মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০৪:২০ পূর্বাহ্ন

যে অভ্যাসগুলোয় ক্ষতিগ্রস্ত হয় তোমার মস্তিষ্ক

রবিউল আউয়াল- তোমার শরীরটা যদি হয় একটা গাড়ি তাহলে তোমার হৃদপিণ্ড বা হার্ট হচ্ছে সেই গাড়ির ইঞ্জিন। আর গাড়ির ড্রাইভার হচ্ছে মস্তিষ্ক বা ব্রেইন। ড্রাইভার যেমন গাড়ি কোনদিকে যাবে, কত গতিতে যাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে ঠিক তেমনি তুমি কি করবে, কি বলবে তথা দেহের অভ্যন্তরীণ সার্বিক ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে তোমার মস্তিষ্ক। আবার অগণিত স্মৃতির ভাণ্ডারও এই মস্তিষ্ক।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, কিছু দৈনন্দিন অভ্যাস যা আপাত দৃষ্টিতে খুব স্বাভাবিক মনে হতে পারে অথচ সেগুলোই মস্তিষ্কের উপর নিদারুণ ক্ষতি সাধন করে যাচ্ছে নীরবে। ব্যাপারটা কী ভয়ংকর,  তাই না? তাহলে এসো সেই ভুল অভ্যাসগুলো সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।

বিজ্ঞানীদের মতে, মস্তিষ্ক ১০০ বিলিয়ন সেল দিয়ে তৈরি ও অনেকটা মাংসপেশির মতো। মস্তিষ্ক যতই ব্যবহার হবে, ততই এটি শক্তিশালী হবে। তবে দুঃখের বিষয়– দৈনন্দিন জীবনে এমন কিছু অভ্যাস আছে, যেগুলো মস্তিষ্কের ক্ষতি করে।

 

সকালের নাস্তা বাদ দেয়া 

দিনের আহারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সকালের নাস্তা বা ব্রেকফাস্ট। রাতে দীর্ঘ সময় ঘুমের পর সকালে উঠে শরীর তথা মস্তিষ্কের জন্য পুষ্টি পদার্থের চাহিদা থাকে সর্বাধিক। কিন্তু দেখা যায় প্রায়ই ছেলেমেয়েরা সকালে ঘুম থেকে উঠেই স্কুল বা কলেজে দৌড় দেয়। নাস্তা করার সময় থাকে না, আবার কখনো ঐ সময় খেতে ইচ্ছে করে না। কারণ যেটাই হোক না কেন এটি মোটেও উচিত নয়। নিয়মিত সকালের নাস্তা না করতে থাকলে দেহে সুগার লেভেল নীচে নেমে যায় যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘হাইপোগ্লাইসেমিয়া’ বলে। এছাড়াও টাইপ-২ ডায়াবেটিস, রক্তচাপ বৃদ্ধি, মাইগ্রেন ইত্যাদির ঝুঁকি বাড়ায়।

অতিরিক্ত খাওয়া 

যেমনটা বলা হয় যে সবকিছুরই একটা নির্দিষ্ট সীমা আছে। সেই সীমা লঙ্ঘন করলে হিতের বিপরীত হতে পারে। খাদ্যগ্রহণের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের অভ্যাস ব্রেইনের রক্তনালির স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট করে দেয়। অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণ মস্তিষ্কের ক্ষতির পাশাপাশি আমাদের ধমনীগাত্র শক্ত করে ফেলতে পারে যার ফলে দেখা দেয় হৃদরোগ আর হ্রাস পায় মানসিক শক্তি।

অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ 

সুগার দেহের জন্য প্রয়োজন হলেও অতিরিক্ত গ্রহণ করলে তা ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার বদ অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। প্রতিদিনের খাবারে চিনির ব্যবহার থাকেই। কিন্তু অতিরিক্ত চিনি সেবনের কারণে আমাদের শরীরে পুষ্টি এবং প্রোটিনের অভাব হয়ে থাকে। অনেক বেশি চিনি জাতীয় খাবার দেহের বিশেষ করে মস্তিষ্কের প্রোটিন এবং পুষ্টির শোষণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। যে কারণে মস্তিষ্কের নিউরণ এবং কোষ বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়, মস্তিষ্কের উন্নতি হয় না। এতে আমাদের মস্তিষ্কে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই চিনি খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে।

