মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১২:২৯ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম:
রাজধানীর রামপুরায় বাসের চাপায় আরেক স্কুল ছাত্রের মৃত্যু,৮ বাসে আগুন দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা চেয়ারম্যান পদে জামানত হারিয়ে এবার এমপি নির্বাচন করতে চান ‘ভিক্ষুক’ মুনসুর করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট: এইচএসসি পরীক্ষা হবে কিনা জানালেন শিক্ষামন্ত্রী ১৪ মাসে হেফাজতের শীর্ষ চার নেতার ইন্তিকাল ভারতের ‘ওমিক্রন ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ওমিক্রন: দক্ষিন আফ্রিকা থেকে আসা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৭ ব্যক্তির বাড়িতে লাল পতাকা হেফাজতের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হলেন মাওলানা সাজিদুর রহমান আল্লামা নুরুল ইসলামের জানাজার নামাজ সম্পন্ন আল্লামা নুরুল ইসলামের ইন্তেকালে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের শোক প্রকাশ যে কারণে হাটহাজারিতে হচ্ছে আল্লামা নূরুল ইসলাম জিহাদির দাফন

ফিরে দেখা রাহমানিয়া-রাহমানিয়া দ্বন্দ্ব

প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকেই দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত সকল ক্লাস একসাথে চালু হওয়া মাদরাসার নাম জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া। শুরু থেকেই বেফাকের ঈর্ষণীয় ফলাফলের অধিকারী এ প্রতিষ্ঠানটি। শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক ও মুফতি মনসুরুল হকসহ দশজন প্রবীণ আলেমের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে উঠেছিলো এ জামিয়া। রাহমানিয়া তার প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকেই সারা দেশে এতটা সুনাম ও সুখ্যাতির একমাত্র কারণ ছিলেন শাইখুল হাদিস রহ.।
শাইখুল হাদিস রহ. নব্বই এর দশক থেকেই এদেশের জাতীয় রাজনীতিতে একজন বড় ধরণের প্রভাব সৃষ্টিকারী ব্যক্তি ছিলেন। বাবরি মসজিদ লংমার্চ থেকে শুরু করে বড় বড় দেশকাঁপানো আন্দোলনগুলো তিনি রাহমানিয়ায় থাকা অবস্থাতেই করেছিলেন। বড় বড় আন্দোলনগুলোতে তাঁর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাহমানিয়ার ছাত্রদের স্বতঃস্ফুর্ত উপস্থিতি ছিলো। ব্যাপক হারে বিভিন্ন মিছিল মিটিংএ ছাত্ররা অংশগ্রহণ করতো। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই শাইখুল হাদিসের সবচে বড় সহযোগী রাহমানিয়ার নায়েবে মুহাতামিম ছিলেন মুফতি মনসুরুল হক সাহেব।
শায়েখের চিন্তা ও তার চিন্তা একই সরল রেখায় চলতো। আমরা মুফতি সাহেবের তৎকালিন ছাত্রদের কাছ থেকে শুনেছি, তিনি ছাত্রদেরকে উৎসাহ দিতে গিয়ে বলতেন, ‘রাহমানিয়ার ছাত্রদের দ্বীনের হার লাইনের তাকাযা পূরণ করতে হবে। রাহমানিয়া ভেজা কম্বলের আস্তানা না, এটা বুলেট তৈরির কারখানা।’
