মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০, ১২:৪৩ অপরাহ্ন

শিরোনামঃ
রাষ্ট্রের পুনর্গঠন : তাত্ত্বিক আলোচনা বনাম বাস্তবতা সৈয়দ শামছুল হুদা ১৮ ভোট কেন্দ্রে কচুয়ার ২ ইউনিয়নের উপ-নির্বাচন কাল উত্তাল পাকিস্তান, ‘ইমরান খানের পদত্যাগ চাই’ প্রেমিকাকে ধর্ষণ করে অন্যকে ফাঁসাতে গিয়ে ফেঁসে গেলো ছাত্রলীগ নেতা মাওলানা সিরাজীর স্মরণে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস যুক্তরাজ্য শাখার ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত তাইওয়ানে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন ইসরায়েলে অবতরণ করলো আমিরাতের প্রথম ফ্লাইট সিলেটে রায়হান হত্যাকান্ডে প্রধান অভিযুক্ত আকবরকে ধরিয়ে দিলে ১০লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা মেয়র আতিকের পরিবারের ২০ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হাতিরঝিলের সেই অজ্ঞাত লাশের রহস্য উদঘাটন হলো যেভাবে

মধ্যযুগে অটোম্যানরা কেন প্রিন্টিংপ্রেস ব্যবহার করে নি?

১৪৩৯ সালে জার্মানির স্বর্ণকার ইয়োহান গোটেনবার্গ সর্বপ্রথম প্রিন্টিংপ্রেস আবিষ্কার করেন এবং ১৪৫৫ সালে তার প্রেস থেকে প্রথম বাইবেল ছাপা হয় । অন্যদিকে ১৪৫৩ সালে সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ কনস্টান্টিনোপল জয় করলে বাইজান্টাইন অনেক বুদ্ধিজীবি ইউরোপে চলে যান । অর্থাৎ কনস্টান্টিনোপল বিজয় ও প্রিন্টিংপ্রেস আবিষ্কার খুবই সমসাময়িক ঘটনা । এখন প্রশ্ন হচ্ছে তবে কি অটোম্যানরা প্রিন্টিংপ্রেসের কথা জানত না নাকি ইচ্ছা করেই তারা এটি ব্যবহার করে নি ?? অটোম্যান সাম্রাজ্যে কি প্রিন্টিং প্রেস নিষিদ্ধ ছিলো ?? মধ্যযুগে অটোম্যানদের প্রিন্টিং প্রেস নিয়ে মিথ, প্রিন্টিংপ্রেসের সাথে অটোম্যানদের পতনের সম্পর্ক,আলেমদের ভূমিকা আর ওরিয়েন্টালিস্টদের মিথ্যাচার নিয়ে থাকছে আজকের ব্লগ ।

পূর্ব ও পশ্চিমের সাংস্কৃতিক কার্যাবলীর প্রতি সুলতান ফাতিহের গভীর আগ্রহ ছিল । তিনি ইউরোপিয়ান,পার্সিয়ান ও আরব চিত্রশিল্পীদের নিয়ে রাজকীয় চিত্রশালা প্রতিষ্ঠা করেন,গ্রীক পান্ডুলিপিকে অটোম্যান ভাষায় রূপান্তরের অনুমতি দেন ও ভেনিসীয় চিত্রশিল্পী বেল্লিনিকে রাজকীয় চিত্রশালায় স্থান দেন। তিনি এস্ট্রোনমি অধ্যয়নকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা করেন । তার পরবর্তী অটোম্যান সুলতানরাও কৌশলগত প্রযুক্তি ও শৈল্পিক সৌন্দর্যের প্রতি সমর্থন দেয়া অব্যাহত রাখেন । সুলতান সেলিম যখন ১৫১৪ সালে তাব্রিজ জয় করেন তখন তিনি ১০০০ জন অনুচিত্রশিল্পীদের একটি দলকে রাজকীয় চিত্রশালায় নিয়ে আসেন । সুলতান ফাতিহের রাজত্বের শেষদিকে রাজকীয় পাঠশালায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বই ছিল এবং তিনি নিজেও প্রিন্টিং প্রেসের সাথে পরিচিত ছিলেন । তবে কেন তিনি বা তার পরবর্তী অটোম্যান সুলতানগণ প্রিন্টিং প্রেস ব্যবহার করেন নি?

