বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০, ০৩:৪২ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস যুক্তরাজ্য শাখার ভার্চুয়াল নির্বাহী সভা অনুষ্ঠিত.. অবশেষে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরব ইসলামী আন্দোলনের দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা বিশ্বজুড়ে পণ্য বর্জনের ডাকে প্রবল ঝুঁকিতে ফ্রান্সের অর্থনীতি বয়কট ফ্রান্স আন্দোলন: রেচেপ তায়েপ এর্দোয়ান ফরাসী পণ্য বর্জনের ডাক দিলেন ফ্রান্সের তাগুতী শক্তি অচিরেই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। আবার জেগেছে হেফাজত: শুক্রবার দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক মুসলমানদের কটাক্ষ করে রীতিমতো খলনায়ক বনে গেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের একটি মাদরাসায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ, ৭ তালিবুল ইলম শহীদ ৬০ মিনিটের সাক্ষাৎকারে ১৬টি মিথ্যা বলেছেন ট্রাম্প

কুরআন-সুন্নাহর ইলম কেন কল্যাণময় – মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া আব্দুল্লাহ

কুরআন মাজীদের একটি বিখ্যাত আয়াত-

یُّؤْتِی الْحِكْمَةَ مَنْ یَّشَآءُ وَ مَنْ یُّؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ اُوْتِیَ خَیْرًا كَثِیْرًا وَ مَا یَذَّكَّرُ اِلَّاۤ اُولُوا الْاَلْبَابِ .

অর্থাৎ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিকমাহ দান করেন। আর যে হিকমাহ প্রাপ্ত হয়েছে সে তো প্রভুত কল্যাণ প্রাপ্ত হয়েছে। -সূরা বাকারা (২) : ২৬৯

কুরআনে কারীমের প্রতিটি ইলম, প্রতিটি বিষয় কল্যাণ। কুরআনে কারীমের যে কোনো বিষয়ের উপর আমলের তাওফীকও কল্যাণ। কুরআনে কারীমের এক একটি অংশ যে অর্জন করে সে কল্যাণের এক একটি অংশ অর্জন করে। কুরআনে কারীমের এক একটি বিধানের উপর আমলের সৌভাগ্য যে অর্জন করে, সে খাইর ও কল্যাণের এক একটি বড় অংশ অর্জন করে।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি বিখ্যাত হাদীসে ইরশাদ করেছেন-

مَنْ يُرِدِ اللهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ.

আল্লাহ তাআলা যার ব্যাপারে কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তাকে দ্বীনের গভীর ইলম, গভীর প্রজ্ঞা দান করেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৭১; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১০৩৭

তাহলে দ্বীনের ইলম, দ্বীনের প্রজ্ঞা হচ্ছে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে অনেক বড় নিআমত। যাকে তিনি কল্যাণ দান করতে চান তাকে এই নিআমত দান করেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আল্লাহ যার ব্যাপারে কল্যাণের ইচ্ছা করেন সে কল্যাণপ্রাপ্ত হয়। দুনিয়াতেও কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, আখিরাতেও কল্যাণপ্রাপ্ত হয়। আল্লাহ পাকের ইচ্ছার বাইরে কিছুই হয় না।

ما شاءَ الله كانَ، وما لم يشَأْ لم يكُن.

আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, তা-ই হয়, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন না তা হয় না। তো হাদীস শরীফে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ পাকের কল্যাণ-ইচ্ছার একটি লক্ষণ উল্লেখ করেছেন যে, যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তাকে দ্বীনের গভীর ইলম, গভীর প্রজ্ঞা, দান করেন। সে দ্বীনকে সঠিকভাবে বুঝতে পারে, দ্বীনের বিধান অনুযায়ী চলতে পারে। আর এভাবে দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ অর্জন করে।

কুরআন ও সুন্নাহ্য় হিকমাকে খাইর বলে অভিহিত করা হয়েছে; বরং খাইরে কাছীর প্রভ‚ত কল্যাণ বিশেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এর তাৎপর্য কী? তাৎপর্য হল বান্দা যেন, এ ‘খাইরে কাছীর’ অর্জনে উৎসাহিত হয়। খাইর বলে জানবে কিন্তু তা অর্জনে সচেষ্ট হবে না- তা তো হতে পারে না। যার বিচার-বুদ্ধি আছে, কুরআন ও সুন্নাহ্র প্রতি বিশ্বাস আছে, যে নিজের দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ চায়, সে যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে জানবে যে, এই বিষয়টি খাইর, এটি কল্যাণ, তখন অবশ্যই তা অর্জনে সচেষ্ট হবে।

