রাহমানিয়া হাকিকিয়া : স্মৃতি অমলীন দিনগুলো

এহসানুল হক : জামিয়া রাহমানিয়া হাকিকিয়া। প্রিয় উস্তাদের ভালোবাসায় নির্মিত একটি ব্যতিক্রম প্রতিষ্ঠানের নাম। যার অস্তিত্য ছিলো খুব অল্প সময়, মাত্র দেড় বছর। শাইখুল হাদীস রহ. যতদিন রাহমানিয়া ভবনের বাইরে ছিলেন ঠিক ততোদিনই। এই হাকিকিয়াতেই আমার কিতাব বিভাগে পড়াশুনার সূচনা। মুহাম্মাদী হাউজিং কোবা মসজিদকে কেন্দ্র করেই মাদরাসাটির যাত্রা শুরু। প্রধান ক্লাসগুলো হতো কোবা মসজিদে। বাকি দরস হতো নূর মসজিদ ও জিলানী মসজিদে। আমরা থাকতাম মুহাম্মাদী হাউজিং ৮৩/সি এর টিনশেড বাসায়। দারুণ উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে শুরু হয়েছিলো পড়াশোনা। মাত্র দুই সপ্তাহ ক্লাস করার পরেই আমাদের উপর নেমে এলো ভয়াবহ দুযোর্গ। তখন চলছে ফতোয়া রক্ষার আন্দোলন। ২০০১ এর ২ ফেব্রুয়ারী পল্টনে মহাসমাবেশ হলো। পরদিন হরতালে তুমুল সংঘর্ষ হলো মুহাম্মাদপুরে। ঘটে গেল নূর মসজিদ ট্রাজেডি। শাইখুল হাদীস রহ. গ্রেফতার হলেন। রাহমানিয়ার অসংখ্য ছাত্র গ্রেফতার হলেন। মুহাম্মাদপুরে আর কোন মাদরাসা চালানোর পরিস্থিতি থাকলো না। বছর সবেমাত্র শুরু। পড়াশুনার কি হবে? মাদরাসা বন্ধ। বাসায় প্রায় প্রতিদিন মিটিং হতো। মাওলানা আশরাফুজ্জান সাহেব, মামুন মামা, হাসান ভাই, ভাইয়া মিটিং করতেন। কোথায় মাদরাসা চালু কারা যায় সেই চিন্তা করতেন। এমন সময়ে নদীর ওপার কেরাণীগঞ্জ ওয়াশপুর ঘাটারচরে মাদরাসা করার প্রস্তাব এলো। একদিন সবাই এলাকা দেখতে গেলেন। বড়দের সাথে আমিও গেলাম। আজ থেকে উনিশ বছর আগের কথা। নদীর ওপারে তখন উন্নয়নের ছোঁয়া একেবারেই লাগেনি। বসিলা ব্রিজের কাজ শুরুও হয়নি। ওয়াশপুর ছিল সম্পূর্ণ গ্রাম। অনেক দূরে দূরে একেকটি ঘর। চার দিকে ধান ক্ষেতের ফসলি জমিন। কাচা মাটির রাস্তা। একেবারেই অজপাড়া গাঁ যাকে বলে। তবুও ঠিক করা হলো, সেখানে মাদরাসা চালু করা হবে। কারণ আর কোনো বিকল্প ছিলো না। সেখানে মাওলানা সুলাইমান সাহেবদের দারুল মাআরেফ নামে ছোট একটা মাদরাসা ছিলো। সম্ভবত সেখানে কিছু অংশ, আশপাশের আরও কিছু ভাড়া বাসা ও কয়েকটি মসজিদের উপর ভর করে মাদরাসা খোলা হলো। মাদরাসার প্রথম মজলিস হয়েছিলো ঘাটারচর মাঠের কোণে অবস্থীত নূর মসজিদে। সেই আলোচনা সভায় গাজীপুরী ‍হুজুরের একটা কথা আমার স্পষ্ট মনে পড়ে। হুজুর সবুজ রঙ এর একটা রুমাল পরা ছিলেন। হুজুর বলেছিলেন, শাইখুল হাদীস সাহেব যখন লালবাগ ছেড়ে আসে, তখন হেদায়াতুল্লাহ সাহেব