বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০, ০২:৫৬ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস যুক্তরাজ্য শাখার ভার্চুয়াল নির্বাহী সভা অনুষ্ঠিত.. অবশেষে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরব ইসলামী আন্দোলনের দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা বিশ্বজুড়ে পণ্য বর্জনের ডাকে প্রবল ঝুঁকিতে ফ্রান্সের অর্থনীতি বয়কট ফ্রান্স আন্দোলন: রেচেপ তায়েপ এর্দোয়ান ফরাসী পণ্য বর্জনের ডাক দিলেন ফ্রান্সের তাগুতী শক্তি অচিরেই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। আবার জেগেছে হেফাজত: শুক্রবার দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক মুসলমানদের কটাক্ষ করে রীতিমতো খলনায়ক বনে গেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের একটি মাদরাসায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ, ৭ তালিবুল ইলম শহীদ ৬০ মিনিটের সাক্ষাৎকারে ১৬টি মিথ্যা বলেছেন ট্রাম্প

সেই পরিচিতি চেনা পথেই ইসলামী দলগুলোর যাত্রা- সৈয়দ শামছুল হুদা

বাংলাদেশের রাজনীতি বুঝাটা বড় কঠিন। রাজনীতি বিষয়টাই অনেক কঠিন। এখানে দুইয়ে দুইয়ে চার হয় না প্রায়শই। কিন্তু দূরের পাঠক বোর্ডে যখন দেখে ২+২= কত? তখন সে চিৎকার করে উঠে= ৪। আসলে অনেক ক্ষেত্রেই চার হয় না। কখনো তিন হয়ে যায়। কখনো পাঁচ হয়ে যায়। কখনো বা আরো কম বা বেশি। রাজনীতিটা বড় অনিশ্চয়তার খেলা। এখানে বক্তব্য এক, অর্থ ভিন্ন। এখানের মিছিলের রূপ এক, অর্থ অন্যটা। এখানে গলা ফাটানোর চিত্র এক, কিন্তু উদ্দেশ্য ভিন্ন।

দীর্ঘদিন পর উলামায়ে কেরাম রাজপথে নামার সুযোগ পেলেন। কেন পেলেন? কীভাবে পেলেন? সরকার কেন ছাড় দিলো তা বুঝা বড় কঠিন। আমরা দেখলাম, শাহবাগে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ, অবস্থান, মিছিল। সেখানে দেখলাম, আজান আর জায়নামাযে লুটিয়ে পড়ার মনকাড়া দৃশ্য। কিন্তু যেটা দেখলাম না, সেটা হলো, পুলিশের উগ্রমূর্তি। দেখলাম না পুলিশের আগ্রাসী অভিযান। অথবা মিডিয়াতেও দেখলাম না তেমন বাড়তি কোন সমালোচনা। শাহবাগে দীর্ঘদিন পর, কতদিন পর জানি না, কোন ইসলামী দলের কর্মসূচী করতে দিলো সরকার। এটা কি পরিবর্তনের কোন ইঙ্গিত? এটা কি আমাদের এগিয়ে যাওয়ার কোন বার্তা? না কি সেখানেও রাজনীতি আছে বুঝা বড় দায়।

এরপর যা দেখলাম, তা হলো গতকাল বায়তুল মুকাররম উত্তর গেইটে ইসলামী দলগুলোর শক্তি প্রদর্শনের মহড়া। একই জায়গায়, একই সময়ে, একই বিষয়ে সমমনা কিছু ইসলামী দল একদিকে, অপরদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। যারা বায়তুল মুকাররমে নামায পড়েছেন তাদের কেউ কেউ জানালেন, সালাম ফিরানোর সাথে সাথে বায়তুল মুকাররমের সেই পূরণো দিনের চিত্রের কথা। মিছিলের ডাক, হুঙ্কার। জায়গা দখল। গতকাল ঢাকায় বড় ধরণের শোডাউন লক্ষ্য করা গেছে। ব্যাপক উপস্থিতিতে মিছিল ও বিক্ষোভ হয়েছে। দীর্ঘদিন পর এমনটা দেখা গেলো। এগুলোর বাহ্যিক উদ্দেশ্য আর যাই হোক, পরোক্ষভাবে এর ফলাফল খুব ইতিবাচক আমার মনে হয় না। এগুলো আমাদের পূরনো চিত্র। আমরা নিজেদের বেলায় শক্তি প্রদর্শনে বেশ পারঙ্গম।

