বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০, ০৭:৩৬ অপরাহ্ন

শিরোনামঃ
ফ্রান্সের পণ্য বর্জন ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে -আল্লামা মাহফুজুল হক সিএমএইচে এমপি আবু জাহির বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস যুক্তরাজ্য শাখার ভার্চুয়াল নির্বাহী সভা অনুষ্ঠিত.. অবশেষে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরব ইসলামী আন্দোলনের দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা বিশ্বজুড়ে পণ্য বর্জনের ডাকে প্রবল ঝুঁকিতে ফ্রান্সের অর্থনীতি বয়কট ফ্রান্স আন্দোলন: রেচেপ তায়েপ এর্দোয়ান ফরাসী পণ্য বর্জনের ডাক দিলেন ফ্রান্সের তাগুতী শক্তি অচিরেই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। আবার জেগেছে হেফাজত: শুক্রবার দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক মুসলমানদের কটাক্ষ করে রীতিমতো খলনায়ক বনে গেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট

‘বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে নিয়ে যাচ্ছি’

  • মাহদি হাসান রিয়াদ

তখন আমি খুব ছোট। সাত কিংবা আট বৎসর বয়স। বাবার নিজস্ব রিকশা ছিল। সে রিকশাতে চড়েই স্কুলে যেতাম। ছিল জ্ঞান আহরণ করার তুমুল আগ্রহ। ক্লাসের ফাস্ট বয় ছিলাম। ছিলাম প্রখর মেধার অধিকারীও। স্যার- ম্যাডামদের কাছ থেকে বেশ আদর পেতাম। আদর পেতাম আমার পরিবার ও এলাকাবাসীর কাছ থেকেও। স্বাচ্ছন্দ্যে কেটেছিল শৈশব। যাকে আমি সোনালী শৈশব বলতে একটুও কৃপণতা করি না।

মানব সমাজে অর্থ আর সম্মানের যে কতটা কদর, তা আমি বুঝতাম না। হয়তো বোঝার বয়সও হয়নি তখন। তবে, আমার বাবা ‘মতিন মিঞা’ অবশ্য ঠিকই বুঝতেন; বুঝতেন খুব ভালো ভাবেই৷ তাই হয়তো একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে মাঝরাস্তায় বলেছিলেন— রাকিব, আমি যে তোর বাবা, সেকথা কাউকে বলিস না। বাবার কথা ওঠলে যথাসম্ভব এড়িয়ে যাবি। ভুলেও মুখ খুলবি না। আমিও মেনে নিয়েছিলাম। তখন আর ‘কারণ’ বিশ্লেষণ করার প্রয়োজনবোধ করিনি। স্বাভাবিকত শিশু মনা এমনই হয়ে থাকে। এক-দেড় বছর পর অবশ্য কারণ বিশ্লেষণ না করা সত্বেও, ঠিকই বুঝতে পেরেছিলাম বাবার বলা কথাটার বেশ শক্তপোক্ত যৌক্তিক কারণ ও সারমর্ম। হাড়েহাড়ে টের পেয়েছিলাম বাস্তবতা।

আমি পড়তাম প্রাইভেট স্কুলে। শহরের স্বনামধন্য স্কুল। যেই স্কুলে পড়লে মাস শেষে দিতে হতো মোটা অংকের টাকা। আমার মত দরিদ্র বাবার ছেলে ওই স্কুলে পড়ার ক্ষমতা রাখে না৷ তবুও ওই বাবা নামক জ্ঞানহীন দরিদ্র বটবৃক্ষটা অসাধ্যকে সাধন করেছিল। বিসর্জন দিয়েছিল নিজের সুখশান্তি। পড়িয়ে ছিল শহরের নামকরা স্কুলে।

বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব ছিল পাঁচ কিলোমিটার। এই পথটা প্রতিদিন বাবার রিকশায় চড়ে পাড়ি দিতাম। যাওয়া-আসার পথে অনেক স্কুল ফ্রেন্ডসরা দেখত। গেইটের সামনে নামিয়ে দিয়ে, টিফিনের জন্য লাল একটা প্লাস্টিকের দশটাকার নোট ধরিয়ে দিতেন। দুই কপোলে আলতো ভাবে হাত বুলিয়ে দিয়ে বিদায় জানাতেন। স্কুল ছুটি হওয়ার দশমিনিট আগে থেকেই বাবা অপেক্ষায় থাকতেন। দৌঁড়ে স্কুল থেকে বের হতাম। বাবা তখন মুচকি হেসে পরম যত্নে রিকশায় বসাতেন। আমাদের ভালোবাসা দেখে ফ্রেন্ডসদের মনে একপ্রকার সন্দেহ জাগলো! তারা ছলেবলে কৌশলে কথা বের করার আপ্রাণ চেষ্টা করতো। চেষ্টা করতো সত্যতা জানার, রহস্য উদ্ঘাটন করার, সন্দেহ মুক্ত হওয়ার। কিন্তু, বাবার আদেশ মানতে গিয়ে বরাবরই আমি চুপ থাকতাম। কখনো আবার এড়িয়ে যেতাম। স্কুলে একদিন অভিভাবক সভার আয়োজন করা হয়। বাবাও নিমন্ত্রণ পেলেন। সৌজন্যতা রক্ষার্থে বাকিদের মতো বাবাও আসলেন। বসলেন অভিভাবকদের চেয়ারে। তখন আমার ফ্রেন্ডসরা খুব সহজে বুঝতে পারলো— রিকশা চালক ‘মতিন মিঞা’ সম্পর্কে আমার বাবা হন। এরপর থেকে আমার সাথে কেউ আর বন্ধুত্ব করতো না৷ দেখতো হীন চেখে। ঝগড়া হলে ‘ছোটলোকের পোলা’ বলে গালিও দিতো। এভাবে চলতে চলতে একসময় স্কুলের গণ্ডি পার করলাম। পার করলাম কলেজে-ভার্সিটির গণ্ডিও।

এখন আমি ইঞ্জিনিয়ার। বেশ নামডাক হয়েছে। আর্থিক ভাবেও স্বচ্ছল। কিছুদিন আগে গুলশানে বাড়ি কিনলাম। মার্সিডিস গাড়িও কিনেছি। ইচ্ছে ছিল মা’কে নিজের ক্রয়কৃত বাড়িতে রাখবো। মার্সিডিস গাড়িতে বসিয়ে শহর ঘুরাবো। গ্রামে নিয়ে যাবো৷ ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, এইচএসসি পরীক্ষার আগে আমার মা- রবের সান্নিধ্য লাভ করেন। চলে যান ওপারে। বড় আপুরও বিয়ে হয়েছে৷ বাড়িতে এখন স্রেফ বাবা থাকেন৷ আমার লেখাপড়ার খরচ জোগাতে গ্রামের সব স্ব-সম্পত্তি বাবা বিক্রি করে দেন। গ্রামে শুধু ঘরটায় আছে। তাই বাবাকে ঢাকায় নিয়ে এসেছি। বাবা এখন আমাদের সাথেই থাকেন।

পাঁচ-ছয় মাস ভালো ভাবেই কাটলো। আমি এবং আমার সহধর্মিণী চাকুরীজীবি হওয়াতে, বাবার খাবারদাবার নিয়ে খুবই কষ্ট হয়ে যেত। আমরা খেতাম বাহিরে। সারাদিন থাকতাম অফিসে। এদিকে সকাল সকাল রান্নাবান্না করতে সহধর্মিণীর কষ্ট হয়ে যেত। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে পুরো ঘর অগোছালো দেখে সহধর্মিণী চিল্লাপাল্লা করতো। এ নিয়ে প্রতিনিয়ত আমাদের মধ্যে ঝগড়াবিবাদ লেগেই থাকতো। মাঝেমধ্যে প্রস্রাব-পায়খানা করে কাপড় নষ্ট করে রাখতেন বাবা। প্রথম দিকে সহধর্মিণী পরিষ্কার করলেও, এখন আর করে না। নিজেকেই করতে হয়। কিছুদিন পর আমারও অনীহা চলে আসে। দুজনেই পরামর্শ করলাম; বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসবো।

