সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:১৮ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম:
সুস্থ ও ভালো থাকার দোয়া নামাজে অনিহা কাটানোর সহজ কিছু উপায় রাস্তা ও ভবন নির্মাণে মানসম্পন্ন ইট তৈরি ও সরবরাহের নির্দেশ স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর মিথ্যে চুরির অভিযোগ এনে মাদ্রাসাছাত্রকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন বঙ্গবন্ধুর সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে: তথ্য প্রতিমন্ত্রী সিলেটের সিংহ পুরুষ খ্যাত প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান রহ. এর ছেলে মাওলানা তায়েফ বিন হাবীব আর নেই নির্বাচনকালীন সময়ে আওয়ামী সরকারই তত্ত্বাবধায়ক সরকার: তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুফতি তাকি উসমানি পাকিস্তান বেফাকের সভাপতি নির্বাচিত সঙ্গীতশিল্পী ও ইসলামী আলোচক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বাইক এক্সিডেন্টে আহত নেজামে ইসলাম পার্টির জেলা সভাপতি যোগ দিলেন ইসলামী আন্দোলনে

পান্ডুলিপি “আল জামি”

আল জামি(মেরাজ)

শফিক সাহেব গাড়ি চলে এসেছে, তাড়াতাড়ি চলুন! দশটায় লাইভ শো শুরু! আজ আপনার জীবনের প্রথম লাইভ শো!
“হুম আমি রেডি চলো” শফিক সাহেব আর তার এসিস্ট্যান্ট রওনা হলো বাংলা একাডেমির উদ্দেশ্যে। আজ শফিক সাহেবের লাইভ শো আছে টিভিতে।দেশের নামকরা লেখকদের মধ্যে একজন তিনি। এ পর্যন্ত মাত্র ৪ টি বই বের হয়েছে তার। এরই মধ্যে মানুষের ভালোবাসার বাগিচায় জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।নিপুণ শব্দগাঁথা আর অসাধারণ বাক্যের তালে তালে নিজেকে তুলে ধরেছেন মানুষের সামনে।সামনের বইমেলায় বের হতে চলেছে তার আরো একটি বই। যেটা তিনি তার মায়ের জীবনি নিয়ে লিখেছেন।

সময় মতো পৌঁছে গেলেন তারা।শো শুরু হয়েছে। পাঠকের নানান প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চলেছেন তিনি।হাজার হাজার মানুষ দেখছে তাকে। একজন পাঠক তাকে প্রশ্ন করে বসলো ” প্রথম বই প্রকাশের দিন আপনার কেমন অনুভূতি হয়েছিলো?কেমন লেগেছিলো সেদিন?”

প্রশ্নটি শুনেই চুপ হয়ে গেলেন শফিক সাহেব।কিছু সময় এভাবেই চুপ করে বসে থাকলেন।সবাই চেয়ে আছে তার মুখের দিকে।নিস্তব্ধতা ভেঙে বলতে শুরু করলেন তিনি।

পাঁচ বছর আগের কথা।আমি তখন সবে মাত্র ভার্সিটি থেকে বের হয়েছি। আগে থেকেই টুকটাক লিখতাম। ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল লেখক হবো। মায়েরও খুব স্বপ্ন, একদিন আমি লেখক হবো।আমার বই পড়বেন আমার মা। পড়বে হাজারো মানুষ। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছি।টানাপোড়ার সংসার ছিলো আমাদের।তিন ভাই বোন আর মাকে নিয়ে আমাদের সংসার। এত্ত কিছুর মধ্যেও আমি আমার লেখা চালিয়ে গেলাম। তার এক বছর পর একটা বইয়ের জন্য লেখা শেষ করলাম।আমার ওতো ইচ্ছে ছিলো না বই বের করার। একদিন মা আমার লেখার পান্ডুলিপিটা পড়লো।খুব ভালো লেগেছিলো মায়ের। আমাকে বললেন,কোনো প্রকাশনীর সাথে যোগাযোগ করতে। তখন আমি এত কিছু বুঝতাম না। পান্ডুলিপি নিয়ে গেলাম কিছু প্রকাশনীর কাছে।কয়েকজন প্রকাশক পড়লো আমার লেখা।কেউ কেউ তো পড়ার আগেই বাদ দিয়ে দিলো।এভাবে পান্ডুলিপি নিয়ে বেশ কয়েকদিন ঘুরতে লাগলাম একের পর এক প্রকাশনীর দ্বারে।একজন বই প্রকাশ করতে রাজি হলো। বললো চল্লিশ হাজার টাকা লাগবে। শুনে আমার বই প্রকাশের ইচ্ছে সম্পূর্ণ মাটি হয়ে গেলো।আমি নিরাশ হয়ে বাসায় ফিরে এলাম।এত্তগুলো টাকা আমার পক্ষে যোগাড় করা সম্ভব ছিলো না ওই মুহূর্তে। বাবার রেখে যাওয়া কিছু টাকা আর আমার টিউশনিতে কোন রকম চলে আমাদের পরিবার।বাসায় ফেরার সঙ্গে সঙ্গে মা বইয়ের কথা জিজ্ঞেস করলেন।আমি না বলতে চেয়েও সেদিন সব বলে দিয়েছিলাম মাকে।তখন কিচ্ছু বলেন নি মা।চুপচাপ ছিলেন।এর কিছুদিন পর প্রকাশনী থেকে ফোন আসলো।তারা সোজাসাপ্টা বলে দিলো,তারা বই প্রকাশ করতে চায়। টাকার কথা জিজ্ঞেস করলে তারা বলতে অস্বীকার করলো।শুধু এতটুকু বললো যে, একজন আপনার লেখা পড়েছে তার খুব ভালো লেগেছে,সে সব টাকা দিয়ে দিয়েছে। বই বের হওয়ার পর তার নাম বলবে। খুব অবাক হলাম আমি!এজগতে এরকম মানুষের দেখা মেলা ভাগ্যের ব্যাপার।আমি মাকে গিয়ে এই খুশির খবরটা দিলাম।মা খুব খুশি হলো।আমি খুব দোয়া করলাম তার জন্য।

