রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ০৩:২৯ অপরাহ্ন

জামিআ রাহমানিয়া প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও মালিকানা সংক্রান্ত ইতিহাস এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট

  • মুফতি দেলওয়ার বিন গাজি
মালিকানা দাবি করে সরকারের সহায়তায় দখল করে নেওয়া হলো ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিআ রাহমানিয়া!
আমরা সবাই জানি যে, ওয়াকফ সম্পত্তির কোন ব্যক্তি মালিকানা থাকেনা।
সুতরাং দখল করে মালিকানা বুঝিয়ে দেয়ারও প্রশ্ন আসে না।
অথচ আজ প্রশাসন এই অনিয়মটিই করলো!
বাংলাদেশের বড় বড় সকল মাদরাসাই কোন না কোন বড় আলেম প্রতিষ্ঠা করেছেন জনগণের দান করা জমির উপর।
প্রতিষ্ঠাতার নামেই মানুষ মাদরাসাকে চিনে এবং এটাই বাস্তবতা।
জামিআ রাহমানিয়াও তেমন একটি বড় মাদরাসা।
শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহঃ যখন লালবাগ মাদরাসা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার জন্য মোহাম্মদপুরে জমি খোঁজতে থাকেন তখন শাইখুল হাদীস সাহেবের নাম শুনে দাতা হিসেবে এগিয়ে আসেন জনাব মোহাম্মাদ আলী, নূর হোসেন ও সাবেদ আলী প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।
দুটি দলিলমূলে তারা জামিআ রাহমানিয়ার জন্য জায়গা ওয়াকফ করে দেন। একটি হলো, ১০ কাঠার (দলিল নং ৩৭৭১/৮৮) অপরটি হলো ৬ কাঠার (দলিল নং ৩২০০/৮৯)।
ওয়াকফ দলিলে যা লেখা ছিল:
——————————————
“জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া সাত মসজিদ মাদরাসার বরাবরে আল্লাহর ওয়াস্তে ওয়াকফ করিতেছি। অদ্য হইতে উল্লেখিত মাদরাসাকে উক্ত সম্পত্তির স্বত্ব দান করিয়া আমরা চিরতরে নিঃস্বত্ববান হইলাম। উক্ত সম্পত্তি নিষ্কণ্টক অবস্থায় ওয়াকফ করিয়া দিলাম। এই সম্পত্তি মাদরাসা কমিটি পরিচালনা করিবে। মাদরাসা কমিটি আমাদের নামের স্থানে রাজস্ব অফিসে নাম জারি করিয়া খাজনাদি পরিশোধ করিবেন। এবং উহা মাদরাসার কাজে যদিচ্ছা ভোগ দখল ব্যবহার করিবেন। ইহাতে আমাদের বা আমাদের ওয়ারিশগণের ওজর-আপত্তি চলিবে না। করিলেও তা সর্ব আদালতে অগ্রাহ্য হইবে।”
এখানে মুতাওয়াল্লির কোন কথা নেই, আছে পরিচালনা কমিটির কথা যা শাইখুল হাদীস রহঃ এর নির্দেশনায় গঠন হয়েছে এবং তিনি ছিলেন এই কমিটির অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ও জামিআর প্রতিষ্ঠাতা।
আর দেশব্যাপী তার পরিচিতি, প্রভাব ও উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীস বিশারদ হওয়ার কারণে এমনটিই হবার কথা। অন্য কেউ তার উপর ছড়ি ঘুরাবে তা কল্পনা করা যায় না।
শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহঃ প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মাদরাসার অবকাঠামো ও একাডেমিক কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যান এবং তাঁর আস্থাভাজন ছাত্র মুফতী মানসূরুল হক দাঃবাঃ এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ আঞ্জাম দেন।
মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব দেন তৎকালীন খেলাফত আন্দোলনের একাংশের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আব্দুল গাফফার সাহেবকে।
ওয়াকফ দলিলের ভিত্তিতে তৎকালীন জয়েন্ট স্টক কোম্পানী নিবন্ধিত গঠনতন্ত্রে জামিয়া রাহমানিয়ার ১০ সদস্য বিশিষ্ট প্রথম যে পরিচালনা কমিটি ছিল তার মধ্যে ৫ জনই ছিলেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিজ্ঞ আলেম।
যথা:
১. প্রতিষ্ঠালগ্নে রাহমানিয়ার প্রধান মুরুব্বি হিসেবে ‘শাইখ’ পদে ছিলেন শাইখুল হাদীস রহ.। পাশাপাশি তিনি তখন ছিলেন খেলাফত আন্দোলনের একাংশের সভাপতি। অতঃপর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস প্রতিষ্ঠার সময় অভিভাবক পরিষদের চেয়ারম্যান এবং পরবর্তীতে দীর্ঘকাল তিনি এ সংগঠনের আমীর ছিলেন।