ধূমপান

ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তা আমরা সবাই জানি। এর সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর দিক হলো এটি মস্তিষ্ক সংকীর্ণ করে দেয়। ধারণা করা হয় আলঝেইমার্স ডিজিজ-সহ আরও অনেক স্মৃতিশক্তি লোপজনিত রোগের জন্য এটি দায়ী।

সিগারেটে নিকোটিন ছাড়াও আরও প্রায় ৭০০০ বিষাক্ত রাসায়নিক থাকে। যখন তুমি ধূমপান করো তখন সিগারেটের তামাকে থাকা নিকোটিন খুব দ্রুত রক্তে মিশে যায় এবং মাত্র ১০ সেকেন্ডের মধ্যেই পৌঁছে যায় মস্তিষ্কে। এই বিপুল পরিমাণ নিকোটিন ধারণের জন্য মস্তিষ্কে তৈরি হয় অতিরিক্ত নিকোটিন রিসেপ্টর। এই কারণে এরা নিকোটিন গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে যায়, ফলে পরে আর তোমার জন্য ধূমপান ত্যাগ করা সহজ হয় না। এছাড়া নিকোটিন অ্যাড্রেনালিন হরমোন নিঃসরণ ঘটায় যার ফলে হৃদযন্ত্রে রক্তপ্রবাহে বাধা পেয়ে হৃদস্পন্দন হার বেড়ে যায়। আবার নিকোটিন ইনসুলিন হরমোন নিঃসরণে বাধা দেয়, ফলে দেহে গ্লুকোজ মাত্রা বেড়ে দেখা দেয় ডায়াবেটিস।

অনিদ্রা 

বর্তমান প্রজন্মের একটি সাধারণ অভ্যাস হচ্ছে অকারণে রাত জাগা। কোনো কারণে রাত জাগলে এবং দিনে ঘুমিয়ে নিলে তা সমীচীন কিন্তু ঘুম থেকে নিজেকে একদমই বঞ্চিত করা উচিত নয়। কারণ তা মস্তিষ্কের জন্য প্রচণ্ড ক্ষতিকর। ঘুম মানুষের শরীরের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব তোমার ব্রেইন সেল বা নিউরন ধ্বংস করে। ফলে স্মৃতিশক্তি, সমন্বয় ও মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটে। এছাড়াও ডায়াবেটিস, স্থূলতা, বিষণ্ণতা ও হৃদরোগের মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোর সাথে এটি সম্পর্কযুক্ত। আচরণের উপরেও এটি ব্যাপক প্রভাব ফেলে- মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। বয়সভেদে গড়ে দৈনিক কমপক্ষে ৮ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন।

যে অভ্যাস গুলো  মস্তিষ্কের মারাত্নক ক্ষতি ধ্বংস করে

মস্তিষ্ক ছাড়া কারও অস্তিত্ব টিকে থাকা মোটেও সম্ভব নয়। আর তাই মস্তিষ্কের যত্ন নিতে হবে।

যেমন-

১. ধূমপানে হৃৎপিণ্ড এবং ফুসফুসের ক্ষতি করে ও ত্বকে দ্রুত বুড়িয়েও যায়। আর ধূমপানের কারণে মস্তিষ্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধূমপানের অভ্যাস মানসিক স্বাস্থ্য, আচরণগত সমস্যা তৈরি করে।

২. অতিরিক্ত অ্যালকোহল পানেও মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এই অভ্যাস ত্যাগ করা উচিত।

৩. মস্তিষ্ক যে ৭৫ শতাংশ পানি দিয়ে তৈরি তা হয়তো অনেকেই জানেন না। এ কারণে শরীরে পানিশূন্যতা হলে মস্তিষ্কেও সমস্যা দেখা দেয়।

