বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর ২০২১, ০৪:৫৪ অপরাহ্ন

শিরোনাম:
বন্ধ করে দেয়া হলো খার্তুম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পাকিস্তানে বিদ্রোহীদের সাথে সংঘর্ষে ৪ পুলিশ সদস্য নিহত কথিত প্রগতিশীলদের বাধা: যুক্তরাজ্যের প্রোগ্রামে যেতে পারেননি মাওলানা আজহারী কবরে থেকেও মামলার আসামি হাফেজ্জী হুজুরের নাতি নরসিংদীতে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ৩০ আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনীতিকদের সঙ্গে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক প্রথমবারের মতো ক্যামেরার সামনে আসলেন মোল্লা ইয়াকুব আজ বন্ধ হতে পারে অনেকের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট এখন শেখ হাসিনার অলৌকিক উন্নয়নের গল্প শোনানো হচ্ছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাবজি খেলতে দেয়ার প্রলোভনে শিশুদের বলাৎকার করতেন স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা

আল্লামা মোস্তফা আল হোসাইনী রহ.; বহুমুখী যোগ্যতার অধিকারী একজন ক্ষণজন্মা মনীষী

পৃথিবীতে আল্লাহ তায়া’লা যাদেরকে প্রাণ দান করেছেন, তাদের মৃত্যু অবধারিত। প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। এটাই চিরন্তন সত্য। কিন্তু কারো মৃত্যু দুনিয়াবাসীর নিকট স্বাভিবিক বিষয়, কারো মৃত্যু খুশির আবার কারো মৃত্যু দুনিয়াবাসীর নিকট কষ্টের, শোকাহত হওয়ার, হৃদয় ছেঁড়া বেদনার। তেমনই একজন ছিলেন আল্লামা মোস্তফা আল হোসাইনী রহ.। ২০১৭ সালের ৫ জুলাই তারিখে ক্ষণজন্মা এই মহান মনীষী ইহজগত ত্যাগ করে মহান রবের সান্নিধ্যে চলে যান।

এদেশের ইসলামী অঙ্গনে ‘আল্লামা মোস্তফা আল হোসাইনী’ একটি সুপরিচিত নাম। গত শতকের ৯০-এর দশক থেকে নিয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে ওলামায়ে কেরামের সাথে থেকে বিরাট ভূমিকা রেখেছেন। তিনি একই সাথে বহুমুখী যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। তিনি একাধারে একজন মুফাসসিরে কুরআন, শাইখুল হাদিস, সুমিষ্টভাষী ওয়ায়েজ, মুহাক্কিক আলেম, লেখক এবং বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ ছিলেন।

আল্লামা মোস্তফা আল হোসাইনী রহ. ১৯৩৮ সালের ১লা মার্চ কুমিল্লা জেলার মনোহরগঞ্জ উপজেলাধীন খিলা বড় বাড়িতে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা মুন্সী সুলতান আহমেদ একজন আলেম ছিলেন। আল্লামা হোসাইনীর শিশুকালেই তার পিতা ইন্তেকাল করেন। পিতার মৃত্যুকালে তারা ২ ভাই ছিলেন এবং দুজনেই ছিলেন খুবই ছোট। পিতার ইন্তেকালের পর তারা নানার বাড়িতে লালিত-পালিত হন। পরবর্তিতে আল্লামা হোসাইনী রহ. মনোহরগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ ফেনুয়া গ্রামে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন।

তিনি নানার বাড়িতে থেকেই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। তারপর হোসাইনী রহ.-এর পড়ালেখা হয়েছিলো আলিয়া মাদরাসায়। তার শিক্ষা জীবন তিনি আলিয়া মাদরাসাতেই অতিবাহিত করেন। তিনি ১৯৫৯ সালে কৃতিত্বের সাথে দাখিল পাশ করেন এবং ঐ বৎসর তিনি দাখিল পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাক্ষর রাখায় স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন। তারপর ১৯৬১ সালে আলিম, ১৯৬৩ সালে ফাজিল ও ১৯৬৫ সালে তিনি নোয়াখালী ইসলামিয়া থেকে কামিল শেষ করেন।

