স্মৃতিপটের উজ্জ্বল নক্ষত্র আমাদের নানুভাইয়া: আশরাফ মাহদী

নানাকে আমরা ডাকতাম নানুভাইয়া বলে। ছোট বেলা থেকেই নানার সাথে আমাদের কাটানো স্মৃতিপটে জমা হয়ে আছে অনেক অনেক গল্প। কারণ আমরা তিন খালাতো ভাইবোন বলতে গেলে নানার আদর-আহ্লাদেই বড় হয়েছি। নানার পানের বাটা থেকে চুরি করে পান খাওয়াটা ছোটবেলায় আমার আর ফরহাদ ভাইয়ার জন্য একটা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার ছিল। এই কাজটা আমরা ঠিক তখন সারতাম যখন নানা বাটা রেখে কোথাও যেতেন। এর জন্য আমাদের পূর্বপরিকল্পনা ও পূর্বপ্রস্তুতি দুইটাই থাকতে হত৷ এরপর আমরা যখন আরেকটু বড় হই, তখন নানার মুতালায়ার রুম থেকে খালি প্যাড ও ভিজিটিং কার্ড চুরিতে মনোনিবেশ করি। কারণ লেখাওয়ালা প্যাড চুরি করতে নানার নিষেধ ছিল। মাদরাসায় গিয়ে আমরা নানার রুমে ঢুকলেই উনি জিজ্ঞেস করতেন, "কি খাবি নানা?" আমরা যেটা খাবো সেটা জানিয়ে দিতাম। আর নানা সোহেল মামাকে ডেকে সেটার অর্ডার দিয়ে আবার মুতালায়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। এরপর আমরা নির্বিঘ্নে আমাদের চুরিকার্য সম্পাদন করতাম। রোজার ঈদে দুই নাতিকে নিয়ে সাতরওজার পাকিস্তান মাঠে ঈদের নামাজ পড়াতে যাওয়াটা নানার একটা নিয়ম ছিল। আর এরজন্য নানাকে গুনতে হত বড় অংকের সালামী। তাই নামাজ শেষে মাদরাসায় এসে নিজ দায়িত্বে আমাদেরকে তিনি সালামী বুঝিয়ে দিতেন। হিফজ শেষে পাগড়ি নেওয়ার সময় আসলো। সেবার নানার শরীর ভাল ছিল না। এরপরও নানা বললেন "আমি শুধু আমার নাতির পাগড়িটাই বেধে দিব"। আমি তখন খতমে বুখারীর অনুষ্ঠানে আল আসমাউল হুসনা মুখস্থ পড়তাম। খতমে বুখারীর দিন নানার রুমে গেলেই নানা মেহমানদের সামনে আদর করে কাছে টেনে নিয়ে বলতেন, "এইটা আমার নাতি, আসমাউল হুসনা পুরাটা আপনাদের মুখস্থ শুনাবে আজকে"। কিতাব বিভাগে ভর্তি হওয়ার সময় আসলো। আব্বু নানার সাথে পরামর্শ করলেন, আমাকে কোথায় ভর্তি করালে ভাল হয়৷ কারণ নিজের কাছে রাখে পড়ানোর সুবিধা ও অসুবিধা দুইটাই ছিল। নানা চাইলেন, আমি যেন শিক্ষা জীবনের শুরু থেকেই তার কাছে থাকি৷ আব্বুও তাই করলেন। নানার এই সিদ্ধান্তের কাছে আমাকে আজীবন ঋণী থাকতে হবে। নাহলে উনার জীবনে শেষ ছয়টি বছর উনাকে কাছ থেকে দেখার ও জীবনে গুরুত্বপূর্ণ সবকগুলো শেখার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যেত। ছাত্র হয়ে নানাকে নতুনভাবে চেনা শুরু করলাম। কেতাবী দরস তো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মেই চলতো, কিন্তু সাপ্তাহিক জলসায় ছাত্রদের মজলিসে আকাবিরের আয়োজনে তিনি তাফাক্কুহ ফিদদিন অর্জনের তরিকা শেখাতেন। এই দ্বীনের ইলম ধারণ করার কারণে একজন আলামের উপর দ্বীনের হেফাজতের কতটুকু দায়বদ্ধতা তৈরী হয় সেটা খুব সুন্দরভাবে বুঝাতেন। আকাবেরে দেওবন্দের ইলমী ও দ্বীনী কুরবানীর কথাগুলো দরদমাখা কণ্ঠে শুনিয়ে ছাত্রদের মেজাজ তৈরী করতেন। মজলিশে আকাবিরে যখন তিনি সব ছাত্রদের সামনে নিয়ে বসতেন তখনই একদম তাইসির থেকে নিয়ে ইফতা পর্যন্ত প্রত্যেকটা ছাত্রের কাছে তিনি একজন পিতৃতুল্য উস্তাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন৷ খুব স্বাভাবিকভাবেই তিনি মাদরাসার প্রত্যেকটি ছাত্রের মত আমারো স্বপ্নপুরুষ হয়ে উঠলেন। তখন কেউ যদি প্রশ্ন করতো, বড় হয়ে কি হতে চাও? উত্তরে বলতাম, মুফতি আমিনী হতে চাই। যদিও নিজের অযোগ্যতার ফলে এখন সেই বাক্য উচ্চারণের সাহস হারিয়ে ফেলেছি। শাগরিদদের মধ্যে শেষ চার বছর যারা এই মহাপুরুষকে কাছ থেকে দেখার সু্যোগ পেয়েছিল তারা প্রত্যেকেই জানে দ্বীনের জন্য আকাবেরে দেওবন্দের ত্যাগের মহিমায় মুফতি আমিনী রহ. নিজে কতটা উজ্জীবিত ছিলেন। শত সীমাবদ্ধতার ভেতরে থেকেও দিনে বাতিলের বিরুদ্ধে হুংকার আর রাতে তাহাজ্জুদে রোনাজারীর চিত্রগুলো ছিল একজন জীবন্ত আকাবেরের নমুনা। আদর্শের কথা শুধু ছাত্রদের নীতিবাক্য হিসেবে শুনিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং সে কন্টকাকীর্ন পথ মাড়িয়ে দেখিয়ে গেছেন। শিখিয়ে গেছেন কি করে বাতিলের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সম্মুখপানে অগ্রসর হতে হয়। তার সেই আপোষহীন পথচলায় অনুপ্রাণিত হয়েছে দলমত নির্বিশেষে ইসলামী রাজনীতির প্রত্যেকটি কর্মী। আল্লাহ তায়ালা দ্বীনের জন্য তার সকল কুরবানীকে কবুল করে তাকে জান্নাতের উচু মাকাম দান করুক। #স্মৃতিতে_আমিনী