বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর ২০২১, ০৫:১৫ অপরাহ্ন

শিরোনাম:
বন্ধ করে দেয়া হলো খার্তুম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পাকিস্তানে বিদ্রোহীদের সাথে সংঘর্ষে ৪ পুলিশ সদস্য নিহত কথিত প্রগতিশীলদের বাধা: যুক্তরাজ্যের প্রোগ্রামে যেতে পারেননি মাওলানা আজহারী কবরে থেকেও মামলার আসামি হাফেজ্জী হুজুরের নাতি নরসিংদীতে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ৩০ আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনীতিকদের সঙ্গে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক প্রথমবারের মতো ক্যামেরার সামনে আসলেন মোল্লা ইয়াকুব আজ বন্ধ হতে পারে অনেকের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট এখন শেখ হাসিনার অলৌকিক উন্নয়নের গল্প শোনানো হচ্ছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাবজি খেলতে দেয়ার প্রলোভনে শিশুদের বলাৎকার করতেন স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা

বিশ্বসভ্যতা বির্নিমান ও আধুনিক বিজ্ঞানপ্রযুক্তি উৎকর্ষে মুসলিমদের অবদান

রবিউল আউয়াল;
জ্ঞান অর্জন না করে নিজেকে জানা যায় না, সৃষ্টিতত্ত্ব বোঝা যায় না, আল্লাহকে চেনা যায় না, ক্ষমতাধর হওয়া এবং নেতৃত্বও দেয়া যায় না। ইকরা’ অর্থাৎ ‘পড়’। ‘পড় তোমার রবের নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। এ পড়ার মূল কথা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনের সব শাখায় বিচরণ এবং মাতৃভাষায় জ্ঞানার্জন। অষ্টম থেকে প্রায় দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলমানরা দেশ জয় করে বিশ্ব জুড়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠাই করেননি; বিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা, দর্শনের মতো জ্ঞানচর্চায় অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছিলেন। আজ বিজ্ঞানের যে প্রাপ্তিগুলোকে ইউরোপীয়দের কৃতিত্ব বলে দাবি করা হয়, তার অনেকটাই সে যুগের মুসলমানদের কীর্তি। আব্বাসি বংশের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, ৭৪১ থেকে ৮৬১ পর্যন্ত বিজ্ঞানচর্চাকে যে ভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়, তা আলেকজ়ান্দ্রিয়ার সংগ্রহশালার আদি যুগের পর আর দেখা যায়নি। স্পেনের কর্ডোভা-তে উমাইয়া খলিফাদের শাসনকাল (৯২৮-১০৩১) এবং সিপেন ও মরক্কোয় তৎপরবর্তী ছোট ছোট আমিরদের শাসনকালেও বিজ্ঞানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রথমেই শুরু করা যাক ভারতবর্ষ দিয়ে – দেওবন্দি ইসলামি পণ্ডিত আবুল হাসান আলী নদভী রচিত ভারতের ইতিহাস বিষয়ক একটি জনপ্রিয় বই, যেখানে লেখক ভারতবর্ষের সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিনির্মাণে মুসলমানদের অবদান নিয়ে আলোচনা করেছেন। গ্রন্থটি “আল মুসলিমুনা ফিল হিন্দ” নামে ১৯৫৩ সালে আরবি ভাষায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই গ্রন্থে লেখক অভিযোগ করেছেন স্বার্থান্বেষী মহল কর্তৃক ভারতীয় মুসলমানদের ইতিহাস ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করা হচ্ছে, তাদের অবদান ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং ভারতের ইসলামি আধিপত্যের সময়কে বিবেচনা করা হচ্ছে উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি অন্ধকার যুগ হিসেবে। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে ১৯৩২ সালে সভাপতির অভিভাষণে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় ইসলামের কীর্তি বিষয়ে বলেছিলেন, “আমাদিগকে তাঁহাদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করিতে হইবে এবং সেই প্রেরণা, সেই অবাধ সত্যানুসন্ধান, সেই জাতিদেশনির্বিশেষে উন্মুক্ত চিত্তে জ্ঞানাহরণ, যাহা ইসলামকে তাহার উচ্চ স্থান প্রদান করিয়াছিল, সেইভাবে আমাদিগকে বিভোর হইতে হইবে। ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মনিষীগন ইবনে সিনা— বুখারার (বর্তমান উজবেকিস্তান) অন্তর্গত খার্মাতায়েন জেলার আফসানা নামক স্থানে ৯৮০ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে (মতান্তরে, আগস্ট মাস) জন্মগ্রহণ করেন। ইবনে সিনা ৫ খণ্ডের চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর কানুন ফিততিব নামে বিশ্বকোষ রচনা করেন। এটি মুসলিম বিশ্বে এবং ইউরোপে ১৮ শতক পর্যন্ত প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসাবে ব্যবহৃত হত। [৯][১০] ইউনানি চিকিৎসায় এখনও এর অবদান অপরিসীম। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সেরা চিকিৎসক, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক ছিলেন। তাঁকে একইসাথে ইরান, তুরস্ক, আফগানিস্তান এবং রাশিয়ার বিজ্ঞজনেরা তাদের জাতীয় জ্ঞানবীর হিসেবে দাবি করে। মধ্যযুগীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভিত রচনায় তিনি অবদান রেখেছেন। তাঁর মূল অবদান ছিল চিকিৎসা শাস্ত্রে। তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রের বিশ্বকোষ কানুন ফিততিব্ব রচনা করেন যা ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে পাঠ্য ছিল। আরবিতে ইবন সিনাকে শায়খুল রাইস তথা জ্ঞানীকুল শিরোমণি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আল ফারাবি (৮৭০—৯৫০ খ্রি:) বাগদাদে আল ফারাবি প্রায় ৪০ বছর উচ্চতর শিক্ষা-গবেষণার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। আল ফারাবি জ্ঞানের আকর্ষণে মিশর, দামেস্কসহ বিশ্বের বেশকিছু দেশ ভ্রমণ করেন এবং নিজেকে বহুমুখী বিদ্যায় সম্মৃদ্ধ করে তোলেন। পদার্থ বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র, চিকিত্সাবিজ্ঞান প্রভৃতিতে আল ফারাবির অবদান অবিস্মরণীয়, এককথায় অনন্য। তবে বিজ্ঞান ও দর্শনে আল ফারাবির অবদান সব চেয়ে বেশি এবং এ জন্যই তিনি সুপ্রসিদ্ধ। পদার্থবিদ্যায় তিনিই ‘শূন্যতা’র অবস্থান প্রমাণ করেন। দর্শনে আল ফারাবি ছিলেন দার্শনিক প্লেটোর সমপর্যয়ের। আল ফারাবির অবদানের জন্য তাকে ‘দ্বিতীয় এরিস্টটল’ এবং ‘আল মুয়াল্লিমুস সানি’ বা দ্বিতীয় শিক্ষক বলা হয়। আল কিন্দি (৮১৩—৮৭৩ খ্রি:) বিভিন্ন ভাষা ও বহুবিধ জ্ঞান-প্রজ্ঞায় আল কিন্দি এক অনন্য মুসলিম ব্যক্তিত্বের নাম। তিনি পবিত্র কোরআন, হাদিস, ফিকহ্, ইতিহাস, দর্শন, ভাষাতত্ত্ব, গণিত, জ্যেতির্বিদ্যা, রাজনীতির