তো কুরআন ও সুন্নাহ্য় এই কল্যাণ অর্জনের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। মানুষ যেন নিজেও এই কল্যাণ অর্জন করে এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য এই কল্যাণের চিন্তা-ভাবনা করে।

এখানে একথাটিও বুঝতে হবে যে, কুরআন-সুন্নাহ্র ইলম হচ্ছে এমন কল্যাণ, যা অর্জন করা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই। এটা নিছক মুস্তাহাব বা ঐচ্ছিক পর্যায়ের বিষয় নয়। ইচ্ছে হয় অর্জন করলাম, ইচ্ছে হল না অর্জন করলাম না- এমন বিষয় নয়; বরং এটা এমন খাইর, যার বিপরীত ‘শার’। এমন কল্যাণ, যার বিপরীতে অকল্যাণ। এমন কল্যাণ, যার বিপরীতে ধ্বংস। এমন কল্যাণ, যা মানুষের মুক্তি ও সাফল্যের পথ। সুতরাং এটা ঐচ্ছিক কল্যাণ নয়; বরং এমন কল্যাণ, যা অর্জন করতেই হবে।

নিজেও অর্জন করতে হবে, নিজের পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী সকল মুসলিমের জন্য এই কল্যাণের শুভ কামনা অন্তরে পোষণ করতে হবে।

কুরআনে কারীমের সূরাতুত তাহরীমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা অতি হৃদয়গ্রাহী আঙ্গিকে ইরশাদ করেছেন-

يَا اَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا قُوْۤا اَنْفُسَكُمْ وَ اَهْلِیْكُمْ نَارًا وَّ قُوْدُهَا النَّاسُ وَ الْحِجَارَةُ عَلَیْهَا مَلٰٓىِٕكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا یَعْصُوْنَ اللّٰهَ مَاۤ اَمَرَهُمْ وَ یَفْعَلُوْنَ مَا یُؤْمَرُوْنَ.

হে ঈমানদারগণ! তোমরা রক্ষা কর নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনকে।

কীসের থেকে রক্ষা করবে? ‘نَارًا’-ঐ আগুন থেকে, ঐ জাহান্নাম থেকে وَّ قُوْدُهَا النَّاسُ وَ الْحِجَارَةُযার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর। عَلَیْهَا مَلٰٓىِٕكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ -সেই জাহান্নামের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন কঠোর প্রকৃতির ফেরেশতাগণ। لَّا یَعْصُوْنَ اللٰهَ مَاۤ اَمَرَهُمْ-যারা আল্লাহ তাআলার কৃত আদেশের অন্যথা করেন না। وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ-এবং তাদের যে আদেশ করা হবে তা-ই তারা করবেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আখিরাতের সেই কঠিন আযাব থেকে রক্ষা করার আদেশ করেছেন। কাকে রক্ষা করার? اَنْفُسَكُمْ وَ اَهْلِیْكُمْ-নিজেকে রক্ষা করার এবং পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করার।

রক্ষা করার উপায় কী? প্রকৃতপক্ষে রক্ষা তো করবেন আল্লাহ তাআলা। আল্লাহ ছাড়া রক্ষাকারী কেউ নেই। এখানে যে আল্লাহ মুমিনদেরকে আদেশ করেছেন তোমরা নিজেদেরকে এবং পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর- একথার মানে কী? মানে হল তোমরা নিজেদেরকে ও পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষার উপায় অবলম্বন কর। নিজেরাও জাহান্নামের আগুন থেকে আত্মরক্ষার উপায় অবলম্বন কর, পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততিও যেন জাহান্নামের আগুন থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে, সেই উপায় অবলম্বন কর। সেই উপায় কী?

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন-

اعْمَلُوا بِطَاعَةِ اللهِ، وَاتّقُوا مَعَاصِيَ اللهِ، ومُروا أَهْلِيكُمْ بِالذِّكْرِ، يُنْجِيكُمُ اللهُ مِنَ النّارِ.