২. রাহমানিয়ার প্রিন্সিপাল ছিলেন মাওলানা আব্দুল গাফফার সাহেব। পাশাপাশি তখন তিনি ছিলেন খেলাফত আন্দোলনের একাংশের সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের আমীর।
৩. কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন মাওলানা ইসহাক সাহেব। সেই সাথে তিনি ছিলেন তৎকালীন খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির। এবং বর্তমানেও তিনি খেলাফত মজলিসের আমীরের দায়িত্ব পালন করছেন।
৪. কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন হাফেজ মুজাম্মেল সাহেব। তিনিও ছিলেন খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নির্বাহি সদস্য।
৫. কমিটির সদস্য ছিলেন মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ। তিনিও ছিলেন খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নিবার্হি সদস্য।
উল্লেখযোগ্য যে, প্রথম পরিচালানা কমিটির ১০ জনের মধ্যে মুফতী মানসূরুল হক দাঃবাঃ ছিলেন না। তবে শায়েখের তত্ত্বাবধানে জামিআর জন্য তার খেদমত অনস্বীকার্য। এক কথায় তিনি ছিলেন শায়েখের ডান হাত।
মাদরাসা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য:
————————————-
জয়েন্ট স্টক কোম্পানী নিবন্ধিত গঠনতন্ত্রের ধারা নং ৩ এর (ক)তে রয়েছে
” কুরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে দারুল উলুম দেওবন্দের অনুকরণে একটি বেসরকারি অবৈতনিক জাতীয় জামিয়া প্রতিষ্ঠা করা। যা দ্বীনের হেফাজত, ইলমে দ্বীনের প্রসার ও সুন্নতে নববীর বাস্তবায়নে সহায়ক হইবে। এবং এমন ধরনের জিহাদের অনুপ্রেরণা সম্পন্ন আলেম তৈরি করিবে যারা দেশ জাতি ও ইসলামের জন্য আত্মউৎসর্গ করিতে সর্বদা নিবেদিত প্রাণ থাকিবে।”
ধারা নং ৩ এর (ছ)তে রয়েছে
“মুসলিম মিল্লাতের ঈমান-আকায়েদ এবং দ্বীন ও ইসলামের পরিপন্থি নাস্তিক্যবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতা, শিরিক, বিদআত ইত্যাদির বিরুদ্ধে জিহাদ অব্যাহত রাখা, আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকারের মাধ্যমে শিরক, বিদআত ইত্যাদি সমাজ থেকে উৎখাতের জন্য সচেষ্ট থাকা।”
}} উপরোক্ত ইতিহাস ও তথ্যের ভিত্তিতে এবার আপনি বলুন –
১.ওয়াকফ সম্পত্তির মালিকানা দাবি করা যায় কি না?
২. অরাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জামিআ প্রতিষ্ঠা হয়েছে এমন দাবি করার কোন প্রমাণ আছে কি না?
৩. প্রতিষ্ঠাকালীন জামিআর প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা আজিজুল হক রহঃ কে অরাজনৈতিক ব্যক্তি বলার সুযোগ আছে কি না?
৪. কেউ যদি এরকম অসার দাবি তুলে অস্থিরতা তৈরী করে সাজানো একটি এলমি মারকায দখল করে নেয় তা বৈধ হবে কি না?
উল্লেখ্য যে, শাইখুল হাদীস রহঃ রাজনৈতিক ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও জামিআ রাহমানিয়ায় ছাত্র রাজনীতির অনুমতি দেননি এবং শেষ সময়(২০২১ইং)পর্যন্ত দেশের অন্য কওমী মাদরাসাগুলোর মতই দলীয় রাজনীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি পরিচালিত হয়ে আসছে।
শায়েখের কাছে ছাত্রদের লেখা-পড়া, আমল আখলাক ছিল সবার আগে। এরপরও শায়েখের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উত্থাপন করা মানে কোন অভিসন্ধি আছে।
তবে নিষিদ্ধ থাকলেও দেশের বহু প্রতিষ্ঠানে কিছু ছাত্র গোপনে ছাত্র রাজনীতি করে সেটা ভিন্ন কথা। আর এজন্য সে সকল প্রতিষ্ঠানে কোন তুলকালাম কাণ্ডও ঘটেনা।
অবশ্য ঈমানী আন্দোলনে অন্য মাদরাসার মত জামিআর ছাত্র শিক্ষকগণও অংশগ্রহণ করতেন, কারণ মাদারিসে কওমীয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য এটি। আর শাইখুল হাদীস রহঃ এর মত ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান ঈমানী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করবে না এটা কি কল্পনা করা যায়?