পাশাপাশি আরো অনেক বিষয়ে গভীর ও মৌলিক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। ভাষাতাত্ত্বিক ব্যুত্পত্তিসমপন্ন আল কিন্দি ছিলেন আরবি, গ্রিক, হিব্রু, ইরানি, সিরিয় ভাষায় সমান সুদক্ষ ও পণ্ডিত। আল কিন্দি রচিত গ্রন্থাদি বিভিন্ন উচ্চতর গবেষণা কাজে ব্যাপকভাবে সমাদৃত এবং এখনো দারুণ জনপ্রিয়। গবেষকগণের মতে আল কিন্দি ২৬১ বা ২৬৫টি মৌলিক ও মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। আল কিন্দি ‘এরিস্টটলের ধর্মতত্ত্ব’ অনুবাদ করেন। আল কিন্দিকে ‘আরব জাতির দার্শনিক’ বলা হয়। আল রাযি (৮৬৫—৯২৫ খ্রি:) আল রাযি ছিলেন সমসাময়িক ইরানের সুদক্ষ চিকিত্সক ও দার্শনিক। তিনিই সর্বপ্রথম সালফিউরিক অ্যাসিড আবিষ্কার করেন। তিনি ইথানল উত্পাদন, বিশোধন ও চিকিত্সার প্রয়োজনে ইথানলের ব্যবহার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। আল রাযি সুগভীর দর্শনতত্ত্বের অধিকারী ছিলেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অজানা রহস্যভেদের জন্য তিনি দেশভ্রমণ ও মনঃসংযোগের ক্ষেত্রে একনিষ্ঠার পরিচয় দেন। এই বিখ্যাত মুসলিম চিন্তাবিদ চিকিত্সা, রসায়ন, পদার্থ ও অন্যান্য বিষয়ে ১৮৪ বা প্রায় ২০০টি মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেন। এগুলোর মধ্যে ৬০টি ছিল চিকিত্সাবিষয়ক। তার জলবসন্ত ও হামসংক্রান্ত গ্রন্থের নাম আল জুদারি, আল হাসবাহ ল্যাটিন ও ইংরেজিসহ অনেক ভাষায় অনূদিত হয়। তিনিই সর্বপ্রথম বসন্ত ও হামের পার্থক্য, এগুলোর লক্ষণ ও উপসর্গ যথাযথভাবে বর্ণনা করেন।
ইবনে আল হাইসাম ছিলেন :
সর্বকালের সর্বশ্র্রেষ্ঠ একজন পদার্থ বিজ্ঞানী। তিনিই সর্বপ্রথম প্রদান করেন জড়তত্ত্ব ও আলোর প্রতিসরণ তত্ত্ব। পরবর্তীতে যা নিউটনের হাতে পুনরাবিষ্কৃত হয়। জাবির বিন হাইয়ান রসায়ন শাস্ত্রের ভিত্তি রচনা করেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইবনে সিনা, জাবির হাসান বিন হাইয়ান, আল রাযীর নাম উল্লেখযোগ্য। তাদের লিখিত বইয়ের ল্যাটিন অনুবাদ ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য ছিল।ভিত্তি রচনা করেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইবনে সিনা, জাবির হাসান বিন হাইয়ান, আল রাযীর নাম উল্লেখযোগ্য। তাদের লিখিত বইয়ের ল্যাটিন অনুবাদ ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য ছিল। কম্পিউটারের আবিষ্কার কিন্তু অঙ্ক শাস্ত্রনির্ভর। বস্তুর ‘সংখ্যাতাত্ত্বিক পরিমাপ’ আল খাওয়ারেযমীই প্রথম প্রণয়ন করেছিলেন। নিউটনের বহু আগেই কবি ওমর খৈয়াম ‘বাইনোমিয়াল থিউরাম’ আবিষ্কার করেন। পৃথিবীর প্রথম সম্পূর্ণ মানচিত্র প্রণয়ন করেন মুসলিম ভূগোলবিদ ইবনে হাক্কল। আল ফারাবি ছিলেন – বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ ও দার্শনিক। তিনি ৭০টি ভাষায় কথা বলতে পারতেন। আল বিরুনি – (প্রসিদ্ধ গ্রন্থ কিতাব আল হিন্দ), ইবনে বতুতা প্রমুখ মুসলিম মনীষী ভূবিদ্যার প্রসারে অনেক অবদান রাখেন। ইবনে খালদুনকে বলা হয় ইতিহাস, দর্শন ও সমাজ বিজ্ঞানের জনক। বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক ছিলেন ইবনে জাবির তাবারি— ‘তারিখ আল রাসূল ওয়া আল মুলুক’ তার এ গ্রন্থটি