৪. মস্তিষ্কের শক্তির প্রধান উৎস হচ্ছে গ্লুকোজ। শরীরে ৫০ শতাংশেরও বেশি গ্লুকোজ মস্তিষ্কের মাধ্যমে শরীরের নানা অংশে ব্যবহৃত হয়। তবে শরীরে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গেলে মস্তিস্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত পরিমাণ সুগার খেলে মস্তিষ্কের সেলে সমস্যা হয়। সেই সঙ্গে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহেও সমস্যা দেখা দেয়।

৫. নিয়মিত সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানো জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুম কম হলে মস্তিষ্কে টক্সিন জমা হয়। সেই সঙ্গে মস্তিষ্কের সেলও ধীরে ধীরে মরে যায়।

 

 

মুখ ঢেকে ঘুমানো 

ঘুমানোর সময় চাদর, কম্বল বা অন্য কিছু দিয়ে মাথা ঢাকা উচিত নয়। এতে নিঃশ্বাসের বায়ুই আবার গ্রহণ করতে হয় যাতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব থাকে তীব্র। ফলে মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহ হয় না। আবার দীর্ঘক্ষণ মাথায় আঁটসাঁট ক্যাপ পড়ে থাকাও উচিত নয়, এতে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহে ব্যাঘাত ঘটে।

এখন জীবন হবে আরও সুন্দর!

 

সেলফোন ব্যবহার

একটি গবেষণায় দেখা গেছে ব্রেইন ক্যান্সারের সাথে মোবাইল ফোন সম্পর্কযুক্ত। ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে যে রশ্মি বিকিরিত হয় তা আমাদের মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর। দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় ইয়ারফোন বা স্পিকার ব্যবহার করতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে, অনেকেই রাতে ঘুমানোর সময় বালিশের পাশে ফোন রেখে ঘুমায়। এই অভ্যাস অবশ্যই ত্যাগ করতে হবে।

অসুস্থতার সময় মস্তিষ্ককে চাপ দেয়া 

তুমি যখন অসুস্থ হও, তখন উচিত কোনো পরিশ্রমী কাজ অথবা পড়াশোনা থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে ব্রেইনকে বিশ্রাম দেওয়া। তা না হলে অসুস্থতার সময় অতিরিক্ত চাপ ব্রেইনের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে ব্রেইনের দীর্ঘমেয়াদি মারাত্মক ক্ষতিসাধন হয়।

নিয়মিত ঘুমের ওষুধ খাওয়া 

অনেকেই ঘুমানোর জন্য ঘুমের ওষুধ খেয়ে থাকেন। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রেই এটি একটি অভ্যাসমাত্র। নিয়মিত ঘুমের ওষুধ গ্রহণ করতে থাকলে তা মস্তিষ্কের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এক গবেষণায় দেখা গেছে পূর্ণবয়স্ক মানুষ টানা তিনমাসের বেশি সময় রোজ ঘুমের ওষুধ খেতে থাকলে তার স্মৃতিলোপজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এছাড়া ঘুমের ওষুধের জন্য প্যারাসমনিয়া হতে পারে যাতে মানুষের মস্তিষ্ক অবচেতন হয়ে যায়, অর্থাৎ মানুষ একপ্রকার না-ঘুমন্ত না-জাগ্রত অবস্থায় থাকে। অনেক সময় স্লিপ ওয়াক বা ঘুমের মধ্যে হাঁটতে দেখা যায়।

যোগাযোগহীনতা 

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা থেকে দেখা গেছে, দৈনিক কমপক্ষে মাত্র ১০ মিনিট কথা বলাও মানসিক দক্ষতা বৃদ্ধি করে। তুমি কিছুটা আত্মকেন্দ্রিক বা ইন্ট্রোভার্ট হতেই পারো কিন্তু তাই বলে একদমই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘরের কোণে থাকা উচিত নয়, এতে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তাই প্রতিদিন কিছু সময় তোমার বন্ধু, আত্মীয় বা পরিবারের মানুষের সাথে কথা বলো।

যত বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় অংশ নিতে পারবে, কোনো বিষয়ে গঠনমূলক সমালোচনায় অংশ নিয়ে যুক্তি খণ্ড করার চেষ্টা করবে সেটা ব্রেইনের স্বাভাবিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য তত কাজে লাগবে।