আল্লামা মোস্তফা আল হোসাইনী রহ. তীক্ষ্ম মেধা আর অগাধ যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। তিনি ছাত্র জীবন থেকেই অধ্যাপনার সাথে যুক্ত হন। তার দরস দানের সূচনা হয় নাথেরপেটুয়া ফাযিল ডিগ্রি মাদরাসায় অধ্যাপনার মাধ্যমে। তিনি ফাযিল পড়াকালীন সময়েই এখানে দরস দেওয়া শুরু করেন। তারপর তিনি কামিল সমাপ্ত হওয়ার পর পাটোয়ার মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি নোয়াখালী জেলার ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান সোনাইমুড়ি কামিল মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। পরবর্তিতে ১৯৮১ সালে তৎকালীন শিক্ষনীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলনের পর তিনি আলিয়া মাদরাসার অধ্যাপনা ত্যাগ করে ক্বওমী মাদরাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন।

তার ক্বওমী মাদরাসায় অধ্যাপনার সূচনা হয় কুমিল্লা জেলার ঐতিহ্যবাহী দীনি বিদ্যাপীঠ দারুল উলূম বরুড়ায়। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন যাবত হাদিসের দরস দিয়েছেন। এরপর ২০০১ সালে তিনি ঢাকার জামিয়া করীমিয়া আরাবিয়া রামপুরা মাদরাসার শাইখুল হাদিস হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন যাবত হাদিসের খেদমত করার পর তিনি ২০১৩ বা ২০১৪ সালে নোয়াখালীর ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা জামেয়া ওসমানিয়া চাটখিল মাদরাসায় শাইখুল হাদিস হিসেবে নিযুক্ত হন এবং এখানেই তিনি আমৃত্যু হাদিসের খেদমত করেন।

তিনি ছিলেন একজন সুমিষ্ট ভাষী ওয়ায়েজ। তার বয়ানে সমসাময়িক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা থাকতো, ইতিহাস ছিলো তার বয়ানের অন্যতম সৌন্দর্য, বিশেষত তার বয়ানে সাহাবায়ে কেরামের ঈমানদীপ্ত ঘটনা স্থান পেতো অনেক বেশি, বিভিন্ন বাতিল ফেরকার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতেন তিনি দালিলিক আলোচনার মাধ্যমে। কোরআনের তাফসির করতেন খুবই সাবলীল ভাষায়। সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে তিনি উপস্থাপন করতেন তার বয়ান। দীর্ঘ সময়কাল ব্যাপী তিনি ওয়াজের ময়দানে বিরাট ভূমিকা পালন করেন। তিনি বাংলাদেশে বয়ানের ময়দানে ভূমিকা রাখা আলেমদের মধ্যে প্রথম সারির একজন।

লেখালেখির জগতেও তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। ‘শানে সাহাবা’ ও ‘ইসলামী তাহজীব’ গ্রন্থদ্বয় ছিলো তার অনবদ্য সৃষ্টি।

তিনি ছিলেন, একজন সুপরিচিত শাইখুল হাদিস। হাদিসের মসনদে তিনি দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর খেদমত করেছিলেন। তার হাদিসের দরসের সুনাম তার ছাত্রদের থেকে শোনা যায়। তার ছাত্রদের থেকে জানা যায়, তিনি হাদিসের দরসের ক্ষেত্রে হাদিস সংশ্লিষ্ট সকল আলোচনা খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতেন। বিশেষ করে তিনি হাদিসের তাহকীক এবং সেই হাদিস থেকে মাসয়ালা বের করা তার দরসের অন্যতম লক্ষণীয় বিষয় ছিলো।

