প্রিন্ট এর তারিখঃ মে ২৬, ২০২৬, ২:০৬ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ মে ২৫, ২০২৬, ৪:৫৭ পূর্বাহ্ণ

টানা ৩ বছর ধরে গাজায় ইসরায়েলির অব্যাহত হামলায় মানুষ হত্যার পাশাপাশি হত্যার শিকার হয়েছেন পশুরাও। চলমান যুদ্ধে খাদ্য ও আবাসন সংকটে কুরবানি করার মতো কোন পশু আর অবশিষ্ট নেই। এছাড়াও গাজায় দখলদার ইসরায়েলির বাহিনীর অবরোধে গবাদি পশু আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এতে পবিত্র ঈদুল আজহায় পশু কুরবানির ধর্মীয় রীতি ও উৎসবের আনন্দ উদযাপন করতে পারছেনা গাজাবাসী।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আইয়ের’ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে গাজায় একসময় ঈদুল আজহাকে ঘিরে সবচেয়ে ব্যস্ত সময় কাটাতেন খ্যাতনামা পশুপালক মাজেন আল-জেরজাভি। প্রতিবছর তিনি শত শত ভেড়া ও ছাগল বিক্রি করতেন, কারণ কোরবানির জন্য পশু কিনতে ভিড় জমাতেন স্থানীয় মানুষ।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গাজা সিটির এই ব্যবসায়ী এখন ছোট একটি রেস্তোরাঁ চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সেখানে তিনি ব্যবহার করছেন সীমিত পরিমাণে গাজায় প্রবেশ করতে দেওয়া হিমায়িত মাংস।
মাজেন আল-জেরজাভি বলেন, “এই সময়টাতে আমি প্রায় ২০০টি ভেড়া ও গরু বিক্রি করতাম। এখন আমার কাছে একটি পশুও নেই। গাজায় কোনো জীবিত পশু ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।” তার অভিযোগ, ইসরাইল এমন আচরণ করছে যেন গাজার মানুষ এখানে সাময়িকভাবে বসবাস করছে। তাদের কেবল ন্যূনতমভাবে টিকে থাকার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহায় সামর্থ্যবান মুসলমানরা ভেড়া, ছাগল, গরু বা উট কোরবানি করেন। সেই মাংস আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
যুদ্ধের আগে প্রতি বছর ঈদের আগে গাজায় ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার ভেড়া ও বাছুর আমদানি করা হতো। কিন্তু টানা তৃতীয় বছরের মতো এবারও গাজার ফিলিস্তিনিরা কোরবানির অন্যতম প্রধান ধর্মীয় রীতিটি পালন করতে পারছেন না।
গাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে গাজার পশুপালন খাতের ৯০ শতাংশের বেশি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে জীবিত পশু প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। ফলে পশুর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। যুদ্ধের আগে একটি ভেড়ার দাম ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার। বর্তমানে অবশিষ্ট অল্প কয়েকটি পশুর দাম উঠেছে প্রায় ৭ হাজার ডলার পর্যন্ত।
জেরজাভি বলেন, “গাজায় এখন পশু এতটাই কমে গেছে যে আমি ব্যবসাই বন্ধ করে দিয়েছি।” তিনি জানান, বিদেশে থাকা অনেক ফিলিস্তিনি এখনো গাজায় থাকা স্বজনদের জন্য কোরবানির পশু কিনতে চান। তবে তিনি তাদের প্রায়ই নিরুৎসাহিত করেন।
তার ভাষায়,“আমি বলি, একটি ভেড়ার পেছনে এত টাকা খরচ না করে বরং ৫০ কেজি হিমায়িত মাংস কিনুন। একটি ভেড়ার জন্য ২০ হাজার শেকেল খরচ করার বদলে সেই অর্থ দিয়ে একটি পরিবারের বিয়ের খরচও চালানো সম্ভব।”
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) জানিয়েছে, গত বছরের নভেম্বর নাগাদ গাজার অন্তত ৮০ শতাংশ ভেড়া এবং ৭০ শতাংশ ছাগল মারা গেছে বা যুদ্ধের কারণে ধ্বংস হয়েছে।
শুধু পশুই নয়, খামার, খাদ্য গুদাম, পশু চিকিৎসাকেন্দ্র ও পানির অবকাঠামোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাদ্যের সংকটে অনেক পশুকে বাঁচিয়ে রাখাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
জেরজাভি বলেন, “আমরা পশুগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে পাস্তা ও যা পাওয়া গেছে তাই খাইয়েছি। কিন্তু আশপাশে বোমা হামলার পর অনেক পশু মারা যায়।”
তিনি আরও জানান, বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার কারণে মানুষ নিজেদের জীবন বাঁচাতেই ব্যস্ত ছিল। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে কম দামে পশু বিক্রি করে দিয়েছেন বা জবাই করেছেন।
গাজার কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে যেখানে প্রায় ৬০ হাজার ভেড়া ও ছাগল ছিল, বর্তমানে তা কমে মাত্র ৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে। গরু প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাফাত আসালিয়া বলেন, “বর্তমানে যে অল্প কিছু পশু বেঁচে আছে, সেগুলো মূলত যাযাবর পশুপালকদের কাছে রয়েছে এবং ঈদের বাজারে বিক্রির জন্য পাওয়া যাচ্ছে না।” তিনি জানান, পানির সংকটের কারণে পশুপালন খাত পুনরুদ্ধারেরও কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই।
গাজা সিটির স্কুলশিক্ষক মুহাম্মদ আবুরিয়ালা বলেন, “মনে হয় তিন বছর ধরে আমরা ঈদই উদযাপন করিনি। কোরবানি ও তা ভাগাভাগির যে অনুভূতি, তা আর নেই। কোরবানি ছাড়া যেন ঈদও নেই।”
তিনি বলেন, শুধু পশুর সংকটই নয়, অধিকাংশ পরিবার এখন নিত্যদিনের খাবার জোগাড় করতেও হিমশিম খাচ্ছে। আবুরিয়ালার মতে, পশু আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা শুধু খাদ্য সংকটই তৈরি করছে না, বরং হাজারো মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেও ধ্বংস করছে।
তিনি বলেন, “যদি গাজায় পশু প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হতো, তাহলে পশুচিকিৎসক, খামারি, কৃষক, কসাই ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীসহ বহু মানুষ উপকৃত হতেন। কিন্তু ইসরাইল গাজার সমাজকে পঙ্গু করে দিতে এবং আত্মনির্ভরশীল হতে বাধা দিতেই এমন করছে।”