মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২১, ০৫:৩৩ পূর্বাহ্ন

প্রশংসার অতিরঞ্জন ও আমাদের পিছিয়ে থাকার গল্প : সৈয়দ শামছুল হুদা

ড. এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী সাহেবকে আমি তখনই চিনেছি যখন উনাকে দেখেছি হেফাজতের আহবানে উনাকে দাওয়াত না দেওয়া সত্ত্বেও নারায়নগঞ্জে হেফাজতের ১৩দফার সমর্থনে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। যখন শামীম উসমানের হুঙ্কারের পরোয়া না করে এক হিন্দু শিক্ষকের ইসলাম অবমাননা নিয়ে রাজপথে হুঙ্কার দিয়ে উঠেছিলেন। এরপরেও আমাদের কতিপয় ভাই, তাকে মীলাদ-কিয়ামের বহস নিয়ে হেনস্থা করতে উঠেপড়ে লেগেছিল। আমি তখনই বলেছিলাম, উনি এই উম্মাহর জন্য হিতাকাঙ্খী এবং ইসলামের একটি সম্পদ। মানুষ মাত্রই ভুল থাকবে। হয়তো তিনি কোন কোন বিষয়ে ভুল করেছেন। অথবা ভুল কাজের মধ্যে জিদ করে বসে আছেন। কিন্তু সামগ্রীকভাবে তিনি আমাদের সম্পদ এই কথাটা আমি অনেক লেখায় অনেক আগেই বলেছি। এই জন্য আমরা প্রসংশার বন্যাও বাসাবো না। সমালোচনায়ও কখনো সীমা লঙ্ঘন করবো না।

জনাব আব্বাসী সাহেব একজন বিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ মানুষ। তাঁর ভয়েসটা যেমন চমৎকার, তেমনি বলিষ্ট উচ্চারণটা আমার খুব পছন্দ। তিনি যেমন আরবী ভালো জানেন, ইংরেজি জানেন, সমসাময়িক বিষয়টা খুব ভালো করেই উপলব্দি করতে পারেন। কোনটাতে উনাকে সমর্থন দিতে হবে, কোনটা এড়িয়ে চলতে হবে সেটাও বুঝেন। বুঝি না আমাদের কওমীর অতি আবেগী কিছু ভাই।আমরা যেটা বুঝি সেটা এমনভাবে বুঝি যে, এর বাইরে আর কোন কিছুকেই সামান্য মুল্যায়ন করি না। আমাদের মধ্যে প্রশংসা করলেও অতিরঞ্জন করা হয়, বিরোধিতা করলেও অতিরঞ্জন করা হয়। বিশেষ করে এদেশের কওমী অঙ্গনের অনেক বক্তা মাহফিলগুলোতে সকল ক্ষেত্রে মুবালাগাহ করেন। বাংলাদেশের ধর্মীয় অঙ্গনে অস্থিরতার পেছনে একমাত্র কারণ হলো এই অতিরঞ্জন।

গতকালকের টকশো নিয়েও কিছু কথা বলতে চাই।
প্রথমত: আমরা যদি আলোচনার পুরো বিষয়টা খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করি, তাহলে দেখবো যে, এদেশের বামপন্থীরা মোটাদাগে কী কী বিষয় ওরা দেমাগে বসিয়ে নিয়েছে তার পুরো চিত্রটা গতকালের শাহরিয়ার কবিরের কথায় উঠে এসেছে। আগামী দিনে যে কেউ যে কোন টকশোতে যদি যান, তাহলে বামপন্থীরা আপনাকে কোন বিষয়টাতে ঘায়েল করতে পারে সেই পয়েন্টগুলো জেনে গেলেন। বামপন্থী বুদ্ধিজীবিদের নিকট এর বাইরে তেমন কোন পয়েন্ট ইসলামপন্থীদের ব্যাপারে নাই।

দ্বিতীয়ত: জনাব আব্বাসী সাহেবকে কি দেখেছেন তিনি ইসলামপন্থী সবগুলো মতবাদ ও দলের পক্ষে কীভাবে কথা বলেছেন, তিনি জামায়াত বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও জামায়াতকে তুলোধুনো করার কোন সুযোগ নেননি। বরং শাহরিয়ার কবির যেহেতু সামগ্রীক ইসলামের শত্রু সে জায়গায় সে মাওলানা মওদুদী সাহেবের প্রতি সম্মান জানিয়ে কথা বলেছেন, এদেশের সকল হকপন্থী আলেমদের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। আমাদের কোন কোন ভাই আছেন, যারা সুযোগ পেলেই আহলাদিত হয়ে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বাজে মন্তব্য করে শত্রুকে খুশি করেন। আব্বাসী সাহেব সেই কাজটা করেননি। আব্বাসী সাহেবের গোটা আলোচনা থেকে অনেক কিছুই শিখার আছে।

এছাড়া আব্বাসী সাহেব প্রতিটি কথার উত্তরে শাহরিয়ার কবিরকে যথাযথ সম্মান দিয়ে কথা বলেছেন। অথচ আমরা ফেসবুকে জনাব শাহরিয়ার কবিরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে একের পর এক স্টেটাস দিচ্ছি। এটা একজন দাঈ’র কোন চরিত্র হতে পারে না। আব্বাসী সাহেব প্রকৃতপক্ষেই দ্বীনের একজন উঁচু মানের দাঈ এর পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু আমরা খুশির ঠেলায় কী করছি? কোন আলেমের আইডি থেকে শাহরিয়ার কবির সাহেবকে বিশ্রি ভাষায় কটাক্ষ করে স্টেটাস দেওয়া উচিত নয়। এগুলো অন্য বামরা দেখে পরবর্তীতে যে কোন আলেমকে টকশোতে অপমান করার জেদ অন্তরে লালন করবে।

