রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ০৩:৩৭ অপরাহ্ন

জামিয়া রহমানিয়া ও মুফতী মনসুরুল হক (১৯৯১-২০০০)

  • মুফতি মাহফুজুল হক
বাবরি মসজিদ লংমার্চের পরের বছর জামিয়া রহমানিয়ায় ভর্তি হই। ভর্তির আগে মুফতী সাহেবকে চিনতাম না, নামও শোনিনি। শাইখুল হাদীস সাহেবকে আগে দেখিনি কিন্তু সর্বস্তরের আলেমদের কাছে শাইখের নাম শোনতে শোনতে শাইখের টানে, শাইখের সুহবতের আশায়, শাইখের কাছে পড়ার বাসনায় গিয়েছিলাম রহমানিয়ায়।
শুধু আমি নই, সেই ৯০’র দশকের প্রচুর সিনিয়র-জুনিয়র ছাত্রদের সথে আলাপ করে, খোঁজ নিয়ে জেনেছি সবাই আামর মতো পাগল। যাকে দেখেনি, যিনি নিচের কোন ক্লাস করানও না তাঁর (শাইখুল হাদীস) জন্যই সবাই এসেছে। অবশ্য মুফতী সাহেবের জন্য যে ছাত্র আসত না, তা না। মক্তবের শিক্ষকদের পরিচয়েও কিছু ছাত্র তো আসতো। এমনকি অনেক সিনিয়র ছাত্রদের পরিচয়েও নিচের শ্রেণির কিছু ছাত্র আসত।
নরসিমা রাও ঠেকাও আন্দোলনের কারণে বিএনপি সরকার শাইখকে কারাবন্দী করে রেখেছেন। শাইখকে পেলাম না। পেলাম মুফতী সাহেবকে। মুফতী সাহেবের কথা, বয়ান সবকিছুই অসম্ভব ভালো লাগত। বাদ ফজর সাত মসজিদ চত্বরে দেয়া তাঁর বয়ানগুলো তন্ময় হয়ে শোনতাম। আর উজ্জ্বীবিত হতাম।
৯০’র দশকের শুরুর দিকে আমাদের কৈশরের দিনগুলোতে মুফতী মনসুরুল হক সাহেব হাফি.র একটি কমন বয়ান ছিল। কত শতবার যে সরাসরি তাঁর যবানে মুবারাক থেকে এ বয়ান শোনেছি তা গণনা করা সম্ভব না। রহমানিয়ার পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য বুঝাতে যেয়ে তিনি বলতেন : “দ্বীনের হার লাইনের তাকাযা পূরা করার নাম জামিয়া রহমানিয়া। এখানে দ্বীনী জ্ঞানের চর্চা হবে, তবলীগের কাজ হবে, দাওয়াতুল হকের কাজ হবে, সিয়াসত ও জিহাদ হবে, বাতিলে বিরুদ্ধে মিছিল-মিটিং হবে, মানব সেবা হবে, লেখালেখি হবে, বক্তৃতা হবে। দ্বীনের হার লাইনের তাকাযা এখান থেকে পূরণ করা হবে।”
সেই ৯০’র দশকের শুরুতে আমাদের কিশোর বয়সে তিনি এভাবেই “দ্বীনের হার লাইনের তাকাযা” শিরোনামে জামিয়ায় ভর্তি হওয়া হাজার হাজার ছাত্রের সাথে জামিয়া রহমানিয়াকে পরিচয় করিয়ে দিতেন।
সেই দিনগুলোতে মিছিলে না যাওয়া তরুণ ছাত্রদের মুফতী মনসুরুল হক সাহেব হাফি. ভিজা কম্বল বলে তীব্র ভর্ৎসনা করতেন। সম্ভবত ভিজা কম্বল শব্দ ও এর ব্যাখ্য জীবনে প্রথম শোনেছি তাঁর মুখে। আর তা শোনেছি বহুবার, বহুবার। ভরমজমাতে মিছিলে না যাওয়ার সমালোচনা করতেন। হার লাইনের তাকাযা দিয়ে মিছিলে যাওয়ার গুরুত্ব বুঝতেন।
