রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ০৪:০২ অপরাহ্ন

গার্মেন্টস শিল্প ও রাষ্ট্রীয় অবহেলা

  • রবিউল আউয়াল:

শ্রম, শ্রমিক ও উৎপাদন তিনটি জিনিস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শ্রমিকদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে আসে উৎপাদন। তাদের কঠোর পরিশ্রম আর খাটুনির মাধ্যমে নির্মিত হয় ইতিহাস। গড় উঠে শহর, নগরী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সভ্যতা। কিন্তু এই শ্রমিকরাই তাদের প্রাপ্য মজুরি থেকে হচ্ছে বঞ্চিত । যুগ যুগ ধরে মালিকসমাজ শ্রমিকদের রক্ত শোষণ করে তাদের ন্যায্য মজুরী থেকে বঞ্চিত করে আসছে। বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশে শুধুমাত্র গার্মেন্টস শিল্পে রফতানি আয় বেড়েছে বহুগুণ, কিন্ত সেই অনুপাতে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরী নিশ্চিত হয়নি। বরং চরম অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার শ্রমিক সমাজ। দায়িত্বশীল সরকার ও এ ব্যাপারে এখনও কোনো সমাধান দিতে পারেনি। বরং তারা তাদের মজুরি চুরি, কারখানার ইউনিয়নীকরণ, অগ্নিনিয়ন্ত্রণ ও ভবন নিরাপত্তার চরম অভাবসহ বিভিন্ন অধিকারের জন্য আন্দোলন করে ক্রমাগত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ফলে কেউ কর্মক্ষমতাহীন, আবার কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করে মানবেতর জীবন যাপন করছে। একটা সময় ছিল যখন শ্রমিকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ছিল না। মালিকপক্ষ জোর করে শ্রমিকদের ১০-১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করাতো। কিন্ত সেই অনুযায়ী তাদের পারিশ্রমিক দেওয়া হতো না। তখন ১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরে শ্রমিকরা দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ ও তাদের ন্যায্য মজুরীর জন্য আন্দোলন ও বিক্ষোভ শুরু করে। পরে কয়েকজন শ্রমিকের প্রাণের বিনিময়ে মালিকপক্ষ তাদের দাবী মানতে বাধ্য হয়। সেই থেকে গোটা বিশ্বে শ্রমিক সমাজে ব্যাপক উন্নতি হয় শ্রমিকরাও তাদের প্রাপ্ত সুবিধাগুলো ভোগ করে। কিন্ত সেই অনুযায়ী অনুন্নত দেশগুলোর মধ্যে আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রমিকদের দুঃখ দুর্দশা ঘুচেনি। সম্প্রতি, নারায়নগঞ্জের সেজার জুস কারখানায় আগুনে নিহত শ্রমিকরাই বলে দেয়, কতটুকু সুবিধায় আছে আমাদের দেশের সাধারণ শ্রমিকরা? গাজীপুরের স্টাইল ক্র্যাফটসের পোশাক শ্রমিকেরা তাদের তিন মাসের বকেয়া বেতন ভাতার দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচী পালন করেছে। এছাড়াও ৭ জানুয়ারি ইস্ট ওয়েস্ট লিমিটেড কারখানার শ্রমিক ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। এভাবে মাসের পর মাস দেশের গার্মেন্টস, পাটকল, চিনিকলের শ্রমিকেরা শুধুমাত্র তাদের প্রাপ্য অধিকার ও প্রকৃত মজুরির জন্য আন্দোলন, ধর্মঘট করে যাচ্ছে। করোনা মহামারি যখন প্রকট আকারে ধারণ করেছে ঠিক সেই পরিস্থিতিতেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাজীপুরের দুরন্ত গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন করতে গিয়ে আহত হয়েছে অনেক শ্রমিক৷ এভাবে আন্দোলন করেও প্রতিদিন