শায়েখের মত মুফতী মানসূরুল হক সাহেবও বলতেন, দ্বীনের হার তাকাযা পুরা করার জন্য এই জামিআ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এখন প্রণিধানযোগ্য কথা হলো, তৎকালীন সময়ে আল্লামা আজিজুল হক রহঃ ছিলেন সারা বাংলার অবিসংবাদিত ইসলামী রাজনৈতিক নেতা।
আর তিনি একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবেই এই জামিআ প্রতিষ্ঠা করেছেন যদিও নিজ প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের দলীয় রাজনীতির অনুমতি দেননি। এখন ‘রাজনৈতিক ব্যক্তি হওয়ার কারণে মাদরাসাকেও রাজনৈতিক বানিয়ে ফেলছেন’ আওয়াজ তুলে অন্যরা তাকে তারই মাদরাসা থেকে সরিয়ে দেবে এটা কি হাস্যকর নয়?
অথচ ২০০০ সনে তাই করেছিল তারা। নিজের গড়া প্রতিষ্ঠান থেকে শায়েখকে বের করে দিয়েছিল।
জামিআর ছাত্ররা শায়েখকে স্বপদে বহাল করাসহ ৪টি দাবিতে আন্দোলন করলে ছাত্রদেরকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে মামলা করা হয়। ১৬ জন ছাত্রকে গ্রেফতার করে কারাগারেও পাঠানো হয়!
এবার আপনি বলুন দেড় বছর পর ২০০১-এ যখন শায়েখ জামিআ রাহমানিয়ায় আবার ফিরে আসবেন, তখন কি সেই অন্যায়কারী কমিটিকে বহাল রাখা সম্ভব?
অবধারিতভাবেই শায়েখ কমিটিতে পরিবর্তন এনেছেন এবং অনিয়মকারীদের বাদ দিয়ে সুষ্ঠ পরিচালনার স্বার্থে কমিটিতে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
আর এটাই স্বাভাবিক। এখন মাদরাসা ও কমিটি থেকে বহিষ্কৃত সেই সদস্যরা যদি বলে যে, শাইখুল হাদীস সাহেব তাদেরকে বের করে দিয়ে অবৈধভাবে মাদরাসা দখল করে নিয়েছেন, তাহলে বক্তব্যটা কতটা হাস্যকর হয়ে দাঁড়ায়!?
এখন আবার সুযোগ পেয়ে প্রতিষ্ঠার ৩৪ বছর পর এসে প্রমাণ ছাড়া বলছেন যে, মাদরাসা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল রাজনীতিমুক্ত লেখা পড়া আর এজন্য শায়েখের সন্তান মাওলানা মামুনুল হক ও মাহফুজুল হক রাজনৈতিক ব্যক্তি ও অবৈধ দখলকারী হওয়ার কারণে তাদের থেকে মাদরাসা দখলমুক্ত করবেন!
এটা চরম উদ্দেশ্য প্রণোদিত কথা ছাড়া আর কী হতে পারে ??!
তাঁরাত যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজ পিতার প্রতিষ্ঠিত বৈধ আমানত সুচারুরূপে পরিচালনা করছিলেন!
মাওলানা মাহফুজুল হক সাহেবকে মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করেছিল শায়েখের হাতে গড়া সেই পরিচালনা কমিটি।
প্রথম পরিচালনা কমিটিও শায়েখের ছিল। কমিটি থেকে বাদ গিয়েছিল শুধু অভিসন্ধিকারীগণ।
২০ বছর পর সরকারি আনুকূল্য পেয়ে অভিসন্ধিকারীগণ সেই একই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কথা বলে নিজেদের বৈধ মালিকানা দাবি করা আর জামিআ দখল করা কতটা যৌক্তিক?
এভাবে সাজানো একটি বাগান দখলের দ্বারা দ্বীনের কোন তাকাযা পূরণ হয় নাকি অস্থিরতা সৃষ্টি হয়?
আর জনগণ ভাল করেই জানে যে, শায়েখের পরিবারকে চাপে রাখতে সরকার উদ্দেশ্যমূলকভাবেই দখলদার নতুন কমিটিকে সহায়তা করছে। প্রয়োজন মনে করলে দখলদার কমিটিকে আবার সরকারই সরিয়ে দেবে।
এখন এটাকে আমরা কী করে বৈধ দখল আর বৈধ কমিটি বলি??
জাতির কাছে জামিআর ফুযালাবৃন্দের জিজ্ঞাসা।
তবে যাদের কাছেই জামিআর পরিচালনার দায়িত্ব থাকুক, শাইখুল হাদীস রহঃ এর এই আমানত যেন অক্ষত থাকে, ভাল থাকে এ মুহূর্তে সেটাই প্রত্যাশা।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved ©2020 jubokantho24.com
Website maintained by Masum Billah