কিন্তু হঠাৎই মুফতি সাহেবের চিন্তাচেতনায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে। তিনি রাজনীতিকে মনে প্রাণে ঘৃণা করতে শুরু করেন। শুনেছি, হাদুইর হযরতের খেলাফত পাওয়ার পর থেকেই তার চিন্তায় বড় ধরণের পরিবর্তন আসেত শুরু করে। এটা কতটুকু বাস্তব তা আমি বলতে পারবো না।
এভাবেই শুরু হয় শাইখুল হাদিস সাহেবের সাথে তার একটা ঐতিহাসিক বিরোধ। যে বিরোধের আগুন আজো শাইখুল হাদিসের সন্তানাদিসহ একটি ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি বিদ্যাপীঠকেও ধ্বংস করার জন্য হা করে ধেয়ে আসছে।
মুফতি সাহেব কমিটিকে বুঝাতে সক্ষম হন যে, রাজনীতির কারণে প্রতিষ্ঠানের চরম ক্ষতি হচ্ছে। ছাত্রদের পড়ালেখার খুব ক্ষতি হচ্ছে। এক পর্যায়ে কমিটির সহযোগিতায় শায়েখের প্রভাবকে খাটো করার জন্য প্রথমেই তাঁকে রাহমানিয়ার মুহতামিমের পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। শায়েখকে জাতীয় ব্যস্ততার কথা বলা হলে তিনি নিজেই ১৯৯৯ সালের ১ আগস্ট মুহতামিমের পদ থেকে অব্যাহতি নেন।
এরপর থেকে রাহমানিয়ার ভেতরে শায়েখকে নানাভাবে কোনঠাসা করে রাখার চেষ্টা চলতে লাগলো। যেমন, তাকে না জানিয়েই বড় বড় সিদ্ধান্ত নেয়া। তার মতের বিরুদ্ধে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ ইত্যাদি। এতে ভেতরে ভেতরে রাহমানিয়ায় দুইটা গ্রুপ তৈরি হয়ে গেলো। একটা মুফতি সাহেবের গ্রুপ; যারা রাজনীতি পছন্দ করে না। আরেকটা শাইখুল হাদিসের গ্রুপ; যারা শায়েখকে মনে প্রাণে ভালবাসে এবং রাজনীতি পছন্দ করে। বলে রাখা ভালো, রাজনীতি পছন্দ করার অর্থ এই না যে, মাদরাসার ভেতরে রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। বরং রাজনীতি পছন্দ করার অর্থ হলো, ইসলামের উপর যখন আঘাত আসে তখন যে যে অবস্থানেই থাকুক তাকে প্রতিবাদমুখর হতে হবে। এভাবেই ওই বছর শেষ হলো।
পরীক্ষাপরবর্তী রমজান মাসে, অর্থাৎ ২০০০ সালের ১১ জানুয়ারিতে শাইখুল হাদিসকে তার প্রাণের প্রতিষ্ঠানের সকল কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেয়া হলো। এবং এই সিদ্ধান্ত হলো তাকে অনুপস্থিত রেখে। ঈদের পর ডাকযোগে তার কাছে সেই নোটিশ পাঠানো হয়। এটা ছিলো মুফতি সাহেব ও তৎকালিন কমিটির সবচে বড় ভুল। এরপর শাইখুল হাদিসেকে ছাড়াই নতুন বছর শুরু হলো। কিন্তু ছাত্ররা তো শাইখুল হাদিসকে চায়। তাই ফেবরুয়ারির ৫ তারিখে ছাত্রদের অনুরোধে জামিয়ার অন্যতম মুরুব্বি আল্লামা নুরুদ্দিন গহরপুরী রহ. এর অনুরোধে শাইখুল হাদিস সাহেবকে শুধুমাত্র বোখারী শরীফের দরস প্রদানের অনুমতি দেয়া হয়। তিনি শুধু আসতেন। এসে বুখারীর দরস দিয়ে চলে যেতেন।