অর্থাৎ তোমরা নিজেরাও আল্লাহ তাআলার ফরমাবরদারি করো, নাফরমানী থেকে বেঁচে থেকো আর পরিবার-পরিজনকেও স্মরণ রাখার আদেশ করো তাহলে আল্লাহ তাআলা তোমাদের জাহান্নাম থেকে নাজাত দিবেন। তাফসীরে ইবনে কাছীর সহীহ বুখারীর এক দীর্ঘ ঘটনায় আছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কিছু যুবক সাহাবীকে যারা বেশ কিছু দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে থেকে ইলম অর্জন করেছেন, তাদের উপদেশ দিয়েছেন যে,

ارْجِعُوا إِلَى أَهْلِيكُمْ، فَأَقِيمُوا فِيهِمْ وَعَلِّمُوهُمْ وَمُرُوهُمْ.

পরিবারের কাছে ফিরে যাও এবং ওদের মধ্যে অবস্থান করো আর-

عَلِّمُوهُمْ وَمُرُوهُم.

তাদেরকে শেখাও এবং আদেশ কর। দুটো বাক্য, দুটো কথা। কিন্তু অনেক কথা এই দুই কথার মধ্যে আছে। عَلِّمُوْهُمْ-তাদেরকে শেখাও।

কী শেখাবে? তাদেরকে ইসলাম শেখাও, দ্বীন শেখাও। আকীদা শেখাও, আমল শেখাও। তাদেরকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বিধি-বিধান সম্পর্কে সচেতন কর। হালাল-হারাম সম্পর্কে সচেতন কর। এটা হল শেখানোর পর্যায়।

এর পরের পর্যায় হল আদেশ কর। শুধু শেখানো নয়, শুধু শেখানোর দ্বারাই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং ‘مُرُوْهُمْ’ যা শেখানো হল সেই অনুযায়ী আমলের আদেশ কর। তাদেরকে পরিচালিত কর। তো কুরআন ও সুন্নাহ্র ইলম শেখা ও শেখানো, সহীহ আকীদা, সহীহ আমল শেখা ও শেখানো, হালাল-হারামের বিধান শেখা ও শেখানো এবং সেই মোতাবেক নিজের ও সংশ্লিষ্টদের পরিচালিত করার চেষ্টা করা- এটা হচ্ছে জাহান্নাম থেকে আত্মরক্ষার এবং সংশ্লিষ্টজনদের রক্ষা করার উপায়।

এই আদেশ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনে কারীমে দান করেছেন।

কাদেরকে দান করেছেন? যারা মুমিন তাদেরকে। يَا اَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا বলে সম্বোধন করেছেন। ঈমানদাররা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আদেশ মোতাবেক চলতে হবে। দুনিয়ার জীবন শেষ হওয়ার পর আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামনে হাজির হতে হবে। বিশ্বাস করে যে, দুনিয়াতে মানুষের কর্মের ফল আখিরাতে পেতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জান্নাত এবং জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন। এক দল জান্নাতী হবে, এক দল জাহান্নামী। এই বিষয়টি তারা বিশ্বাস করে। কাজেই মুমিনদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে, তোমরা সত্যে বিশ্বাস করেছ, সেই বিশ্বাস অনুযায়ী আমল কর-

তাহলে মুমিনকে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। হয় সে আলিম হবে অথবা মুতাআল্লিম। দ্বীনের জ্ঞানী হবে, কুরআন ও সুন্নাহ্র প্রজ্ঞাবান আলিম হবে অথবা কুরআন-সুন্নাহ্র ছাত্র হবে অথবা কুরআন সুন্নাহ্র ইলমের শ্রোতা হবে, মনযোগের সাথে, আন্তরিকতার সাথে গ্রহণের নিয়তে কুরআন-সুন্নাহ্র বিধি-বিধান শুনতে থাকবে। এর বাইরে- চতুর্থ প্রকারের লোক, না আলেম, না ছাত্র, না কুরআন-সুন্নাহ্র কথা শুনে সেই মোতাবেক নিজের জীবনকে পরিচালিত করার চেষ্টা করে- কোনোটাই নয়; বরং চতুর্থ প্রকারের। অর্থাৎ জাহিল। এই চতুর্থ প্রকারের অন্তর্ভুক্ত কিছুতেই হবে না। তাহলে তো ধ্বংস হতে হবে। দুনিয়ার জীবন ধ্বংসও হবে আখিরাতের জীবনও ধ্বংস হবে।

