বৃহস্পতিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:১৫ অপরাহ্ন

কওমী মাদরাসায় ‘রাজনীতি নিষিদ্ধ’ অযৌক্তিক ও নিছক ইলহামী: মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক

কওমী মাদরাসায় রাজনীতি নিষিদ্ধ করা যে অযৌক্তিক তার কারণসমূহ-

১. হাইআতুল উলয়ার কমিটি বানানো হয়েছে পরীক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সিদ্ধান্তের জন্য। কওমি মাদ্রাসার দেড় শত বছরের চলে আসা মৌলিক নীতির পরিবর্তন করার তাদের কোন অধিকার নেই। তারপরও তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। এটা যুক্তিতে আসেনা।

২. তারা জানেন দেশে অনেক বিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম রয়েছেন তারপরও তারা কোনো পরামর্শ সভা আহবান না করে তড়িঘড়ি করে ইসলামি রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছেন। এই সিদ্ধান্ত যুক্তিতে আসে না।

৩. সমস্যা হলো হেফাজতের প্রোগ্রামে। অথচ হেফাজতের সংগঠন করতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে তারা নিষিদ্ধ করলেন ইসলামি রাজনীতি। ব্যাপারটা ওয়াসওয়াসিল খান্নাসের মত হয়ে গেল। যা কোনভাবেই যুক্তিগ্রাহ্য নয়।

৪. রাজনৈতিক স্বভাব ও জঙ্গি স্বভাব ভিন্ন। রাজনৈতিক স্বভাব হলো , জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে মিটিং মিছিল করা। যা একটি গণতান্ত্রিক দেশের সুনাম ও সৌন্দর্য। আর জঙ্গিদের স্বভাব হলো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড করে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করা। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে তারা মাদরাসায় জঙ্গি সংগঠন নিষিদ্ধ না করে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করলেন। ব্যাপারটা কি সন্দেহজনক নয়? এতে তাদের জঙ্গি সঙ্গঠনের সাথে সম্পর্কের আভাস পাওয়া যায়।

৫. সম্প্রতি হেফাজতের কর্মসূচির কারণে সমস্যা হল বি-বাড়িয়া, হাটহাজারী ও চট্টগ্রামরোডে। মজার বিষয় হল এই তিন স্পটের কোন মাদরাসা রাজনীতির সাথে জড়িত নয়। অথচ হাইআতের ধারক-বাহকরা গায়ে পড়ে ইসলামি রাজনীতি নিষিদ্ধ করলেন। ব্যাপারটা “সফতার ডাক্তার” এর চিকিৎসার মত হয়ে গেল ।

৬. বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতি করে পাঁচটি দল
১) জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। যার রাজনৈতিক আন্দোলনে ১৯০ বছরের গোলামী থেকে উপমহাদেশ স্বাধীন হয়।
২) খেলাফত আন্দোলন।
৩) ইসলামী আন্দোলন।
৪) বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ ও
৫) খেলাফত মজলিশ বাংলাদেশ।
এই পাঁচটি দল তার জন্মলগ্ন থেকে খুবই শান্তি শৃঙ্খলার সাথে রাজনৈতিক প্রোগ্রাম পালন করে আসছে। কোন পার্টি কখনও কোন ধ্বংসাত্মক কাজ করেনি৷ এর কোন নযিরও নেই। তারপরও হেফাজতের অপরাধকে জোরপূর্বক নিরপরাধ রাজনৈতিক দলগুলোর উপর চাপিয়ে দেয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ধরণের জালিমানা আচরণ ইসলাম বিদ্বেষীরা করতে পারে। কিন্তু উলামায়ে কেরাম এই অবৈধ কাজটা করলেন কেমন করে? ব্যাপারটা যুক্তিতে আসেনা।

৭. যেসব জায়গায় এসব অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে সেখানে অধিকাংশ ছেলেরা অরাজনৈতিক ছিল। এদের মধ্যে অপরাদের সাথে জড়িত যারা তারা যে, রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পর্ক রাখে তা
হাইআতের হুজুররা বুঝলেন কোন ওহির
মাধ্যমে? তাদের কি জানা নেই
.ولا تقف ماليس لك به علم ان السمع والبصر والفؤاد كل اولئك كان عنه مسؤلا.

