রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ১১:৪৮ পূর্বাহ্ন

ক্রিকেট খেলা কি হারাম? মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভি

অহেতুক বিষয়ে মানুষের মাঝে উন্মাদনা সৃষ্টি করে বাস্তবতার প্রতি তাদের বেখেয়াল বানিয়ে ঈমান, চিন্তা-চেতনা, আর্থসামাজিক সক্ষমতা, সক্রিয় জীবনের অমূল্য সম্পদ সৃজনশীলতা প্রভৃতি থেকে বঞ্চিত করে অথর্ব করে তোলার কারণেই কোনো কোনো খেলা ইসলাম হারাম করেছে। জুয়া, ভাগ্যনির্ধারনী লটারি ,শতরঞ্জ বা দাবা এর অন্তর্ভুক্ত । দেখুন, ক্রিকেটও হারাম হওয়ার এসব কারণের মধ্যে পড়ে যায় কি না!

পৃথিবীতে ২৩৪টি দেশ আছে।
এর মধ্যে মাত্র ১০টা দেশ ইংল্যান্ডে একটা টুর্নামেন্ট খেলছে, সেটা নাকি আবার বিশ্বকাপ!

আর এই তথাকথিত বিশ্বকাপ নিয়ে এই দেশের সব প্রফেশানের মেধাবীতম মানুষের ঘণ্টার পর ঘন্টার চুলচেরা এনালাইসিস আর সময় নষ্ট করা দেখে একটা কথাই মনে আসে– “থার্ড ওয়ার্ল্ড কান্ট্রির মেধাবীদের চিন্তাভাবনা থার্ড ক্লাসই হয়।”

আর এই ধরণের রিসার্চের এক দশমাংশ যদি নিজের পেশার উন্নতির জন্য করা হত, সোনার বাংলা আসলেই উন্নত ও মানবিক সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হয়ে যেত।

ক্রিকেট খেলেই ১০-১৫টি দেশ। এদের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ থেকে ১১ র মধ্যে।
(টেস্টে-৮, ওডিআই তে-৭ এবং টি টুয়েন্টিতে-১১)

আপনি বলছেন অমুক বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান। তমুক বিশ্বের সেরা বোলার। আর সমুক বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার।
আচ্ছা বিশ্ব মানে কী বোঝাতে চাচ্ছেন একচুয়ালি?
বিশ্ব মানে কি এই ১০-১৫’টা দেশ?
হ্যাঁ বলতে পারেন, অন্যরা ক্রিকেট তো পারে না।
অন্যরা পারে না,
নাকি খেলে না?

যারা বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, অর্থনীতিতে এত এত কিছু করে ফেলল, তাদের পক্ষে ক্রিকেট খেলা কি খুব টাফ?
আসল কথা তাদের ন্যাশনাল পলিসিতেই ক্রিকেট নেই।

আর আমার দেশে ক্রিকেটের ছোট খাট সাফল্যে উইশ করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি,
প্রিয় পলিসি মেকার, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তিবর্গ আর মিডিয়া মালিকগণ!

বিশ্বের শতাধিক দেশের প্রতিযোগিকে হারিয়ে আমাদের হাফেযগন শত শতবার সর্বোচ্চ পুরস্কার নিচ্ছেন, এটার রাষ্ট্রীয় কোন সম্মাননা কি আপনারা দিচ্ছেন?

লাখো আলেম-উলামা পীর-মাশায়েখ নিরন্তর কোটি কোটি মানুষকে সুশিক্ষা, নসীহত, দিকনির্দেশনা ও মনুষ্যত্ব বিকাশের তালকিন দিয়ে দেশ ও জাতির যে অকল্পনীয় সেবা করে চলেছেন, তার কি কোনো স্বীকৃতি বা শোকরিয়া আপনারা জানিয়েছেন।

নাসায় কাজ করা কোন বাংলাদেশীকে কি আপনারা লাক্স চ্যানেল আই সুপার স্টার পুরস্কার দিয়েছেন?

অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, এমআইটি, হার্ভার্ডে চান্স পাওয়া কিংবা এসব ভার্সিটি থেকে পাশ করা, কিংবা ইন্টারব্যাশনাল পরীক্ষাগুলোতে সর্বোচ্চ রেজাল্ট করা মানুষগুলিকে কি আপনারা হেড লাইন করেছেন?

নির্ঘুম রাতে হাসপাতালে নাইট ডিউটি করে মানুষের জীবন বাঁচানো কোন ডাক্তারকে আপনারা হাইলাইটস করেছেন? দেশের বাইরের পরীক্ষাগুলোতে যারা ভাল রেজাল্ট করছে, তাদেরকে কি আপনারা হাইলাইটস করেন?

দায়িত্বশীলতার সাথে আইন শৃঙ্খলা মেইন্টেইন করে যাওয়া ঈদ, কোরবানিতে ডিউটি করা কোন পুলিশকে আপনারা হাইলাইটস করেছেন?

দায়িত্বশীলতার সাথে অফিস এবং সংসার মেইন্টেইন করে সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করা কোন মাকে বেস্ট অলরাউন্ডার পুরষ্কার দিয়েছেন?

বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রতি সেমিস্টারেই ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হওয়া এত এত মানুষকে আপনারা কী প্যাট্রনাইজ করলেন?

খেলা কি কখনো একটা জাতির প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্র হতে পারে? তাও আবার এমন খেলা– যা খেলে ওয়ার্ল্ডের ১০-১৫টা টিম। এর মধ্যে আপনার টিমের অবস্থান ৭ থেকে ১১?

আর যেসব মেধাবী পেশাজীবীরা এই খেলার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে যাচ্ছেন, তাঁরা নিজ নিজ পেশার মান বাড়ানোর প্রতি কতটা যত্নবান?

৮০টির ও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মান সূচক ডক্টরেট পাওয়া প্রফেসর নোয়াম চমস্কির উক্তি দিয়ে শেষ করছি,

“আপনার বুদ্ধিমত্তা, ক্রিয়েটিভিটি এবং মেধা চর্চার উপযুক্ত স্থান হচ্ছে পলিসি মেকিং, পলিটিক্স, ইকোনোমিক্স এবং কালচার।”

কিন্তু সাধারণ জনগনের এই সুযোগ নেই যে তারা খুব গভীরভাবে এগুলির সাথে সম্পৃক্ত হবে। এসব ব্যাপারে তারা নিষ্ক্রিয় দর্শক মাত্র। তাই তারা যা করে তা হচ্ছে তাদের চিন্তাধারাগুলোকে অন্য বিষয়গুলোতে কাজে লাগায়, যেমনঃ খেলা ইত্যাদি।

আপনাকে শেখানো হয় অনুগত দাস হতে; আপনার কোন আকর্ষনীয় চাকরি নেই; আপনার আশেপাশে সৃষ্টিশীল কোন কাজ নেই; অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে আপনি একজন নিষ্ক্রিয় দর্শক মাত্র; রাজনৈতিক এবং সামাজিক জীবন আপনার সাধ্যের বাইরে, কারণ ঐগুলো বড়লোকদের কাজ-কারবার।

তাহলে আম জনগণের জীবনে আর কি বাকি থাকে?
হ্যা, একটা জিনিস যা বাকি থাকে – তা হচ্ছে খেলা।
সুতরাং আপনি আপনার বুদ্ধিমত্তা, চিন্তা এবং আত্মবিশ্বাসের একটি বড় অংশ ব্যয় করেন এর পিছনে।

আমি মনে করি এই সমাজ এবং এর অব্যবস্থাপনাকে টিকিয়ে রাখতে এটিও (খেলা নিয়ে উন্মাদনা) একটি মৌলিক বিষয় হিসেবে কাজ করে। কারণ, এটি জনগণকে ব্যস্ত রাখে এবং বাধা দেয় ঐসকল বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হতে যা নিয়ে আসলেই তাদের ব্যস্ত হওয়া উচিত।”

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved ©2020 jubokantho24.com
Website maintained by Masum Billah