রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন

এত সহজেই ভেঙ্গে পড়লে কি চলবে হে বন্ধু!

  • সৈয়দ শামছুল হুদা
পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমরা অভ্যস্ত নই। মুসলমানদের ওপরে কত ঝড়-ঝাপটা গিয়েছে সে সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই ধারণা নেই। আমরা মনে করি, আমরা কত ভালো কাজ করছি। আমাদের কেন সমালোচনা হবে? আমাদের পেছনে কেন শয়তানি শক্তি এত ষড়যন্ত্র করে? আমরাতো কাউকে কষ্ট দিই না। আমরা তো কারো বাড়া ভাত কেড়ে নিই না। কাউকে গালি দিই না। আমরা মাদ্রাসার গন্ডি থেকেও বের হই না। তাহলে আমাদের নিয়ে এত মাথাব্যাথা কেন কিছু মানুষের?
আমরা সামান্য বিপদ দেখলে অস্থির হয়ে যাই। ভেঙ্গে পড়ি। এটা ঠিক নয়। আমি অতীতে অনেকের সামনে অনেকবার বলেছি, কওমী মাদ্রাসার এখন সোনালী যুগ চলছে, যে কোন সময় ঝড় আসতে পারে। একটি অনুষ্ঠানে আমি ফটোজার্নালিস্টেও বলেছিলাম। আমার পরিস্কার মনে আছে। আমরা সোনালী সময় পার করছি। হকপন্থী মানুষ, সংগঠন, ব্যক্তি, দল সোনালী সময় খুব বেশি পার করতে পারে না। নানা বিপদ আসবেই। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, আমরা এমন একটা অবস্থায় বিরাজ করছি, বিপদ যে আসতে পারে, তখন আমার করণীয় কী হবে, সে সম্পর্কে আমাদের মধ্যে কোন আলোচনা হয় না। আমরা সুখে থাকতে দুখের অনুভূতি বুঝার চেষ্টা করি না।
আজ গোটা কওমী মাদ্রাসার ওপরে এক ধরণের মরুঝড় এসে গেছে। এটা আমরা কেউ টের পাচ্ছি, কেউ উদাসীন হয়ে আছি। অনেক গভীর থেকে এ ঝড় শুরু হয়েছে। প্রতীকি কিছু ব্যক্তিকে আমরা এখন আক্রমন করে কথা বলছি। লেখালেখি করছি। সামান্য কিছু মানুষ প্রতিবাদ করছে। বিশাল একটা অংশ এখনো বুঝতেই পারছে না যে, কওমী মাদ্রাসায়ও নৈতিক বড় ধরণের অধঃপতন নিরবে ঘটে গেছে। এর পরিচালনা পদ্ধতি, শিক্ষার মান, সমাজ ও রাষ্ট্রের সাথে এর সমন্বয় সাধন ইত্যাদি ক্ষেত্রে বড় ধরণের বিপর্যয় হয়ে গেছে। এখনো কিছু মানুষ চাচ্ছে আগুনকে ছাইচাপা দিয়ে ঢেকে রাখতে। এটা যে ঠিক নয়, এটা এখনো বুঝতে পারছে না।
কিছু মানুষ সামান্য বিপর্যয় দেখে এতটাই মুষড়ে পড়েছে, যে কারণে এখনই স্টেটাস দিচ্ছে- কওমী মাদ্রাসা না থাকলে কী কী ক্ষতি জাতির হবে। অর্থাৎ সামান্য আঘাতেই ধরে নিচ্ছে যে, হায়! হায়! আমরাতো শেষ! আগামীতে যে আরো বড় ঝড় অপেক্ষা করছে সেটা নিয়ে ভাববার মতো শক্তিও অনেকের নেই। কেউ কথা বললে তাকেই অপরাধী মনে করা হচ্ছে। কিন্তু হাজারো সমস্যা দেখেও না দেখার ভান করে, কিছু মানুষ এগুলো দেখে সহ্য করতে না পেরে আড়ালে চলে যাচ্ছে। বিশেষকরে কওমী মাদ্রাসাসমূহে অর্থনৈতিক লেন-দেনে বড় ধরণের বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। এটা সরলতার কারণে হয়েছে। কিছু মানুষের অতি চালাকির কারণে হয়েছে। এ ছাড়া পরিচালনাগত দুর্বলতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এ থেকে উত্তরণ কীভাবে ঘটবে সেটা বের করার জন্য অবশ্যই আগে সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে। পর্যালোচনা করতে হবে। তারপর সমাধান দিতে হবে।