বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর ২০২১, ০৬:১৫ অপরাহ্ন

শিরোনাম:
বন্ধ করে দেয়া হলো খার্তুম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পাকিস্তানে বিদ্রোহীদের সাথে সংঘর্ষে ৪ পুলিশ সদস্য নিহত কথিত প্রগতিশীলদের বাধা: যুক্তরাজ্যের প্রোগ্রামে যেতে পারেননি মাওলানা আজহারী কবরে থেকেও মামলার আসামি হাফেজ্জী হুজুরের নাতি নরসিংদীতে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ৩০ আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনীতিকদের সঙ্গে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক প্রথমবারের মতো ক্যামেরার সামনে আসলেন মোল্লা ইয়াকুব আজ বন্ধ হতে পারে অনেকের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট এখন শেখ হাসিনার অলৌকিক উন্নয়নের গল্প শোনানো হচ্ছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাবজি খেলতে দেয়ার প্রলোভনে শিশুদের বলাৎকার করতেন স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা

গেল বিশ বছর দুই রাহমানিয়ার সম্পর্ক কেমন ছিল?

মাওলানা এহসানুল হক

রাহমানিয়া দখলের এক সপ্তাহ হতে চললো। দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি করা এই ঘটনার আগে পরে, পক্ষে বিপক্ষে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক লেখালেখি হয়েছে। উভয় পক্ষের কিছু মানুষের কথার্বাতা দেখে মনে হবে, কতই না বিরোধী আর বিদ্বেষ লালন করেছে দুই পক্ষ। কিন্তু বাস্তবতা কি? মাত্র ত্রিশ গজ ব্যবধানে থাকা বিপরীতমুখী দুটি প্রতিষ্ঠান এতকাল কি সংঘাত করেই পার করেছে? অনেক কথাই মনে পড়ছে।

রাহমানিয়ায় আমার দরস ছিল আছর পর্যন্ত। এজন্য প্রায় দিনই বিকাল বেলা আমার মাদ্রাসায় থাকা হতো। সময়টা কাটতো রাহমানী পয়গাম অফিসে। লেখালেখি ও সম্পাদনার টুকটাক কাজ করতাম। বিকালের এই ছুটির সময়টায় আশপাশের মাদ্রাসা থেকে অনেক ছাত্রই আসতো। কেউ আসতো পত্রিকা কিনতে। কেউ আসতো নবীন কাফেলার সদস্য হতে। কোন মাদ্রাসা থেকে আসছো এটা জিজ্ঞেস করার পর আমাকে হতবাক করে দিয়ে অনেকেই বলতো ‘ঐ রাহমানিয়া থেকে আসছি, অথবা বলতো জামিয়াতুল আবরার থেকে আসছি’ ব্যাপার আমার কাছে ভীষণ ভালো লাগতো।

ঐ রাহমানিয়ার উস্তাদদের সাথে প্রায়ই মুখোমুখি হতাম। আদবের সাথে সালাম দিতাম। একদিনের কথা মনে পড়ে। মাওলানা আব্দুল হামিদ সাহেব হুজুরের সাথে দেখা। আমি সালাম দিতেই হুজুর মুসাফাহার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন, আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, হুজুর কি আমাকে চিনেন, তিনি বললেন, তোমাকে চিনবো না? তোমাকে ছোটকালে কত কোলে নিছি।আমার বোনের নাম ধরে জিজ্ঞেস করলেন ও কেমন আছে? মুফতি সাহেব হুজুর ও আব্দুল হামিদ সাহেব আমাদের বাসায় অনেক দিন থেকেছেন।(সেই গল্প আরেক দিন) আমার ধারণা ছিল, তিনি আমাকে চিনেন না, এতকাল আগের কথা হয়তো মনে নাই। কিন্তু না, তিনি মনে রেখেছিলেন, বিষয়টা ভালো লাগার ছিল।

বলতে চাইলে এমন আরও অনেক গল্পই বলা যাবে। ব্যক্তিগত কথা বলা উদ্দেশ্য না, সম্পর্কের মাত্রাটা একটু দেখাতে চাই। পাশাপাশি বিপরীতমুখী দুই মাদরাসা এতকাল চলেছে, উভয় মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের প্রতিদিন বারবার মুখোমুখি হতে হয়েছে, কোনো দিন কোনো ঝামেলা হয়নি, গন্ডগোল হয়নি। প্রথম দিকে কিছু উত্তেজনা হয়তো ছিল, কিন্তু সময়ের ব্যবধানে মানুষ ভুলতে বসেছিল এত আগের বিরোধ। এর পিছনে অবশ্য কিছু মানুষের অবদান আছে। সেটা হয়তো সবাই স্বীকার করবে না। সবার স্বীকার করা জরুরিও নয়। কয়েকটা পয়েন্ট বলি।