অলস মস্তিষ্ক

কথায় আছে, “অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা।” মস্তিষ্ককে সুন্দর চিন্তায় ব্যস্ত না রাখলে শুধু যে কুচিন্তা ভীড় করে তাই নয়, বরং তা মস্তিষ্কের জন্যেও ক্ষতিকর। যেকোনো যন্ত্র যত বেশি ব্যবহার করা হয় তা তত বেশি সচল ও কর্মক্ষম থাকে। মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি প্রযোজ্য। নিউরনের উদ্দীপনার জন্য চিন্তা-ভাবনা করা অত্যন্ত জরুরি। যত বেশি সৃষ্টিশীল চিন্তায় মনোযোগ দিতে পারবে, তোমার মস্তিষ্কের কোষ তত বেশি উদ্দীপিত হবে। আরো বেশি দক্ষ ও মনোযোগী হতে পারবে যেকোনো কাজে। চিন্তাহীন ব্রেইন ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হয়ে ব্রেইনের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।

তোমার মস্তিষ্কের উপর এইসব দৈনন্দিন অভ্যাসগুলোর এমন ক্ষতিকর প্রভাব জানার পর আজ থেকে নিশ্চয়ই তুমি এগুলো বর্জন করবে। সে ব্যাপারে তোমাকে অনুরোধ করা বা তাগাদা দেয়ার প্রয়োজন হবে না। কারণ যে মস্তিষ্ক দিয়ে মানুষ অজস্র সুন্দর চিন্তা করতে পারে, বিশ্বজয় করার মতো উদ্ভাবনী চিন্তা করতে পারে, অতীতের স্বর্গীয় মুহূর্তগুলোর স্মৃতি ধারণ করতে পারে সেই মস্তিষ্কের সামান্য ক্ষতিও যে মেনে নেয় তার থেকে বোকা পৃথিবীতে কেউ কি আছে

যে অভ্যাসগুলোয় ক্ষতিগ্রস্ত হয় তোমার মস্তিষ্ক

 

তোমার শরীরটা যদি হয় একটা গাড়ি তাহলে তোমার হৃদপিণ্ড বা হার্ট হচ্ছে সেই গাড়ির ইঞ্জিন। আর গাড়ির ড্রাইভার হচ্ছে মস্তিষ্ক বা ব্রেইন। ড্রাইভার যেমন গাড়ি কোনদিকে যাবে, কত গতিতে যাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে ঠিক তেমনি তুমি কি করবে, কি বলবে তথা দেহের অভ্যন্তরীণ সার্বিক ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে তোমার মস্তিষ্ক। আবার অগণিত স্মৃতির ভাণ্ডারও এই মস্তিষ্ক।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, কিছু দৈনন্দিন অভ্যাস যা আপাত দৃষ্টিতে খুব স্বাভাবিক মনে হতে পারে অথচ সেগুলোই মস্তিষ্কের উপর নিদারুণ ক্ষতি সাধন করে যাচ্ছে নীরবে। ব্যাপারটা কী ভয়ংকর,  তাই না? তাহলে এসো সেই ভুল অভ্যাসগুলো সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।

বিজ্ঞানীদের মতে, মস্তিষ্ক ১০০ বিলিয়ন সেল দিয়ে তৈরি ও অনেকটা মাংসপেশির মতো। মস্তিষ্ক যতই ব্যবহার হবে, ততই এটি শক্তিশালী হবে। তবে দুঃখের বিষয়– দৈনন্দিন জীবনে এমন কিছু অভ্যাস আছে, যেগুলো মস্তিষ্কের ক্ষতি করে।

 