নিজের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানে এভাবে তিনি পরবর্তী ৬ মাস অপরাধীর মতো আসতেন এবং চলে যেতেন। এটা ছিলো শাইখুল হাদিসের ভক্তদের জন্য অসহ্য বেদনার। ভেতরে তখন এমন একটা অবস্থা ছিলো যে, শাইখুল হাদিসের পক্ষে একটি কথাও বলা যেতো না। কোনো শিক্ষক মিটিংএ এসব বললে তার প্রতি বাঁকা চোখে তাকানো হতো। জায়গায় জায়গায় মুফতি সাহেবের গোয়েন্দা লাগানো থাকতো। যাদেরকেই সমস্যা মনে করা হতো তাদেরকেই বহিস্কার করে দেয়া হতো।
এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্ররাই সোচ্চার হয়ে উঠে। ২০০০ সালের জুলাই মাসের ১ তারিখ রাতে দাওরায়ে হাদিসের ছাত্রদের নেতৃত্বে চারদফা দাবি নিয়ে ছাত্ররা ক্লাস বর্জনের ডাক দেয়। তাদের দাবি ছিলো, ক) শাইখুল হাদিস সাহেবকে আবার মুহতামিমের পদসহ যথাযথ মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে হবে। খ) মুফতি মনসুরুল হক সাহেব ও মুফতি হিফজুর রহমান সাহেবকে মাদরাসা থেকে বের হয়ে যেতে হবে। গ) সিনিয়র চার উস্তাদ ও ২৪ জন ছাত্রকে ফিরিয়ে আনতে হবে। ঘ) জামিয়ার বর্তমান কমিটি বিলুপ্ত করতে হবে।
এ অবরোধ ছিলো একান্তই ছাত্রদের ভেতর থেকে। এখানে শায়েখ পরিবারের পরোক্ষ কোনো উসকানী ছিলো না। এটা আমি অবরোধের আমির মাওলানা জামিল ভাই এর কাছ থেকে জেনেছি।
কঠোর হস্তে ছাত্রদের এই অবরোধ দমন করা হয়। ১৬ জন ছাত্রকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়। এবং ৫৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এবং এক সপ্তাহের জন্য মাদরাসা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এই এক সপ্তাহের মধ্যেই মাদরাসাকে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়।
এরপর আর শাইখুল হাদিস সাহেব ও তার অনুসারীদের রাহমানিয়ায় থাকার কোনো সুযোগ থাকে না। তাই বাধ্য হয়ে শাইখুল হাদিস সাহেব তার জন্য নিবেদিতপ্রাণ ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে নতুন মাদরাসা খোলার সিদ্ধান্ত নেন। মোহাম্মদপুরের কুবা মসজিসিদ ও নুর মসজিদে অস্থায়ীভাবে সেই মাদরাসার দরস শুরু হয়। শাইখুল হাদিস সাহেব রাহমানিয়া থেকে বের হয়ে গিয়ে নতুনভাবে রাহমানিয়া হাকিকিয়া প্রতিষ্ঠা করেছেন এ সংবাদে রাহমানিয়া ভবনের ভেতর থেকে অনেক ছাত্র শিক্ষক এখানে চলে আসেন। এভাবেই জমে ওঠে জামিয়া রাহমানিয়া হাকিকিয়া।
হাকিকিয়ার সময়টাতেই দেশে ঘটে যায় বিশাল পরিবর্তন। আওয়ামী শাসনের মেয়াদ শেষ প্রায়। দুই হাজার সালের ১ জানুয়ারি আদালতে ফতোয়া নিষিদ্ধ করা হয়। গর্জে ওঠেন মুফতি আমিনি। আন্দোলনকে বৃহৎ রূপ দেন শাইখুল হাদিস ও খতিব উবায়দুল হক রহ.। ২ ফেবরুয়ারি পল্টনে মহা সমাবেশ হয়। ৩ তারিখ মুহাম্মদপুরে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। বিক্ষোভে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার এক পর্যায়ে এক পুলিশ নিহত হয়। অসংখ্য ছাত্র গ্রেফতার হয়। ৪ ফেবরুয়ারি হরতাল পালিত হয়। এ দিনেই প্রেফতার হন শাইখুল হাদিস সাহেবে ও মুফতি আমিনি সাহেব। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছয়জন শহিদ হন। সারা দেশের আলেম সমাজ তওহিদী জনতার উপর নেমে আসে জুলুসের অক্টোপাস। আর রাহমানিয়া থেকে রাজনীতি ও শাইখুল হাদিস সাহেবকে বের করে দিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন মুফতি মনসুরুল হক সাহেবরা।