রাহমানিয়া থেকে বের হওয়ার পর তারা রাহমানিয়ার একেবারে নাকের ডগায় একই নামে প্রতিষ্ঠান করেছেন। একবারের জন্য কেউ বাধা দেয়নি। মাহফুজ সাহেবদের বক্তব্য ছিল, একই নামে কত প্রতিষ্ঠান সারা বাংলাদেশে আছে। তারা যে নাম ইচ্ছা ব্যবহার করুক, আমাদের আপত্তি নাই। এরপর তারা মাদরাসার ক্যালেন্ডারে ২০ বছর এই রাহমানিয়ার ছবি ব্যবহার করেছে। তাতেও কেউ বাধা দেয়নি। এখন পরিস্থিতি আমাদের প্রতিকূল হলেও তখন কিন্তু অনূকুলই ছিল। ২০০১ সালে শাইখুল হাদীস রহ. যখন রাহমানিয়ায় ফিরে আসেন। তখন চারদলীয় জোট ক্ষমতায়। তিনি জোটের শীর্ষ নেতা। তখন মাহফুজ সাহেবরা বাঁধা দিলে তারা এখানে কিছুই করতে পারতো না।

রাহমানিয়া থেকে গত বিশ বছরে কত ধরনের প্রকাশনা বের হয়েছে। প্রতি মাসে রাহমানী পয়গাম বের হয়েছে। বিশ বছরে কত শত প্রোগ্রাম হয়েছে। কোথাও ঐ রাহমানিয়ার কারো বিপক্ষে বিষোদগার করা হয়েনি। তাদের বিপক্ষে কখনোই কিছু বলা হয়নি, কিছু লিখাও হয়নি। চাইলে কি লেখা সম্ভব হতো না? তাদের বাৎসরিক স্মারক পয়গামে সুন্নতে প্রতি বছর এসব লেখা হতো। কিন্তু মাহফুজ সাহেব বলতেন, এসব প্রকাশনার বিপক্ষে আমরা পাল্টা কিছু প্রকাশ করলে বিরোধ আরও বাড়বে। সেটার প্রয়োজন নেই। এক সময় থেমে যাবে। ঠিকই এক পর্যায়ে পয়গামে সুন্নতে এসব লেখা বন্ধ হয়ে যায়।

মহিউস সুন্নাহ আল্লামা শাহ আবরারুল হক সাহেব রহ. যখন বাংলাদেশ সফরে আসলেন। ঐ সময়ের কথা। সন তারিখ মনে নাই। তখন তিনি উভয় রাহমানিয়াতেই এসেছিলেন। মুহাম্মাদপুরে এসে তিনি প্রথমে ঐ রাহমানিয়ায় যান। এরপর তিনি আমাদের মাদরাসায় আসেন। শাইখুল হাদীস রহ. তখন অনেকটা অসুস্থ, হাটুতে ব্যথা ছিল। এজন্য হাটু ভেঙ্গে বসতে সমস্যা হতো। তাসত্বেও তখন তিনি আবরারুল হক রহ. এর সম্মানে ঐ রাহমানিয়ায় গিয়েছেন। হাটু গেড়ে মাটিতে বসে বয়ান শুনেছেন।