প্রোগ্রাম শেষে কর্মীদের মধ্যে আলোচনাগুলো একটু কান দিয়ে শুনুন। ফেসবুকের কমেন্টস গুলো মনযোগ দিয়ে পড়ুন। দেখবেন, আলোচনার বিষয় বস্তু হলো, কাকে কোথায় দাঁড়াতে দেওয়া হলো না, কারা কোথায় ঘেষতেই পারলো না, কাদের উপস্থিতি কেমন ছিল, লোক দলে লোক সংখ্যা কেমন হয়েছে সেই আলোচনা। এর বাইরে তেমন কোন আলোচনা শোনা যায় না। নিজ নিজ দলের নেতৃত্বের প্রশংসা আর ভিন্ন দলের নেতাদের তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখা, সম্মানের চোখে না দেখা এসবই আমাদের পূরণো চিত্র। কোন দলের নেতারাই এসব বলে দেন না তথাপি কিন্তু এসব চর্চাই হয়।

ছোট কাল থেকে এ পর্যন্ত এ রকম বহু মিছিলে অংশগ্রহন করেছি। আফগানের যুদ্ধ, সাদ্দাম বুশ প্রসঙ্গ, কাদিয়ানী প্রসঙ্গ, তাসলিমা নাসরীন ইস্যু ইত্যাদি উপলক্ষে খুব বড় বড় মিছিলে অংশ নিয়েছি। ৩০শে জুন ১৯৯৪ সালের তাসলিাম নাসরীন বিরোধী বিক্ষোভে বায়তুল মুকাররমে অবস্থানের সেই চিত্রগুলো এখনো চোখে ভাসে। তখনো বিশাল বিশাল বিক্ষোভ হতো। কিন্তু আমরা এতটা বছর পরও রাজনৈতিকভাবে যেই তিমিরে ছিলাম, সেই তিমিরেই রয়ে গেছি। রাজনীতিতে আমাদের কোন অবস্থান তখনো ছিল না, এখনো নেই। আমাদের সকল আন্দোলন ভাসা ভাসা। চাপ সৃষ্টি করার পর আমরা এমনভাবে চুপসে যাই ভুলে যাই যে, আমরা এ জন্য কোনদিন রাজপথে এত কষ্ট করেছিলাম। হেফাজতের মহা উত্থানের পরও আমরা এভা্বেই চুপসে গিয়েছিলাম। প্রতিটি মিছিল শেষে আমরা সবসময়ই চুপসে যাই।

২০০১সালের নির্বাচনের আগেও আমরা এমনই পরিবেশ তৈরী করেছিলাম। কিন্তু নির্বাচনের পর তা থেকে কোন ফলাফলই আমরা ঘরে তুলতে পারিনি। সেদিনের ইসলামী নেতৃত্ব চরমভাবে কর্মীদের আশা-আকাঙ্খাকে পদদলিত করেছিল। রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং ভালো অবস্থানে থাকা শক্তিটা সবসময়ই চায় এদেশের আলেমদের মাঠের আন্দোলন থেকে সুবিধা নিতে। দেশের যে কোন ঘটনায় হুজুরদেরকে রাজপথে অনেকেই দেখতে চায়। কিছু না করলে বলে, হুজুররা বিক্রি হয়ে গিয়েছে। আর কিছু করলে এর ফলাফল ঐ সব রাজনীতিবিদদের পকেটেই যায়। আজকের ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন বলেন, ৭১টিভি বিরোধী আন্দোলন বলেন, এ সবের জের ধরে রাজপথে, বিশেষ করে আলেম-উলামাগণ মসজিদে, খুতবায়, মাহফিলে সরকার বিরোধী যে পরিবেশ গড়ে তুলবেন তার শতভাগ সুফল ভোগ করবে দেশের নীরব হয়ে থাকা ব্যর্থ রাজনৈতিক শক্তি।