সারাবিশ্বে রেফারেন্স হিসেবে পঠিত হচ্ছে। আল ফিন্দি গণিত, ইতিহাস, ভূগোল, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ৩৬৯টি গ্রন্থ রচনা করেন। অতীতে জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতেই নয়; বরং ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, কল-কারখানাতেও মুসলমানদের ছিল গুরুত্বপূর্ণ অবদান। আব্বাসীয় খলিফা মামুন বাগদাদে ‘দারুল হিকমাহ’ নামে যে বিজ্ঞান কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন তাতে সে যুগেই প্রায় ৭ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছিল।ইসলাম ও আরবি সভ্যতার ইতিহাস’ বইতে ওস্তাভলি বোঁ লিখেছেন, ‘ইউরোপে যখন বই ও পাঠাগারের কোন অস্তিত্ব ছিল না, অনেক মুসলিম দেশে তখন প্রচুর বই ও পাঠাগার ছিল। সত্যিকার অর্থে বাগদাদের ‘বায়তুল হিকমাহ’য় ৪০ লক্ষ, কায়রোর সুলতানের পাঠাগারে ১০ লক্ষ, সিরিয়ার ত্রিপোলী পাঠাগারে ৩০ লক্ষ বই ছিল। অপরদিকে মুসলমানদের সময়ে কেবল স্পেনেই প্রতিবছর ৭০ থেকে ৮০ হাজার বই প্রকাশিত হতো। কিন্তু বর্তমানে মুসলিম দেশগুলোতে বইয়ের কদর নেই, বই প্রকাশের বিষয়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অপ্রতুল। ইউরোপের একটি ক্ষুদ্র দেশ গ্রিসে বছরে ৫০০টির মতো বই অনুবাদ করে থাকে। ‘অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে ইসলাম জ্ঞান-বিজ্ঞানকে অনেক ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। যখন খ্রিষ্টীয় জগতে বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের ওপর নিষেধাজ্ঞা চলছিল তখন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে বহুসংখ্যক গবেষণা ও আবিষ্কার সাধিত হয়। কর্ডোভার রাজকীয় পাঠাগারে ৪ লাখ বই ছিল। ইবনে রুশদ তখন সেখানে গ্রীক, ভারতীয় ও পারস্য দেশীয় বিজ্ঞানে পাঠদান করতেন। যার কারণে সারা ইউরোপ থেকে পণ্ডিতরা কর্ডোভায় পড়তে যেতেন, যেমন আজকের দুনিয়ায় মানুষ তাদের শিক্ষার পরিপূর্ণতার জন্য আমেরিকা যায়। তাছাড়া, ভাষা ও সাহিত্যে মুসলিম মনীষীদের অবদান বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চায় এগিয়ে আসে সুলতানি আমলে। মুসলমান কবিদের মধ্যে প্রাচীনতম হচ্ছেন- শাহ মুহম্মদ সগীর। তার কাব্য ‘ইউসুফ-জুলেখা’ সুলতান গিয়াসুদ্দীন আজম শাহের রাজত্বকালে (১৩৮৯-১৪১০) রচিত বলে মনে করা হয়। এর সব পুথি চট্টগ্রাম ও ত্রিপুরা (বর্তমান কুমিল্লা ও ভারতের ত্রিপুরা) থেকে পাওয়া গেছে।
নবী হজরত ইউসুফ (আ.)-এর সংক্ষিপ্ত কাহিনী যা ফেরদৌস ও জামীর ইউসুফ-জুলেখায় পল্লবিত, সেটাকে তিনি বাংলায় একটি মৌলিক কাব্যের মর্যাদা দিয়ে গ্রন্থিত করেছেন। শেখ ফয়জুল্লাহ মধ্যযুগের মুসলিম কবিদের মধ্যে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। যে পাঁচটি গ্রন্থের জন্য তিনি খ্যাতিমান, সেগুল হলো- ‘গোরক্ষবিজয়’, ‘গাজীবিজয়’, ‘সত্যপীর (১৫৭৫)’, ‘জয়নবের চৌতিশা’ এবং ‘রাগনামা’। রাগনামাকে বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম সঙ্গীতবিষয়ক কাব্য মনে করা হয়। দৌলত উজীর বাহরাম খাঁর একটিমাত্র কাব্য পাওয়া গেছে এবং সেটি হলো ‘লায়লী-মজনু’; এর রচনাকাল ১৫৬০-৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে অনুমান করা হয়। এটি ফারসি কবি জামীর ‘লাইলী-মজনু’ কাব্যের ভাবানুবাদ; তবে স্বচ্ছন্দ রচনা, কাব্যরস ইত্যাদি গুণে এটি অনন্য। আধুনিক যুগে শেখ আবদুর রহিম বাংলা ভাষার মাধ্যমে যেভাবে বাঙালি মুসলমানদের ঐতিহ্য সন্ধান এবং মানব সভ্যতায় ইসলামের অবদান তুলে ধরার চেষ্টা করেন, তেমনিভাবে আর কেউ করেননি বলে অনেকে মনে করেন। তার প্রথম গ্রন্থ হজরত মহাম্মদ (সা.) ‘র জীবনচরিত ও ধর্মনীতি (১৮৮৭) তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি। তিনি সুধাকর, মিহির, হাফেজ, মোসলেম প্রতিভা, মোসলেম হিতৈষী প্রভৃতি পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মোহাম্মদী পত্রিকায় তিনি যেসব প্রবন্ধ লেখেন তা থেকে সেকালের মুসলিম বাংলা সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়। মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ছিলেন একাধারে রাজনৈতিক কর্মী, সমাজসেবক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সুবক্তা। তিনি প্রধানত ইতিহাসমূলক রচনার জন্যই খ্যাতি লাভ করেন। ‘ভারতে মুসলমান সভ্যতা’ তার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি। এ ছাড়া মধ্যযুগে অন্যান্য মুসলমান কবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন- সৈয়দ সুলতান (আনু. ১৫৫০-১৬৪৮, কাব্য: নবীবংশ, শব-ই-মিরাজ, রসুলবিজয়, ওফাৎ-ই-রসুল, জয়কুম রাজার লড়াই, ইবলিসনামা, জ্ঞানচৌতিশা, জ্ঞানপ্রদীপ, মারফতি গান, পদাবলি), নসরুল্লাহ্ খাঁ (আনু. ১৫৬০-১৬২৫, কাব্য: জঙ্গনামা, মুসার সওয়াল, শরীয়ৎনাম। উল্লেখযোগ্য আরও কয়েকজন হলেন মোহাম্মদ আকরাম খাঁ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ (১৮৮৫-১৯৬৯), এস ওয়াজেদ আলী (১৮৯০-১৯৫১), কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯), আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩), মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-১৯৫৬), আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪), কবি বন্দে আলী মিয়া (১৯০৭-১৯৭৫) ও বেগম সুফিয়া কামাল (১৯১১-১৯৯৯) প্রমুখ।
মুসলমানদের অতীত ইতিহাস বই পড়ার ইতিহাস। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাস। অতীত ইতিহাস থেকে প্রেরণা নিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানে পুনরায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য আজ সারাবিশ্বের মুসলমানদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। কারণ আল কুরআনে বার বার জ্ঞান চর্চার বিষয়ে তাগিদ দেয়া হয়েছে। তাই মুসলমানদের জন্য জরুরি ধর্মীয় জ্ঞানের সাথে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ ব্যবহারিক জীবনের যাবতীয় জ্ঞান অর্জন করা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই পড়ার প্রতি উৎসাহিত হওয়া দরকার। ইসলামের সোনালি দিনের কথা আজকের মুসলমানরাও কি মনে রেখেছেন? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা সম্ভবত জানি।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved ©2020 jubokantho24.com
Website maintained by Masum Billah