এর বেশ কিছু কারণ ছিল । প্রথমত অটোম্যান প্রশাসনিক ও বিচারব্যাবস্থা নির্দিষ্ট অনুরোধ বা অভিযোগের প্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট ফরমান,ফতোয়া বা অনুমতি প্রদান করতো । যেহেতু প্রত্যেক নির্দিষ্ট কার্যকলাপের প্রেক্ষিতে স্বতন্ত্র নির্দেশ প্রদান করা হতো অর্থাৎ একটি ফরমানের শুধুমাত্র একটি কপিই লেখার প্রয়োজন হতো,অনেকগুলা কপির দরকার ছিলোনা তাই প্রিন্টিং প্রেস থেকে লিপিকারের কার্যকারিতা বেশী ছিল । এক্ষেত্রে প্রত্যেক ফরমানে সুলতানের স্বাক্ষর(তুগরাহ) নকল করতে স্টেনসিল ব্যবহৃত হতো। পাশাপাশি অটোম্যান বিচারালয় ও রাজকীয় প্রাসাদে অনুলিপিকারদের একটি দল তৈরি হয়েছিলো যারা দক্ষতার সাথে ফরমান লিখত ও তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করতো । তাদের মাধ্যমে রাজকীয় ফরমান, বিচারালয়ের রায় ও রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর তথ্য সংরক্ষণ করা হতো ও জনসাধারণের কাছ থেকে গোপনীয়তা রক্ষা করা হতো যা প্রিন্টিং প্রেসের মাধ্যমে সম্ভব ছিলো না । প্রিন্টিং প্রেস যদিও একটি পান্ডুলিপি থেকে দক্ষতার সাথে অনেকগুলা কপি তৈরি করতে পারত কিন্তু প্রত্যেক স্বতন্ত্র কপির জন্য প্রিন্টিং প্রেস ব্যবহার করা অযৌক্তিক ছিলো । সুলতান ফাতিহ থেকে সোলায়মান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট পর্যন্ত প্রায় সকল অটোম্যান সুলতানরা ইউরোপের শহরগুলোতে অভিযান চালিয়েছেন ও জয়লাভ করেছেন । তারা যদি চাইতেন তাহলে পুরো অটোম্যান সাম্রাজ্যে প্রিন্টিং প্রেস ব্যবহার শুরু করতে পারতেন । কিন্তু তৎকালীন অটোম্যান রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে প্রিন্টিং প্রেস নিষ্প্রয়োজন ছিলো ।

দ্বিতীয়ত প্রথম দিকের প্রিন্টিং প্রেসে অক্ষরগুলো আলাদা আলাদা লেখা হতো । এভাবে ইংরেজি শব্দগুলো লেখা সম্ভব হলেও আরবী শব্দগুলো লেখা সম্ভব ছিলো না । যেমন আরবী حسن শব্দটি প্রিন্টিং প্রেসে লেখলে ح س ن এইরকম হতো। তাই প্রিন্টিং প্রেসে আরবী লেখলে তা একটা বিশৃঙ্খল টেক্সট হতো ফলে অটোম্যানরা দীর্ঘদিন প্রেসে আরবী ছাপে নাই । পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রিন্টিংপ্রেস ব্যবহারের ফরমান জারি করলেও ধর্মীয়গ্রন্থ ছাপানোর অনুমতি দেওয়া হয় নাই।

আরেকটি কারণ হলো সুলতান সোলায়মানের পে রোল রেজিস্টার থেকে জানা যায় ১৫২৬-১৫৬৬ সালের মধ্যে শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় বেতনভুক্ত লেখক ছিল ১৪০ এরও অধিক যারা টেক্সট লিখত ও ডিজাইন করতো। সোলায়মানের শাসনামলে প্রায় দেড় লক্ষাধিক ফরমান জারি করা হয় অর্থাৎ গড়ে প্রতি বছর ৩৪০০ ও প্রতিদিনে ১০টির মতো ফরমান জারি হতো । এর বাইরে আরো কয়েক হাজার অনুলেখক লেখা কপি করতো। ইস্তাম্বুল ভ্রমণের পর ফার্নান্দো মারসিগ্লি প্রায় আশি হাজার লিপিকার ইস্তাম্বুলে কাজ করেন বলে তিনি বর্ণনা দেন। যদি প্রিন্টিং প্রেসের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হতো তবে লেখক ও অনুলেখকগণ বেকার হয়ে যেতো । এমনকি ১৭২৭ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রিন্টিংপ্রেস ব্যবহারের ঘোষণা দিলেও অনুলেখকগণ বাব-ই-আলী (সাবলাইম পোর্তে) তে বিক্ষোভ করে।

