মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০৩:৫১ পূর্বাহ্ন

মঙ্গোল থে‌কে তুর্কি : খানদের দ্বারা খানাত শাসনের বিচিত্র ইতিহাস

মঙ্গোল থে‌কে তুর্কি : খানদের দ্বারা খানাত শাসনের বিচিত্র ইতিহাস ‘খান’ উপাধির সাথে আমাদের প্রায় সবাই পরিচিত। ভারতীয় উপমহাদেশে ‘খান’ উপাধিকে বেশ আভিজাত্যের প্রতীক বলেই মনে করা হয়। যদিও বর্তমানে ‘খান’ উপমহাদেশের যেকোনো মুসলিমের নামের শেষেই দেখতে পাওয়া যায়। মজার ব্যাপার হলো, পশ্চিমবঙ্গের অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বী ব্যক্তির নামের শেষেও ‘খান’ দেখা যায়। বর্তমানে ‘খান’-এর সাথে আভিজাত্যের সম্পর্ক না থাকলেও খানদের ইতিহাস কিন্তু বেশ গৌরবান্বিত। যেমন- ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল আমলে শুধু অধিক সম্মানিত ব্যক্তিদেরই ‘খান’ উপাধিতে ভূষিত করা হত। সেসময় খানদের মধ্যে আবার কয়েকটি শ্রেণী ছিল। যেমন- খান সাহিব, খান বাহাদুর, খান-উল-আযাম, খান উল মুয়াযযাম, খান-উল-আযাম-উল-মুয়াযযাম ইত্যাদি।

খানদের ইতিহাস অনেক পুরোনো ও বিস্তৃত। মূলত খানাত বা খাগানাতের শাসকদেরকে ‘খান’ নামে ডাকা হত। কথাটি ঘুরিয়ে বললে দাঁড়ায়- খানরা যে অঞ্চল শাসন করত তাকেই খানাত বা খাগানাত বলা হত। খানাত হলো সাম্রাজ্যের একটি বিস্তৃত প্রশাসনিক অঞ্চল। একটি সাম্রাজ্য অনেকগুলো খানাতে বিভক্ত থাকত। সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শাসকের পাশাপাশি প্রত্যেকটি খানাতে একজন নির্দিষ্ট শাসক থাকত। খানাতের শাসকগণ আবার সর্বদা কেন্দ্রীয় শাসকের অনুগত থাকত। সহজভাবে বলতে গেলে, এটা ছিল অনেকটা বর্তমানের প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থার মতো।

খানাত বা খাগানাত শাসনব্যবস্থা ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে মঙ্গোল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক পূর্বেই বেশ কয়েকটি খানাতের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। সেসবের মধ্যে রোরা খানাত ছিল সবচেয়ে প্রাচীন। রোরা খানাত প্রতিষ্ঠিত হয় চতুর্থ শতকের শুরুর দিকে। মূলত মঙ্গোলীয় আদিবাসীদের দ্বারা এই খানাত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই খানাত স্থায়ী ছিল প্রায় ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত। সেসময় গুরতুর্ক বিদ্রোহের মাধ্যমে এই খানাতের বিলুপ্ত হয়। পরবর্তীতে এর মধ্য দিয়েই উত্থান ঘটে তুর্কিদের।

চেঙ্গিস খানের উত্থানের পূর্বে মঙ্গোলরা একক কোনো জাতি ছিল না। একাধিক গোষ্ঠী এবং গোত্রে বিভক্ত থেকে তারা যাযাবর জীবনযাপন করত। পুরো মঙ্গোলীয় স্তেপ জুড়ে তাদের ছোট ছোট অসংখ্য যাযাবর গোষ্ঠী ছিল, যারা সুযোগ পেলেই পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতে ছোটখাট হামলা করে বসত। ডাকাতি আর লুটপাটই ছিল তাদের অনাড়ম্বরভাবে বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা।

দশম শতাব্দীর দিকে ‘খামাগ’ নামে একটি খানাত প্রতিষ্ঠিত হয়। বিস্তৃত মঙ্গোল যাযাবর গোষ্ঠীগুলো তখন অনন, খেরলেন ও তুল নদীর অববাহিকায় বসতি স্থাপন করে। মঙ্গোল যাযাবরদের সমন্বয়ে মঙ্গোলিয়ান স্তেপ জুড়ে বিস্তৃত এই শাসনাঞ্চল খামাগ খানাত নামে পরিচিত ছিল, মঙ্গোলদের ইতিহাসে যা সর্বপ্রথম খানাত।

তবে খানাতের সবচেয়ে ব্যাপক প্রচলন ও বিস্তার ঘটে মঙ্গোল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর। মঙ্গোল সাম্রাজ্যে খানাতের এর উৎপত্তি ঘটে চেঙ্গিস খানের আপানিজ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে। আপানিজ ছিল এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে মঙ্গোল সাম্রাজ্যের অধিপতি চেঙ্গিস খানের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা এবং দৌহিত্রগণ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশের অংশীদার হয়ে যান। বিস্তৃত সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রশাসনিক অঞ্চলের শাসনভার দেওয়া হয় একেকজনের হাতে। সাম্রাজ্যের এই প্রত্যেকটি অংশকে তখন খানাত নামে অভিহিত করা হয়। এভাবে মঙ্গোল সাম্রাজ্যে খানাতের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। মঙ্গোল সাম্রাজ্য ছাড়াও আফসারি, তিমুরী, তুর্কি এবং সালাভি সাম্রাজ্যে খানাতের বিস্তার লক্ষ্য করা যায়।

এই পোষ্টটি আপনার সামাজিক মিডিয়াতে শেয়ার করুন।

Design & developed by Masum Billah