নিপীড়িত হচ্ছে তারা। ২০১৭ সালের খুলনার প্লাটিনাম জুটমিল শ্রমিকদের আন্দোলন যেখানে অনশন করে জীবন দিয়েছিল এক শ্রমিক। সাভারের মৃত্যুকুপ রানাপ্লাজার ধ্বস যেখানে সহস্রাধিক শ্রমিক নিহত হয়েছিল এছাড়াও তাজরীন ফ্যাশনের স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড যা গোটাবিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল। এই শত শত শ্রমিকদের তাজাপ্রাণগুলোর ক্ষতিপূরণ মালিকপক্ষ এবং সরকার কেউ দিতে পারেনি। এর সঙ্গে জড়িত রাঘববোয়াল দোষীদের শাস্তি প্রদান করতে বার বার ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্র প্রশাসন। এক শ্রমিকের মতামত- খুব ক্ষোভেই তিনি এ কথাগুলো বলেছেন, করোনাভাইরাসে মৃত্যু ও সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় আগামি ২৩ জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে তিব্রতর লকডাউন দিয়েছে সরকার। এই সময়ে সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত বন্ধ থাকবে। বন্ধ থাকবে শপিংমল ও দোকানপাটও। আরো বন্ধ থাকবে যানবাহনও । কিন্ত, ঈদের ছুটিতে যখন শ্রমিকরা দেশের বাড়িতে যাবে, ছুটি শেষে ঢাকা ফিরবে কি গার্মেন্টস কোম্পানির নিজস্ব বিমানে ? এমনও শ্রমিক আছে, বছরে মাএ কোরবানি ঈদে গ্রামে যায়। গার্মেন্টসে তুলনামূলক কোন ছুটিও পাই না,মাএ বছরে কয়েকটা । এখন, সরকার যদি চায় পুরো ৫ই আগস্ট পর্যন্ত দিতে পারে । ঈদের সাথে আরো ১০ দিন বন্ধ দিলে তেমন কোন ক্ষতি হবে না বলেও তিনি জানান। মালিকরা তো, কেয়ামত চলাকালীন সময়েও গার্মেন্টস খুলা রাখতে আবেদন করবে..! করোনায় কি শ্রমিকদের ভয় নাই্,নাকি গার্মেন্টসে কাজ করি বলে করোনা হবে না? আমরা গরিব বলে, সরকার এমনটা করছে.. এমনটাই জানিয়েছে , মিরপুরের শিল্প এলাকার একজন শ্রমিক। যদি , লকডাউনের আওতায় সারা দেশের মত গার্মেন্টসও যদি বন্ধ রাখে সরকারকে ধন্যবাদ দিবেন। এ অবস্থায় পোশাক কারখানা খোলা রাখার দাবি জানিয়েছেন মালিকরা। ট্রেয উইনিয়ন সংঘ বলেছিলেন- করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সরকার ঘোষিত ‘কঠোর বিধিনিষেধ বা লকডাউনের’ সুযোগে মালিকদের দুরভিসন্ধি ও অবহেলার কারণে শ্রমিকরা মজুরি-বোনাস নিয়ে দুর্ভোগের পাশাপাশি ছাঁটাই এবং লে-অফের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি ”আহসান হাবিব বুলবুল’ জাতীয় প্লেসক্লাবে এক সময় বলেছিলেন- ২০১৩ সালে গার্মেন্টস খাত রপ্তানি করেছিল ১৯ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে রপ্তানি করছে ২৮ বিলিয়ন ডলার। জাতীয় রপ্তানির ৮০ শতাংশ আসে গার্মেন্টস খাত থেকে। তবু গার্মেন্টস শ্রমিকরা সামান্য বেতন পান। রমজান বা ঈদ ঘনিয়ে আসলে অনেক গার্মেন্টস মালিক বেতন-বোনাস পরিশোধে গড়িমসি করেন। প্রতি বছর রোজার শুরুতে শ্রম মন্ত্রণালয় মালিকদের সাথে বৈঠক করে সকল পোশাক ও শিল্পে শ্রমিকরদের বেতন বোনাস পরিশোধের আশ্বাস দেন। কিন্তু মালিকরা ঈদের পূর্ব পর্যন্ত কিছু বেতন বোনাস দিয়ে শ্রমিকদের জিম্মি করেন। শ্রমিকদের তখন আন্দোলন করারও সুযোগ থাকে না। তাছাটা প্রতিবাদ করলে হয়রানি করা হয়। এটাতো গেল ২০১৭ সালের কথা !

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved ©2020 jubokantho24.com
Website maintained by Masum Billah