বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ০৫:৩৬ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
চরমোনাই পীর ও মামুনুল হকের কিছু হলে তৌহিদী জনতা বসে থাকবে না মাওলানা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে গাজীপুরে যুব মজলিসের বিক্ষোভ ময়মনসিংহে যুব মজলিসের বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত!! মামুনুল হক যে বক্তব্য দেন তা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল: রাব্বানী মাস্কের হাটে কারও মুখে মাস্ক নেই কেন রাজধানীর মহাখালীর সাততলা বস্তির আগুনে পুড়ে গেছে ২০০ ঘর ও ৩৫টির বেশি দোকান মুফতি ফয়জুল করীম ও মাও. মামুনুল হকের কিছু হলে তৌহিদী জনতা বসে থাকবে না: মুফতি আবদুল্লাহ ইয়াহইয়া “কথিত ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ’ কর্তৃক ওলামায়ে কেরামদেরকে বিষোদগার ও ওয়াজ মাহফিলে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন” ইসলামের দৃষ্টিতে মূর্তি ও ভাস্কর্য ভাস্কর্য না করে স্মৃতি মিনার করুন, তাতে বঙ্গবন্ধুর আত্মা শান্তি পাবে : মুফতী ফয়জুল করীম

আদৌ কি বাইডেন মুসলিম বিশ্বের স্বার্থ রক্ষা করে চলবে?

সাইফ নূর 

আমেরিকার ৫৯তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী জো বাইডেনের বিজয়ের পর পৃথিবীব্যাপী রাজনীতিতে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা ও হিসাব-নিকাশ। পূর্ব-পশ্চিমের অন্যান্য রাষ্ট্রের ন্যায় মুসলিম বিশ্বও এ নিয়ে সমীকরণে ব্যস্ত সময় পার করছে।

যেসব যুক্তিতে বাইডেনের বিজয়ে খুশি প্রকাশ করা হচ্ছে:  

ইউরোপ-আমেরিকাসহ মুসলিম দেশগুলোর নাগরিক ও পর্যবেক্ষকদের অনেককে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের পরাজয়ে তারা আনন্দ প্রকাশ করছেন। বাইডেনের বিজয়ে তারা বেশ খুশি। তাদের যুক্তিগুলো কিছুটা এরকম:

এক. ডেমোক্রেটিক প্রার্থী বাইডেন তার নির্বাচনী প্রচারণার সময় মুসলমান নাগরিকদের সঙ্গে উত্তম আচরণ, আমেরিকায় অভিবাসীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসী বিরোধী পলিসি সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এসব ইস্যুতে ট্রাম্প তার চার বছরের ক্ষমতায় বিতর্কিত পদক্ষেপের কারণে ইতিপূর্বে মুসলমানদের ঘৃণা কুড়িয়েছিলেন।

নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর বাইডেন ইঙ্গিত দিয়েছেন, যেসব মুসলিম প্রধান দেশের উপর ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন সেগুলো খুব দ্রুত বাতিল করবেন তিনি। নিষেধাজ্ঞার তালিকায় ছিল ইরান, সিরিয়া, লিবিয়া, সোমালিয়া, ইয়েমেন, ভেনেজুয়েলা, উত্তর কোরিয়া, নাইজেরিয়া এবং মিয়ানমার। আফ্রিকার দেশ সুদানও এই তালিকায় ছিল।

দুই. বাইডেন ভারত অধীকৃত কাশ্মীরের ইস্যুতে পূর্ব থেকেই কাশ্মীরীদের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করেছেন। তিনি কাশ্মীরীদেরকে মতামতের স্বাধীনতা এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ অধিকার দেওয়ার পক্ষে দাবি তুলেছেন।

গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী গত বছর ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার কর্তৃক কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার আইন বিলুপ্ত করে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে কাশ্মীরকে দ্বিখণ্ডিত করার বিরোধিতা করেছিলেন বাইডেন। তিনি সেসময় কাশ্মীরকে তার পূর্বের অবস্থায় বহালের দাবি তুলেছিলেন। এসব দৃষ্টিভঙ্গির ফলে বাইডেনের বিজয় ভারত-পাকিস্তানে মুসলমানদের পক্ষে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করবে বলে অনেকে মনে করছেন।

