শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২০, ০১:৪৭ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
চাকরি হারানোর ভয়, পায়ে হেঁটে ঢাকার পথে হাজারও মানুষ করোনাভাইরাস: ইসরায়েলে গোঁড়া ইহুদিদের এলাকা লকডাউন করোনাভাইরাস: ঢাকায় টেলিভিশন সাংবাদিক আক্রান্ত, একই চ্যানেলের ৪৭ জন কোয়ারেন্টিনে করোনায় মৃত্যুতে দাফনে বাধা, মুসলিম বৃদ্ধের লাশ দাহ! গুজব ঠেকাতে সতর্ক পাহারায় থাকুন: কাদের এবার করোনায় আক্রান্ত হলেন মাওলানা সাদ! গণমাধ্যম কর্মীর এক স্ট্যাটাসেই দশ দিনের খাবার পেলেন অসংখ্য দিন মজুর! দেশে আরো নতুন ২ জন করোনায় আক্রান্ত ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে জ্বর, সর্দি ও কাশিতে কলেজছাত্রসহ পাঁচজনের মৃত্যু, উপজেলা জুড়ে আতঙ্ক আইসোলেশন সেন্টারের জন্য বিল্ডিং দেবে দারুল উলূম দেওবন্দ

আমরা কেন সিরাত পাঠ করব?

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও তাহলে আমার অনুসরণ করো।’
(সূরা আলে ইমরান : ৩১)

‘আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর যুদ্ধগুলোর বিবরণ শিক্ষা দিতাম, যেভাবে কোরআনের সূরা শিক্ষা দিতাম।’ Ñআলী ইবনুল হুসাইন (রা.)। (আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ইবনে কাসির : ২/৩৫২)।