বলেছিলো, শাইখুল হাদীস যেখানে যাবে সেখানেই মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হবে। যদি গাছ তলায় যায় সেখানেও মাদরাসা হবে। গাজিপুরী হুজুর বলেন, আমি নিয়ত করেছি, হুজুর যেখানে মাদরাসা করেন, আমি সেখানেই হুজুরের সাথে থাকবো। হুজুর যদি পানিতে গিয়ে বা নৌকায় গিয়ে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন সেখানেও আমি হুজুরের সাথে থাকবো। গাজিপুরী হুজুরের কথাটা ভুলতে পারি না। কি আবেগ! কি ভালোবাসা! আমাদের পড়াশুনা শুরু হলো। নিচের চার জামাত এক জায়গায় থাকতাম। পাশেই ছিলো একটা খালি ময়দান। আমরা বলতাম আরাফার ময়দান। সেখানেই টিনের চালা ও বেড়া দিয়ে হলরুম তৈরি করা হলো। যে কোনো মজলিস বা পরিক্ষার হল হিসেবে ব্যবহার হতো আরাফার ময়দান। বৃষ্টি আসলেই উপর থেকে টুপটুপ পানি পড়তো। আর নিচের সম্পূর্ণ কাঁচা মাটি কাঁদা হয়ে যেত। রাতে বৃষ্টি শুরু হলে ঘুম থেকে উঠে বিছানা মাথায় করে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। যাতায়াত ব্যবস্থা ছিলো অনেক কঠিন। বুড়িগঙ্গা নদী পার হতে হতো। সাঁতার জানতাম না। জীবনটা হাতে নিয়ে নৌকায় দুলতে দুলতে নদী পার হতাম। এরপর বাহন ছিলো ছাদ খোলা বেবিটেক্সি। আমরা নাম দিয়েছিলাম হেলিকপ্টার। সারা পথ ধুলো উড়িয়ে চলতো বেবিটেক্সিগুলো। আশপাশে তেমন কোনো দোকানপাট ছিল না। কিছু কিনতে হলে যেতে হতো অনেক দূর আঁটিবাজার। রাতগুলো আমার জন্য ছিল ভয়ংকর। অন্ধকারে আমি এক কদম হাঁটতে পারতাম না। মনে হতো এই যে সাপের গায়ে পা দিলাম! ভয়ে গা ছমছম করতো। কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলে রাস্তার ধারে বসে থাকতাম, কখন মানুষ আসে। কাউকে পেলে তার পিছু পিছু পথ চলতাম। কত রকম যে কষ্ট ছিলো, মাদরাসার জায়গা নাই, ঘর নাই। ভালো খাবারের ব্যবস্থা নাই। তবুও ছাত্রদের মনে কি এক অপার্থিব শান্তি ছিলো তা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব না। এভাবেই কেটেছে আমাদের একটি বছর। ঐ সময়ে মরহুম মাওলানা আশরাফ আলী সাহেব হুজুর ও সুলাইমান সাহেবের অনেক অবদান ছিলো। হাকিকিয়ার প্রথম সময়ে মাওলানা আবুল কালাম সাহেবেরও অনেক সহযোগীতা ছিলো। আর সবচেয়ে বেশি অবদান ছিলো জামিয়ার নাজেমে তালিমাত মাওলানা আশরাফুজ্জামান সাহেবের। শাইখুল হাদীস রহ. তখন কারাগারে, মাহফুজ মামা অনুপস্থিত। এই পুরো সময়টা মাদরাসা আগলে রেখেছিলেন আশরাফুজ্জামান সাহেব। হুজুরের ঐসময়ের অবদান ভোলার মতো না। ফেলে আসা সোনালী দিনের গল্প-৪