আমাদের খুব বেশি আগ্রহ শোডাউনের ওপর। এতে করে একটি লাভ হয়, সেটা হলো, রাম বামরা কিছুটা হলেও দমতে বাধ্য হয়। কিন্তু এরপর যেই লাউ সেই কদু। গতকাল সমমনা ইসলামী দলের এক নেতাকে গর্বের সাথে বলতে শুনলাম, আমরা ৫০/-কেজি আলুর দামের প্রতিবাদ করতে আসিনি, আমরা ১০০/-টাকা কেজির পিঁয়াজের দাম নিয়ে প্রতিবাদ করতে আসিনি, আমরা এসেছি মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষার জন্য। কথাটা খুব সুন্দর। কিন্তু সামগ্রীকভাবে, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অদূরদর্শিতা। দ্রব্যমূলের সাথে দেশের কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য জড়িত। ৭১টিভি এবং ধর্ষণ এর প্রতিবাদের চেয়ে এর প্রতিবাদের মূল্য কোনভাবেই কম নয়। বরং আমি বলবো, অনেক বেশি। এর সাথে কোটি কোটি গরীব মানুষের ভাগ্য জড়িত। এর দ্বারা বুঝা যায় আমরা শুধূ ধর্মীয় ইস্যূ ছাড়া অন্য বিষয়গুলোতে প্রতিবাদে এতটা আগ্রহী নই। দেশের সীমাহীন গুম, খুন, দুর্ণীতি, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, বিচার বিভাগীয় সীমাহীন জুলুম ও নৈরাজ্য নিয়ে আমাদের এতটা ক্ষোভ নেই, যতটা ক্ষোভ শুধুমাত্র ধর্মীয় ইস্যুতে।

গতকাল বিশাল শোডাউন হলো। অনেক শক্তি ব্যয় হলো। অপেক্ষা পরবর্তী ধারাবাহিক কী কর্মসূচী থাকে সেটা দেখার। যে সকল দফা দেওয়া হয়েছে তা কতটুকু আদায় হয় তা দেখার। প্রত্যেকটা কর্মসূচীতে একটি জিনিস খুব কমন, সেটা হলো, বক্তাদের মধ্যে কে কা’র চেয়ে বেশি গলা ফাটাতে পারে। খুব গভীর দৃষ্টিতে মানুষের মধ্যে প্রভাব সৃষ্টি করবে এমন আলোচনার প্রতি শ্রোতাদেরও আগ্রহ নেই। বক্তাদেরও নেই। কেউ ভালো কিছু শুনতে যায় না। জানতে চায় না।

আমার প্রস্তাব হলো, মিছিল হোক খুব পরিকল্পিতভাবে। সীমিত লোক নিয়ে। দাবী-দাওয়াগুলো নিয়ে সুন্দরভাবে আলোচনা হোক। কী কারণে বিক্ষোভ, কী করণে মিছিল সেটাই অনেকে জানে না। দেশের সব মানুষকে বুঝানোর মতো করে, জনমত তৈরী হয় এমন পরিবেশ তৈরী করে কিছু কিছু মিছিল হোক, কিন্তু আমরা যেভাবে শুধুমাত্র মিছিলটাকেই বেশি গুরুত্ব দিই এটা আসলে কতটা ফলপ্রসু হচ্ছে তা বিবেচনার বিষয়।

সকল ইসলামী দলের সমন্বয়ে- হলে হলে, কোন বড় মাঠে সীমিত লোক নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হোক, মানুষকে দাবীগুলোর প্রতি সংহতি প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হোক। সকল নেতা-কর্মী যারা উপস্থিত থাকবে তারা যেন যে কয়টি দফা দেওয়া হয়েছে তা ভালোভাবে মুখস্থ করতে পারে, তারা যেন অনুপস্থিত জনতাকে ভালোভাবে বুঝাতে পারে, সেভাবে গড়ে তোলা হোক।

আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, গতকাল যে দুটি বড় সমাবেশ বায়তুল মুকাররমে এবং বিজয়নগরে অনুষ্ঠিত হয়েছে তার মধ্যে উপস্থিত কতজন উভয় সভায় প্রদত্ত দফাগুলো বুঝতে পেরেছে, জানতে পেরেছে, বা দাবীগুলো অন্তত নিজ নিজ দলের কর্মীগণ শিখতে পেরেছে।

ধর্ষণ বিরোধী মিছিলে আমরা কতজন সাধারণ নাগরিককে সম্পৃক্ত করতে পেরেছি সেই প্রশ্নটাও করে রাখলাম। মাদ্রাসার ছাত্র এবং নির্দিষ্ট গড়ানার শিক্ষক ছাড়া এই সমাজে সংক্ষুদ্ধ মানুষ কি আর নেই? তারা কেন এসব সমাবেশে আসে না? তারা কেন এসব সমাবেশকে সমর্থন দেয় না? এর বড় একটি কারণ আমাদের প্রোগ্রামগুলো থাকে অগোছালো। অনিয়ন্ত্রিত। একপেশে। এখানে ঠান্ডা মাথায় গুছানো কোন আলোচনা হয় না। অথচ বামদের মিছিলগুলো দেখেন। কর্মসূচী দেখেন, তাদের প্রতিটি কাজ থাকে গুছানো। আমাদের বড় বড় কর্মসূচী থেকে একটি প্রেসব্রিফিং করার মতো কেউ থাকে না। পত্রিকায় নিউজ করা, মিডিয়ায় বিষয়টা সুন্দরভাবে তুলে ধরার জন্য লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। ঠেলাঠেলি চলে। এ ওর দোষ দিয়ে চলে যায়। এ কারণে ইসলামী দলগুলোর কোন কর্মসূচী মিডিয়া কভারেজ পায় না।

সেই পূরনো পরিচিত পথে আমাদের বিক্ষুদ্ধতার ফলাফল শুন্য। আমাদের এসব কারণেই ৭১টিভি ওয়ালারা ইমোশন বিক্রি করে খায়। এরা জনগণের ইমোশন নিয়ে খেলা করে। জনগণকে খেলায়। ৪/৫জন সাংবাদিক মিলে গোটা ইসলামী আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে। আমাদের নিয়ন্ত্রনহীন বিক্ষোভ সমাবেশে অনিয়ন্ত্রিত বক্তব্যের কোট করে ওরা আমাদের ঘায়েল করে ফেলে। কারণ আমরাও সামনে বিপুল ছাত্র দেখে ভুলে যাই, আমি কী বলছি, আর আমার কী বলা উচিত ছিল। লোক সমাগম থেকে উনি যে কথাগুলো বলে এসেছেন, সেই কথাগুলোর গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে যদি পরবর্তীতে উনাকে দেখানো হতো, তাহলে আমার মনে হয় উনি নিজেই লজ্জিত হতো।

এভাবে আর নয়। প্রতিটি মিছিলেই সকল জনশক্তিকে উপস্থিত করতে হবে, এমন মানসিকতা পরিহার করুন। প্রত্যেকটা কর্মসূচী হবে বাছাই করা সীমিত লোক দিয়ে। গোটা বছরে দুয়েকটি প্রোগ্রাম হতে পারে যেখানে পুরো জনশক্তিকে হাজির করা হবে। সেটা হতে পারে কোন জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে। অথবা দলীয় কোন বড় প্রোগ্রামে। এছাড়া সব জায়গায়, সব প্রোগ্রামে ব্যাপক উপস্থিতি এবং বিপুল শক্তিক্ষয় লক্ষার্জনে আমি প্রতিবন্ধক মনে করি।

জেনারেল সেক্রেটারী
বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট (বিআইএম)
17.10.2020

এই পোষ্টটি আপনার সামাজিক মিডিয়াতে শেয়ার করুন।

Design & developed by Masum Billah