সিরাত বলতে বোঝায় মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনে ও যুগে সংঘটিত সব ঘটনার বিবরণ ও ইতিহাস। তিনি যা বলেছেন, যা করেছেন এবং যা কিছুর অনুমোদন দিয়েছেন বা নির্দেশ দিয়েছেন তার সবকিছু সিরাতের অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবনচরিত, তাঁর চারিত্রিক গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্য, তাঁর বংশধারা, তাঁর নবুয়তের দলিলগুলো এবং এগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলি, তাঁর যুদ্ধ ও জিহাদ সিরাতের মৌলিক বিষয়বস্তু। এটি কোনো  সাধারণ মানুষের জীবনচরিত নয়; বরং সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠ নবী, পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মহামানব, মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ নেতার জীবনের ইতিহাস। একজন মুসলমানের জন্য সিরাত হলো সবচেয়ে বড় ও শ্রেষ্ঠ জ্ঞানভা-ার। শুধু জ্ঞান অর্জন নয়; বরং মুসলমান হিসেবে নিজের আকিদা ও বিশ্বাস এবং চিন্তা ও চেতনাকে একটি মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করার জন্য সিরাত পাঠ অপরিহার্য।
মুসলমানদের অন্তরে ঈমান ও বিশ্বাসকে দৃঢ় করার জন্য সিরাত পাঠের আবশ্যকতা রয়েছে। কারণ, শয়তান সবসময় মোমিন বান্দার ঈমান হরণের চিন্তায় থাকে; অনেক সময় পারিপার্শ্বিক অবস্থাবলিও ঈমান বিনষ্টের কারণ হয়ে থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবনচরিত আলোকবর্তিকারূপে সামনে থাকলে আমাদের ঈমান ও বিশ্বাস পারিপার্শ্বিক আঘাত ও শয়তানের প্রবঞ্চনা থেকে মুক্ত থাকে। খাব্বাব ইবনুল আরাত (রা.) বলেন, একবার আমরা নবী করিম (সা.) এর কাছে অভিযোগ করলাম। তখন তিনি একটি চাদর মাথার নিচে রেখে কাবা ঘরের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। যেহেতু মুশরিকদের পক্ষ থেকে আমাদের ওপর কঠিন নির্যাতন চলছিল, তাই আমরা বললাম, আপনি আল্লাহর কাছে কেন দোয়া করেন না? এ কথা শুনে তিনি সোজা হয়ে বসলেন। এ সময় তাঁর চেহারা মোবারক লাল হয়ে গেল। তিনি বললেন, ‘(তোমাদের ওপর এমন আর কী নির্যাতন চলেছে?) তোমাদের পূর্ববর্তী যুগে যারা ঈমানদার ছিল, এক আল্লাহর ইবাদত করত, তাদের কারও জন্য মাটিতে গর্ত খোঁড়া হয়েছে, তারপর তাকে সেই গর্তে রেখে তার মাথার ওপর করাত চালিয়ে তাকে দ্বিখ-িত করা হয়েছে। তবুও ওই নির্যাতন তাকে তার দ্বীন ও ঈমান থেকে ফেরাতে পারেনি। আবার কারও কারও শরীরের হাড় পর্যন্ত যাবতীয় গোশত ও শিরা লোহার চিরুনি দ্বারা আঁচড়ানো হয়, তবুও সেই নির্যাতন তাকে তার দ্বীন থেকে ফেরাতে পারেনি।’ (বোখারি : ৩৬১২)।
সিরাতুন্নবীর পাঠ আল্লাহ তায়ালার কিতাব কোরআন বোঝার জন্য সহায়ক। কোরআন বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নাজিল হয়েছে। জিজ্ঞাসার জবাবে, সন্দেহ দূরীকরণে, নবীজীবনের কোনো ঘটনার ব্যাখ্যায় কোরআনের আয়াতগুলো ধারাবাহিকভাবে নাজিল হয়েছে। কোরআনে যেমন বদর যুদ্ধ, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ, তাবুকের যুদ্ধ, হুদায়বিয়ার সন্ধি ইত্যাদি প্রসঙ্গে আলোচনা এসেছে, তেমনি হিজরতের ঘটনা, ইফকের ঘটনা, ইহুদিদের বিভিন্ন জিজ্ঞাসার জবাব, সাহাবিদের বিভিন্ন প্রেক্ষিতে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব আলোচিত হয়েছে। সুতরাং কোরআনের এসব বিষয় বোঝার জন্য সিরাতের পাঠ অপরিহার্য। নবীজীবনের ধারাবাহিক ঘটনাবলির ওপর স্বচ্ছ ও স্পষ্ট ধারণা না থাকলে কোরআনকে যথার্থভাবে বোঝা যাবে না। কোরআনের ১১৪টি সূরা ও তার আয়াতগুলো নাজিল হওয়ার কার্যকারণ রয়েছে; আর এসব কার্যকারণ নিহিত রয়েছে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবন ও সময়কালের ঘটনাবলিতে। কোরআন বোঝার পূর্বশর্ত হলো সিরাতের অধ্যয়ন ও তা আত্মস্থ করা।