প্রিন্টিং প্রেসের প্রতি অটোম্যানদের ঘৃণাঃ
অনেক অরিয়েন্টালিস্টরা প্রিন্টিং প্রেসের প্রতি অটোম্যানদের ঘৃণার বিবরণ দিয়েছেন,যা নির্জলা মিথ্যাচার । অটোম্যানরা প্রিন্টিং প্রেসকে ঘৃণা করেনি ঠিক তবে এর প্রতি বীতশ্রদ্ধ ছিলো ।
১৪৯২ সালে ক্রিস্টানদের স্পেনিশ রিকনকুইস্তার পর অনেক মুসলিম ও ইহুদি (সেফারদিক ইহুদি) অটোম্যান সাম্রাজ্যে চলে আসে । ১৪৯৩ সালে সেফারদিক ইহুদিরা স্পেন ও পর্তুগাল থেকে কিনে আনা প্রিন্টিং প্রেস সর্বপ্রথম ইস্তাম্বুলে স্থাপন করে । ১৫০৪ সালে ডন ইয়াহুদা গিদালয়া নামের লিসবনের এক শরণার্থী ইস্তাম্বুলের প্রিন্টিং প্রেস থেকে তাওরাত প্রকাশ করে । ১৫২৭ সালে ইহুদি প্রকাশক সঞ্চিনো ইতালি থেকে ইস্তাম্বুলে চলে আসে ও ১৫৪৬ সালে আরবী টেক্সট হিব্রু অক্ষরে প্রকাশ করে । ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে ইস্তাম্বুলের হিব্রু প্রকাশনা শিল্প ভেনিস ও আমস্টারডামের সাথে পাল্লা দেয়া শুরু করে এবং সতেরশো শতাব্দীর মধ্যভাগে কায়রো ও ফেজের মতো অটোম্যান শহরে হিব্রু প্রেস সফল্ভাবে পরিচালিত হয়। অন্যদিকে ১৫৬৭ সালে আর্মেনীয়রা ইস্তাম্বুলে প্রিন্টিং প্রেস চালু করে ও ডোমিনিকানদের সাথে তাদের প্রেস শেয়ার করে যারা পরবর্তীতে তাদের প্রকাশনার জন্য ভেনিস থেকে ল্যাটিন ফ্রন্ট আমদানি করে । ১৫৮৮ সালে সুলতান আহমদ একটি ফরমান জারি করে অটোম্যান সাম্রাজ্যে ইতালীয় ব্যবসায়ীদেরকে বই বিক্রির অনুমতি দেন ।

উপরের ইতিহাস থেকে বুঝা যায় প্রিন্টিং প্রেসের প্রতি অটোম্যানদের ঘৃণা ছিলো না । অটোম্যান সুলতানগণ রাষ্ট্রীয় কাজে প্রিন্টিং প্রেস ব্যবহার না করলেও এটি ব্যবহারে বাধা দেননি অর্থাৎ এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান নিরপেক্ষ ছিলো । প্রিন্টিং প্রেসের প্রতি অটোম্যানদের যদি এতোই ঘৃণা থাকতো তবে তারা তাদের সাম্রাজ্যে কোন প্রেস স্থাপন করতে দিতো না তবে প্রিন্টিং প্রেসের প্রতি অটোম্যানদের বীতশ্রদ্ধার বেশ কিছু যৌক্তিক কারণ ছিলো ।
প্রথমত ১৪৫৫ সালে বিখ্যাত গোটেনবার্গ বাইবেল প্রকাশেরও প্রায় এক বছর পূর্বে গোটেনবার্গ প্রেস Eine Mahnung der Christenheit wider die Türken (A warning for Christendom against the Turks) নামে একটি বই প্রকাশ করে, যেখানে “অটোম্যান দখলদারিত্বের” বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে ও সাইপ্রাসকে রক্ষা করতে ক্রিস্টান জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান জানানো হয় অর্থাৎ প্রথম থেকেই ইউরোপীয়রা প্রিন্টিং প্রেসকে অটোম্যান অগ্রযাত্রা রুখতে ও খ্রিস্টান জাতিকে নতুন ক্রুসেডে উদ্বুদ্ধ করে । ফলে অনেক অটোম্যান প্রিন্টিং প্রেসকে “অটোম্যান বিরোধী” হিসেবে দেখতে থাকে ।
দ্বিতীয় ঘটনাটি ছিলো ম্যাসিভ ডেভাস্টেটিং যা অটোম্যানদেরকে প্রিন্টিং প্রেসের প্রতি চূড়ান্তভাবে বীতশ্রদ্ধ করে তোলে । ১৫১৪ সালে পোপ জুলিয়াসের সহায়তায় ইতালিতে প্রথম আরবী বই Kitab Salat al-Sawa’i প্রকাশিত হয় । এর প্রায় ৩০ বছর পর ১৫৩৭ বা ১৫৩৮ সালের দিকে ভেনিসের আলেসান্দ্রো পাগানিনো সর্বপ্রথম প্রিন্টিং প্রেসে কুরআন প্রকাশ করেন । পুরো কুরআন কোন ব্যাখ্যা বা অনুবাদ ছাড়াই শুধুমাত্র টেক্সট আকারে প্রকাশিত করা ইঙ্গিত করে যে, কুরআনগুলো এক্সপোর্ট করার জন্য প্রকাশিত হয়েছে (অনেকটা মার্টিন লুথারের গণহারে বাইবেল প্রকাশের মতো) । ভেনিসে ছাপানো সেই কুরআনে যবরের জায়গায় যের,পেশের জায়গায় যবর, দাল(د)-যাল(ذ) ও আইন(ع)-গাইন(غ) এর মধ্যে ভ্রান্তি ও বিভিন্ন স্থানে অযাচিতভাবে আলিফ সংযোজন সহ অসংখ্য টেক্সট্যুয়াল ভুল ছিলো । এমনকি ভেনিসে ছাপানো সেই কুরআনের প্রথম পৃষ্ঠাতেও ছিলো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভুল । অটোম্যানরা যেখানে শত শত বছর ধরে পবিত্রতা ও চরম আধ্যাত্মিকতার সাথে হস্তাক্ষরে নির্ভুলভাবে কুরআন লিখতো সেখানে প্রিন্টিংপ্রেসে তৈরি এমন বিশৃঙ্খল টেক্সট ও বিচ্ছিরি কুরআন দেখে তাদের অনুভূতি ছিলো “কেবলমাত্র শয়তান স্বয়ং পবিত্র গ্রন্থের এমন কুৎসিত ও জঘন্য সংস্করণ প্রকাশ করতে পারে” ।

অটোম্যান সাম্রাজ্যে কি সত্যিই প্রিন্টিং প্রেস নিষিদ্ধ ছিলো ??