মুফতি সাহেব হুজুরের এর ছেলে যখন শাহাদাৎ বরণ করলেন তখন রমজান মাস ছিল। বেজোড় রাত্রিতে আমাদের বাসায় খতম চলছিল, খতম শেষে মাহফুজ সাহেব দোয়া করলেন, এবং বিশেষভাবে মুফতি সাহবে হুজুরের ছেলের জন্য দোয়া হলো। মুফতি সাহেবের পরিবারের জন্য দোয়া হলো। কথাগুলো এখনো আমার কানে বাজে। শাইখুল হাদীস রহ. সহধর্মিণী, আমাদের নানী মুফতি সাহেবের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে তাদের বাসায়ও গিয়েছিলেন। অথচ এর কিছুদিন আগে শায়েখের ইন্তেকালের পর যখন শবদেহ রাহমানিয়া প্রাঙ্গনে আনা হয়, তখন মাওলানা হিফজুর রহমান সাহেবসহ ঐ রাহমানিয়ার আরও অনেকেই এসেছেন। জানাযায় শরিক হয়েছেন। হিফজুর রহমান সাহেব হুজুর বাসায় গিয়েও দেখা করেছেন। কিন্তু মুফতি সাহেব হুজুর আসেননি। এবং জানাযাতে শরিক হয়েছেন এমন কোনো নিশ্চিত তথ্যও আমাদের কাছে নেই।

তাদের মাদ্রাসার একজন মুহাদ্দিস যখন গ্রেফতার হলেন, তখন আমাদের উস্তাদদের মধ্যেও পেরেশানি দেখেছি। মাহফুজ সাহেব তাদের সাথে কথা বলতে ইব্রাহীম হেলাল সাহেব এর বাসায় গেছেন। মুহাম্মাদপুর থানায় গিয়ে হুজুরের সাথে দেখা করেছেন। সাধ্যমত সহযোগিতার চেষ্টা করেছেন।

এভাবেই ধীরে ধীরে সময়ের ব্যবধানে দূরত্ব কমে আসছিল। এখন এক রাহমানিয়ার ছাত্র আরেক রাহমানিয়ায় ভর্তি হতো, আমাদের মাদরাসার অনুষ্ঠানে ঐ মাদরাসার ছাত্ররা দলবেধে আসতো। তাবলিগের দু-পক্ষের আন্দোলনের সময় উভয় রাহমানিয়ার ছাত্ররা এক সাথে কাজ করেছে। একবার কোনো এক কারণে তাবলিগের এক পক্ষ তাদের উপর ক্ষিপ্ত হয়েছিল। জামিয়া আবরারের উপর হামলা করবে এমন সংবাদ ছড়িয়ে ছিল৷ উত্তেজনাকর সেই সময়ে ঐ রাহমানিয়ার একজন উস্তাদ মাওলানা আশরাফুজ্জামান সাহেবকে ফোন দিলেন, অপর প্রান্তের কথাগুলো শুনার সুযোগ হয়নি। তবে আশরাফুজ্জামান সাহেব বলছিলেন, আপনাদের উপর কোনো বিপদ আসলে আমরা সবার আগে আপনাদের পাশে থাকবো।

এই ছিল আমার দেখা উভয় মাদরাসার সম্পর্কের সংক্ষিপ্ত চিত্র। বিছিন্ন দু’একটি ঘটনা থাকতে পারে। সেটা অস্বীকার করছি না। তবে সৌহার্দ্য ও সুন্দর সম্পর্কের আরও অনেক ঘটনাই আছে। এই মূহুর্তে মনে থাকা কয়েকটা বললাম। এসব কারণেই যখন হেফাজত নেতাদের উপর ক্রাকডাউন শুরু হলো, মামুন সাহেবসহ অনেকেই গ্রেফতার হলেন, বিভিন্ন মাদ্রাসায় অব্যাহতি ও বহিষ্কারের ঘটনা ঘটছিল, তখন অনেকেই আমাকে রাহমানিয়ার কথা জিজ্ঞেস করতো, রাহমানিয়া দখলের সম্ভবনা আছে কিনা জানতে চাইতো।

আমার উত্তর ছিল একটাই- আলেম উলামাদের এই কঠিন সময়ে তারা এই কাজ করবে না। মামুন সাহেব কারাবন্দী, আরও অনেকেই ফেরারী এমন সময়ে তারা এই কাজ করার কথা না। মুফতি সাহেব চাইলেও উনার আশপাশের লোকজন বাঁধা দিবে, এটা হবে না। কিন্তু আমার সব ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। রাহমানিয়া এবং শাইখুল হাদীস রহ. এর পরিবারের এই কঠিন সময়ে ভবন দখলের সুযোগ তারা হাতছাড়া করেনি। কয়েকটি অডিও ফাঁস হওয়ায় ‘প্রশাসন বাধ্য করছে’ এজাতীয় কথাও ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। এটাকে আমাদের দুর্ভাগ্যই বলতে হয়।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved ©2020 jubokantho24.com
Website maintained by Masum Billah