এই জায়গাটাতেই ইসলামপন্থী ব্যক্তিগণ বড় ধরণের ভুল করেন। ফেসবুকে আপনার সুন্দর চেহারার, নুরানী চেহারার আইডি থেকে যখন বিশ্রি ভাষায় স্টেটাস প্রসব করেন তখন সেটাকে তারা গুরুত্বের সাথেই নেয়। আপনি বড় আলেম নাকি শরহে জামি, মিশকাত পড়েন সেটা তারা দেখবে না। তারা একজন আলেম এর ভাষা দেখে। আপনাকে বড় আলেম মনে করেই বিষয়টা নোট করে রাখে। দয়া করে এই কাজটা করবেন না। আব্বাসী সাহেব তাঁর উঁচু মানের আখলাক দিয়ে শাহরিয়ার কবিরকে বুদ্ধি দিয়ে পরাজিত করতে পেরেছেন তার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন।

আমরা নিজেদেরকে এখনো সময়ের ভাষায় উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে পারিনি। একবার চোখটা বুলিয়ে দেখেন, আমাদের মধ্যে কতজন আলেম আছেন যারা শাহরিয়ার কবিরদের সময়ের ভাষায় উত্তম পদ্ধতিতে মোকাবেলা করতে ক্ষমতা রাখেন। আমরা খুব ভালো করেই জানি, বামদের যোগ্যতা সীমিত। তাদের জ্ঞানের দৌঁড় সীমিত। ঢাকার এক বিনাভোটে নির্বাচিত মেয়র, পিলখানা হত্যাকান্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত, একজন ব্যারিষ্টার এর ইসলামী জ্ঞান সম্পর্কে বক্তব্য আমরা শুনেছি। অজ্ঞতার ওপর তাদের অহঙ্কারের নমুনা আমরা দেখেছি। ইসলাম সম্পর্কে দেশের সাধারণ শিক্ষিত বুদ্ধিজীবি বলেন, রাজনীতিবিদ বলেন তাদের একেবারেই জ্ঞান নেই। ড. জাফরুল্লাহদের বক্তব্যে এটা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। এরা নামকাওয়াস্তে মুসলমান। ইসলাম সম্পর্কে এদের জ্ঞান ঐ তাপসের মতো আলিফ, বা, তা, ছা পর্যায়ের। এরা একেবারেই শিশু। ঠিক এমনিভাবে জাগতিক ভাষায় আমরাও শিশু। এই জিনিসটাও মনে রাখতে হবে।

জনাব আব্বাসী সাহেব উভয় ভাষাটা খুব ভালো ভাবে রপ্ত করতে পেরেছেন বলেই আজ শাহরিয়ার কবিররা জ্ঞানের বহর প্রকাশ করে স্বস্তি পায়নি। মাথা উঁচু করে ঘরে ফিরতে পারেনি। এদেশের ইসলামপন্থীদের জ্ঞানের গভীরতা সম্পর্কে এদেশের মাথামোটা বাম বুদ্ধিজীবিদের কোন ধারণা নেই। সমস্যা হলো, এদেশের আলেমরা সময়ের ভাষায় কথা বলাটা শিখেনি। জগতটা যে পাল্টে গেছে, এটা বুঝতে পারেন না অনেকেই। অনেক আলেম মনের ভেতরে এক ধরণের আমিত্ব লালন করেন। অহমিকা রোগে ভোগেন। ইলমের অহঙ্কারে ভোগেন। কিন্তু সময় বাস্তবতা উনাকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসতে দিচ্ছে না। এই বাস্তবতা না বুঝা পর্যন্ত আমরা বামদের, ইসলামের প্রকৃত শত্রুদের মোকাবেলা করতে পারবো না।

আমরা আমাদেরকে মোকাবেলায় খুব পারদর্শী। আমরা শত্রুকে মোকাবেলায় পারদর্শী নই। আমরা প্রকৃত শত্রু কে তাকে চিনিও না। চিনলেও তার সামনে মিন-মিনিয়ে কথা বলি। আর আপন ভাইদের দোষ দেখলে রণহুঙ্কার ছেড়ে দিই। কারণ, আমরা শত্রুর মোকাবেলায় যাই না। আমরা সবাই এক ময়দানে বসে কিলাকিলি করি। গুতাগুতি করি।

আসুন, আমরা সব ময়দানে ছড়িয়ে পড়ি। শত্রুকে উত্তম পদ্ধতিতে মোকাবেলার ব্যবহার শিখি। ইসলামের সুন্দর আখলাক শত্রুর সামনে মেলে ধরি। শুধু কুরআন-হাদীসের এত এত শামায়েলের হাদীস পড়ে কী লাভ যদি শত্রু আমার ব্যবহার নিয়েই প্রশ্ন তুলে? আমরা ভাইয়ে ভাইয়ে শত্রুতা লালন করি। ‍মুসলমানদেরকে ইসলাম থেকে বের করে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আমাদের মাঝে এমন কোন দায়িত্বশীলও নেই, যিনি সবাইকে ধমকে দিয়ে সামলে রাখবেন। কষ্ট লাগে, যখন দেখি আমাদের মুরুব্বিরাও এসব বিষয়ে নীরব থাকেন। কথা বলেন না, ধমক দেন না।

আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। আমার লেখায় কেউ কষ্ট পেলে ক্ষমা করে দিবেন।

জেনারেল সেক্রেটারী
বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট বিআইএম
21.12.2020

এই পোষ্টটি আপনার সামাজিক মিডিয়াতে শেয়ার করুন।

Design & developed by Masum Billah