সকালের নাস্তা বাদ দেয়া 

দিনের আহারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সকালের নাস্তা বা ব্রেকফাস্ট। রাতে দীর্ঘ সময় ঘুমের পর সকালে উঠে শরীর তথা মস্তিষ্কের জন্য পুষ্টি পদার্থের চাহিদা থাকে সর্বাধিক। কিন্তু দেখা যায় প্রায়ই ছেলেমেয়েরা সকালে ঘুম থেকে উঠেই স্কুল বা কলেজে দৌড় দেয়। নাস্তা করার সময় থাকে না, আবার কখনো ঐ সময় খেতে ইচ্ছে করে না। কারণ যেটাই হোক না কেন এটি মোটেও উচিত নয়। নিয়মিত সকালের নাস্তা না করতে থাকলে দেহে সুগার লেভেল নীচে নেমে যায় যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘হাইপোগ্লাইসেমিয়া’ বলে। এছাড়াও টাইপ-২ ডায়াবেটিস, রক্তচাপ বৃদ্ধি, মাইগ্রেন ইত্যাদির ঝুঁকি বাড়ায়।

অতিরিক্ত খাওয়া 

যেমনটা বলা হয় যে সবকিছুরই একটা নির্দিষ্ট সীমা আছে। সেই সীমা লঙ্ঘন করলে হিতের বিপরীত হতে পারে। খাদ্যগ্রহণের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের অভ্যাস ব্রেইনের রক্তনালির স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট করে দেয়। অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণ মস্তিষ্কের ক্ষতির পাশাপাশি আমাদের ধমনীগাত্র শক্ত করে ফেলতে পারে যার ফলে দেখা দেয় হৃদরোগ আর হ্রাস পায় মানসিক শক্তি।

অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ 

সুগার দেহের জন্য প্রয়োজন হলেও অতিরিক্ত গ্রহণ করলে তা ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার বদ অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। প্রতিদিনের খাবারে চিনির ব্যবহার থাকেই। কিন্তু অতিরিক্ত চিনি সেবনের কারণে আমাদের শরীরে পুষ্টি এবং প্রোটিনের অভাব হয়ে থাকে। অনেক বেশি চিনি জাতীয় খাবার দেহের বিশেষ করে মস্তিষ্কের প্রোটিন এবং পুষ্টির শোষণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। যে কারণে মস্তিষ্কের নিউরণ এবং কোষ বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়, মস্তিষ্কের উন্নতি হয় না। এতে আমাদের মস্তিষ্কে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই চিনি খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে।

ধূমপান

ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তা আমরা সবাই জানি। এর সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর দিক হলো এটি মস্তিষ্ক সংকীর্ণ করে দেয়। ধারণা করা হয় আলঝেইমার্স ডিজিজ-সহ আরও অনেক স্মৃতিশক্তি লোপজনিত রোগের জন্য এটি দায়ী।

সিগারেটে নিকোটিন ছাড়াও আরও প্রায় ৭০০০ বিষাক্ত রাসায়নিক থাকে। যখন তুমি ধূমপান করো তখন সিগারেটের তামাকে থাকা নিকোটিন খুব দ্রুত রক্তে মিশে যায় এবং মাত্র ১০ সেকেন্ডের মধ্যেই পৌঁছে যায় মস্তিষ্কে। এই বিপুল পরিমাণ নিকোটিন ধারণের জন্য মস্তিষ্কে তৈরি হয় অতিরিক্ত নিকোটিন রিসেপ্টর। এই কারণে এরা নিকোটিন গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে যায়, ফলে পরে আর তোমার জন্য ধূমপান ত্যাগ করা সহজ হয় না। এছাড়া নিকোটিন অ্যাড্রেনালিন হরমোন নিঃসরণ ঘটায় যার ফলে হৃদযন্ত্রে রক্তপ্রবাহে বাধা পেয়ে হৃদস্পন্দন হার বেড়ে যায়। আবার নিকোটিন ইনসুলিন হরমোন নিঃসরণে বাধা দেয়, ফলে দেহে গ্লুকোজ মাত্রা বেড়ে দেখা দেয় ডায়াবেটিস।

