মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০৩:৩০ পূর্বাহ্ন

বেফাকের নতুন নেতৃত্ব ও কিছু কথা

আবু নাঈম ফয়জুল্লাহ
বেফাকের নতুন নেতৃত্ব এক দিক থেকে খুব আশা জাগানিয়া। তা হলো, বেফাকের মহাসচিবের পদটি এমন একজনের কাঁধে আসা যিনি বেফাকের মেজায ও সাংগঠনিক কাঠামোর সাথে পুরোপুরি অভ্যস্ত, দীর্ঘ দিন যিনি বেফাকের ভেতরে থেকে এর সমস্যা, সম্ভাবনা ও ভাল-মন্দ যাবতীয় বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ পেয়েছেন। হয়তো সমস্যাগুলোর সমাধানের পথও তার মনের মধ্যে অঙ্কিত আছে। সাথে সাথে যিনি জাতির জন্য ভাবেন। নিজেকে সর্বোচ্চ দায়িত্বের কাঠগড়ায় দাঁড় করান। যেকোনো ইস্যুতে নিজের দায়িত্বটা খুঁজে বের করে সে অনুযায়ী কাজ করেন। যিনি জাতির জন্য কাজ করতে চান, নিজের অর্জনের চিন্তা না করেই। প্রয়োজনে নিজের অনেক কিছু জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করে যান।
অপর দিকে বেফাকের সর্বোচ্চ আসনে এমন একজনকে বসানো হয়েছে, যিনি বেফাকের মেজাযের সাথে একদমই পরিচিত না। বেফাকের সাংগঠনিক অবকাঠামোর সাথে খুব বেশি মুমারাসাত যার নেই। বরং বেফাকের অনেক নীতির সাথে যার নিজস্ব নীতির বৈপরিত্ব আছে। সাথে সাথে তিনি ছাড় দেয়ার মানসিকতাও খুব একটা রাখেন না। নিজের মাসলাক ও মানহাজ নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন। যিনি ঐক্য চান, তবে তা অন্যের ছায়াতলে না হয়ে নিজের ছায়াতলে হওয়াকে বেশি পছন্দ করেন। যিনি জাতিকে নিয়ে ভাবেন, তবে নিজের অবস্থানকে ঠিক রেখে। যিনি আলেমদেরকে এসলাহ করতে চান, তবে তা দরদী বন্ধুর মতো না করে ছাত্র বা অধিনস্তদের মতো করে। আমি তাঁর কর্মপন্থার সমালোচনা করছি না। বড়দের একেজনের কর্মপন্থা একেক রকম হতে পারে, এবং সব কর্মপন্থার মধ্যেই কিছু ভাল ও কিছু মন্দ দিক থাকে।
আমি শুধু বলতে চাই, দুইজন দুই মানসিকতার হওয়ার কারণে বেফাকের কর্মকাণ্ডে স্বভাবতই একটা বিরোধ ধীরে ধীরে দানা বেঁধে উঠবে। তা হলো, কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা ও ঐতিহ্যবাদী মানসিকতার বিরোধ। ঐতিহ্যবাদী বলতে, যারা বেফাককে পূর্বসূরীদের মূল ঐতিয্যে ফিরিয়ে নিতে চাইবে। আর কর্তৃত্ববাদী বলতে ঐতিহ্য ধরে রাখার মোড়কে নিজের কর্তৃত্ব পাকাপোক্ত করার চেষ্টা। দুই দ্বন্দের কারণে বেফাকের শিক্ষাকারিকুলাম, সিলেবাস ও অবকাঠামোগত যে পরিবর্তন দরকার তা স্বাচ্ছন্দের সাথে হবে না। সংস্কারের আওয়াজ বেফাকের ভেতরে খুব বেশি জোরালো হতে পারবে না। তবে বেফাক থমকে থাকবে না। দুই জনের কারণে দুই ধরণের উন্নতি বেফাকের হবে। সভাপতির মাধ্যমে বেফাক অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে যাবে। আর সিনিয়র সহসভাপতি ও মহাসচিবের কারণে বেফাক তার গঠনতন্ত্রের দিকে ফিরে যাবে এবং সাংগঠনিকভাবে আরো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারবে।