তিন. গত বছর ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার প্রধান নরেন্দ্র মোদি যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বড় রাজ্য টেক্সাসের শহরে প্রকাশ্যে আমেরিকার পরবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয় কামনা করে বলেছিলেন, ‘আব কি বার ট্রাম্প সরকার।’ ভারত ও আমেরিকার রাজনীতিতে এটা ছিল অত্যন্ত আলোচিত একটি ঘটনা। ডেমোক্রেটরা মোদির এ আচরণের কথা ভুলে যায়নি। ফলে বাইডেনের বিজয় মোদি সরকারকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে।

অপরদিকে বাইডেনের সঙ্গে কাকতালীয়ভাবে আগে থেকেই মুসলিম প্রধান দেশ পাকিস্তানের সুসম্পর্ক রয়েছে। বাইডেন ইতোপূর্বে বেশ কয়েকবার পাকিস্তান সফর করেছেন। ২০০৮ সালে পাকিস্তানের সাবেক আসিফ আলি জারদারীর সরকার আমলে সিনেটর বাইডেনকে পাকিস্তানের জন্য আমেরিকার দেড় বিলিয়ন ডলার অনুদান মঞ্জুরির পুরষ্কার স্বরূপ ‘হেলালে পাকিস্তান’ এওয়ার্ড প্রদান করা হয়।

চার. জো বাইডেন মিয়ানমার কর্তৃক রোহিঙ্গা মুসলিমদের গণহত্যা এবং চীনে উইঘুর মুসলমানদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন।

পাঁচ. ট্রাম্প প্রশাসন এতদিন সৌদি আরব সরকারকে যেভাবে মাথায় তুলে রেখেছে, বাইডেন এসে সেটাকে বদলানোর চেষ্টা করবেন। কারণ, ইয়েমেনে সৌদির নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধে বেসামরিক লোকজনের মৃত্যু এবং মানবিক বিপর্যয়ের কারণে এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যে বড় ধরনের অসন্তোষ রয়েছে।  ফলে বাইডেন ক্ষমতা গ্রহণ করলে সমকালীন নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে মুসলমানদের নিকট ধিকৃত সৌদি আরব থেকে আমেরিকা কিছুটা দূরে সরে যাবে বলে নিশ্চিত ধরে নেওয়া যায়।

ছয়. বাইডেনের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যেখানে তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি বিখ্যাত হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। ভিডিওটিতে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে বলতে শোনা যাচ্ছে:“হযরত মোহাম্মদের একটি হাদীসে নির্দেশ করা হয়েছে, তোমাদের কেউ কোনো অন্যায় সংঘটিত হতে দেখলে সে যেন তা নিজ হাতে প্রতিরোধ করে। তা সম্ভব না হলে যেন মুখে প্রতিবাদ করে। যদি তাও সম্ভব না হয় তবে যেন মন থেকে ঘৃণা করে।” এরপর বাইডেন বলেন, “আপনারা অনেকেই এই দীক্ষা নিয়ে জীবনধারন করেন, এই বিশ্বাস আর নীতি নিয়ে যা যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’’

আদৌ কি বাইডেন মুসলিম বিশ্বের স্বার্থ রক্ষা করে চলবে?

এসব কারণে মুসলিমদের অনেকেই বাইডেনের প্রতি ইতিবাচক ধ্যানধারণা পোষণ করছেন। তারা মনে করেন, আমেরিকায় বাইডেনের বিজয় মুসলিম বিশ্বের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর সাব্যস্ত হবে।

কিন্তু আদৌ কি সেটা সম্ভব? ইতিহাস কী বলে? আসুন আমরা কিছুটা বিশ্লেষণ করি।

* ইতিপূর্বে আমেরিকায় বারাক ওবামা বিজয়ী হওয়ার পরও অনেকে বেজায় খুশি প্রকাশ করেছিলেন। যেন মুসলমানদের কোনো ত্রাতা এসেছেন ক্ষমতায়। এদিকে ওবামাও শুরুর দিকে ইসলামকে শান্তিপূর্ণ ধর্ম আখ্যা দেওয়ায় অনেকের মধ্যেই বিগলিত ভাব দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এরপরে যখন ওবামা প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে আগুণের রাজনীতি ফুঁকে দিল, লিবিয়া, ইয়েমেন এবং তিউনিসের মতো শান্তিপূর্ণ দেশগুলোকে ধ্বংস করে দিল, সিরিয়ার বরকতময় ভূমিতে গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে দিল তখন সবার হুঁশ হলো।

