বৃহস্পতিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৫:১৭ অপরাহ্ন

খেলাপি ঋণের সাড়ে ৪৭ শতাংশই ৫ ব্যাংকে

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥

ছোট ঋণের পরিবর্তে বড় ঋণ দিতে বেশি আগ্রহ ব্যাংকগুলোর। আর বড় অঙ্কের ঋণ বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। এছাড়া নির্দিষ্ট খাত ও গ্রুপের কাছে ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। ফলে গুটিকয়েক গ্রাহকের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে ব্যাংক খাত। এর মধ্যে দেশের ব্যাংক খাত নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সংস্থাটি বলছে, শীর্ষ তিন গ্রাহক খেলাপি হলে ২১ ব্যাংক মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হবে। এছাড়া দেশে ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে ১০ ব্যাংকের কাছেই রয়েছে মোট খেলাপি ঋণের ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ। ১০টি ব্যাংকের মধ্যে পাঁচটিতে খেলাপি ঋণ সাড়ে ৪৭ শতাংশ। অন্যদিকে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের সাড়ে ৮৬ শতাংশই মন্দ বা ক্ষতিজনক পর্যায়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক স্থিতিশীলতা পর্যালোচনা (ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট) প্রতিবেদনে এ হিসাব রয়েছে। চলতি (২০১৯-২০) অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক কেন্দ্রিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৯) এ প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বড় গ্রাহকরা খেলাপি হলে কী ঝুঁকিতে পড়বে তা নিরূপণ করে বলা হয়েছে, ২১টি ব্যাংক আছে যাদের তিনজন শীর্ষ গ্রাহক খেলাপি হলে ব্যাংকগুলো মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হবে। ৭ জন শীর্ষ গ্রাহক খেলাপি হলে ৩৫টি ব্যাংক এবং ১০ জন শীর্ষ গ্রাহক খেলাপি হয়ে পড়লে ৩৭টি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে পড়বে।

এতে আরও বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ঋণ খেলাপি বেড়েছে ১৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৬৯ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে অবলোপন বাদে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ২০১৮ একই সময়ে (সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে) খেলাপি ঋণ ছিল ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা। ওই সময়ে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণও বেড়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশই রয়েছে শীর্ষ ৫ ব্যাংকের কাছে। আর ১০ ব্যাংকের কাছে রয়েছে খেলাপি ঋণের ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ। বাকি ৩৫ শতাংশ অন্য ব্যাংকগুলোর কাছে।

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের বেশিরভাগই আদায় অযোগ্য কু-ঋণ (মন্দ ঋণ)। মোট ঋণের ৮৬ দশমিক ৫ শতাংশই আদায় অযোগ্য, মন্দ বা ক্ষতিজনক পর্যায়ে রয়েছে। খেলাপি ঋণের তিনটি শ্রেণি রয়েছে- সন্দেহজনক, নিম্নমান ও মন্দমানের।

পরিশোধ করার নির্ধারিত তারিখের পর ৬ মাসের বেশি সময় ধরে বকেয়া থাকলে তাকে সন্দেহজনক মানে শ্রেণিকরণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট খেলাপি ঋণের মাত্র ৯ দশমিক ৭ শতাংশ সন্দেজনক। ৯ মাসের বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণকে নিম্নমানে শ্রেণিকরণ করা হয়। সেপ্টেম্বর শেষে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ আর ১২ মাসের বেশি থাকা খেলাপি ঋণ মন্দ বা ক্ষতিজনক মানের। মন্দ মানে শ্রেণিকৃত ঋণ আদায় হয় কম।

প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ব্যাংকগুলোর সম্পদের বিপরীতে আয় কমেছে। সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংকগুলোর মূলধনের বিপরীতে আয় বা রিটার্ন অন ইক্যুইটি (আরওই) দাঁড়িয়েছে ঋণাত্বক ১ দশমিক ৯ শতাংশ। কিন্তু তিন মাস আগেও (এপ্রিল-জুন প্রান্তিক) এটা ছিল ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ। অন্যদিকে সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতের সম্পদের বিপরীতে আয় বা রিটার্ন অন এসেট শূন্য দশমিক ২ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে।

আর্থিক স্থিতিশীলতা পর্যালোচনা প্রতিবেদনে মূলত বাংলাদেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও সক্ষমতার চিত্র তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হয়। আর্থিক খাতের গতি-প্রকৃতি, স্থিতিশীলতা ও তার প্রভাব এবং তা মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গৃহীত পদক্ষেপ, সম্পদের মান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও তারল্যের নির্দেশকগুলো এখানে বিশ্লেষণ করা হয়ে থাকে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো উঠে আসে এ প্রতিবেদনে। এ বিবেচনায় এই প্রতিবেদনের গুরুত্ব অনেক বেশি। তবে প্রতিবেদনের তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ যদি না নেয়া হয়, তাহলে এ ধরনের রিপোর্ট প্রকাশ করা অর্থহীন বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ঝুঁকি জেনেও বড় ঋণে ঝুঁকছে ব্যাংকগুলো। প্রভাবশালীদের চাপ ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের বড় ঋণের দেয়ার মন-মানসিকতা থেকে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। এছাড়া বড় ঋণ প্রদানে সময় কম ও অনিয়ম দুর্নীতির সুযোগ বেশি থাকে, তাই এসব ঋণ বেশি দেয়। এতে করে ব্যাংকগুলো গুটিকয়েক ঋণগ্রহীতার কাছে জিম্মি হয়েছে পড়েছে। ফলে ঋণের সুষম বণ্টন হচ্ছে না। বড় একটা শ্রেণি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও ঋণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ধরনের মানসিকতা থেকে বের হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, এখন ব্যাংকিং খাতে বড় সমস্যা সুশাসনের অভাব। সুশাসনের ঘাটতি মেটাতে পারলে অনেক কিছু সহজ হয়ে যাবে। অনিয়ম দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যাংকার, গ্রাহক ও প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।

যদি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় তাহলে ব্যাংক খাতের চলমান অস্থিরতা, তারল্য সংকট, খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি, পরিচালকদের বেপরোয়া ঋণ গ্রহণ সব সমস্যাই সমাধান হয়ে যাবে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved ©2020 jubokantho24.com
Website maintained by Masum Billah