শনিবার সকাল। সহধর্মিণী আগেভাগে বাবার কাপড়চোপড় গুছিয়ে রাখে। বাবাকে কিছু বলতে হয়নি। সবকিছু বুঝে নিয়েছেন। চুপচাপ আমার পিছুপিছু আসতে লাগলো৷ দরজা খুলে দিলাম। গাড়িতে বসলেন। মাঝরাস্তায় আমাকে আবদার করে বললেন— বাবা, আমাকে একটু তোর মায়ের কবরের পাশে নিয়ে যা। আবদার রক্ষার্থে নব্বই কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেলাম। মায়ের কবর যিয়ারত করলাম। এরপর আমার হাত দুটো ধরে বললেন— ‘রাকিব, এ ক’দিন তোকে এবং বউমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। পারলে ক্ষমা করে দিস। বউমার কাছ থেকেও ক্ষমা চেয়ে নিস। আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে দিতে যাচ্ছিস বলে একদমই মন খারাপ করবি না। এতে আমি খুব খুশি। নিশ্চয়ই তোর মা-ও খুশি হতেন৷ কারণ, আমরা সবসময়ই চাইতাম— তুই সুখে থাক। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, আমার উপস্থিতিতে তোরা সুখি নয়৷ পিতা হিসেবে যা আমার কাছে চরম দুঃখজনক! কষ্টদায়ক। সবসময় নিজেকে অপরাধী মনে হয়। মনে হচ্ছে আজকেই নিরপরাধ হলাম।

কথাগুলো বলার সময়, বাবার চোখের কোণে একসাগর পরিমাণ অশ্রুজল দেখেছিলাম আমি। দেখেছিলাম বুকভরা হতাশা। কিন্তু, বোঝার ক্ষমতা আমার ছিল না! একবারও বাবার চাপা কষ্ট বুঝতে পারিনি। বুঝতে চাইনি বাবার হৃদয়ে লুকায়িত আকুতি। উঁচু ডিগ্রী, গুলশানের মস্ত বাড়ি, মার্সিডিস গাড়ি, আর রূপবতী নারীর প্রেমে আমি মত্ত হয়েছিলাম! অকালে বিবেককে গলাটিপে হত্যা করেছিলাম। বিবেকের মৃত্য হওয়াতে এসব আমার বোধগম্য হয়নি। ভুলে গিয়েছিলাম অতীত! লাত্থি মেরে তছনছ করে দিয়ে ছিলাম উপরে উঠার সিঁড়ি।

তবে, একুশ বছর পর আবারো আমার বিবেক প্রাণ ফিরে পায়। জিন্দা হয়ে ওঠে৷ আমার ডাক্তার ছেলেটি জিন্দা করে তুলে৷ আজ আমি বৃদ্ধাশ্রমে! ছেলের হাত ধরেই বৃদ্ধাশ্রমে এসেছি। আমার বাবার সাথে যেরূপ আচরণ করেছিলাম, একুশ বছর পর এসে তা হাড়েহাড়ে বুঝে পেলাম। আমার আদরের ছেলে আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে৷ পাওনা মিটিয়ে দিয়েছে।

পড়ছিলাম আমার ডাক্তার বাবার রেখে যাও একমাত্র ডায়েরি। যা বৃদ্ধাশ্রমে বসেই লিখেছিলেন।
একবছর আগে আমার দাদা ইঞ্জিনিয়ার রাকিব আহমেদের ছেলে, ডাক্তার রহিম আহমেদ (আমার বাবাকে) বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসছিলাম৷ গত সপ্তাহে তিনি ইন্তেকাল করেন। আমার জন্য রেখে যান এই ডায়েরিটি। খুবই গুরত্ব দিয়ে পড়তে বলেন। এটা যেনো অবশ্যই-অবশ্যই আমি পড়ি, সে কথাও বলে যান। অতঃপর আজ পড়লাম। পড়ার সময় পুরো রুমে হামাগুড়ি দিয়ে, বিলাপ কান্নাকায় নিজেকে উজাড় করে দিলাম।

অপেক্ষায় আছি। অল্প কিছুদিন পর আমার আদরের ছেলেটিও হয়তো এরূপ আচরণ উপহার দেবে আমাকে। যেমনটা বাবা আমার দাদাকে দিয়েছিলেন, আর আমি বাবাকে দিয়েছিলাম।

এই পোষ্টটি আপনার সামাজিক মিডিয়াতে শেয়ার করুন।

Design & developed by Masum Billah