ধ্বংস থেকে যদি বাঁচতে হয় সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-পড়শী গোটা মুসলিম উম্মাহকে ধ্বংসের পথ থেকে যদি বাঁচাতে হয় তাহলে এর উপায়, কুরআন-সুন্নাহ্র ছাত্র হওয়া। কুরআন-সুন্নাহ্র ইলম অর্জন করা এবং সে অনুযায়ী নিজের জীবনকে পরিচালিত করার চেষ্টা করা। তাহলে কুরআন ও সুন্নাহ্র ইলম, যাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ‘খাইর’ বলেছেন, এটা এমন খাইর, এমন কল্যাণ, যার বিপরীত হল শার, অনিষ্ট-অকল্যাণ-ধ্বংস। এই কল্যাণ আমাদের অর্জন করতেই হবে।

কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের কী শেখায়? কুরআন ও সুন্নাহ আমাদেরকে শেখায়- আমাদের বিশ্বাস কী হবে, আমাদের চিন্তা-চেতনা কেমন হবে। কুরআন ও সুন্নাহ আমাদেরকে শেখায়- আমাদের ইবাদত-বন্দেগী কী হবে, তার পদ্ধতি কী হবে। কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের শেখায়- আমাদের লেন-দেন কেমন হবে, কোন পদ্ধতিতে হবে। উপার্জনের কোন্ পদ্ধতি হালাল, আর কোন্টি হারাম। কুরআন-সুন্নাহ আমাদের শেখায়- আমাদের স্বভাব-চরিত্র, আচার-ব্যবহার কেমন হবে। আল্লাহর হক কীভাবে আদায় করা হবে, বান্দার হক কীভাবে আদায় করা হবে। আল্লাকে কীভাবে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতে হবে আর বান্দার সাথে কীভাবে ভালো ব্যবহার করতে হবে।

কাজেই ভালো ও সজ্জন হতে হলে কুরআন-সুন্নাহ্র ইলমের কোনো বিকল্প নেই।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে ‘খাইরে কাছীর’-প্রভুত কল্যাণ উন্মুক্ত করেছেন। এই ইলমের মাধ্যমে মানুষের জীবনের সকল অঙ্গন আলোকিত হয়। আকীদা-বিশ্বাস থেকে শুরু করে ইবাদত-বন্দেগী, লেন দেন, আচার-ব্যবহার সবকিছু সুন্দর হয়।

দেখুন, আকীদা, ইবাদত এই পর্যন্ত তো সহজেই বুঝে আসে। কারণ সহীহ আকীদা মানুষ জানতেই পারবে না, যদি কুরআন-সুন্নাহ্র ইলম অর্জন না করে। তার সঠিক বিশ্বাস কী হবে, আল্লাহ সম্পর্কে বিশ্বাস এবং চারপাশের জগৎ সম্পর্কে বিশ্বাস, মানুষের সূচনা ও সমাপ্তি সম্পর্কে বিশ্বাস। মানুষ কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় যাবে, এ সম্পর্কে সঠিক বিশ্বাস অর্জনই করতে পারবে না, যদি কুরআন ও সুন্নাহ্র ইলমের শরণাপন্ন না হয়।

ইবাদতের বিষয়টাও বুঝে আসে। আল্লাহ রব্বুল আলামীনের ইবাদত সঠিক পন্থায় যদি করতে হয় তাহলে আমাকে শিখতে হবে, জানতে হবে। নামাযের নিয়ম শিখতে হবে, যাকাতের নিয়ম শিখতে হবে, সওমের নিয়ম শিখতে হবে, হজে¦র নিয়ম শিখতে হবে।

লেন-দেন সম্পর্কেও বুঝে আসে। কোন্ মুসলিম না জানে যে, লেন-দেনের ক্ষেত্রে হালাল-হারামের বিধান আছে। বেচা-কেনা হালাল, রিবা হারাম। এটা সকল মুসলিম জানে। তো প্রত্যেক মুসলিম মৌলিকভাবে জানে যে, লেন-দেনের ক্ষেত্রে হালাল-হারামের বিধান রয়েছে। হালাল মোতাবেক চলতে হলে জানতে হবে। হারাম থেকে বাঁচতে হলে জানতে হবে।

