শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১, ০৮:২০ অপরাহ্ন

শিরোনাম:

সংখ্যালঘু নির্যাতন না হলেও ‘আরএসএস উদয়ের’ দায়ভার নিতে হবে মমতাকেই

আরএসএস। ১৯২৫ সালে নাগপুরের ডা. কে. বি. হেডগেওয়ার একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন রূপে আরএসএস প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্দেশ্যের সঙ্গে তাদের কার্যক্রমের মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি কখনোই।

আরো সহজ করে বললে, হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু ইংরেজ সরকার তাদেরকে নিষিদ্ধ সংগঠন বলে ঘোষণা দেয়। এমনকি উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, স্বাধীন ভারত সরকারের আমলেও দুইবার সংগঠনটির সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

ভারত স্বাধীনতার অন্যতম নায়ক মহাত্মা গান্ধী হত্যার পর প্রথমবার সংগঠনটি নিষিদ্ধ তকমা পায়। কিন্তু তাদের কার্যক্রম রুখে দেয়া যায়নি। বাবরি মসজিদ দখলের পর আবারো এই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হয়।

মোদ্দা কথা হল, ভারতের জনসাধারণ বা ধর্ম নিরপেক্ষ সরকার কখনোই তাদেরকে মেনে নেয়নি। যদিও হালের খবর অনেকটাই ভিন্ন বার্তা দেয়।

আরএসএস প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভারতবর্ষে পুরোদমে তাদের সাংগঠনিক শক্তিবৃদ্ধি, জ্ঞানী-গুণীজন বা বোদ্ধামহল থেকে শুরু করে প্রান্তিক পর্যায়ে তাদের কার্যক্রম চালায় পুরো ভারতবর্ষে। যার ফলে এখন ভারত সরকারের পলিসি মেকার বা আংশিক নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় এই সংগঠনটি।

পুরো ভারতবর্ষের চিত্র এটি হলেও পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতায় প্রতিষ্ঠার ১০০ বছর পরেও সংগঠনটি এই অঞ্চলে শক্তিশালী ঘাঁটি তৈরি করতে পারেনি। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকারের পূর্বেও দীর্ঘদিন বাম শাসনে একেবারেই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি কট্টর হিন্দুত্ত্ববাদী এই সংগঠনটি।

তবে তৃণমূল কংগ্রেস অথবা মমতা ব্যানার্জির শাসনামলে সংগঠনটি তাদের কার্যক্রম এই রাজ্যে যথেষ্ট শক্তিশালী অবস্থানে নিতে সক্ষম হয়েছে। বিস্তৃত করেছে তাদের কার্যক্রম। যদিও অন্যান্য রাজ্যের তুলনায়ও অনেকটা কম। আমার দেখা মমতা ব্যানার্জির একটি বড় ব্যর্থতা এটি।

মমতা ব্যানার্জির শাসনামলে তারা যেভাবে কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে, সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করেছে তার প্রমাণ এই পরিসংখ্যানটি।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ সালে আরএসএস নিয়ন্ত্রিত স্কুলের সংখ্যা ছিল ৬ হাজার। মমতা ব্যানার্জির শাসনামলে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজারে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন পশ্চিমবঙ্গের অসাম্প্রদায়িক জনগোষ্ঠী।

গনমাধ্যমের বিভিন্ন খবর পড়ে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম পশ্চিমবঙ্গের লেখক ও কলামিস্ট বন্ধু ইমাম আলীর কাছে। এনিয়ে দীর্ঘক্ষন আলাপ হলো তার সঙ্গে।

তিনি জানালেন, দিদির (মমতা ব্যানার্জি) শাসনামলে সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়নি একথা বলা যায়। হলেও তা উল্লেখ করার মতো নয় বলে আমরা মনে করি। কিন্তু বাম শাসনামলে আরএসএস বা বিজেপি যেভাবে কোণঠাসা ছিল, তৃণমূল কংগ্রেস বা মমতা ব্যানার্জির শাসনামল কট্টর এই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।

বলা যায় আরএসএস-এর পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলায় শক্ত অবস্থান গেড়েছে বিজেপি। এই রাজ্যে আরএসএস এখনও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেনি, তা ঠিক। কিন্তু শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। আমি আরএসএস-কে কোন সংগঠন মনে করিনা। এটা হল একটা আইডোলজি। আমি মনে করি, আরএসএসের সক্রিয় কর্মীরা এই রাজ্যের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর বিভিন্ন পদে আছে। খোদ তৃণমূল কংগ্রেসেও আছে।

একটি গণমাধ্যমে পড়লাম পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের গ্রন্থাগার ও জনশিক্ষা প্রসার দপ্তরের মন্ত্রী মাওলানা সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী বলেছেন, ‘ওদের (বাম) আমলেও ছিল, ওরা সেটা প্রকাশ্যে আসতে দেয়নি। তবে এখন গোটা ভারতজুড়ে তাদের যে বাড়বাড়ন্ত হয়েছে তা অস্বীকার করার কথা নয়। আরএসএসের স্কুল আছে পশ্চিমবঙ্গে। পুরুলিয়ায় তাদের যে অস্ত্র ভাণ্ডার ছিল তা তো বাম মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর আমলে ছিল। কোলকাতায় যেসব স্কুল আছে তাদের, তা সিপিএম জমানাতে ছিল।’

তবে মমতা ব্যানার্জির কেবিনেটের এই সদস্য গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এও বলেছেন ‘আমাদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, আমরা বিচলিত নই। আমরা এ দেশকে ইনশাআল্লাহ্‌ হিন্দুরাষ্ট্র হতে দেবো না। আমরা সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করব।

অন্যদিকে ইমাম আলী মোল্লা মনে করেন, উগ্র সাম্প্রদায়িক আরএসএসকে দমন করতে বা প্রতিহত করতে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর নেতা পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকীর প্রয়োজন আছে। মাঠে ময়দানে তিনি যেভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা-দীক্ষার উন্নয়নের কথা বলছেন, তেমনিভাবে বিজেপি আরএসএস-এর মত উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সমালোচনায় সরব ভূমিকা রাখছেন। যার ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আব্বাস সিদ্দিকী এখন বড় ফ্যাক্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুরো ভারতবর্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গকে আমরা ভিন্ন চোখে দেখি। সেখানে আমরা বাঙালি মুসলিমরা নানা প্রয়োজনে ভ্রমণ করি। আমি ব্যক্তিগতভাবে সংখ্যালঘু নির্যাতন বা সংখ্যালঘুদের বাঁকা চোখে দেখা অথবা আড়চোখে তাকাতে দেখিনি সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর কাউকে। কিন্তু হাল জামানার এই খবর, আরএসএসের মজবুত ভিত্তি অথবা বিজেপির উদয় পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের জন্য কতটা অস্বস্তিদায়ক হবে সেটাই কেবল দেখার বাকি।

লেখাটির টানতে চাই দুই বাংলার জনপ্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা দুটি চরণ দিয়ে-

তব মস্‌জিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী।
মোল্লা-পুর”ত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবী!’
কোথা চেঙ্গিস্‌, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?
ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া-দ্বার!
খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?
সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা!

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved ©2020 jubokantho24.com
Design & Developed BY Masum Billah