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা পর্যালোচনাকে খুব ভয় পাই। ভিন্নমতকে আমরা কোনরকম সহ্য করতে পারি না। নিজে অপরাধ করেও অন্যের মতকে খন্ডাতে হাজারো যুক্তি দাঁড় করাতে পারি। কিন্তু নিজের দুর্বলতাকে দূর করতে কোন রকম পদক্ষেপ গ্রহনকে সহনীয়ভাবে নিই না। সময়ের সাথে তাল মিলিয়েই শুধু নয়, আমাদেরকে সবসময় চলমান সময় থেকেও অগ্রসর হয়ে থাকতে হবে।
কওমী অঙ্গনে চিন্তার দুর্বলতা, ভারসাম্যের দুর্বলতা, পরমতসহিষ্ণুতার দুর্বলতা বিরাজমান। স্পর্শকাতরতা, অতিপ্রতিক্রিয়াশীলতা খুব কঠিনভাবে বিদ্যমান। এসব কাটিয়ে উঠার জন্য এখনো দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে কোন আয়োজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। যে কারণে নতুন প্রজন্ম কিছু শুনলেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে। বড়রাও হিমশিম খাচ্ছে কোন সমস্যার কী সমাধান তা করতে।
এজন্যই আমি সকলের কাছে অনুরোধ করবো, কওমী মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ যে সকল সমস্যা দীর্ঘ দিন ধরে বিরাজমান, সে সকল বিষয়ে সংস্কার আনতে ঘরোয়াভাবে সোচ্চার হোন। যারাই এসব সমাধানে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াবে, তাদের বিরুদ্ধে রুঁখে দাঁড়ান। হয় সমাধান নয় ধ্বংস। কিন্তু অন্যায়ের সাথে কোন আপোষ নয়। এক্ষেত্রে এটাও স্মরণ রাখতে হবে, আপনার একার দৃষ্টিতে যেটা সমস্যা, সেটা আর দশজনের কাছে সমস্যা মনে নাও হতে পারে। সে জন্য আগে সমস্যা নিয়ে আলোচনা করুন। পর্যালোচনা করুন। সমাধান কী সেটা ঠিক করুন। তারপর কার্যকর করতে সম্মিলিতভাবে পদক্ষেপ গ্রহন করুন।
আমাদের সমস্যা হলো, আমরা ছোট ঘটনায় খুব বড় প্রতিক্রিয়া দেখায়। আবার বড় বড় অপরাধ দেখলেও অনেক সময় নীরবতা অবলম্বনকে সাধুতা মনে করি। কোন সমস্যাটা জাতীয়, কোন সমস্যাটা উম্মাহর জন্য ক্ষতিকর, আর কোন সমস্যাটা একান্তই ব্যক্তিগত তা যদি বুঝতে না পারেন তাহলে আপনি কিছুই করতে পারবেন না। জাতীয় ইস্যুতে আপনার নীরবতা যদি কোন বিষয়ে ক্ষতির কারণ হয় তাহলে এই ক্ষেত্রে নীরব থাকা আপনার জন্য হারাম হয়ে যাবে। আমরে বিল মা’রুফ এবং নেহি আনিল মুনকার এটা শুধু বাইরের জগতের জন্য না। নিজেদের জন্যও। নিজেদের আঙ্গিনাতেও।
কওমী মাদ্রাসা জগতে আমি মনে করি, বর্তমানে যে সংস্কারের আওয়াজ উঠেছে, সেটাকে দক্ষতার সাথে কাজে লাগাতে বর্তমান সময়ের চিন্তাশীল মানুষদের দায়িত্ব রয়েছে। নিজেকে আড়াল করে শুধু নীরব দর্শকের ভূমিকায় দাঁড় করিয়ে না রেখে আমি অনুরোধ করবো সচেতন আলেম সমাজের কাছে, আপনারা দয়াকরে এ মুহুর্তে এগিয়ে আসুন। ভালো মানুষকে ভালো জায়গায় বসানোর ব্যবস্থা করুন। আপনাদের মাথার ওপর কাঠাল ভেঙ্গে খাবে কিছু অযোগ্য, অদক্ষ মানুষ তা হতে পারে না।