হাদিস বোঝার জন্যও সিরাতের পাঠ জরুরি। হাদিসের গ্রন্থগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নবীজীবনের ঘটনাবলি খ-িত বা সংক্ষিপ্ত আকারে উল্লেখ রয়েছে। কয়েকটি হাদিস একত্র করে একটি ঘটনার সম্পূর্ণ বিবরণ পাওয়া যায়। যারা হাদিস বর্ণনা করেছেন তাঁরা হয়তো একটি ঘটনার প্রতি শুধু ইঙ্গিত করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট বিধান বর্ণনা করেছেন; কিন্তু পূর্ণ ঘটনার বিবরণ দেননি। এসব ক্ষেত্রে সিরাতের ওপর দখল থাকা অত্যন্ত জরুরি। নবীজীবনের অনুপুঙ্খ ঘটনারাশিকে আত্মস্থ করতে পারলে হাদিস ও সুন্নাহ বোঝা অত্যন্ত সহজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবনচরিত ও সুন্নাহকে আলাদাভাবে বোঝার কোনো পথ নেই; তাঁর জীবনের নির্যাস ও সারবত্তাই হাদিসশাস্ত্রে বিবৃত হয়েছে। কোনো কোনো হাদিস আছে যা পাঠ করে বোঝা দুঃসাধ্য, কারণ সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি জানা নেই। যেসব হাদিস কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বর্ণিত হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ঘটনার বিবরণ জানা না থাকলে ওই হাদিসটি কিছুতেই বোঝা যাবে না। এ কারণেই নবীজীবনের ও তাঁর কালের ইতিহাস পাঠ অনিবার্য।
আরেকটি কারণে সিরাত পাঠের বিকল্প নেই; তা হলো ইসলামি আকিদা ও বিশ্বাস উপলব্ধি ও ধারণ করা। নবীজি (সা.) তাঁর বিশ্বাসকে কর্মে রূপ দিয়েছেন; তিনি যা বিশ্বাস করতেন, তা-ই বলতেন এবং তা-ই অনুষ্ঠান করতেন। নবীজি (সা.) এর আমলি জিন্দেগি, তাঁর তাকওয়া ও পরহেজগারিতা, আল্লাহ তায়ালার প্রতি তাঁর আস্থা ও আনুগত্য, ইখলাস ও সত্যনিষ্ঠা এসব বিষয় উপলব্ধি ও ধারণ করার জন্য সিরাত পাঠের বিকল্প নেই। সত্যের পথে নবীজির দৃঢ়তা, কষ্ট ও বিপর্যয়ে তাঁর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা, শত্রুদের উৎপীড়ন ও নির্যাতনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্থির বিশ্বাসে অটলতা তাঁর উম্মতের জন্য শিক্ষণীয় ও অনুকরণীয়। আকিদা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কোনটি গ্রহণযোগ্য আর কোনটি বর্জনযোগ্য; আমলের ক্ষেত্রে কোনটি গ্রহণযোগ্য বা গ্রহণঅযোগ্য; ইসলামি বিশ্বাসকে ধারণ করে জীবন চলার পথে কোনটি অনুকরণযোগ্য ও কোনটি বর্জনীয় তা জানার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবনচরিতের পাঠ অপরিহার্য। নবীজির মক্কি জীবন ছিল ঈমানের পথে এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষার নাম। তাওহিদ, একত্ববাদ, আল্লাহর মহত্ত্ব, বড়ত্ব ও পবিত্রতার বিষেয় অবিশ্বাসীদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত যাবতীয় প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা ও সন্দেহের জবাব পাওয়া যাবে সিরাতের মক্কি জীবন অংশে।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও তাহলে আমার অনুসরণ করো।’ (সূরা আলে ইমরান : ৩১)। এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসার জন্য মুহাম্মদ (সা.) এর অনুসরণকে শর্ত করা হয়েছে। আর নবীজিকে তখনই যথার্থভাবে অনুসরণ করা যাবে যখন তাঁর জীবন সংগ্রাম, তাঁর যুদ্ধ ও জিহাদ, তাঁর আদেশ ও নিষেধ, তাঁর বিচার ও ফয়সালা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকবে। তিনি যখন মক্কি জীবনে দুর্বল ছিলেন তখন মানুষের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করেছেন, মদিনার জীবনের যখন রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব তাঁর হাতে এলো তখন মানুষের প্রতি তাঁর কী ধরনের আচরণ ছিল তা বোঝা ও অনুধাবন করা একজন সচেতন মুসলমানের জন্য জরুরি। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যাঁরা আল্লাহ ও আখেরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসুলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সূরা আজহাব : ২১)।
মুহাম্মদ (সা.) হলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে ইসলামি শরিয়তের প্রবর্তক। বলা হয়ে থাকে যে, সিরাতুন্নবী বা নবীজির জীবনচরিতই হলো শরিয়তসংক্রান্ত জ্ঞানের আধার। তাঁর জীবেন শরয়ি হুকুম-আহকামের বাস্তবিক রূপ মূর্ত হয়ে উঠেছে এবং ইসলামের প্রতিটি বিধানের প্রায়োগিক ব্যাখ্যা রয়েছে। শরয়ি শিক্ষাদীক্ষার মূলভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে তাঁর প্রবর্তকের জীবনচরিতের ওপর। সুতরাং শরয়ি শিক্ষা-দীক্ষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে হলে নবীজির জীবনচরিত পাঠের বিকল্প নেই।

এই পোষ্টটি আপনার সামাজিক মিডিয়াতে শেয়ার করুন।

Design & Developed BY It Host Seba Mobile: 01625324144
0Shares