এ সময় জামিয়া রাহমানিয়া হাকিকিয়া চলে যায় বসিলিা ঘাটার চর। টিনের ছাপড়ার নিচে শ্যাঁতসেঁতে মাটির বিছানায় দেড় বছর এখানেই কাটে এ দেশের জাতীয় রাজনীতির মাঠ গরম করা কিছু তরুণ আলেম ও ইলম পিপাসু ছাত্রদের।
এরই মধ্যে ক্ষমতার পালা বদল হয়। আর রাহমানিয়া থেকে বহিষ্কৃত এক ফেরারী ও জেলবন্দী শাইখুল হাদিস হয়ে উঠেন ক্ষমতার পালাবদলের মূল প্রভাবক শক্তি। অক্টোবরে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসে। শাইখুল হাদিস জেল থেকে ফিরে আসেন আগের চেয়ে বহুগুণ প্রভাব নিয়ে। হাকিকিয়ার সেই শ্যাঁতসেঁতে কাঁদামাটিতে কষ্ট করতে থাকা তার ভক্তদের কথা তিনি ভুলে যাননি। কিন্তু এটাও তিনি চাননি যে, তিনি আবার জোরপূর্বক রাহমানিয়ায় ফিরে যাবেন। বরং এদেরকে নিয়েই নতুন করে ভালো কোনো জায়গায় যাওয়ার ইচ্ছাই তার ছিলো। কিন্তু স্মৃতিকাতর ছাত্র জনতা ও এলাকাবাসী বিশেষত মুফতি শহিদুল ইসলাম সাহেব ও স্থানীয় প্রশাসনের ঐকান্তিক ইচ্ছায় আবারো তারা নিজেদের আসল জায়গায় ফিরে গিয়েছিলেন।
২০০১ সালের ৩ নভেম্বর আসরের আগ মুহূর্তে বার্ষিক পরীক্ষা চলাকালিন সময়ে তারা রাহমানিয়া ভবন নিজেদের দখলে নেন। ছাত্রদেরকে এখতিয়ার দেয়া হয়, যারা ইচ্ছা থাকতে পারে। তাদেরকে কিছুই বলা হবে না।
হ্যাঁ, ভবনে ঢুকার সময় হাকিকিয়ার কষ্টকর জীবন অতিবাহিত করে আসা এবং দীর্ঘদিন শাইখুল হাদিসকে তার জামিয়ায় অপরাধী ও জিম্মি করে রাখা মানুষগুলোকে দেখে হয়তো কোনো কোনো উৎসাহী তরুণ দরজা জানালা ভাঙচুর করেছে। যদি লুটতরাজ ও হামলা উদ্দেশ্য হতো তাহলে আরো মারাত্মক হতাহতের ঘটনা ঘটতো। কিন্তু তা ঘটেনি। মুফতি মনসুরুল হক সাহেব ও তার অনুসারীদেরকে সম্মানের সাথেই বিল্ডিং থেকে বেরে করে নিরাপত্তার সাথে বাসায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে।
[বি.দ্র. : এ ধরণের কোনো কিছু লিখার ইচছা আমার একেবারেই ছিলো না। কিন্তু গত দুই দিনের বিভ্রান্তিকর নানা পোস্ট ও কমেন্টের কারণে মনে হলো, আমার জানা বিষয়গুলো অন্তত লিখে রাখা দরকার। আমি ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর‌্যন্ত আট বছর রাহমানিয়ায় কাটিয়েছি। এখানের প্রতিটি ইট বালুর সাথে আমার স্মৃতি। এখানের প্রতিটি সকাল সন্ধ্যা আমাকে হাতছানি দেয়। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই আমার জানা দু চার কথা লিখলাম। তথ্যগত ভুল থাকলে অবশ্যই ধরিয়ে দিবেন। ]

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved ©2020 jubokantho24.com
Website maintained by Masum Billah