রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ১১:৩০ পূর্বাহ্ন

অন্তহীন সঙ্কটে আগামীর কওমি মাদ্রাসা

কওমী মাদ্রাসা নিয়ে অনেক আগে থেকেই এমন কিছু কথা বলে আসছিলাম, যেটা অনেকের কাছে ছিল বিরক্তিকর। এর পরিচালনা, সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ, হিসাব-নিকাশ, কমিটি, মুহতামিম এর দায়িত্ব পালন ইত্যাদি বিষয়ে অসংখ্য লেখা ইতিপূর্বে লিখেছি। ২৬শে মার্চের ঝড় আসার এক মাস আগেও লিখেছিলাম, “শেষ ঝড়টা কওমীদের ওপর দিয়েই যাবে।” এসবকে বাড়তি কথা বলে অনেকেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
আবারও বলছি, বিশেষ করে তরুন পরিচালক ও মুহতামিমদের কাছে বিনীতভাবে অনুরোধ করছি, পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যাবে এটা মাথায় রেখে সকল মাদ্রাসায় স্ব-উদ্যোগে হিসাব-নিকাশে এখনই শতভাগ স্বচ্ছতা আনয়ণ করুন। শিক্ষক ও স্টাফ নিয়োগ নীতিমালা পরিস্কার করুন। শরীর থেকে বাড়তি রাগ, ক্ষোভ, ধৈর্যহীনতা নিয়ন্ত্রন করুন। প্রতিষ্ঠানকে জনগণের সম্পদ এবং আমানত মনে করুন। আপনি শুধুমাত্র এর রক্ষক ছাড়া আর কিছুই নন মনে করুন। নিজের টিকে থাকার ওপর দ্বীনের টিকে থাকা মনোভাব পরিহার করুন। জিদ নিয়ন্ত্রন করুন। পাশাপাশি অন্যান্য মাদ্রাসার প্রতি সকল প্রকার রেষারেষি ঝেটিয়ে বিদায় করুন। প্রতিষ্ঠানের আশেপাশের সকল আলেমকে বিশ্বস্ত বন্ধু ভাবুন। মাদ্রাসার জমি-জমার কাগজপত্রের দুর্বলতা দূর করুন। খাজনা-খারিজ ঠিক করুন। নিয়মিত অডিট করুন। শতভাগ কাজ সুন্দর মতো করার পর আল্লাহর ওপর ভরসা করুন। বাকীটা আল্লাহ দেখবেন।
মনে রাখবেন, কওমী মাদ্রাসাগুলো দ্বীনের যে মশাল জ্বালিয়ে যাচ্ছে চরম এই ফেতনার যুগেও তা অকল্পনীয়। ব্যতিক্রমবাদে কওমী মাদ্রাসার প্রতিটি ছাত্র যেন ফেরেশতাতুল্য। তাদের আদব-আখলাক, তাদের মার্জিত ব্যবহার, পরিবারের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধ, বাবা-মা’র প্রতি সম্মান প্রদর্শন, রাষ্ট্রের প্রতিটি আইনের প্রতি সমীহ করার চলার ক্ষেত্রে কওমী মাদ্রাসার ছাত্রদের তুল্য আর কেউ নেই। প্রতিটি হিফজখানায় কুরআনের যে ধ্বনি প্রতি মুহুর্তে দেশের সকল প্রান্তে উচ্চারিত হচ্ছে এটাকে বড় নেয়ামত মনে করুন। তবে, এটুকুই যথেষ্ট নয়। আমাদেরকে রাষ্ট্রীয় আইনের কাছেও স্বচ্ছ থাকতে হবে। যেহেতু কওমীদের মতো সরল, ফেরেশতাতুল্য মানুষ আর কোথাও নেই, তাই এই অঙ্গনের প্রতি বাতিলের চোখ আরো বেশি পড়বে এটাই স্বাভাবিক। তাদের ওপরই ঈমানী পরীক্ষা আসবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের শতভাগ চেষ্টা করতে হবে ছোট-খাট ভুল থেকেও বেঁচে থাকার। তারপরও আসবে। ঝড় আসবে। তুফান আসবে।
তৃতীয় কাজ হলো, ঝড় আসলে ভেঙ্গে না পড়া। হতাশ হয়ে না পড়া। পরস্পরে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়া। যতদূর সম্ভব পরস্পরে আরো কাছাকাছি আসার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। কাছের মানুষকে শত্রু বানানো থেকে বিরত থাকতে হবে। কোথাও সাময়িক কোন ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে দেখেও নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে হবে। চেষ্টা করেও সে ক্ষতি ঠেকাতে না পারলে ধৈর্য ধরতে হবে। নিজের ঈমান ও আখলাকের ওপর আস্থা রাখতে হবে। কুরআনী মেজাজ সবক্ষেত্রে প্রাধান্য দিতে হবে। সীরাতে নববীর আলোকে নিজেকে গড়তে হবে। উদারতা, সহনশীলতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। আদর্শে অবিচল থাকতে হবে। সামান্য সুযোগ পেলেই এদিক-সেদিক ছুটোছুটি করা নববী আখলাকের অনুসারীদের মানায় না।
আজকে আমরা আফগান মু জা হি দ দের সুদিন দেখে খুব খুশি হচ্ছি। কিন্তু একবার চোখটা বন্ধ করে ৮০দশকের দিকে ফিরে যান। ইতিহাসটা খুলে দেখুন। সেখানে কী পরিমাণ জুূলুম-নির্যাতন আলেমদের ওপর হয়েছে। গত ২০টি বছর আফগানের সংগ্রামী কাফেলাটি কী পরিমান ধৈর্য আর সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছে সেটা না দেখে পাগড়ি পরা ছবির মিছিল দেখেই সব হিসাব মিলালে চলবে নারে ভাই।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সময়ের শ্রেষ্ঠ জ্ঞান দান করুন। যমানার নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা দান করুন। কুরআন ও সুন্নাহর প্রকৃত চেতনার আলোকে নিজেকে শানিত করার তৌফিক দান করুন। আর দেশের মধ্যে উম্মাহ কেন্দ্রিক সামগ্রীক চিন্তা লালন করার তৌফিক দান করুন। বিচ্ছিন্ন ভাবনা থেকে আমাদের হেফাজত করুন। আর ইলমি অহঙ্কার থেকে হেফাজত করুন। মানুষকে মুর্খ ভাবার প্রবণতা থেকে হেফাজত করুন। সাধারণ মানুষকে সম্মান দেখানো, রাষ্ট্রের সকল স্তরের দায়িত্বশীলদের সাথে সম্মানসূচক সম্পর্ক রাখা, কোন প্রকার দুনিয়াবি স্বার্থে নিজেকে বিলিয়ে না দেওয়ার তৌফিক দান করুন।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved ©2020 jubokantho24.com
Website maintained by Masum Billah