বাকি স্বভাব-চরিত্র আচার-আচরণ- এই পর্যায়ে এসে অনেকের ভুল হয়ে যায়। পশ্চিমা শিক্ষাদর্শনের প্রভাবে মানুষের মনে এই চেতনা অনেক সময় জাগে যে, ভালো মানুষ তো সে, যার আচার-ব্যবহার ভালো। মানুষের সাথে হাসিমুখে কথা বলে। মানুষের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে। নিজের স্বার্থের উপরে অন্যের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। দুঃখ-দুর্দশায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ পার্থিব জীবনের কিছু ভালো স্বভাব, কিছু ভালো আচরণকেই মানুষ ভালোর মানদÐ মনে করে এবং ভালো মানুষ হওয়ার জন্য এইটুকুই যথেষ্ট মনে করে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। সেই বিষয়টি হচ্ছে, যে কোনো ভালো কাজ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে ঐ সময়ই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন তা ঈমানের সাথে, আল্লাহ পাককে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে হয়। জগতে ভালো কাজ অনেকেই করে। কিন্তু প্রথমত ইসলামের শিক্ষা ছাড়া মানুষের জীবনে পূর্ণাঙ্গ ভালোত্ব আসতে পারে না। এক অঙ্গনে ভালো তো আরেক অঙ্গনে ঠিক এর বিপরীত। স্ব-দেশের লোকদের জন্য ভালো কিন্তু অন্য জাতির জন্য মহা হিং¯্র। এরকম অজ¯্র দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আছে। মানুষ সামগ্রিকভাবে সবার জন্য ভালো তখনই হয় যখন অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয়ত ভালো স্বভাব, ভালো আচরণও আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ঐ সময় গ্রহণযোগ্য হয় যখন তা ঈমানের সাথে হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে হয়। এটা যদি না হয়, তাহলে স্বভাব-চরিত্রগত যত ভালো গুণ রয়েছে, সেগুলো দুনিয়াতে কিছু কাজে আসে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন দুনিয়াতেই কিছু সুনাম-সুখ্যাতি দান করে দেন। আখেরাতে সে কোনো বিনিময় লাভ করতে পারে না।

স্বভাব ও আচরণগত ভালো কাজগুলোও তখনই প্রকৃত ভালো হয় যখন মানুষ দ্বীন-ঈমান শেখে, আল্লাহমুখিতা অর্জন করে, আল্লাহর জন্য করে।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীস শরীফে ইরশাদ করেন-

النّاسُ مَعَادِنُ، خِيَارُهُمْ فِي الجَاهِلِيّةِ خِيَارُهُمْ فِي الإِسْلاَمِ، إِذَا فَقِهُوا.

এখানে একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে, যার সারকথা হচ্ছে আল্লাহ পাক মাটির নীচে অনেক রকমের মূল্যবান ধাতু ও মূল্যবান বস্তুর খনি তৈরি করেছেন। সোনার খনি, রুপার খনি, তেলের খনি ইত্যাদি এগুলোর মধ্যে মর্যাদাগত পার্থক্য আছে। সোনার খনির দাম বেশি। রুপার খনি আরেকটু কমদামী, কমদামী হলেও এটাও দামী। এরকম বিভিন্ন মানের বিভিন্ন রকম খনি মাটির নীচে আছে। এরকম মাটির উপরেও আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিভিন্ন শ্রেণির বিভিন্ন স্বভাবের মানুষ সৃষ্টি করেছেন। কিছু মানুষ দানশীলতার ক্ষেত্রে অগ্রসর। কিছু মানুষ সত্যবাদিতার ক্ষেত্রে অগ্রসর। কিছু মানুষ ইবাদত-বন্দেগীর ক্ষেত্রে অগ্রসর। গুণ ও যোগ্যতার মণি-মাণিক্য দিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। এখানে মানুষ বিভিন্ন শ্রেণির, বিভিন্ন পর্যায়ের।

তো মানুষের মাঝে স্বভাবগত যেসকল ভালো গুণ আছে সেগুলো ভালো।

জাহেলি যুগে আরবে অনেক মানুষ ছিল, দানশীল। অনেক মানুষ ছিল মেহমানদার। অনেক মানুষ ছিল বীরত্বে শৌর্য-বীর্যে প্রসিদ্ধ। এরকমের বিভিন্ন গুণাবলী জাহেলী যুগেও বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে ছিল। একেক পরিবার, এক এক গোত্র এক এক বৈশিষ্ট্যে বিখ্যাত ছিল।