ইহুদি লবি

* মুসলমানরা আশা করি একথা ভুলে যাননি যে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইহুদি লবিকে সবসময় প্রাধান্য দেয়া হয়ে থাকে। সেদেশে যে দলের লোকই ক্ষমতায় আসুক ইহুদি স্বার্থকে উপেক্ষা করার সাহস তার নেই। এই তো সেদিন বাইডেনের বিজয়ে ইহুদিবাদী ইসরাইলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বাইডেনকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন যে,  জো, আমাদের প্রায় ৪০ বছরের দীর্ঘ ও উষ্ণ ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। আপনাকে আমি ইসরাইলের একজন দুর্দান্ত বন্ধু হিসেবে জানি।’

এমনিভাবে জো বাইডেন ইসরায়েল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের চুক্তিকে সমর্থন করেছেন। যে চুক্তিটিকে মুসলিম বিশ্বের ব্যাপক জনগোষ্ঠী কখনোই সমর্থন করেনি। বাইডেন সবসময়ই ইসরাইলের বড় একজন সমর্থক। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নীতি বিষয়ক নথিপত্রেও ‘দখল‘ (ফিলিস্তিনি জমি) শব্দটি ব্যবহার হয়নি কখনই।

অতএব, ফিলিস্তিনি মুসলমানদের প্রতি যুগ যুগ ধরে নির্যাতন চালানো ইসরাইলের সঙ্গে যাদের এত সখ্যতা, তাদের ক্ষমতারোহনে মুসলিম বিশ্বে চলমান আনন্দ উদযাপনকে নির্বুদ্ধিতা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

আমেরিকার শত্রু-মিত্র

* আমেরিকার একজন সাবেক মন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমাদের স্থায়ী কোনো বন্ধু নেই। আমরা শুধু আমেরিকান স্বার্থকে দেখি।’ মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আরেকটি কথা বিখ্যাত আছে যে, আমেরিকায় যারাই ক্ষমতায় থাকুক তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় কোনো তফাৎ হয় না। এসব কারণে স্পষ্টতই ডেমোক্রেটিক প্রার্থী বাইডেনের নীতিতে ট্রাম্প প্রশাসন থেকে খুব বেশি পার্থক্য হওয়ার আশা করা যায় না।

*  তাছাড়া বিদায়ী প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প কিন্তু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হননি। বরং বিপুল ভোট পেয়ে সামান্য ব্যবধানে তিনি পরাজিত হয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ যেমন বাইডেনকে ভোট দিয়েছেন, তেমনি হাজার হাজার মানুষ ট্রাম্পকেও ভোট দিয়েছেন। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, আমেরিকার বিশাল সংখ্যক মানুষ এখনো ট্রাম্পের সমর্থক, ট্রাম্পের শাসননীতির পক্ষে তারা। সুতরাং ব্যক্তি ট্রাম্পের পরাজয় ঘটলেও তার মতের ব্যাপক সমর্থন রয়ে গেছে এখনো। এর ফলে বাইডেনের শাসন নীতিও একই রকম থাকার সম্ভাবনাই বেশি দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।

হ্যাঁ, ট্রাম্প ছিলেন একরোখা। ‘একলা চলো’ নীতি ছিলো তার। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার চার বছরের শাসনামলে যাচ্ছে তাই অনেক পদক্ষেপ নিয়েছেন। যার কারণে বিশ্বব্যাপী তার ব্যাপক সমালোচনা হলেও নির্বাচনে তার পক্ষে ভোট কিন্তু কম ছিল না। এটাতে মুসলিম বিশ্বের জন্য ভাবার বিষয় রয়েছে।

ট্রাম্প কি মুসলিম বিদ্বেষের কারণে হেরেছেন?

* একটি প্রশ্ন দাঁড়ায় যে, ট্রাম্প কি মুসলিম বিদ্বেষী নীতির কারণে হেরেছেন? নাকি অন্য কোনো কারণে? পর্যবেক্ষকরা বলছেন, করোনা ভাইরাসের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যর্থতা এবং আমেরিকার অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কারণে ট্রাম্প হেরেছেন। ফলে একথা বলাটা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে যে, ট্রাম্প তার আদর্শের অজনপ্রিয়তার কারণে হেরেছেন। কারণ ট্রাম্পের দল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। আমেরিকার পঞ্চাশটি রাজ্যের স্থানীয় পার্লামেন্টেও বেশিরভাগ রাজ্যে ট্রাম্পের দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে। ফলে ব্যক্তি ট্রাম্পের পরাজয় ঘটলেও ‘ট্রাম্প-ইজম’ যথারীতি বহাল রয়েছে।