৮. হেফাজতের ঘটনাবলিকে অন্যের উপর চাপানোর যখন তাদের খাহিশ হলো, তখন এই অবাস্তব কাজটা ছাত্রলীগ ও জঙ্গি সংগঠনের উপর না চাপিয়ে ইসলামি রাজনৈতিক দলের উপর চাপানোর আগ্রহ তাদের কেন হলো? বিষয়টি রহস্যজনক…..।

৯. রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের ঘোষণার দ্বারা হাইআতের উলামারা সরকার ও জনগনকে বুঝাতে চেয়েছেন যে, এই ইসলামি দলগুলো সর্বদা এইসব ধ্বংসাত্মক কাজ করে থাকে। তাই ঐদিনের অপ্রিতিকর ঘটনা তারাই ঘটিয়েছে। অতিতের পত্রিকার আলোকে তাদের ঘোষণার ভিত্তি শতভাগ মিথ্যা।
اياك والظن فان الظن اكذب الحديث

১০. দেশে ইসলামি রাজনীতি করেন মাদরাসার উলামারা, তাদেরকে রাজনীতি থেকে বিরত রাখার অর্থ হচ্ছে দেশে যেন ইসলাম মায়নাস রাজনীতি চলতে থাকে সর্বদা, আর ইসলামি দাবি-দাওয়া রাজপথে যেন না হয় কখনো। তাতে হাইআতের উলামাদের প্রশান্তি লাভের ব্যাপারটা যুক্তিতে আসেনা মোটেই।

১১. রাজনীতির মাধ্যমে ১৯০বছরের গোলামী থেকে দেশ স্বাধীন হলো।রাজনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। রাজনীতির মাধ্যমে ফতোয়া
নিষিদ্ধ আইন বাতিল হলো। এতে হায়্যাতের উলামারা এতো ক্ষিপ্ত কেনো ?

১২. সুবর্ণজয়ন্তীকে কেন্দ্র করে পুলিশ কুড়িজন লোক শহিদ করলো, কিন্তু হাইআতের হুজুররা এই শহিদানদের প্রতি কোন শোক প্রস্তাব , পুলিশের প্রতি নিন্দা প্রস্তাব এবং সরকারের কাছে বিচারের দাবী করার কোন প্রয়োজন মনে করেননি। তাঁরা যে-কোন বাহানায় ইসলামি রাজনীতি বন্ধ করার প্রয়োজন মনে করেছেন। ব্যাপারটা নিশ্চয়ই কোনো
আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ বিশেষ।

১৩. ছাত্রসমাজের ইসলামি জযবা ও আবেগের বিকাশের এক বৈধ প্লাটফরম ইসলামি রাজনীতি। তা থেকে তাদেরকে বাধাগ্রস্ত করে হাইআতের হুজুররা তাদেরকে জঙ্গি সংগঠনের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, যেভাবে সরকার ১৮ বছরের পূর্বে মেয়েদের বিবাহ নিষিদ্ধ করে, ব্যভিচার ও ধর্ষণের দিকে সমাজকে ঠেলে
দিচ্ছে।

১৪. নাস্তিক-মুরতাদরা দেশে ইসলামি রাজনীতি চায় না, হাইআতের হুজুররা ইসলামি রাজনীতি নিষিদ্ধ করে তাদের আকাঙ্ক্ষা পুরণ করলেন। ولاتعاونواعلي الاثم والعدوا

১৫. ইসলামি রাজনীতি হলো রাষ্ট্রীয় আমর বিলমারূফ ও নহি আনিল মুঙ্কার। হাইআর হুজুররা খুচরা আমর ও নহিকে বৈধ রেখে রাষ্ট্রীয় ও আঈনী আমর ও নহিকে নিষিদ্ধ করলেন বিবেকের অভাবে।

১৬. ইসলামি রাজনীতি উলামাদের দ্বীনি দায়িত্ব, মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সংবিধানের দেয়া অধিকার। এই অধিকার থেকে সরকার ও
আমাদের কে বঞ্চিত করেনি। হাইআর হুজুররা এই অবৈধ পদক্ষেপ নিলেন কোন বিবেকে?
من قال مالاينبغي سمع مالايشتهي

১৭. পৃথিবীতে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘লীগ অফ নেশনস” প্রতিষ্ঠিত হয়২৭ টি দেশ নিয়ে ১৯১৯ সনে, দ্বিতীয় মহাযুদ্বের পর। অতঃপর আরো বড় পরিসরে জাতিসংঘ (U.N.O.) প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৯৪৫ সনে। কিন্তু দারুল উলূম প্রতিষ্ঠার ১২ বছরের মাথায় হযরত শাখুলহিন্দ, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ৬৭ বছর পূর্বে দারুল উলূম দেওবন্দের ছাত্র সংগঠন”ছামারাতুত্তারবিয়া” গঠন করেন ১৮৭৮ সনে। সে যুগে (যখন ইঞ্জিন চালিত যানবাহন আবিস্কার হয়নি) এই সংগঠনের শাখা গঠন করেন তিনি এশিয়া, আফ্রীকা ও ইরোপের মুসলিম দেশগুলোতে، আজাদী আন্দোলনের জন্য। এই আধুনিক পৃথিবীতে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠন করেন হযরত শায়খুল হিন্দ।

রাজনীতিতে এতো অগ্রসর” দারুল উলূম দেওবন্দের” আদলে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাগুলোতে রাজনীতি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়াটা ফিকরে দারুল উলূম দেওবন্দ সম্পর্কে অনবগতি ও দায়িত্বহীনতা বটে।