৯০’র দশকের শুরুর দিকেই মধ্য দশকের আগে হবে কোন একটা ইস্যুতে ইসলামপন্থীদের আহুত হরতাল ছিল। বড় বড় সব ছাত্ররা হরতালের পিকেটিংয়ে গেছে। মুফতী সাহেবকে তখন দেখেছি সক্রিভাবে এ মিছিলে সহযোগিতা করতে। ছাত্রদের পিকেটিংয়ে পাঠাতে। সেই হরতালের দিন শুধুমাত্র ছোট ছাত্ররাই রহমানিয়াতে ছিল। হরতালের আগের দিন বা রাতে হরতালের প্রস্তুতিমূলক বয়ানে কিছু ছাত্র মিছিলে না যেয়ে মাদরাসায় থাকার গুরুত্ব বুঝাতে যেয়ে তিনি বলেছিলেন : “দেখ, এটা (রহমানিয়া) সেনা ক্যাম্প। সব সৈন্য যুদ্ধে গেলে তো হবে না। ক্যাম্প তো পাহাড়া দিতে হবে।”
মুফতী মনসুরুল হক সাহেব ছাত্রদের শিখাতেন সুন্নত মতো কিভাবে মিছিল করতে হয়। তিনি একটা মিছিলকে মাইমানা, মাইসারা এবং আরো কি কি নামে ছোট ছোট ভাগ করতে বলতেন।
একবার মুফতী সাহেব নেগরানদের কাছে, ১২ বছরের নিচের ছাত্রদের তালিকা চাইলেন। তালিকা পাওয়ার পর তিনি ঘোষণা দিলেন, এ তালিকাভূক্তরা মিছিলে যেতে পারবে না। বাকিরা মিছিল মিটিংয়ে যাবে। কোন্ কোন‌্ হাদীস দিয়ে যেন তিনি বুঝালেন ১২ বছরের নিচের কাউকে জিহাদে নেওয়া জায়েয নেই। তখন তো আর দলীল বুঝার বয়স হয়নি। তাই তা মনেও রাখতে পারিনি। শুধু জাবানি ফতওয়া আর সারাংশ বুঝেছি।
কিছু কিছু ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনের মিছিলে মুফতী সাহেব ব্যনারের পিছনে, মিছিলের প্রথম সারিতে থেকে মিছিলেরর নেতৃত্বও দিতেন।
মুফতী মনসুরুল হক সাহেবের যবানে মোবারক থেকে এ ফতওয়াও বহু বহুবার শোনেছি, “যে যুগে যে উপায় অবলম্বন করলে বাতিল প্রভাবান্বিত হয় সেই যুগে সেই উপায়ই জিহাদ”। এ মূলনীতির দ্বারা তিনি লংমার্চ, মিছিল, মিটিংকে জিহাদ বলতেন।
সেই দিনগুলোতে তিনিই তারগীব দিয়ে ছাত্রদের তবলীগে পাঠাতেন, দাওতুল হকের কাজ করাতেন, মিছিল পাঠাতেন। আর হার লাইনের তাকাযার নসিহত করতেন।
আমরা যে মুফতী মনসুরুল হককে দেখেছি, পেয়েছি বর্তমান প্রজন্ম সেই মুফতী সাহেবকে দেখেনি।
আমরা সেই দিনগুলোতে শাইখুল হাদীস সাহেব আর মুফতী সাহেব উভয়কে এক মেজাজের আর রাজনীতিবিদ হিসেবেই পেয়েছি। পার্থক্য শুধু এতটুকুই ছিল যে, শাইখুল হাদীস সাহেব নিয়মতান্ত্রিক দলীয় রাজনীতি করতেন। আর মুফতী সাহেব নির্দিষ্ট কোন দল করতেন না, কিন্তু ইস্যুভিত্তিক রাজনীতিতে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সরব। এমনকি বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনের পরামর্শের জন্য সময়সময় তিনি খেলাফত মজলিসের অফিসেও যেতেন।
৯০’র দশকের মাঝামাঝি থেকে বদলে যেতে থাকে মুফতী সাহেবের নযরিয়া। হার লাইনের তাকাযার তারগীব দেওয়া ছেড়ে দেন। মিছিল-মিটিংয়ের প্রতি তার অনীহা বাড়তে থাকে।