উপরোক্ত হাদীসে যেন বলা হল, জাহেলী যুগে স্বভাব ও চারিত্রিক বিভিন্ন গুণ ও বৈশিষ্ট্যে যারা ভালো হিসেবে পরিচিত ছিল ইসলামেও তারা ভালো। ইসলামেও তারা শ্রেষ্ঠ। কিন্তু এক শর্তে। সেই শর্ত হল- إِذَا فَقِهُوا যখন তারা দ্বীনের ইলম অর্জন করবে। কুরআন-সুন্নাহ্র সহীহ ইলম অর্জন করবে এবং সে মোতাবেক তার গুণ ও বৈশিষ্ট্যকে ব্যবহার করবে।

তাহলে জাহেলী যুগের শ্রেষ্ঠত্ব আর ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের মধ্যে কী পার্থক্য? জাহেলী যুগে যারা ভালো ছিল, তাদের প্রাপ্তি দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনে কিছু সুনাম-সুখ্যাতি। তারা যেহেতু ঈমান আনেনি, ইসলাম কবুল করেনি আখিরাতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে তাদের কোনো প্রাপ্তি নেই। আর ইসলামে, ইসলাম কবুল করার পরে যারা ভালো, ইসলাম কবুল করার পরে যারা শৌর্য-বীর্যের অধিকারী, মেহমানদার, দানশীল, খাইরের পথে, কল্যাণের পথে অগ্রগামী তাদের প্রাপ্তি হল, যেহেতু তার এই ভালো গুণ এবং বৈশিষ্ট্যগুলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বিধান মোতাবেক ব্যবহৃত হয়েছে তাই তারা এই গুণ ও বৈশিষ্ট্যের কারণে দুনিয়াতেও সুনাম-সুখ্যাতি অর্জন করেছে, আখেরাতেও আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নৈকট্য ও সওয়াব অর্জনের উপযুক্ত হয়েছে।

তাহলে ভালো স্বভাব-আচরণ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় ঐসময় যখন সেটা আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রেরণায়, আল্লাহর জন্য, আল্লাহ পাকের বিধান মোতাবেক হয়।

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত আরেক হাদীসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

خِيَارُكُمْ أَحَاسِنُكُمْ أَخْلَاقًا، إِذَا فَقِهُوا.

তোমাদের মাঝে শ্রেষ্ঠ মানুষ তারা, যারা তোমাদের মধ্যে স্বভাব-চরিত্রে, আচার-ব্যবহারে, আদব-আখলাকে শ্রেষ্ঠ।

এক শর্তে, সেই শর্ত কী?

إِذَا فَقِهُوا যখন তারা দ্বীনের ইলম অর্জন করে।

তাহলে চিন্তা করুন, দ্বীনের ইলম, কুরআন-সুন্নাহ্র ইলম কত বড় কল্যাণ। কুরআন ও সুন্নাহ্র ইলমের মাধ্যমে মানুষের গোটা জীবন শুদ্ধ-পরিশুদ্ধ হয়। গোটা জীবন আল্লাহমুখী হয়। গোটা জীবনের সকল কাজ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে সন্তুষ্ট করার প্রেরণায় সম্পন্ন হয় এবং আল্লাহর বিধান মোতাবেক, হালাল-হারামের বিধান মোতাবেক, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ মোতাবেক সম্পন্ন হয়। এইজন্য কুরআন ও সুন্নাহ্র ইলম হচ্ছে ‘খাইরে কাছীর’-প্রভুত কল্যাণ।

وَ مَنْ یُّؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ اُوْتِیَ خَیْرًا كَثِیْرًا.

যাকে হিকমাহ দান করা হয়েছে তাকে প্রভুত কল্যাণ দান করা হয়েছে।

এই কল্যাণ আমাদের নিজেদেরকেও অর্জন করতে হবে, আমাদের সন্তানদেরকেও এর অধিকারী করতে হবে। একজন পিতা তার সন্তানকে উত্তম শিক্ষার চেয়ে, কুরআন ও সুন্নাহ্র ইলমের চেয়ে এবং কুরআন ও সুন্নাহ্র পথে পরিচালিত করার চেয়ে উত্তম উপহার আর কিছুই দিতে পারেন না। এটাই বাবার পক্ষ থেকে আদরের সন্তানের জন্য সর্বোত্তম উপহার।