কিছু অসৎ অরিয়েন্টালিস্টরা পূর্ব ও পশ্চিমে খুবই ভালোভাবে এই মিথ্যা প্রতিষ্ঠা করেছেন যে,(এমনকি
আজ পর্যন্ত এই মিথ্যা বহাল তবিয়তে জারি আছে) “অটোম্যান সুলতান বায়েজিদ কর্তৃক ১৪৮৩ সালে জারিকৃত একটি ফরমানে প্রিন্টিং প্রেস ব্যবহার নিষিদ্ধ করেন ও কেউ প্রিন্টিং প্রেস ব্যবহার করলে মৃত্যুদন্ডের বিধান চালু করেন পরবর্তীতে ১৫১৫ সালে সুলতান সেলিম এই বিধান নবায়ন করেন”। অরিয়েন্টালিস্টরা তাদের বইয়ে সরাসরি ধারণার ভিত্তিতে বর্ণনা করেন, “ফরমানটি স্পষ্টত মুদ্রণকে নিষিদ্ধ করে” ,“ধর্মীয় অনুমতির ভিত্তিতে লেখা মুদ্রণ” ,“নির্দিষ্ট কয়েকটি ভাষায় টেক্সটের সীমাবদ্ধ মুদ্রণ”ইত্যাদি ।

কিন্তু ইতিহাসের সাহায্যে আমরা প্রিন্টিং প্রেস নিয়ে মোট চারটি ফরমানের কথা জানতে পারি;দ্বিতীয় বায়েজিদ(১৪৮৩) ,প্রথম সেলিম(১৫১৫),তৃতীয় মুরাদ(১৫৮৮) ও তৃতীয় আহমদের(১৭২৭) ফরমান [40]। কিন্তু Kathryn A. Schwartz তার Did Ottoman Sultans Ban Print? প্রবন্ধে বলেন “no one has claimed to have seen the firmans of Bayezid and Selim concerning print” অর্থাৎ “বায়েজিদ ও সেলিমের ফরমানগুলো কেউ দেখেছেন বলে দাবি করেন নি”। নুসহাত গেরসেক ও ওসমান এরসয় ফরমানটির “অনিশ্চয়তা” তুলে ধরেছেন ও এর “ঐতিহাসিক ভিত্তিহীনতা” প্রকাশ করেছেন । এমনকি মেইনস্ট্রিম ঐতিহাসিকদেরও কেউ বায়েজিদ ও সেলিমের ফরমান জাস্টিফাই করতে পারেননি । অনেক অরিয়েন্টালিস্টরা অবশ্য বলেছেন তাদের ফরমান নাকি ইতিহাস থেকে হারিয়ে গিয়েছে !!!
সাধারণত সুলতান বায়েজিদ রাজকীয় কোন আইন পাশ করার পূর্বে বিতর্কের আয়োজন করতেন (অনেকটা আজকের সংসদের মতো) । কিন্তু প্রিন্টিং প্রেস নিষিদ্ধ নিয়ে তিনি কোন বিতর্কের আয়োজন করেছিলেন বলে ঐতিহাসিকরা লিপিবদ্ধ করেন নি । সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এতো দীর্ঘকাল মৃত্যদন্ডের এই ফরমানটি জারি থাকলেও এই ফরমানের অধীনে মৃত্যুদণ্ড তো দূরে থাক,সাধারণ কোন অভিযোগও লিপিবদ্ধ হয় নি । তবে কি আদৌ “ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাওয়া মৃত্যদন্ডের বিধান সংবলিত প্রিন্টিং প্রেস নিষিদ্ধের” এই ফরমানটি জারি করা হয়েছিলো ?? সেই প্রশ্নের জবাব আপনাদের জন্যই থাকলো ।

অটোম্যান সাম্রাজ্যে প্রিন্টিং প্রেসের প্রয়োজনীয়তাঃ
আমরা আগেই দেখেছি পঞ্চদশ শতাব্দীতে সাম্রাজ্যের প্রাশাসনিক কাজে প্রিন্টিং প্রেস ব্যবহার করা “লস প্রজেক্ট” ছিলো । এর বাহিরে শিক্ষার জন্য কিছু ধর্মীয় পাঠ্যপুস্তক সবার কাছেই ছিলো । এছাড়া নির্দিষ্ট কিছুদিন ইস্তাম্বুলের পাবলিক লাইব্রেরী খোলা থাকতো যেখান থেকে স্কলার,বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষার্থীরা তাদের প্রয়োজনীয় টেক্সট কপি করতো বা বই ধাঁর নিতো । ফলে প্রথমদিকে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রিন্টিং প্রেস এতো প্রয়োজনীয় ছিলো না ।