অনিদ্রা 

বর্তমান প্রজন্মের একটি সাধারণ অভ্যাস হচ্ছে অকারণে রাত জাগা। কোনো কারণে রাত জাগলে এবং দিনে ঘুমিয়ে নিলে তা সমীচীন কিন্তু ঘুম থেকে নিজেকে একদমই বঞ্চিত করা উচিত নয়। কারণ তা মস্তিষ্কের জন্য প্রচণ্ড ক্ষতিকর। ঘুম মানুষের শরীরের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব তোমার ব্রেইন সেল বা নিউরন ধ্বংস করে। ফলে স্মৃতিশক্তি, সমন্বয় ও মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটে। এছাড়াও ডায়াবেটিস, স্থূলতা, বিষণ্ণতা ও হৃদরোগের মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোর সাথে এটি সম্পর্কযুক্ত। আচরণের উপরেও এটি ব্যাপক প্রভাব ফেলে- মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। বয়সভেদে গড়ে দৈনিক কমপক্ষে ৮ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন।

যে অভ্যাস গুলো  মস্তিষ্কের মারাত্নক ক্ষতি ধ্বংস করে

মস্তিষ্ক ছাড়া কারও অস্তিত্ব টিকে থাকা মোটেও সম্ভব নয়। আর তাই মস্তিষ্কের যত্ন নিতে হবে।

যেমন-

১. ধূমপানে হৃৎপিণ্ড এবং ফুসফুসের ক্ষতি করে ও ত্বকে দ্রুত বুড়িয়েও যায়। আর ধূমপানের কারণে মস্তিষ্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধূমপানের অভ্যাস মানসিক স্বাস্থ্য, আচরণগত সমস্যা তৈরি করে।

২. অতিরিক্ত অ্যালকোহল পানেও মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এই অভ্যাস ত্যাগ করা উচিত।

৩. মস্তিষ্ক যে ৭৫ শতাংশ পানি দিয়ে তৈরি তা হয়তো অনেকেই জানেন না। এ কারণে শরীরে পানিশূন্যতা হলে মস্তিষ্কেও সমস্যা দেখা দেয়।

৪. মস্তিষ্কের শক্তির প্রধান উৎস হচ্ছে গ্লুকোজ। শরীরে ৫০ শতাংশেরও বেশি গ্লুকোজ মস্তিষ্কের মাধ্যমে শরীরের নানা অংশে ব্যবহৃত হয়। তবে শরীরে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গেলে মস্তিস্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত পরিমাণ সুগার খেলে মস্তিষ্কের সেলে সমস্যা হয়। সেই সঙ্গে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহেও সমস্যা দেখা দেয়।

৫. নিয়মিত সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানো জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুম কম হলে মস্তিষ্কে টক্সিন জমা হয়। সেই সঙ্গে মস্তিষ্কের সেলও ধীরে ধীরে মরে যায়।

 

 

মুখ ঢেকে ঘুমানো 

ঘুমানোর সময় চাদর, কম্বল বা অন্য কিছু দিয়ে মাথা ঢাকা উচিত নয়। এতে নিঃশ্বাসের বায়ুই আবার গ্রহণ করতে হয় যাতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব থাকে তীব্র। ফলে মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহ হয় না। আবার দীর্ঘক্ষণ মাথায় আঁটসাঁট ক্যাপ পড়ে থাকাও উচিত নয়, এতে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহে ব্যাঘাত ঘটে।

এখন জীবন হবে আরও সুন্দর!

 

সেলফোন ব্যবহার

একটি গবেষণায় দেখা গেছে ব্রেইন ক্যান্সারের সাথে মোবাইল ফোন সম্পর্কযুক্ত। ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে যে রশ্মি বিকিরিত হয় তা আমাদের মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর। দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় ইয়ারফোন বা স্পিকার ব্যবহার করতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে, অনেকেই রাতে ঘুমানোর সময় বালিশের পাশে ফোন রেখে ঘুমায়। এই অভ্যাস অবশ্যই ত্যাগ করতে হবে।

অসুস্থতার সময় মস্তিষ্ককে চাপ দেয়া 

তুমি যখন অসুস্থ হও, তখন উচিত কোনো পরিশ্রমী কাজ অথবা পড়াশোনা থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে ব্রেইনকে বিশ্রাম দেওয়া। তা না হলে অসুস্থতার সময় অতিরিক্ত চাপ ব্রেইনের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে ব্রেইনের দীর্ঘমেয়াদি মারাত্মক ক্ষতিসাধন হয়।

