রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ০৪:৩১ অপরাহ্ন

রাহমানিয়া এর আগেও কেড়ে নেয়া হয়েছিল গড়ে উঠেছিল রাহমানিয়া হাকিকিয়া

এহসানুল হক:

দুই হাজার সালের সংগ্রামে উত্তাল দিনগুলোতে শাইখুল হাদীস রহ. যখন রাজপথের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তখন বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মুখে শাইখুল হাদীসকে তারই প্রতিষ্ঠান রাহমানিয়া ছাড়তে হয়েছিল। তিনি রাহমানিয়া থেকে বের হওয়ার পরেই প্রতিষ্ঠিত হয় রাহমানিয়া হাকিকিয়া। এই প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব ছিল খুব অল্প সময়, মাত্র দেড় বছর। শাইখুল হাদীস রহ. যতদিন রাহমানিয়া ভবনের বাইরে ছিলেন, ঠিক তত দিনই ছিল এর মেয়াদকাল।

এই হাকিকিয়াতেই আমার কিতাব বিভাগে পড়াশোনার সূচনা হয়। মোহাম্মাদপুরস্থ মোহাম্মাদি হাউজিং কোবা মসজিদকে কেন্দ্র করেই মাদরাসাটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। দাওরায়ে হাদীসসহ প্রধান ক্লাসগুলো অনুষ্ঠিত হতো কোবা মসজিদে। আমাদের মিজান জামাতের ক্লাসও কোবা মসজিদেই হতো। এছাড়া বাকি দরসগুলো হতো নুর মসজিদ ও জিলানি মসজিদে। আমরা থাকতাম মোহাম্মাদি হাউজিং ৮৩/সি এর টিনশেড বাসায়। নিচের পাচঁ জামাতের ছাত্ররা সেখানে থাকত। দারুণ উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে শুরু হয়েছিল পড়াশোনা।

হাকিকিয়ার ক্লাস মাত্র দুই সপ্তাহ সুন্দরভাবে চলেছে। এরপর আবারও প্রতিষ্ঠানটি সংকটের মুখোমুখি হয়। তখন শাইখুল হাদীস ও মুফতি আমিনীর নেতৃত্বে ফতোয়া রক্ষার আন্দোলনে উত্তপ্ত ছিল বাংলাদেশের রাজনীতি। ২০০১ এর ২রা ফেব্রæয়ারি পল্টনে মহাসমাবেশ হলো। পরদিন হরতালে তুমুল সংঘর্ষ হলো মোহাম্মাদপুরে। ঘটে গেল নুর মসজিদ ট্র্যাজেডি।

শাইখুল হাদীস রহ. গ্রেফতার হলেন। রাহমানিয়া ও আশপাশের মাদরাসার অসংখ্য ছাত্র গ্রেফতার হলেন। মোহাম্মাদপুরে আর কোনো মাদরাসা চালানোর পরিস্থিতি থাকল না। বছর সবেমাত্র শুরু। পড়াশুনার কী হবে? মাদরাসা বন্ধ। বাসায় প্রায় প্রতিদিন মিটিং হতো। মাওলানা আশরাফুজ্জান সাহেব, মামুন মামা, হাসান ভাই, ভাইয়াসহ আরও অনেকেই মিটিং করতেন। কোথায় মাদরাসা চালু কারা যায় সেই চিন্তা করতেন। এমন সময়ে নদীর ওপার কেরাণীগঞ্জের ওয়াশপুরস্থ ঘাটারচরে মাদরাসা করার প্রস্তাব এল। একদিন সবাই এলাকা দেখতে গেলেন। বড়দের সাথে আমিও গেলাম।

আজ থেকে বিশ বছর আগের কথা। নদীর ওপারে তখন উন্নয়নের ছোঁয়া একেবারেই লাগেনি। বসিলা ব্রিজের কাজও শুরু হয়নি। ওয়াশপুর ছিল তখন সম্পূর্ণ গ্রাম। অনেক দূরে দূরে একেকটি ঘর। চার দিকে ধান ক্ষেতের ফসলি জমিন। কাঁচা মাটির রাস্তা। একেবারেই অজপাড়া গাঁ যাকে বলে। তবু ঠিক করা হলো, সেখানে মাদরাসা চালু করা হবে। কারণ, আর কোনো বিকল্প ছিল না।

সেখানে মাওলানা সুলাইমান সাহেবদের দারুল মাআরেফ নামে ছোট একটা মাদরাসা ছিল। সেখানে কিছু অংশ। মাওলানা আশরাফ আলী রহ.-এর বাসায় কিছু অংশ। এবং আশপাশের আরও কিছু ভাড়া বাসা ও কয়েকটি মসজিদের ওপর ভর করে আবারও শুরু হলো রাহমানিয়া হাকিকিয়ার শিক্ষা কার্যক্রম।

মাদরাসার প্রথম মজলিস হয়েছিল ঘাটারচর মাঠের কোণে অবস্থিত নুর মসজিদে। সেই আলোচনা সভায় উস্তাদদের অনেকেই কথা বলেছিলেন। রাহমানিয়ার বর্তমান শাইখুল হাদীস মাওলানা বাহাউদ্দীন আহমদ গাজিপুরী হুজুরের একটা কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। শীতের দিন ছিল। হুজুর সবুজ রঙের একটা রুমাল পরেছিলেন।

গাজীপুরী হুজুরের কথাগুলো মনে পড়ে, হুজুর বলেছিলেন, শাইখুল হাদীস সাহেব যখন লালবাগ ছেড়ে আসেন, তখন মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ সাহেব বলেছিলেন, ‘শাইখুল হাদীস যেখানেই যাবে সেখানেই মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হবে। যদি গাছতলায় যায় সেখানেও মাদরাসা হবে। গাজিপুরী হুজুর বলেন, ‘আমি নিয়ত করেছি, হুজুর যেখানে মাদরাসা করবেন, আমি সেখানেই হুজুরের সাথে থাকব। হুজুর যদি গাছতলায় গিয়ে মাদরাসা করেন বা পানিতে ভাসমান কোনো মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন, সেখানেও আমি হুজুরের সাথে থাকব।’ গাজিপুরী হুজুরের কথাটা ভুলতে পারি না। কি আবেগ! কি ভালোবাসা!… চলবে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved ©2020 jubokantho24.com
Website maintained by Masum Billah