আবু ইমতিনান রায়েদ
গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক মাদ্রাসায় আজ থেকে তেরো বছর পূর্বে আমার হিফজ সম্পন্ন হয়,আমাদের বাড়ি গ্রামে হলেও দাদার বাড়ি ছিলো কক্সবাজার শহরে,পরিবারের একমাত্র কুরআনের হাফেজ হিসেবে আমার প্রতি ছিলো সবার অন্যরকম এক আবেগ ও ভালোবাসা ,
তাই হিফজ সম্পন্ন হতেই ডাক পড়ে যায় দাদাবাড়ির ঐতিহ্যবাহী মসজিদে,এটি কক্সবাজার শহরের প্রাণকেন্দ্র কলাতলী মোড়ের বিকল্প মেরিন ড্রাইভ রোডে অবস্হিত,
প্রথম রমজান,নির্ধারিত সময়ে মসজিদে উপস্হিত হয়ে দেখলাম,কানায় কানায় পূর্ণ পুরো মসজিদ,কোথাও যেন তিল ধারণের ঠায় নেই, মনে মনে ভাবতে লাগলাম,এরা সবাই কি আমার পেছনে নামাজ পড়বে আজ?!
ভাবছিলাম আর এক প্রচ্ছন্ন অনুভূতি হৃদয়কে আন্দোলিত করছিলো,নামাজের সময় যতই ঘনিয়ে আসতে লাগলো,হৃদয়ের সেই আল্হাদটা বিষণ্নতায় রূপ নিলো ধীরে ধীরে,কাঁপা কন্ঠে আমার জন্য নির্ধারিত অংশ শেষ করলাম,
মনে হচ্ছিলো যেন,একটা পাথর আমার মাথার উপর দিয়ে সরে গেলো,তারাবীহর ইমামতি শেষে যে শান্তির স্পর্শ পাই,সেটিই আমার রমজানের প্রকৃত আনন্দ,গ্রামের চেয়ে শহরের পরিবেশ থাকে বেশ আলাদা,শহরে রমজান যেন ব্যস্ততার আরেক নির্মম চিত্র,যানজটের মধ্যে ইফতার হাতে দাঁড়িয়ে থাকা,অফিস শেষে দৌঁড়,বাজারে ভিড়-মনে হয় যেনো শহরে রমজানকে সময়ের সাথে দৌঁড়াতে হয়,
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় এই বিষয়টি উপলদ্ধি করতে পেরেছি যে,শহরে সারাদিনের ক্লান্তিকর দৌঁড়ঝাপের পরেও অনেক মুসল্লি তারাবীহতে ধীর কেরাত চান,সারাদিনের ব্যস্ততার ফাঁকেও তারাবীহের মেহরাবে একটুখানি স্হিরতা খুঁজেন তাঁরা,যেন কুরআনের শব্দমালা ব্যস্ত জীবনের ভেতর একটুখানি প্রশান্তির প্রলেপ একেঁ দেয় তাঁদের,
মাঝখানে করুণাকালীন এক বছর নিজ গ্রামে তারাবীহ পড়ানোর সুযোগ আমার হয়েছিলো,তখন কাছ থেকে দেখেছি,সারাদিন মাঠে-ঘাটে পরিশ্রম করা খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য দীর্ঘ কেরাত বা ধীর কেরাত কখনো কখনো ক্লান্তিকর হয়ে উঠে,
তাঁদের শরীর তখন বিশ্রাম চায়,অথচ শহরে ব্যস্তততার ভেতর থেকেও অনেকেই তারাবীহর ধীর ও দীর্ঘ তেলাওয়াতেই এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি খুঁজে পান,
ধীর তেলাওয়াত আমার ব্যক্তিগত পছন্দ,ফলে গ্রামে কেরাত সংক্ষিপ্ত রাখার প্রয়োজন আমাকে ভেতরে ভেতরে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলেছিল,তবে সেটি ছিল পরিস্হিতির দাবী,আর শহরে এসে যখন ধীর ও ভাবগম্ভীর কেরাতের সুযোগ পাই,তখন ইমামতি আমার কাছে হয়ে উঠে গভীর তৃপ্তির উৎস,
দীর্ঘ তেরো বছরের তারাবীহর ইমামতির সফরে আমার সবচেয়ে সুখকর সময় কেটেছে কুমিল্লা শহরের প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড় ঝাউতলা জামে মসজিদে,ফেনী জামেয়া রশীদিয়া থেকে আমাকে সেখানে নিয়োগ দেয়া হয়,
টানা তিন বছর সেই মসজিদের মেহরাবে দাঁড়ানোর সৌভাগ্য আমার হয়েছিলো,সেখানকার মুসল্লিদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সম্মান আজও আমাকে আন্দোলিত করে,অপরিচিত মানুষগুলো ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল আপনজন,সেই সময়ের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে,ইমাম ও মুসল্লির সম্পর্ক কেবল নামাজে সীমাবদ্ধ নয়,বরং আন্তরিকতা ও ভালোবাসা অপরিচিত মানুষকেও এক গভীর বন্ধনে আবদ্ধ করে নেয়,
শহর হোক বা গ্রাম,দীর্ঘ তারাবীহর রাতের প্রতিটি মুহূর্ত আমাকে শিখিয়েছে,সুন্দর কেরাতের চেয়ে বড় অর্জন হলো,ধৈর্য্য,আন্তরিকতা ও ভালোবাসার বন্ধন, এই স্বৃতিগুলোই আমার তেরো বছরের ইমামতির সত্যিকারের অর্জন