বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০, ০৮:৫১ অপরাহ্ন

শিরোনামঃ
হেফাজতের মিছিলে কালিমা সংবলিত কালো ব্যানার: নাস্তিক্যবাদী মিডিয়ার চুলকানি মুসলিমদের হত্যার হুমকি দিয়ে ফরাসি মসজিদে ইসলামবিদ্বেষীদের চিঠি মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী নাজিরহাট মাদ্রাসার মোতাওয়াল্লি নির্বাচিত ফ্রান্সের পণ্য বর্জন ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে -আল্লামা মাহফুজুল হক সিএমএইচে এমপি আবু জাহির বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস যুক্তরাজ্য শাখার ভার্চুয়াল নির্বাহী সভা অনুষ্ঠিত.. অবশেষে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরব ইসলামী আন্দোলনের দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা বিশ্বজুড়ে পণ্য বর্জনের ডাকে প্রবল ঝুঁকিতে ফ্রান্সের অর্থনীতি বয়কট ফ্রান্স আন্দোলন: রেচেপ তায়েপ এর্দোয়ান ফরাসী পণ্য বর্জনের ডাক দিলেন

সাইয়েদ আহমদ শরীফ সেনুসী : লিবিয়ার সংগ্রামী পুরুষ

হাবীবুল্লাহ সিরাজ

সাইয়েদ আহমদ শরীফ সেনুসী (১৮৭৩-১৯৩৩) ছিলেন সেনুসি আন্দোলনের ক্রান্তিকালীন আমির। এক দিকে ইতালি অন্যদিকে ফ্রান্সের সাথে আছে ভিতরগত দ্বন্দ্ব। এই অসময়ে তিনি সেনুসী আন্দোলনের আমিরত্ব গ্রহণ করেন। দক্ষ অভিজ্ঞ নিপুণতা ও যোগ্যতা দিয়ে সেনুসি আন্দোলনের সবদিক ঠিক রাখেন। তার চাচা সাইয়েদ মুহাম্মদ আলমাহদি আসসেনুসি রহ. (১৮৮৪-১৯০২) দুনিয়া ত্যাগ করেন। ইতালি ও ফ্রান্স মনে করে করে ছিল সেনুসি আন্দোলন হয়তো দমে যাবে হারিয়ে যাবে সবুজ পাহাড়ের গহীনে। সেনুসিরা লুকিয়ে পড়বে লিবিয়ার বালুময় কোন প্রান্তে। কিন্তু মহান আল্লাহ সেনুসি আন্দোলনের বাগডোর এমন মানুষের হাতে দিলেন, যিনি বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে শুষ্ক মরুর বুকে লিবিয়ার স্বাধীনতার আন্দোলনের আগুন জ্বালিয়ে দিলেন। থমকে যাওয়া আন্দোলনে আমার প্রতিশোধ আর দেশপ্রেমের দহন লাগিয়ে কুত্তার মতো মারলেন ঔপনিবেসিক ইতালি ও ফ্রান্সকে। জীবনের তরে স্বাদ মিটে দিলেন অন্যের জমি দখলের। ইতিহাস বলে- সাইয়েদ মুহাম্মদ আলমাহদি আসসেনুসি রহ. (১৮৮৪-১৯০২) যদি তার মৃত্যুর আগে সেনুসি আন্দোলনের দায়িত্ব তাকে না দিয়ে অন্য কাউকে দিতেন তাহলে হয়তো ইতিহাস হতো ভিন্ন। লিবিয়া হয়তোবা হারিয়ে ফেলতো স্বাধীনতা। লিবিয়ার বুকে আজীবনের জন্য ইতালীয়নরা গড়ে তুলতো তাদের স্বপ্নস্বাদের প্রাসাদ ইমারত ক্যাথলিক খৃস্টান রাজ্য। কিন্তু সেই সুযোগ তারা পেলো না লিবিয়ার স্বাধীনতার সূর্যপুরুষ সাইয়েদ আহমদ শরীফ সেনুসী রহ. এর কারণে।