ট্রাম্পের আচরণে প্রকাশ্যে মুসলিম বিদ্বেষ ছিল। ভারতের হিন্দু কট্টরপন্থী মোদি সরকারের মুসলিম বিদ্বেষী কর্মকাণ্ড, সৌদি আরবের যুবরাজ বিন সালমানের একনায়কতন্ত্র আচরণ, মিসরের জবরদখলকারী অগণতান্ত্রিক জেনারেল সিসির সরকার এবং ফিলিস্তিন ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিককারী আরব আমিরাতের একনায়কতন্ত্রকেও ট্রাম্প ঢালাওভাবে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে গেছেন। বাইডেনের আমলে তাতে কতটুকু পরিবর্তন ঘটবে অথবা আদৌ বদল ঘটবে কিনা অথবা প্রকাশ্য মুসলিম বিদ্বেষের পরিবর্তে ‘মুখে হাসি অন্তরে বিদ্বেষ’ নীতির আবির্ভাব ঘটবে কিনা- সেটা পরবর্তী সময়ই বলে দেবে।

ট্রাম্পের ‘ভালো দিক’

* আরেকটি বিষয়, ট্রাম্পের পলিসিতে কঠোরতা ছিল। কিন্তু তারপরও ইচ্ছায় হোক বা বাধ্য হয়ে, তার আমলে মুসলিম বিশ্বে বিগত দুই দশকের তুলনায় সবচে কম সংঘাত ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত, ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহার এসব মুসলিম বিশ্বের পক্ষে ইতিবাচক। এছাড়া এসময়ে তুরস্কও আন্তর্জাতিক রাজনীতির অঙ্গনে পরাশক্তির মতো প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এই মুহূর্তে লিবিয়া, সিরিয়া, ইরাক, তিউনিসিয়া এবং মিসরে তুরস্কের সরাসরি হস্তক্ষেপ রয়েছে। কাতারে সেনা ঘাঁটি রয়েছে তুরস্কের। ভূমধ্যসাগরে গ্রিস এবং ফ্রান্সের ধমক ও চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে তুরস্ক গ্যা্স এবং তেল আবিষ্কারের অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। আর্মেনিয়া-আজারবাইজান যুদ্ধে তুরস্কই একমাত্র রাষ্ট্র যারা প্রকাশ্যে মুসলিম প্রধান আজারবাইজানকে সমর্থন করেছে। ফলে বাইডেনের বিজয়ে আনন্দে উচ্ছ্বসিত যাওয়ার সময় এ দিকগুলোও বিবেচনায় রাখা জরুরি বলে মনে করছেন অনেকে।

নির্যাতিত মুসলিম বিশ্ব ও বাইডেন

বাইডেন কাশ্মীর ও মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের পক্ষে কথা বলেছেন। প্রতিবাদ করেছেন। কিন্তু সেই বাইডেনই ইহুদিবাদী ইসরাইলের একজন ঘোর সমর্থক এবং ইসরাইল-আমিরাত চুক্তির সমর্থক- এটাও লক্ষ্য করার বিষয়।

এধরনের দ্বিমুখী অবস্থানের কারণে কোনো কোনো বিশ্লেষক এমন কথাও বলেছেন যে, ‘ট্রাম্প আর বাইডেনদের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, ট্রাম্পের দল ঢাকঢোল পিটিয়ে মুসলিম নিধন করেছে। আর বাইডেনরা সেটা করবে গোপনে। মুসলমানদেরকে বোকা বানিয়ে।’

বাইডেনের হাদিসের উদ্ধৃতি

* সামাজিক মাধ্যমে বাইডেনের হাদীস শরীফের উদ্ধৃতি দেওয়ার যে ভিডিওটি প্রকাশিত হয়েছে, তাকে সস্তা জনপ্রিয়তা ও ভোট লাভের মাধ্যম হিসেবে দেখছেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক জনাব ইমামুদ্দীন মেহের। তিনি বলেন, ‘সমকামী বিয়ের পক্ষাবলম্বনকারী জো বাইডেন যে হাদিস উদ্ধৃতি করেছেন তাতে বলা হয়েছে, অন্যায়ের প্রতিরোধে প্রথমে হাত ব্যবহার করতে, এরপর অপারগ হলে মুখে প্রতিবাদ করতে। আর তা না পারলে অন্তরে ঘৃণা করতে। কিন্তু বাইডেনদের দৃষ্টিতে অন্যায় তো সেটাই যা তাদের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্যায়ের প্রতিবাদ মানে তাদের দৃষ্টিতে মুসলিম নিধন। যা তাদেরই লজ্জাজনক ইতিহাস প্রমাণ করে। তাই আমি মনে করি, মুসলমানদেরকে বোকা বানিয়ে এ হাদীসকে তারা মুসলমানদেরই বিরুদ্ধে আক্রমণের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করবে।’