শুধুমাত্র ইউরোপের একটা শহরে যে পরিমাণ প্রিন্টিং প্রেস ছিলো গোটা অটোম্যান সাম্রাজ্যে ততগুলো প্রিন্টিং প্রেস ছিলো না । অথচ ইউরোপ প্রিন্টিং প্রেস আবিষ্কারের প্রায় ৫০ বছরের মাথায় অটোম্যান সাম্রাজ্যে প্রিন্টিং প্রেস স্থাপিত হয় । আসলে তখন অটোমানরা প্রিন্টিং প্রেস ছাড়াই সামগ্রিকভাবে এতো
ভালোভাবে সাবলীল জীবনযাপন করছিলো যে ইউরোপিয়ানদের মতো তারা এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয় ।

১৫৮৮ সালে সুলতান মুরাদের ফরমান নিয়ে এন্টন ও বদোনি নামক দুই ব্যবসায়ী অটোম্যান সাম্রাজ্যে আরবী,টার্কিশ ও পার্সিয়ান বই আমদানী শুরু করে । সুলতানের ফরমানের কারণে তাদের বই অটোম্যান বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে জব্দ হওয়া থেকে বেচে যায় ও তারা অটোম্যান সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে ব্যবসা করার অনুমতি লাভ করে । ১৫৯৪ সালে তারা Euclid’s Elements এর আরবী সংস্করণ নিয়ে আসে ও পরবর্তীতে তারা ইবনে সিনার বিখ্যাত al-Qanun এরও আরবী সংস্করণ আনে । কিন্তু বই দুইটি ইউরোপের তুলনায় খুব কম বিক্রি হয় ও তারা ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় । এটি অটোম্যানদের সামাজিক প্রেক্ষাপট,সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের আলোকে প্রিন্টিং বইয়ের প্রতি তাদের অনীহা প্রকাশ করে ।

শুক্রু হানিয়ুগ্লু তার বইয়ে দেখান যে, রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রিন্টিংপ্রেস ব্যবহারের ঘোষণা দেয়ার পর থেকে অর্থাৎ ১৭২৭ থেকে ১৮৩৮ সালের মধ্যে অটোম্যান রাজকীয় প্রিন্টিং প্রেস থেকে মাত্র ১৪২টি বই প্রকাশিত হয় । এটা প্রমাণ করে যে অটোম্যানদের সাংস্কৃতিক জীবনে প্রিন্টিং প্রেস নিষ্প্রয়োজন ছিলো । অটোম্যানরা উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এসে প্রাণবন্ত প্রিন্টিং প্রেসের উত্থানকে পুরোপুরি গ্রহণ করে ।

উপরের দুটি উদাহরণ থেকে বুঝা যায় প্রথকদিকে অটোম্যান সাম্রাজ্যে প্রিন্টিং প্রেস খুব একটা প্রয়োজন ছিলো না তবে শেষদিকে তারা এর জন্য কিছুটা পিছিয়ে যায় ।

প্রিন্টিং প্রেস ও ধর্মীয় উন্মাদনাঃ
প্রিন্টিং প্রেস নিয়ে অটোম্যানদের মধ্যে কোন ধর্মীয় উন্মাদনা ছিলো না তবে কুরআন বিকৃতির আশঙ্খায় তারা দীর্ঘদিন প্রিন্টিং প্রেসে কোন ধর্মীয় গ্রন্থ ছাপায় নি । ১৫৩৮ সালের দিকে ভেনিসের প্রেসে ত্রুটিপূর্ণ কুরআন ছাপানো হলে অটোম্যানদের এই আশঙ্খা সত্য প্রমাণিত হয় । অরিয়েন্টালিস্টরা প্রিন্টিং প্রেস নিষিদ্ধের সাথে আলেমদের সম্পৃক্ততার যে বর্ণনা দিয়েছেন তা ভিত্তিহীন মিথ্যাচার । আদতে অটোম্যান সাম্রাজ্যে কখনোই প্রিন্টিং প্রেস নিষিদ্ধ ছিলো না ।
তৎকালীন শায়েখুল ইসলামের ফতোয়া থেকেও প্রিন্টিং প্রেস সম্পর্কে আলেমদের মনোভাব বুঝা যায় । শায়েখুল ইসলাম তার ফতোয়াতে বলেন “শব্দ দিয়ে বাক্য তৈরি করে মুদ্রণ শিল্পীরা খুব সহজেই অনেক বই উৎপাদন করতে পারে যা খুব সস্তা । যেহেতু এটি কার্যকর পদ্ধতি তাই ইসলাম এটিকে অনুমতি দেয় । বই সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের উচিত প্রথমে বইটি সংশোধন করা । বই মুদ্রণের পূর্বে পর্যালোচনা করা ভালো ।”

