
বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের ৫০ সদস্যের মন্ত্রিপরিষদের মধ্যে ৩৫ জনই হলফনামায় নিজেদের পেশা হিসেবে ব্যবসার কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ মোট সদস্যের ৭০ শতাংশ ব্যবসায়ী। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের হলফনামা পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
মন্ত্রীদের মধ্যে ১৯ জন এবং প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে ১৬ জন ব্যবসাকে পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ব্যবসার পর সবচেয়ে বেশি স্থান পেয়েছেন আইনজীবীরা। কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী একাধিক পেশার কথাও হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।
মন্ত্রিপরিষদের মাত্র দুজন নিজেদের পেশা ‘রাজনীতিবিদ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান পেশা হিসেবে ‘রাজনীতি’ লিখেছেন। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনও পেশায় রাজনীতিবিদ উল্লেখ করেছেন।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ২৫ জন মন্ত্রী শপথ নেন। তাঁদের মধ্যে দুজন টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হয়েছেন। শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
মন্ত্রীদের মধ্যে ১৯ জন ব্যবসায়ী
হলফনামা অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর; অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ; মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু; ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ও ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুসহ ১৯ জন মন্ত্রী ব্যবসাকে পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এ ছাড়া বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির; শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী; তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন; কৃষি, খাদ্য ও মৎস্য-প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ; বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম (রিতা); পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু; গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের; স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমও ব্যবসাকে পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে ১৬ জন ব্যবসায়ী
প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত; বাণিজ্য ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত; শিল্প প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম; পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম; কৃষি প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু; পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ; যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক; সড়ক পরিবহন প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ ও রাজিব আহসানসহ ১৬ জন ব্যবসায়ী।
আইনজীবী আছেন ৬ জন
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী; আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান; পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান; প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন; ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এবং নারী ও শিশু এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন আইন পেশায় যুক্ত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দ্দিন আহমদ আইন ও ব্যবসা—দুই পেশার কথাই উল্লেখ করেছেন।
চিকিৎসক ও অন্যান্য পেশা
মহিলা, শিশু ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত পেশায় চিকিৎসক। টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া ড. খলিলুর রহমান কূটনীতিক ও অর্থনীতিবিদ। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা; অর্থ প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি প্রকাশক; তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী তথ্যপ্রযুক্তি–বিষয়ক পেশাজীবী।
এ দিকে মন্ত্রিপরিষদে ব্যবসায়ীদের আধিক্য নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এটি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বার্থের দ্বন্দ্ব এড়াতে কঠোর নৈতিক চর্চা প্রয়োজন।
অন্যদিকে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)-এর সভাপতি তাসকীন আহমেদ বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁর ভাষ্য, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে।
সংসদেও ব্যবসায়ীদের আধিক্য
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জয়ী ১৭৪ জন সংসদ সদস্যের (৫৯ শতাংশ) পেশা ব্যবসা। সরকার গঠনকারী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২০৯টি আসন পেয়েছে; দলটির জয়ী প্রার্থীদের ৬৯ শতাংশই ব্যবসায়ী। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া জামায়াতে ইসলামীর ২৯ শতাংশ বিজয়ী প্রার্থী ব্যবসায়ী বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ীর হার ছিল ১৮ শতাংশ। সময়ের সঙ্গে সংসদে ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি বেড়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সংসদেও অর্ধেকের বেশি সদস্য ব্যবসায়ী।




