আল আবিদ শাকের
পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে জামিয়াতুত তারবিয়াহ আল ইসলামিয়া পরিচালিত ‘আরবি ভাষা’, ‘ইংরেজি ভাষা’ ও ‘তাইসির জামাতের প্রস্তুতিমূলক’ কোর্সে অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বিশেষ নসিহত প্রদান করেন জামিয়ার মুদির আল্লামা মামুনুল হক।গতকাল (২মার্চ) বাদ জোহর কলাতিয়াস্থ জামিয়ার নিজস্ব ক্যাম্পাসে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন,
প্রতিটি মানুষের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিগতভাবে মেধা ও যোগ্যতার এক অনন্য সন্নিবেশ করেছেন। হাদীস শরীফে এসেছে, মানুষ হলো খনির মতো। মাটির নিচে যেমন স্বর্ণ, রুপা, তেল, গ্যাস কিংবা ইউরেনিয়ামের মতো মূল্যবান সম্পদ সংরক্ষিত থাকে, মানুষের ভেতরটাও ঠিক তেমনই। স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখলে মাটিকে কেবল মাটিই মনে হয়, যেখানে বড়জোর ফসল ফলে; আবার অনেক মাটি এমনও থাকে যেখানে কোনো ফসলই হয় না। কিন্তু গভীর অনুসন্ধান চালালে দেখা যায়, সেই সাধারণ মাটির নিচেই লুকিয়ে আছে মহামূল্যবান রত্নভাণ্ডার। হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে সেই খনির সাথেই উপমা দিয়েছেন। বাইরে থেকে কাউকে অতি সাধারণ মানুষ মনে হলেও যদি তার ওপর সঠিক পরিচর্যা করা হয় এবং তার ভেতরের সুপ্ত রত্নের সন্ধান চালানো হয়, তবে স্বর্ণের চেয়েও দামী যোগ্যতার দেখা পাওয়া সম্ভব। তবে খনির সন্ধান পেয়েই কাজ শেষ হয়ে যায় না; বরং সেই রত্নকে সেখান থেকে উত্তোলন করা এবং অনেকগুলো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সঠিকভাবে কাজে লাগানোই হলো আসল বিষয়, যা মানুষের জন্য প্রকৃত কল্যাণ বয়ে আনে।
তিনি আরও বলেন, নিজের ভেতরের এই রত্ন উদ্ধার করা এবং নিজেকে উম্মাহর জন্য প্রয়োজনীয় হিসেবে গড়ে তোলা প্রত্যেক তালিবে ইলমের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই সাধনার প্রথম ধাপ হলো নিজের ভেতরের সুপ্ত প্রতিভাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা। অনেকে নিজের প্রতিভা খুঁজতে গিয়ে এক গোলকধাঁধায় বা ময়দানে তিহের মাঝে ঘুরপাক খায়। তারা একই সাথে আলী মিয়াঁ নদভীর মতো মুফাক্কির, তাকি উসমানীর মতো লেখক, জিয়াউর রহমান ফারুকীর মতো বক্তা এবং তারেক জামিলের মতো মুবাল্লিগ হতে চায়। ফলশ্রুতিতে শেষ পর্যন্ত কোনোটিই হওয়া সম্ভব হয় না। তাই আমি কোন কাজের জন্য উপযুক্ত , তা নিজেকেই খুঁজে বের করতে হবে। নিজের ভেতরে কী আছে, তা অন্য কারো চেয়ে মানুষ নিজেই সবচেয়ে ভালো জানে। তাই পৃথিবীতে যারা যোগ্য ও সফল, তাঁদের দেখে চিন্তা করা প্রয়োজন যে তাঁদের মধ্যকার কোন যোগ্যতাটি আমার মাঝে বিদ্যমান। এরপর নিজের সেই চিহ্নিত প্রতিভা নিয়ে একজন অভিজ্ঞ মুরুব্বির সাথে পর্যালোচনা করা চাই। তিনি যদি সায় দেন যে এই বিশেষ গুণটি তোমার মধ্যে আছে, তবেই সেই প্রতিভাকে উত্তোলনের জন্য এক নিরন্তর সাধনার পথে নামা উচিত।
ছাত্রদের বিশেষভাবে সতর্ক করে বলেন, এই প্রতিভা অন্বেষণের পথে অনেক সময় ছাত্ররা এক ধরণের ধোকায় পড়ে। তারা ভাবে—আমি তো বড় হয়ে হুজুর হব, ইংরেজি পড়ে কী লাভ? আমি তো আর হিসাবরক্ষক হব না, তাই অংক শেখার কী দরকার? কিংবা উর্দু-ফারসি তো এই যুগে চলে না, এগুলো পড়ে কী হবে? এভাবে একটি একটি করে বাদ দিতে দিতে এক সময় তারা সবকিছুই বাদ দিয়ে দেয়। অথচ আমাদের দরসে নেজামীতে প্রত্যেকটি বিষয় ঠিক ততটুকুই যুক্ত করা হয়েছে, যতটুকু না হলেই নয়। এই সুবিন্যস্ত সিলেবাস থেকে যখন আমরা কোনো বিষয় বাদ দিয়ে দেই, তখন আমাদের যোগ্যতায় একটি বড় ধরণের কমতি থেকে যায়। অতএব, কোনোভাবেই এই ধোকায় পড়া যাবে না। এভাবেই নিজেকে উম্মাহর জন্য যোগ্য ও অপরিহার্য হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।