১৮. মুসলিম বিশ্বে দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধু শিক্ষার ময়দানে বিচরণ করে। আর দারুল উলূম দেওবন্দ দ্বীনি শিক্ষা সংরক্ষণের সাথে সাথে দেশ ও জাতির সংরক্ষণ ও তার অগ্রগতির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই সমাজনীতি ও রাজনীতি কওমি উলামাদের প্রোগ্রামের অবিচ্চেদ্য অংশ।

১৯. কারী তায়্যিব সাহেব বলেছেন-
دارالعلوم ديوبند.جامع درايت وروايت،
عقل ونقل ،جلوت وخلوت ، ديانت وسياست…. كانام هى.
অর্থাৎ দারুলউলুম দেওবন্দ , দেরায়ত ও রেওয়ায়ত, আকল ও নকল, জালওয়াত ও খালওয়াত, দিয়ানত ও সিয়াসত এর সংমিশ্রণের নাম।

হাইআর হুজুররা দেওবন্দিয়্যাত কী? তা না জানার কারণে এই অগঠন ঘটালেন।

২০. উলামায়ে কেরাম রাজনীতিতে অংশ নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে যদি সক্ষম হন এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায় কিছু দ্বীনি কাজ হয়, (যা সব সরকারের আমলে হয়েছে) তাতে হায়্যার হুজুরদের সমস্যা কী?

২১. চার-দলীয় জোট সরকারের সময় “মওদূদী সাহেবের রচনাবলিকে” রেফারেন্স বুকের লিস্ট ভুক্ত করা হয়। তখন উলামাদের রাজনৈতিক দলগুলো তার বিরুদ্বে আন্দোলন করে। যার ফলে মওদূদী সাহেবের বই প্রত্যাহার করা হয়। তখন হাইআর হুজুররা কোথায় ছিলেন? মাদরাসা আর মুরিদান তাদের কর্ম ক্ষেত্র, জাতীয় কাজে তাদেরকে কখনো পাওয়া যায়নি।

২২. ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের পরিবর্তন চায়। ব্যাকডোরে সরকার পতনের মানসিকতা রাজনৈতিক দল লালন করেনা। ব্যাকডোরে সরকার পতনের মানসিকতা লালন করে হাইআর উলামাদের মত অরাজনৈতিক সংগঠন। তাই তারা বৈধ সংগঠনকে নিষেধ করে، অবৈধ সংগঠনকে অপেন রাখলেন। ব্যাপারটা রহস্যজনক ও রং মনসিকতা বটে।

২৩. জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাথে সম্পর্কিত কিছু ছাত্র কোনো কোনো হুজুরদের খাদেম হয়ে থাকে, তারা সব সময় হুজুরের যেহেন বানানোর চেষ্টা করে। আমার মনে হয় এমন কোনো হুজুর, হাইআর সদস্য, যিনি গণতন্ত্রকে কুফুরী মনেকরেন, তাই রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যেন জঙ্গি সংগঠনের কাজ করতে মাদরাসাগুলোতে কোনো বাধা না থাকে।

২৪. হাটহাজারী মাদরাসার ছাত্র -শিক্ষক ও জামেয়া ইউনুসিয়ার শিক্ষক -শিক্ষার্থি রা অরাজনৈতিক, তারা কোন রাজনীতির সাথে জড়িত নয়। হেফাজতের আন্দোলনে সমস্যা হলো এই দুই মাদরাসার এলাকায় কিন্তু হায়্যাতের হুজুররা এই দুই মাদরাসার ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত না নিয়ে সারাদেশের কওমি মাদরাসায় রাজনীতি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন কোন বিবেকে? দেশের কওমি মাদরাসাগুলো কী অপরাধ করেছিল?! তাদের এই সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই রহস্যজনক। তাদের পেছনে মনে হয় কোনো মানহাজীর হাত রয়েছে। তাদের এই প্রোগ্রাম সামনে আরো অগ্রসর হবে, দ্বিতীয় ধাপে কোন মাদরাসায় রাজনৈতিক কোন ওস্তাদ থাকতে পারবেনা, তৃতীয় ধাপে কোন মাদরাসায় রাজনৈতিক কোন ওস্তাদ থাকলে তারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে
না। এভাবে তারা বিশ্বায়নের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবেন। এই সিদ্ধান্ত যদি কোনো বাতিলের পক্ষ
থেকে অথবা সরকারের পক্ষ থেকে হতো তাহলে কওমি উলামারা রাজপথে আন্দোলন করতো। অনেক মাদরাসায় রাজনীতি নিষিদ্ধ তাতে কোন সমস্যা নেই, কিন্তু যারা রাজনীতি করতে চায় তাদেরকে রাজনীতি থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা অন্যায় ও কওমি মাদরাসার আদর্শ বিরোধী।

লেখক: রাজনীতিক, ইসলামি গবেষক ও শিক্ষাবিদ

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved ©2020 jubokantho24.com
Website maintained by Masum Billah