১৬৫২ সালে অটোম্যান সাম্রাজ্যের জনৈক খ্রিস্টান বর্ণনা করেন তিনি প্রিন্টিং প্রেস থেকে হস্তলিপিকে বেশি প্রাধান্য দেন ও প্রিন্টিং প্রেসকে “বিদেশী” ও “ফ্রাঙ্কিস” হিসেবে গণ্য করেন । এখন প্রশ্ন হচ্ছে ধর্মীয় উন্মাদনাই যদি মুসলিমদেরকে প্রিন্টিং প্রেস ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতো তাহলে অধিকাংশ খ্রিস্টানরাও প্রিন্টিং প্রেস ব্যবহার করে নি কেন ?
প্রিন্টিং প্রেসের ব্যাপারে রাষ্ট্রের মতো ধর্মীয় আলেমরাও ছিলেন নিরপেক্ষ । তারা যেমন অমুসলিমদের বাধা দেন নি তেমনি নিজেরাও প্রেস ব্যবহার করেননি । তবে অটোম্যানদের মাটিতে কেউ প্রিন্টিং প্রেসকে ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারেনি । এইরকম একটি ঘটনা ঐতিহাসিকরা লিপিবদ্ধ করেছেন । ব্রিটিশ ও ডাচ সহায়তায় লুকারিস নামক এক ব্যাক্তি অটোম্যান সাম্রাজ্যে গ্রীক অর্থোডক্স প্রেস স্থাপন করে ,যার উদ্দেশ্য ছিলো স্থানীয় অর্থোডক্স শিক্ষাকে সহজ ও গতিশীল করা । কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই প্রেসটি তার উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয় ও তাদের প্রকাশনায় এন্টি-ক্যাথলিসিজম ও এন্টি-সেমিটিজম প্রোপাগান্ডা শুরু হয় । এর কিছুদিন পর তারা ইসলামের সমালোচনা করে একটি লেখা প্রকাশ করে যা স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত পাশার দৃষ্টিগোচর হয় । ফলে জেনেসারিরা সেই প্রেসে হামলা চালায়,সকল প্রিন্টিং উপকরণ জব্দ করে ও প্রেসটি ধ্বংস করে দেয়।

অটোম্যানদের পতনে প্রিন্টিং প্রেসের ভূমিকাঃ
অটোম্যানদের পতনের কারণ অনুসন্ধানের জন্য অতীতে প্রচুর গবেষণা হয়েছে,ভবিষ্যতেও হবে । শেষদিকে অটোমানরা যেমন জ্ঞান বিজ্ঞানে পিছিয়ে পরে তেমনি যুগ যুগ ধরে আকড়ে থাকা আধ্যাত্মিকতা থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে । শেষদিকের বেশ কয়েকজন সুলতান “ইউরোপীয়”দের মতো হওয়ার জন্য ইউরোপে শিক্ষানবিশ পাঠায় যারা পরবর্তীতে তাঞ্জিমাত ও অন্যান্য সংস্কার আন্দোলন গড়ে তুলে । মুসলিম ঐতিহাসিকরা অটোম্যানদের পতনের কারণ হিসেবে ইজতিহাদের অভাব, অটোমান শাসন পদ্ধতি এবং সাম্রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যকে বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য করতে না পারা কে দায়ী করেন । জামালুদ্দিন আফগানীর মতো রিফর্মিস্টরা ইসলামী যুক্তিনির্ভর দর্শন ও বৈজ্ঞানিক বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতুহল দমন করার জন্য অটোম্যান শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতাকে দায়ী করেন । অন্যদিকে পশ্চিমা ঐতিহাসিক যেমন বার্নার্ড লুইস তার “What Went Wrong?” বইয়ে “ইসলামী সংস্কৃতির বাধা,রাজনৈতিক সেক্যুলারিজমের অনুপস্থিতি,শিল্পায়নের অভাব ও আধুনিকতাকে আলিঙ্গন করার অনীহাকে” অটোম্যানদের পতনের জন্য দায়ী করেন । যদিও পরবর্তীতে তিনি তার অরিয়েন্টালিস্টিক এপ্রোচের জন্য সমালোচিত হন ।
অটোম্যানদের পতনের কারণ হিসেবে খুব কম ঐতিহাসিকই প্রিন্টিং প্রেসকে দায়ী করেছেন । অটোম্যানদের পতনের অনেকগুলো কারণের মধ্যে প্রিন্টিং প্রেস খুবই গৌণ একটা কারণ । আসলে ইউরোপিয়ান হেজিমনিতে ভোগা অনেকেই ইউরোপীয় ও অটোম্যানদের বাইল্যাটারাল তুলনা করে দেখান যে, “ইউরোপীয়রা প্রিন্টিং প্রেস ব্যবহার করে প্রটেস্ট্যান্ট মুভমেন্ট,এনলাইটেনমেন্ট ও শিল্প বিপ্লব সংঘটিত করে যার কারণে তারা উন্নত হয় ও অটোমানরা প্রিন্টিং প্রেস ব্যবহার না করায় তারা পিছিয়ে পরে” । আসলে মূল ব্যাপারটি তা নয় । প্রটেস্ট্যান্ট মুভমেন্টের কারণে ইউরোপে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হয় । এনলাইটেনমেন্টের মাধ্যমে সংঘটিত হওয়া ফরাসি বিপ্লব রীতিমত “রক্তাক্ত বিপ্লবে” পরিণত হয় । এখন প্রশ্ন হলো তাহলে ইউরোপের উন্নয়নের মূলমন্ত্রটি কি ?
ইউরোপের উন্নয়নের মূলমন্ত্রটি হলো কলোনিয়ালাইজেশন । একটা সময় ইউরোপ অটোম্যানদের থেকে অনেক পিছিয়ে ছিলো । কিন্তু কলোনিয়ালাইজেশনের পর থেকে তারা কলোনিগুলোকে এমনভাবে শোষতে থাকে যে,অল্প কয়েক যুগের মধ্যেই তারা অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠে । ফলে তারা সামরিক ও শিক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ করতে থাকে যা শিল্পবিপ্লব বয়ে আনে । অন্যদিকে অটোম্যানদের জিযিয়া,যাকাত,ওয়াকফ থেকে প্রাপ্ত অর্থ ইউরোপের ধারে কাছেও ছিলো না । এইসব অর্থের বড় একটি অংশ আবার সাম্রাজ্যের বিদ্রোহ দমন করতে ব্যয় হতো । ফলে অমানবিক শোষণ ও অত্যাচারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠে ইউরোপের সাথে ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা অটোমানরা পাল্লা দিতে পারেনি ।
পরিশেষে-