জন্ম ও শিক্ষা
তাঁর পুরো নাম সাইয়েদ আহমদ শরীফ সেনুসী আলমাহদী আল ইদ্রিসী রহ.। তিনি ১২৯০ হিজরির ২৭ শাওয়াল ১৮৭৩ সালে জাগবুব জেলার একটি মরুভূমি অঞ্চলে। ওই দিনটি ছিল বুধবার। তার বাবার নাম মুহাম্মদ শরিফ। বাবার কোলে তিনি বেশিদিন থাকতে পারেননি। বাবাকে হারিয়ে তিনি অর্পিত হন আপন চাচা সাইয়েদ মাহদী আসসেনুসি রহ. এর তত্ত্বাবধানে। চাচাও নিজ আগ্রহে নিজের ছেলের মতো করে তুলে লালন পালনের দায়িত্ব। চাচা মাহদি নিজ সন্তানের মতো করেই নিজের কাছে রেখে নিজের প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করান। শৈশবকালেই তিনি চাচার কাছে হিফযুল কুরআন সমাপ্ত করেন। শৈশবের শিক্ষা সমাপন করে চাচার অনুমতিক্রমে তিনি ইলম অর্জনের জন্য বিভিন্ন শহর উপর শহর ভ্রমণ পরিভ্রমণ করেন। তিনি হাদিস ফিকাহ তাফসিরসহ একাধিক বিষয়ে বুৎপত্তি অর্জন করেন। তিনি ইলম অর্জন করার পাশাপাশি তৎসময়ের বড় পীরমাশায়েখদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তার সেসব শিক্ষকের নাম পাওয়া যায় সাইয়েদ মুহাম্মদ শরীফ সেনুসী রহ., সাইয়েদ মুহাম্মদ আলমাহদী সেনুসী, আহমদ রিফি, মুহাম্মদ মুস্তফা মাদানী, ইমরান ইবনে বারাকাত প্রমূখ।

কর্মজীবন
তিনি কর্মজীবন হিসেবে কোন চাকরিকে বেছে নেননি। পড়ালেখা শেষ করেই সেনুসি আন্দোলনে দ্বিতীয় প্রধানতম ঘাঁটি কুফরায় অবস্থান করনে। কুফরায় অবস্থানকালীন তার দায়িত্ব ছিল সেসব মুসাফির কুফরার খানকায় আগমন করতেন তাদের সেবা যতœ করা। তার চাচাই তাকে এই খেদমতে লাগিয়ে ছিল। তার চাচা তাকে বলে ছিল- মুসাফিরদের খেদমত করা সবচে বড় ইবাদত ও জিহাদ। নিজের আমিত্বকে মিটিয়ে দিতে পারা পৃথিবীর সবচে বড় বীরত্ব। পরবর্তীতে দেখা গেছে- তিনি তার দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে আদায় করতেন। মুসাফির হিসেবে যারাই আসতো তারাই তার আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে যেতো। সময়টা ছিল ১৮৯৫ সাল। চাচা সাইয়েদ আলমাহদী রহ. এর শেষ সময়। চাচার সব আদেশ অক্ষরে অক্ষরে মানতেন। চাচার নির্দেশেই তিনি ১৯০০ সালে ছুটে যান সুদানের গারো অঞ্চলে। গারো ও তার আশপাশ এলাকায় ইসলামী শিক্ষার প্রচার প্রসারে নিয়োজিত হয়ে পড়েন। তৎসময়ে এই অঞ্চলগুলোতেও ফরাসীদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিলো। ফরাসি ইতালীয় ও ইউরোপের অন্যান্য শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর স্বপ্ন ছিলো আলজেরিয়া তিউনিশিয়া লিবিয়ার ত্রিপলী মিসরাতা সিরতি হারাওয়াহ বিনজাওয়াদ সাদর আকবালা মাসরাহ আলবিরিগা কামিনিস কুইফায়াহ বেনগাজি জাগবুব দেরানাহ বায়যাহ হামামাহ সুসাহ মিসর ও সুদানের গারো অঞ্চলের ক্যাথলিক খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু তাদের স্বপ্নের ভাড়াভাতে ছাই ফেলেছে স্বাধীনতার অতন্ত্র প্রহরী লিবিয়ার সেনুসি আন্দোলনের মহানায়কেরা। সাইয়েদ আহমদ শরীফ সেনুসী রহ. সুদানে ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি ইতালীয়দের বিরুদ্ধে স্থানীয় যুবকদেরকে ইতালের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। ফলশ্রুতিতে সেখানে ইতালীয়রা কঠিন যুদ্ধের মুখামুখী হয়। ধারাবাহিক যুদ্ধ চলতে থাকে এবং এই যুদ্ধ দীর্ঘ হয়। ইতালীয়দের জন্য চাঁদ দখল করা ছিল লিবিয়ার তুলনায় সহজ। কেননা, এখানে তারা কোন প্রতিরোধের মুখামুখি হয়নি। তবে যখনই চাদে সেনুসি আন্দোলন শুরু হয়েছে তখন তাদের জন্য চাদকে আয়ত্বে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। ইতালির সৈন্যবাহিনী সেনুসিদের সাথে না পারার কারণে সাধারণ মানুষদের উপর গণহত্যা চালায়। হাজার হাজার নিরাপরাধ মানুষকে নির্যাতন করে মেরে ফেলে। নারীদেরকে অবর্ণন নির্যাতন চালায়।

ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
১৯০২ সাল। লিবিয়ার স্বাধীনতার যুদ্ধের শেষ পুরুষ সাইয়েদ মুহাম্মদ আলমাহদি আসসেনুসি রহ. (১৮৮৪-১৯০২) দুনিয়া থেকে চলে গেলেন। এবার হয়তো ইতালীয়দের ভাগ্য চাকা ঘুরবে। প্রতিরোধহীন একটি লিবিয়া পাবে। মরুভূমিতে গড়ে উঠবে ইতালির দ্বিতীয় বৃহৎ শহর। এই রাষ্ট্র হবে ক্যাথলিক খৃস্টান রাষ্ট্র। ইতালীয় দখলদার বাহিনী যখন এই স্বপ্নে বিভোর তখন সেনুসি আন্দোলনের নেতৃত্বের আসেন সাইয়েদ আহমদ শরিফ আসসেনুসি রহ.। ইতালীয় জেনারেলেরা ভেবে রেখে ছিল মুহাম্মাদ আলমাহদী পরে তার স্থালাভিষিক্ত হবে তার অপরিণত বয়সি মুহাম্মাদ ইদরিস সেনুসি। এই অপরিপক্ব নেতা দিয়ে সেনুসিরা ইতালির বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারবে না।
১৯০২ খৃস্টাব্দ। মাহদী সেনুসীর মনে হচ্ছে তার সময় শেষ হয়ে এসেছে। ছেলে ইদরিসের বয়স মাত্র ১৩ বছর। নেতৃত্ব সঁপেবন কার হাতে? আহমদ শরীফের চেয়ে দক্ষ আর কে হতে পারে? তার অধিনেই তো ফরাসীদের বিরুদ্ধে গারো এবং সুদান অঞ্চলে যুদ্ধ করেছে। অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। সুতরাং মাহদী ১২২০ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল, ১৯০২ খৃস্টাব্দের ১৯ জুন কাফরায় ভাতিজা আহমদ শরীফের হাতে তুলে দিলেন সেনুসী আন্দোলনের নেতৃত্ব। বয়স তত বেশী না হলেও, সবাই মেনে নিলো তাকে। মাহদী ভাতিজাকে ওসিয়ত করলেন- ‘ইদরিস বড় হলে, তার হাতে তুলে দিবে নেতৃত্ব।’
সেনুসী আন্দোলনের আগের নেতাদের দেখিয়ে যাওয়া পথেই হাঁটলেন আহমদ শরীফ। অব্যাহত রাখলেন ফরাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। আফ্রিকায় এবার সমস্ত শক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে প্রচার করতে শুরু করলেন ইসলামের দাওয়াত। কুফরার একটি শহরকে সেনুসী আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করলেন।
কাফরায় কেন্দ্র নির্ধারণের পর, ফরাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য একটি ইসলামিক ফ্রন্ট গঠন শুরু করলেন। চাদের পূর্ব এবং উত্তর দিক থেকে সংগ্রহ করতে লাগলেন সেনা সদস্য।

ইতালির বিরুদ্ধে যুদ্ধ

লিবিয়ার তীরে ইতালীয় আগ্রাসনের সূত্রপাত হয় ১৯১১ সালে। এই সময় আহমদ শরীফ সেনুসী আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তুলেন। এমনিতেই তিনি অন্যান্য ইসলামি আন্দোলনকে সাহায্য ও সমর্থন করতেন সবসময়। তুর্কিস্তানে উসমানি খেলাফতের সঙ্গে ছিলো তার গভীর সম্পর্ক। সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে তুর্কি অফিসারদের নেতৃত্বে গড়ে তুলেন সামরিক বাহিনী। সেই বাহিনীকে অস্ত্র ও সরঞ্জাম দিয়ে সজ্জিত করার জন্য গ্রহণ করেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
ইনতেকাল
হিজাযের মাটি হয়েছিলো তার শেষ ঠিকানা। ষাট বছরের এক সাহসী জীবন কাটিয়ে ১৯৩৩ সালের ১০ রবিউল আউয়ালে, মদীনা মুনাওয়ারায়, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সৌভাগ্য যেন শেষ মুহূর্তে ছুঁয়ে গেলো কপাল।

এই পোষ্টটি আপনার সামাজিক মিডিয়াতে শেয়ার করুন।

Design & developed by Masum Billah