আমাদের প্রতিটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে রক্ষার দায়িত্ব আমাদের। এগুলো নিয়ে কথা বললেই সে এসব প্রতিষ্ঠানের শত্রু এটা মনে করা যাবে না। কারা এসব প্রতিষ্ঠানের শত্রু, আর কারা হিতাকাঙ্খী হিসেবে সমালোচনা করে, পরামর্শ দেয়, সেই পার্থক্যই যদি আমরা করতে না পারি, তাহলে আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো ধরে রাখতে পারবো না।
কোন জাতীয় প্রতিষ্ঠানে বরকতান কোন পদ রাখা যাবে না। যোগ্য, মেধাবী, কর্মক্ষম লোক খুঁজে বের করতে হবে। তাদেরকে উপযুক্ত পদ্ধতিতে বাছাই করে বের করে আনতে হবে। এজন্য তরুনদের পক্ষ থেকে একটি এ্যকশন কমিটি হতে পারে। তারা বড়দের সামনে কারা যোগ্য, কারা যোগ্য না, তা তুলে ধরবে। জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে লোক নিয়োগ প্রক্রিয়া হবে স্বচ্ছ পদ্ধতিতে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে, নিয়োগ কমিটির মাধ্যমে লোক বাছাই করতে হবে। বড়রা এ বাছাই কম্যটি করবেন। নিজেরা বড় চেয়ারে বসে যাবেন না। উদ্যমী লোকদের হাতে জাতীয় প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দিতে হবে।
সর্বোপরি, আমরা যেভাবে পরস্পরকে ঘায়েল করার ঘৃন্য মানসিকতা লালন করি সেই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আমাদের ভিতরে সেই নোংরা সংস্কৃতি ঢুকে গেছে যে সংস্কৃতি চর্চা করে বর্তমান সরকার ধারাবাহিক ৩টার্মে ক্ষমতা চালিয়ে যাচ্ছে। পছন্দ না হলেই যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতা বিরোধী আর রাজাকার বলা একটা জাতীয় ব্যাধি। এমনিভাবে কোন একজন কবি কবিতার একটি লাইনে কী বলেছে, সেটাকেই জাতীয় সমস্যার মতো বড় আকারে দেখা এগুলো পরিহার করতে হবে। এগুলো যে প্রতিহিংসা থেকে করা হয় সেটাও বুঝি।
ইতিহাসের কঠিন অধ্যায় গুলো পড়ুন। মুসলমানদের ওপর বড় বড় বিপর্যয়গুলো নেমে আসার পুর্বাপর পরিস্থিতিগুলো পর্যালোচনা করুন তাহলেই চোখ খুলে যাবে। বিশেষকরে আব্বাসী খেলাফতের পতন, চেঙ্গিসখানের ভূমিকা, উসমানী খলিফাদের উত্থান ও পতন, ভারতবর্ষে মুসলমানদের উত্থান- পতন ইত্যাদি বিষয়গুলো চোখের সামনে রাখা দরকার।
আর এ কথাটিও মনে রাখা দরকার যে, বর্তমান কওমী শিক্ষার সিলেবাস একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়। একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিকদের উপযোগী শিক্ষা নিয়েও আমাদের চিন্তা করতে হবে।
জেনারেল সেক্রেটারি
বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট বিআইএম

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved ©2020 jubokantho24.com
Website maintained by Masum Billah