সামাজিক প্রেক্ষাপটের আলোকে অটোম্যানদের প্রিন্টিং প্রেস ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়নি । কিন্তু প্রিন্টিং প্রেসের সাথে জড়িয়ে মুসলিম স্বর্ণযুগের রূপকার আলেম ও সুলতানদের চরিত্র হননের যে হীন প্রয়াস অরিয়েন্টালিস্টরা শুরু করেছিলো তা আজো বহাল তবিয়তে চলছে । সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে মুসলিমরাও অরিয়েন্টালিস্টদের সাথে এ হীন কাজে যোগ দিয়েছে । প্রিন্টিং প্রেস নিষিদ্ধ ও মৃত্যুদন্ডের বিধান জারির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমাদের শ্রেষ্ঠসন্তানদের চরিত্র হনন আর কতোকাল চলবে??………………

লেখকঃ উলুবাতলি হাসান
তথ্যসূত্রঃ

1.Kinross, Patrick Balfour. 1977. The Ottoman Centuries: The Rise and Fall of the Turkish Empire. New York, NY: Morrow;155
2.Bloom, Jonathan M. 2001. Paper Before Print: The History and Impact of Paper in the Islamic World. New Haven, CT: Yale University Press;221
3.Levey, Michael. 1975. The World of Ottoman Art. London, United Kingdom: Thames and Hudson;60
4.Atıl, Esin. 1987. The Age of Sultan Süleyman the Magnificent. Washington, D.C.: National Gallery of Art;31
5.Kreiser, Klaus. 2001. “Causes of the Decrease of Ignorance? Remarks on the printing of books in the Ottoman Empire.”;13
6.Rogers, J. M. and R. M. Ward. 1988. Süleyman the Magnificent. London, United Kingdom: British Museum Publications;58-59
7.Kunt, I. Metin. 2005a. Interview with author. October 18, 2005. Amman, Jordan
8.https://www.youtube.com/watch?v=4dEvEFBpVjg
9.Atıl, Esin. 1987. The Age of Sultan Süleyman the Magnificent. Washington, D.C.: National Gallery of Art;30-31,289-297
10.Bloom, Jonathan M. 2001. Paper Before Print: The History and Impact of Paper in the Islamic World. New Haven, CT: Yale University Press;222
11.Faroqhi, Suraiya. 2000. Subjects of the Sultan: Culture and Daily Life in the Ottoman Empire. New York, NY: I.B. Tauris Publishers;96
12.Oman, G. 1960. “Matba’a.” In The Encyclopaedia of Islam, Vol. 6: 794-799. Leiden, The Netherlands: Brill;795
13.https://www.dailysabah.com/feature/2015/06/08/myths-and-reality-about-the-printing-press-in-the-ottoman-empire
14.Tamari, Ittai Joseph. 2001. “Jewish printing and publishing activities in the Ottoman cities of Constantinople and Salonika at the dawn of early modern Europe.”
15.Finkel, Caroline. 2005. Osman’s Dream: The Story of the Ottoman Empire, 1300-1923. London, United Kingdom: John Murray;366
16.Tamari, Ittai Joseph. 2001. “Jewish printing and publishing activities in the Ottoman cities of Constantinople and Salonika at the dawn of early modern Europe.”;9
17.Krek, Miroslav. 1979. “The Enigma of the First Arabic book Printed from Movable Type.”;209
18.Abdulrazak, Fawzi A. 1990. “The Kingdom of the Book: The History of Printing as an Agency of Change in Morocco Between 1865 and 1912.” Ph.D. Dissertation. Boston University;76
19.Tamari, Ittai Joseph. 2001. “Jewish printing and publishing activities in the Ottoman cities of Constantinople and Salonika at the dawn of early modern Europe.”;9
20.AbiFarès, Huda Smitshuijzen. 2001. Arabic Typography: A Comprehensive Sourcebook. London, United Kingdom: Saqi;65
21.Steinberg, S. H. 1996. Five Hundred Years of Printing. London, United Kingdom: The British Library and Oak Knoll Press;53
22.Bloom, Jonathan M. 2001. Paper Before Print: The History and Impact of Paper in the Islamic World. New Haven, CT: Yale University Press;221
23.Kut, Günay Alpay. 1960. “Matba’a: In Turkey.” In The Encyclopaedia of Islam, Vol. 6: 799-803. Leiden, The Netherlands: Brill;799