আমাদের সর্বস্তরের মুসলমানদেরকে সচেত হতে হবে। দ্বীনী ইলম অর্জন করার, সহীহ আকীদা জানার, ইবাদতের সঠিক নিয়ম জানার, সহীহ শুদ্ধভাবে কুরআন কারীম পড়তে শেখার, কুরআনে কারীম বুঝতে শেখার এবং কুরআনের আলোয় নিজের জীবনকে আলোকিত করার চেষ্টা করতে হবে। এই চেষ্টা সকল শ্রেণির মানুষকেই করতে হবে। শিশু-কিশোরকেও করতে হবে, বয়স্কদেরও করতে হবে। সর্বস্তরের ইলম চর্চা ও ইলম বিস্তারের এই ধারা কীভাবে জারি হতে পারে, কীভাবে গতিশীল হতে পারে- এই বিষয়ে আমাদের চিন্তা-ভাবনাও করতে হবে।

আমাদের কর্তব্য, আমাদের সন্তানদের একটা ভালো ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত করে দিয়ে তাদেরকে কুরআন ও সুন্নাহ্র ইলমের পথে অগ্রসর করে দেওয়া। সামনের জীবনে সে যে শিক্ষায় শিক্ষিত হোক, যে পেশায় নিয়োজিত হোক- ডাক্তার হোক, ইঞ্জিনিয়ার হোক, যা-ই হোক না কেন, যদি তার প্রথম জীবনে শৈশবে-কৈশোরে কুরআন ও সুন্নাহ্র সাথে সম্পর্ক হয়ে যায়, কুরআনে কারীম হিফয করে ফেলে, তা বোঝার মত যোগ্যতা হয়ে যায়, দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো শিখে ফেলে- তাহলে আশা করা যায়, ইনশাআল্লাহ সামনের জীবনে অবশ্যই এর প্রভাব পড়বে।

আমাদের এই অঞ্চলে এই ব্যবস্থা কম। কিন্তু আপনি আরবে যান, সেখানে মসজিদে হারামে, মসজিদে নববীতেও ব্যবস্থা আছে। ওখানে এমন ব্যবস্থাও আছে যে, স্কুলের বাচ্চারা সকালে স্কুলে পড়ে, বিকালে এসে কুরআনে কারীম হিফয করে। হিফযখানায় পুরো সময় দিলে হয়তো দুই-তিন বছরে পূর্ণ হিফয হয়ে যেত। কিন্তু স্কুলের পড়ার পাশাপাশি কুরআনে কারীম হিফয করার কারণে সময় বেশি লাগছে, চার বছর পাঁচ বছর লাগছে। ওখানে ছেলেদের স্মৃতিশক্তি ভালো, ফলে আরো কম সময়ের মধ্যেও হাফেয হয়ে যাচ্ছে। স্কুলেও পড়ছে আবার কুরআনে কারীমের হাফেযও হয়ে যাচ্ছে। এরকম ব্যবস্থা আরববিশে^ আছে। আমাদের দেশেও এরকম ব্যবস্থার বিস্তার দরকার।

আমাদের এ অঞ্চলের সাধারণ চিন্তা হচ্ছে, স্কুলে দিয়েছি তো দিয়েছি। ব্যস, কুরআন-সুন্নাহ্র সাথে আর কোনো সম্পর্ক নেই। অন্য দিকে কুরআন-সুন্নাহ শিখতে এসেছে তো জাগতিক শিক্ষা-দীক্ষার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। দুই শিক্ষার মাঝে এমন দূরত্ব যে, একটাকে অবলম্বন করা হলে আরেকটা ছাড়তেই হবে; বরং সম্পূর্ণরূপেই ছাড়তে হবে। এই চিন্তাটা কতদূর সঠিক তা ভেবে দেখা দরকার। একটা পর্যায় পর্যন্ত সম্ভবত দুটোই একসাথে হতে পারে। একজন মুসলমান কুরআনে কারীম শিখবে, কুরআনে কারীমের হাফেয হবে, কুরআন বোঝার যোগ্যতা অর্জন করবে, দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান অর্জন করবে এরপর পছন্দমতো কোনো পেশার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা-দীক্ষার দিকে যাবে। এমনটাই তো স্বাভাবিক। তাহলে কুরআন-সুন্নাহ্র জ্ঞানের প্রভাবে ঐ পেশায় গিয়েও সে একজন মুসলিম হিসেবে তার জীবনকে পরিচালিত করতে পারবে। আল্লাহ পাক আমাদের বিষয়গুলো বোঝার এবং আমল করার তাওফীক দান করুন!
.
[ মাসিক আলকাউসার || সফর ১৪৪২ || অক্টোবর ২০২০ ]

এই পোষ্টটি আপনার সামাজিক মিডিয়াতে শেয়ার করুন।

Design & developed by Masum Billah