আল্লামা মোস্তফা আল-হোসাইনী (রহ.) একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বৃহৎ অংশ কেটেছে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন (পরবর্তী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ)-এর সাথে। তিনি ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এর সমন্বয়কারী ছিলেন। পরবর্তীতে নায়েবে আমীরের দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘ দিন। বার্ধক্যে উপনিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি টেলিভিশনে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের পক্ষ হয়ে ইসলামী ঐক্যজোটের নির্বাচনী ইশতিহার পাঠ করেছিলেন। বাংলার জমিনে আল্লাহর দীন বাস্তবায়নের সুমহান দায়িত্ব পালনার্থে ইসলামী রাজনীতির দাওয়াত ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে তিনি ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের তৎকালীন আমির সৈয়দ মাওলানা ফজলুল করীম (রহ.)-এর সাথে ছুটে গেছেন বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। ২০০১ সালে ইসলামী রাজনীতির কঠিন মুহূর্তে নারী নেতৃত্ব গ্রহণ এবং জামায়াত-বিএনপির সাথে জোট গঠন ইস্যুতে পীর সাহেব চরমোনাই (রহ.)-এর সাথে তিনিও এর কঠিন বিরোধী ছিলেন। পীর সাহেব চরমোনাই রহ. এর রাজনৈতিক জীবনের এক কঠিন সময় ছিলো ২০০১ সাল। সে সময়ে তিনি পীর সাহেব চরমোনাইর সাথে থেকে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে বিরাট ভূমিকা রেখেছেন। ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার এ আন্দোলনের দাওয়াত সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে মরহুম পীর সাহেব চরমোনাই রহ.-এর সাথে তিনি ছুটে গিয়েছিলেন বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

রাজনৈতিক মঞ্চে তার বক্তব্য শ্রেতাদেরকে দারুণ আবর্ষণ করতো। তিনি ইসলাম বিরুধী শক্তির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মঞ্চে কঠোর বক্তব্য দিতেন। ইসলামী রাজনীতির বিভিন্ন দিক তিনি খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতেন। তিনি স্বল্প কথায় অনেক কিছু বুঝাতে পারতেন।

২০১৩ সালে দেশব্যাপী হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের সময় তিনি হেফাজতে ইসলামের সাথে থেকে নাস্তিক-মুরতাদ বিরুধী সেই আন্দোলনে নিজেকে সপে দিয়েছিলেন। এর পরেও তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য রাখতেন।

তিনি একজন আধ্যাত্মিক সাধক ছিলেন। তিনি বড় বড় অনেক বুজুর্গের সান্নিধ্যে জীবনের বৃহৎ একটা অংশ অতিবাহিত করেছিলেন। খতিবে আজম সিদ্দিক আহমাদ রহ.-এর সান্নিধ্যে তিনি দীর্ঘ ১০ বছর কাটিয়েছিলেন। আমাদের কুমিল্লার বিখ্যাত বুজুর্গ হোসাইন আহমাদ মাদানী রহ.-এর খলিফা মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন রহ. (ফেনুয়ার হযরত)-এর সাথে তার আধ্যাত্মকি সম্পর্ক ছিলো এবং তিনি তাকে খেলাফত দিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি ফেনীর প্রখ্যাত মুহাদ্দিস মাওলানা আবদুল মান্নান রহ. ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর মরহুম আমীর আল্লামা আহমাদ শফী রহ.-এর থেকে খেলাফত লাভ করেন। এছাড়াও অনেক বুজুর্গদের সাথে ওনার ইলমী ও ইসলাহী সম্পর্ক ছিলো।

২০১৭ সালের ৫ জুলাই ঢাকা আল কারীম জেনারেল হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। পরদিন ৬ জুলাই তার জানাযার নামায মনোহরগঞ্জ উপজেলার মুন্সিরহাট বাজার মসজিদের সামনে অনুষ্ঠিত হয়। তার জানাযায় অসংখ্য ওলামায়ে কেরামের সমাগম ছিলো। বিশেষত আল্লামা মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন দা. বা. প্রচণ্ড অসুস্থতা নিয়েও হোসাইনী রহ. এর জানাযায় অংশগ্রহণ করেন এবং কথা বলতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে যান। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম সাহেব, হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে মাওলানা মজিবুর রহমান সাহেবসহ অসংখ্য ওলামায়ে কেরাম এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমান তার জানাযায় অংশগ্রহণ করেন।

রব্বে কায়েনাতের নিকট ফরিয়াদ, এই মহান মনীষীকে জান্নাতের আ’লা মাকাম দান করুন এবং তার রুহানী ফয়েজ আমাদেরকে দান করুন।

– সালাহুদ্দীন শিহাব
শিক্ষার্থী,
দৌলতগঞ্জ গাজীমুড়া কামিল মাদরাসা
লাকসাম, কুমিল্লা।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved ©2020 jubokantho24.com
Website maintained by Masum Billah