নিয়মিত ঘুমের ওষুধ খাওয়া 

অনেকেই ঘুমানোর জন্য ঘুমের ওষুধ খেয়ে থাকেন। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রেই এটি একটি অভ্যাসমাত্র। নিয়মিত ঘুমের ওষুধ গ্রহণ করতে থাকলে তা মস্তিষ্কের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এক গবেষণায় দেখা গেছে পূর্ণবয়স্ক মানুষ টানা তিনমাসের বেশি সময় রোজ ঘুমের ওষুধ খেতে থাকলে তার স্মৃতিলোপজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এছাড়া ঘুমের ওষুধের জন্য প্যারাসমনিয়া হতে পারে যাতে মানুষের মস্তিষ্ক অবচেতন হয়ে যায়, অর্থাৎ মানুষ একপ্রকার না-ঘুমন্ত না-জাগ্রত অবস্থায় থাকে। অনেক সময় স্লিপ ওয়াক বা ঘুমের মধ্যে হাঁটতে দেখা যায়।

যোগাযোগহীনতা 

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা থেকে দেখা গেছে, দৈনিক কমপক্ষে মাত্র ১০ মিনিট কথা বলাও মানসিক দক্ষতা বৃদ্ধি করে। তুমি কিছুটা আত্মকেন্দ্রিক বা ইন্ট্রোভার্ট হতেই পারো কিন্তু তাই বলে একদমই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘরের কোণে থাকা উচিত নয়, এতে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তাই প্রতিদিন কিছু সময় তোমার বন্ধু, আত্মীয় বা পরিবারের মানুষের সাথে কথা বলো।

যত বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় অংশ নিতে পারবে, কোনো বিষয়ে গঠনমূলক সমালোচনায় অংশ নিয়ে যুক্তি খণ্ড করার চেষ্টা করবে সেটা ব্রেইনের স্বাভাবিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য তত কাজে লাগবে।

কোনো সমস্যায় আটকে আছো? প্রশ্ন করার মত কাউকে খুঁজে পাচ্ছ না? যেকোনো প্রশ্নের উত্তর পেতে চলে যাও ১০ মিনিট স্কুল লাইভ গ্রুপটিতে!

 

অলস মস্তিষ্ক

কথায় আছে, “অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা।” মস্তিষ্ককে সুন্দর চিন্তায় ব্যস্ত না রাখলে শুধু যে কুচিন্তা ভীড় করে তাই নয়, বরং তা মস্তিষ্কের জন্যেও ক্ষতিকর। যেকোনো যন্ত্র যত বেশি ব্যবহার করা হয় তা তত বেশি সচল ও কর্মক্ষম থাকে। মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি প্রযোজ্য। নিউরনের উদ্দীপনার জন্য চিন্তা-ভাবনা করা অত্যন্ত জরুরি। যত বেশি সৃষ্টিশীল চিন্তায় মনোযোগ দিতে পারবে, তোমার মস্তিষ্কের কোষ তত বেশি উদ্দীপিত হবে। আরো বেশি দক্ষ ও মনোযোগী হতে পারবে যেকোনো কাজে। চিন্তাহীন ব্রেইন ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হয়ে ব্রেইনের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।

তোমার মস্তিষ্কের উপর এইসব দৈনন্দিন অভ্যাসগুলোর এমন ক্ষতিকর প্রভাব জানার পর আজ থেকে নিশ্চয়ই তুমি এগুলো বর্জন করবে। সে ব্যাপারে তোমাকে অনুরোধ করা বা তাগাদা দেয়ার প্রয়োজন হবে না। কারণ যে মস্তিষ্ক দিয়ে মানুষ অজস্র সুন্দর চিন্তা করতে পারে, বিশ্বজয় করার মতো উদ্ভাবনী চিন্তা করতে পারে, অতীতের স্বর্গীয় মুহূর্তগুলোর স্মৃতি ধারণ করতে পারে সেই মস্তিষ্কের সামান্য ক্ষতিও যে মেনে নেয় তার থেকে বোকা পৃথিবীতে কেউ কি আছে

 

এই পোষ্টটি আপনার সামাজিক মিডিয়াতে শেয়ার করুন।

Design & developed by Masum Billah