জামিয়া রহমানিয়া জন্মলগ্ন থেকেই ইস্যুভিত্তিক জাতীয় রাজনীতিতে মিছিল মুখর, আন্দোলন মুখর। জন্ম থেকে ৯০’র দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ছাত্রদের মিছিল মিটিংয়ে অংশগ্রহণ জামিয়ার ভিতরের কোন বিতর্ক, বিবাদের সৃষ্টি করেনি। কখনো রেষারেষি হয়নি। কারণ রঈস এবং নায়েবে রঈস (শাইখুল হাদীস সাহেব এবং মুফতী সাহেব) একই নযরিয়া লালন করতেন।
৯০’র দশকের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয় চাপা বিরোধ। কারণ শাইখুল হাদীস আগের নজরিয়াতেই আছেন কিন্তু মুফতী সাহেবের নযরিয়া বদলে গেছে। তিনি আন্দোলন বিমুখ পীর সাহেব হয়েছেন।
একটা প্রতিষ্ঠান জন্মলগ্ন থেকে একভাবে চলছে পরিচালকদের সবাই মিলে একভাবে চালিয়ে আসছিলেন। একজনের যখন নযরিয়া বদলে গেল তখন বিবেক, ইনসাফ এটাই ছিল তিনি নিরবে চলে যাবেন। কিন্তু তিনি তা না করে, নিজের নতুন লাভকরা পীরালী ইমেজ দ্বারা কমিটিকে হাত করে, কমিটিকে বিভ্রান্ত করে তাদের দ্বারা ২০০০ সালে যা করালেন তা তো করালেনই।
রহমানিয়া গড়ে উঠেছিল শাইখুল হাদীসের ব্যক্তিত্ব ও পরিচিতির উপর। এমনকি সরাসরি মুফতী সাহেবের থেকে কুরবানীর কাজের তরতীবের বয়ানে একাধিক বছর শোনেছি, “তোমরা মানুষের বাসায় চিঠি নিয়ে গেলে যদি জিজ্ঞেস করে কোন মাদরাসা থেকে এসেছেন? তখন হুজুরের নাম বলবা। বলবা, শাইখুল হাদীস আজিজুল হক সাহেবের মাদরাসা থেকে এসেছি”। মানে আপামর জনগণ নায়েবে রঈস মুফতী সাহেবকে চিনে না। চিনে রঈসকে। চিনে বুখারী শরীফের ভাষ্যকারকে।
রহমানিয়া গড়েই উঠেছে শাইখের ব্যক্তিত্ব আর পরিচিতকে সম্বল করে। তাই যারা শাইখুল হাদীসের আদর্শের সাথে দ্বিমত হবে তাদের এখানে কোন হক নেই।
৮০’র দশকের অনভিজ্ঞ অপরিচিত মুফতি মানসুরুল হকের কি এমন আহামরি ব্যক্তিত্ব ছিলেন যে, তিনি জামিয়া রহমানিয়ার মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে ফেলবেন! শাইখের স্নেহে তিনি বুখারী পেয়েছেন, নায়েবে রঈস পদ পেয়েছেন। এ দু’নিয়ামতের সুবাদে কাজ করতে করতে ধীরে ধীরে তিনি পক্ক হয়েছেন, অভিজ্ঞ হয়েছেন, পরিচিত হয়েছেন আর হয়েছেন আজকের মুফতী মনসুরুল হক। প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন জামিয়া আবরারের মতো বিশাল প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সেই ৮০’র দশকে?

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved ©2020 jubokantho24.com
Website maintained by Masum Billah