এর কিছুদিন পরই ছিলো বইমেলা।একদিন এসেও গেলো সেই দিনটি।আমি খুব উৎসুক ছিলাম আমার প্রথম বেই বের হবে।আমার সাথে দেখা হবে আমার পাঠকের।নানান জল্পনা কল্পনা নিয়ে ঘুরাঘুরি করছিলাম বই মেলায়। হঠাৎ ছোট ভাইয়ের নাম্বার থেকে ফোন আসলো। বললো মায়ের অবস্থা খুব খারাপ। হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।তুমি তাড়াতাড়ি আসো।সব কিছু ফেলে ছুটে গেলাম হাসপাতালে। গিয়ে দেখি আইসিউতে রাখা হয়েছে মাকে।অবস্থা খুব খারাপ। সব কিছু পরিক্ষা করা হচ্ছে। বসে রইলাম মায়ের পাশে। বিকেলে প্রকাশনী থেকে ফোন আসলো।তারা জানালো আপনার বইটি আজ সর্বোচ্চ সংখ্যক বিক্রি হয়েছে।সবাই খুব প্রশংসা করেছে আপনার লেখার। আমি জানতে চাইলাম ওই ব্যক্তিটির ব্যাপারে,যে চল্লিশ হাজার টাকা দিয়েছলো আমার বইটি প্রকাশ করতে।প্রকাশক সাহেব প্রথমে বলতে না চাইলেও অনেক জোড়াজুড়ির পর বললো, “আপনার মা এসে টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন।আর নাম বলতে নিষেধ করেছিলেন।আমি কিছু না বলে ফোন কেটে দিলাম। মাথায় তখন হাজারো চিন্তা আর প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলো। এত্ত গুলো টাকা মা কোথায় পেলেন?আর কিছুই বলেনি কেন আমাকে!হঠাৎ ডাক্তার সাহেব রুমে প্রবেশ করলেন।হাতে একগাদা রিপোর্ট। প্রথমেই বললেন আপনার মায়ের একটি কিডনি নেই, সেটা আমাদের আগেই জানানো উচিৎ ছিলো ।আমি ডাক্তারের কথা শুনে থতমত খেয়ে গিয়েছিলাম সেদিন।তার দুদিন পরই মায়ের মৃত্যু হয়।

আজ যদি মা বেঁচে থাকতেন, আর আমাকে এই অবস্থায় দেখতেন, খুব খশি হতেন।আজ আপনারা আমাকে এই অবস্থায় দেখছেন, সব মায়ের জন্য।মা শুধু আমায় জন্ম দিয়ে আর লালন পালন করে ক্ষান্ত হন নি, আমার জন্য, আমার ভবিষ্যতের জন্য নিজের জীবনটাকে উতসর্গ করে গিয়েছেন।আমার লেখার প্রতিটি শব্দে প্রতিটি বাক্যে যেন আমার মা বেঁচে আছেন।

শ্বাস রুদ্ধ হয়ে এলো শফিক সাহেবের। আর কথা বলতে পারলেন না তিনি।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved ©2020 jubokantho24.com
Website maintained by Masum Billah