যুগের চ্যালেঞ্জ বুঝে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেফাকের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বাধা নয়। বরং সবচে বড় বাধা হলো, কওমী মাদরাসাসমূহে চর্চিত কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা ও এর ব্যাপক প্রভাব। কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা বলতে আমি বুঝাতে চাচ্ছি, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করেই সব কিছু আবর্তিত হয়। প্রতিটি মাদরাসাতেই একজন ‘বড় হুজুর’ থাকেন। ‘বড় হুজুরে’র সংজ্ঞা হলো, তিনি যা বলবেন, তাই আইন। তার সব কাজ, সব সিদ্ধান্ত সমালোচনার উর্ধ্বে। বড় হুজুরের সিদ্ধান্তের উপর যৌক্তিক প্রশ্ন তোলাও মস্ত বেয়াদবি। যার কারণে, বেতন বৃদ্ধি, দরসি তারাক্কি, পদোন্নতি, নতুন শিক্ষক নিয়োগ, এসব ক্ষেত্রে একমাত্র ‘এতাআত’কেই প্রধান মানদণ্ড ধরা হয়। যার কারণে কোনো মাদরাসায় একজন বড় হুজুর কয়েক বছর থাকলে সেই মাদরাসার অধিকাংশ স্টাফ বড় হুজুরের ঘনিষ্টজনদের মধ্য থেকেই হয়ে যায়। ‘বড় হুজুরের’ মাসলাককেই শরীয়তের মাসলাক মনে করা হয়। বড় হুজুরের দেখানো দৃষ্টিকোণ থেকেই সেই মাদরাসার ছাত্ররা শরীয়তকে দেখতে শুরু করে। ফলে, জীবনের বিস্তীর্ণ পরিসর জুড়ে আমরা স্বাধীন ও উন্মুক্ত পাটাতন থেকে শরীয়তের দিকে তাকাতে পারি না। সবাই ‘বড় হুজুরের’ পরানো চশমা দিয়েই শরীয়তকে দেখতে থাকে, আর ছোটখাটো এখতেলাফগুলোকে বড় করতে করতে তাকফির পর্যন্ত নিয়ে যায়।
মোটকথা, কওমি অঙ্গনের অনেক সমস্যার মূলে আমার কাছে মনে হয়, এই কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা বা ব্যক্তিবন্দনাই দায়ী। আর ব্যক্তিবন্দনাকে জিইয়ে রাখার পেছনে অনেক কিছুই দায়ী তা সংক্ষিপ্ত পরিসরে ব্যাখ্যা করা কঠিন। এটা নিশ্চিত, ব্যক্তিবন্দনা জালের মতো এ সমাজের সব জায়গায় ছড়ানো। পুরোহিততান্ত্রিক হিন্দুসমাজের সরাসরি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বাহুডোরে আবদ্ধ এ দেশে ব্যক্তিবন্দনার বিরুদ্ধে আমাদের সব সময় সোচ্চার থাকা দরকার ছিলো। সেখানে আমরা আমাদের প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানে ব্যক্তিবন্দনাকেই জিইয়ে রেখেছি। হ্যাঁ কোনো কোনো জায়গায় এমন হতে পারে যে, সেখানে অনেক বড় কোনো হাস্তি আছেন, যার ব্যক্তিত্ব ও কামালাতের কারণে সবাই তার অনুসারী। কিন্তু ব্যাপকভাবে বিষয়টা এমন না, বরং সবার আকিদতই এমন হয়ে গেছে যে, বড় হুজুর যিনিই হবেন তিনি সব দিক থেকেই বড়, তার ভুল হতে পারে না।
কওমী অঙ্গনের এই মানসিকতাই বেফাকের সর্বোচ্চ আসনে প্রতিফলিত হয়েছে। শধু সর্বোচ্চ আসনে না, এ মানসিকতার মুরুব্বির সংখ্যাই বেশি হবে। যাইহোক, ব্যক্তিবন্দনার এ মানসিকতা থেকে আমাদের ফিরে আসতে হবে। আর এ জন্য মাদরাসাগুলোতে এর চর্চা বন্ধ করতে হবে। তবে তার উদ্যোগও বেফাক নিতে পারে। বেফাকের ঐতিহ্যবাদী ধারার মুরুব্বিরা নিতে পারেন। তরুণদের সমর্থন তাদের সাথে থাকবে। মোটকথা, বেফাকের নতুন কমিটির কাছে জাতির চাওয়া পাওয়া অনেক। ধীরে ধীরে তা বাস্তবায়ন হবে ইনশাল্লাহ।

এই পোষ্টটি আপনার সামাজিক মিডিয়াতে শেয়ার করুন।

Design & developed by Masum Billah