24.Füssel, Stephan. A. 2003. Gutenberg and the Impact of Printing. Burlington, VT: Ashgate Publishing Company.
25.Lunde, Paul. 1981. “Arabic and the Art of Printing.” Saudi Aramco World, March/April 1981: 20-35.
26.Eisenstein, — 2005. The Printing Revolution in Early Modern Europe. Second edition. Cambridge, United Kingdom: Cambridge University Press.
27.Eisenstein, — 2005. The Printing Revolution in Early Modern Europe. Second edition. Cambridge, United Kingdom: Cambridge University Press.;303
28.Abdulrazak, Fawzi A. 1990. “The Kingdom of the Book: The History of Printing as an Agency of Change in Morocco Between 1865 and 1912.” Ph.D. Dissertation. Boston University;78
29.Krek, Miroslav. 1979. “The Enigma of the First Arabic book Printed from Movable Type.”
30.AbiFarès, Huda Smitshuijzen. 2001. Arabic Typography: A Comprehensive Sourcebook. London, United Kingdom: Saqi;45
31.Bloom, Jonathan M. 2001. Paper Before Print: The History and Impact of Paper in the Islamic World. New Haven, CT: Yale University Press;219
32.Pedersen, Johannes. 1984. The Arabic Book. Princeton, NJ: Princeton University Press;131
33.Nuovo, Angela. 1990. “A Lost Arabic Koran Rediscovered.” The Library: The Transactions of the Bibliographic Society s6-12, 4 (December 1990): 273-292
34.Abdulrazak, Fawzi A. 1990. “The Kingdom of the Book: The History of Printing as an Agency of Change in Morocco Between 1865 and 1912.” Ph.D. Dissertation. Boston University;66-67
35.Mahdi, Mushin. 1995. “From the Manuscript Age to the Age of Printed Books.” In The Book in the Islamic World: The Written Word and Communication in the Middle East, edited by George N. Atiyeh, 1-15. Albany, NY: State University of New York Press.
36.https://en.wikipedia.org/wiki/Global_spread_of_the_printing_press
37.Finkel, Osman’s Dream, 366
38.Dagmar Glass and Geoffrey Roper, “Part I: The Printing of Arabic Books in the Arab World,” in Middle Eastern Languages and the Print Revolution: A Cross-Cultural Encounter, ed. Eva Hanebutt-Benz, Dagmar Glass, and Geoffrey Roper [Westhofen: WVAVerlag Skulima, 2002];177
39.Bernard Lewis, The Emergence of Modern Turkey [London: Oxford University Press, 1961]; 50
40.Kathryn A. Schwartz, “Did Ottoman Sultans Ban Print?”;6
41.Refer to the above-listed [40]
42.Faroqhi, Suraiya. 2000. Subjects of the Sultan: Culture and Daily Life in the Ottoman Empire. New York, NY: I.B. Tauris Publishers;95
43.Nuhoğlu, Hidayet Y. 2000. “Mütefferika’s Printing Press: Some Observations.” In The Great Ottoman-Turkish Civilization, edited by Kemal Çiçek, Vol. 3: 83-90. Ankara, Turkey: Yeni Türkiye Publications.
44.Şükrü Hanioğlu, “A Brief History of the Late Ottoman Empire”, Princeton University Press (2010)
45.Faroqhi, Suraiya. 2000. Subjects of the Sultan: Culture and Daily Life in the Ottoman Empire. New York, NY: I.B. Tauris Publishers;95
46.Runciman, Steven. 1968. The Great Church in Captivity: A Study of the Patriarchate of Constantinople from the Eve of the Turkish Conquest to the Greek War of Independence. Cambridge, United Kingdom: Cambridge University Press;272-273
47.Faroqhi, Suraiya. 2000. Subjects of the Sultan: Culture and Daily Life in the Ottoman Empire. New York, NY: I.B. Tauris Publishers;70
48.https://www.islamiqate.com/830/ottomanist-scholars-researchers-alleged-ottoman-decline

এই পোষ্টটি আপনার সামাজিক মিডিয়াতে শেয়ার করুন।

Design & developed by Masum Billah