতিটি হরফ, প্রতিটি মাদ, প্রতিটি গুন্নাহ, প্রতিটি সাকিন ও ওয়াকফ আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়—আমি কেবল একজন ইমাম নই; আমি এক মহান দায়িত্বের ধারক, এক নাজুক আমানতের প্রহরী। এ ভাবনাগুলো আমাকে কখনও কাঁপন ধরিয়ে দেয়, আবার কখনও অশ্রুজলে সিক্ত করে।
জীবনে প্রথমবার যখন তারাবি পড়ানোর সুযোগ পেলাম, হৃদয় আনন্দে ভরে উঠেছিল। কিন্তু সেই আনন্দের অপর পাশে লুকিয়ে ছিল এক গভীর ভয়—আমি কি আল্লাহর কালামের হক আদায় করতে পারব? আমার কণ্ঠ কি যথেষ্ট পবিত্র? আমার অন্তর কি যথেষ্ট খাঁটি? রমজানের প্রতিটি রাত আমাকে নতুন করে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেয়, নতুন করে নিজের ভেতর তাকাতে বাধ্য করে। তারাবি আমার কাছে নিছক ইমামতি নয়; এটি আত্মশুদ্ধির এক দীর্ঘ সফর, যেখানে আয়াতের আলোয় প্রথমে আমি নিজেকেই দাঁড় করাই, তারপর অন্যদের সামনে কুরআনের বাণী পৌঁছে দিই।