আমেরিকা ও ভারত  

* বাকি রইল ভারত। ভারতের সঙ্গে আমেরিকার বন্ধুত্ব পুরনো। ভারত বেশ অনেকদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সহযোগী, এবং সেই নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। চীনের মোকাবেলাসহ আমেরিকার ভারত ও প্রশান্ত-মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশল বাস্তবায়নে এবং সন্ত্রাস দমনে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান একটি সহযোগী দেশ হিসাবেই থাকবে বলে অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করছেন।

ফলে বাইডেনের বিজয়ে মোদি সরকার সাময়িক বিব্রত হলেও ‘আব কি বার বাইডেন সরকার’ বলতে বেশি দেরি হবে না তাদের। কারণ, আগের বন্ধুত্বটা মোদি আর ট্রাম্পের ছিল না। ছিল ভারত এবং আমেরিকার।

ভারতে মুসলিমদের বিষয়ে বিতর্কিত নীতি নিয়ে মোদীকে সরাসরি কোনা কথা বলেননি ট্রাম্প,কিন্তু বাইডেন হয়তো এ ব্যাপারে সরব হবেন। জো বাইডেনের নির্বাচনী প্রচারণা সম্পর্কিত ওয়েবসাইটে ভারতে বিতর্কিত এনআরসি এবং নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) সমালোচনা রয়েছে। এছাড়া,কাশ্মিরিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথাও বলা হয়েছে।

এপ্রসঙ্গে বিশিষ্ট লেখক সম্পাদক শামস তাবরীয কাসেমী বলেন, ‘ভারতের উদাহরণই দেখুন, মুসলমানরা মনে করত, আদভানী বেশি বিপজ্জনক। আদভানীর চেয়ে ক্ষতিকর আর কেউ হতে পারে না। এরপর যখন নরেন্দ্র মোদির চেহারা মানুষ চিনল তখন মনে করা শুরু হলো যে, আদভানী ভালোই ছিল। মোদি বেশি বিপজ্জনক। আর এখন মনে হচ্ছে, মোদিও কিছুটা ঠিক আছে, অমিত শাহ খারাপ। তারপর বর্তমানে মানুষ বলাবলি করছে যে, যোগি আদিত্যনাথই আসল আশংকা।’

মনস্ত্বাত্ত্বিক ভয়

তিনি বলেন, এসব হচ্ছে মূলত মনস্ত্বাত্ত্বিক ভয়ের কারণে। দুঃখজনক হলেও এটা কোনো জাতির অধঃপতনের লক্ষণ যে, তারা অন্যদের হারজিত নিয়ে এবং অন্যের মৃত্যুতে আনন্দ প্রকাশ করবে।

জনাব শামস তাবরীয কাসেমী বলেন, মুসলিম বিশ্বের ১৪০০ বছরের ইতিহাসে মুসলমানরাই এ বিশ্বকে শাসন করেছে। শতাব্দির পর শতাব্দি তারাই ছিল বিশ্বে সুপারপাওয়ার। কখনো খেলাফতে রাশেদার আদলে, কখনো খেলাফতে বনু উমাইয়া, কখনো খেলাফতে বনু আব্বাসিয়া আর কখনো খেলাফতে ওসামানিয়ার আদলে।’

তিনি আরো বলেন, ‘অর্ধেকের বেশি ইউরোপের ওপর মুসলমানদের কর্তৃত্ব ছিল। ফ্রান্সের শাসকদের সিদ্ধান্ত ক্যানস্টেন্টিনোপলের তোপকাপি প্রাসাদ থেকে আসত। এমনকি আমেরিকাও ঐদেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল, যারা খেলাফতে উসমানিয়াকে বছরের পর বছর কর আদায় করেছে।

অতএব, মুসলমানদের উচিত অন্যদের জয়পরাজয়ে আনন্দ-উল্লাসের পরিবর্তে ইতিহাস থেকে নিজেদের পরিচয় খুঁজে বের করে তা পুনরুজ্জীবিত করা।’

এই পোষ্টটি আপনার সামাজিক মিডিয়াতে শেয়ার করুন।

Design & developed by Masum Billah