শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:৫৮ পূর্বাহ্ন

ভূমধ্যসাগরীয় গ্রেট গেম: কে এগিয়ে ম্যাক্রোন নাকি এরদোগান?

করোনা কালে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশ সমূহে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনটি হয়েছে তা হচ্ছে তিউনিশিয়ায় অভ্যুত্থান। তিউনিশিয়ায় সহিংস বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী হিচেম মেচিচি’কে বরখাস্ত করে পার্লামেন্ট স্থগিত করে দেন প্রেসিডেন্ট কায়েস সাঈদ। এর মাধ্যমে ক্ষমতা হারায় রশিদ ঘানুশির আননাহদা সরকার। এই অভ্যুত্থানের ফলে শুধু রশিদ ঘানুশির আননাহদা পার্টি পরাজিত হয়নি সাথে পরাজয় অনুভব করতে হয়েছে ভূমধ্যসাগরের অন্যতম স্টেক হোল্ডার এরদোগানের তুরস্ককেও।
না হয় ধরে নিলাম, রশিদ ঘানুশি ও এরদোগান দুজনেই তিউনিশিয়ায় পরাজিত কিন্তু বিজয়ী কে এখানে? খালি চোঁখে মনে হবে তিউনিশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বা ইসলামের বিরুদ্ধ শক্তির বিজয় হয়েছে। তবে মধ্য প্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার (MENA) রাজনীতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বুঝা যাবে এ বিজয় এ অঞ্চলের নতুন খেলোয়াড় ফ্রান্সের।

ভূমধ্যসাগরীয় রাজনীতিতে উত্তর আফ্রিকার দেশ মিসর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া ও মরোক্কোর গুরুত্ব অপরিসীম। মুসলিম ব্রাদারহুডের জন্মভূমি মিসর সিসির নেতৃত্বে ফ্রান্সের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অপরদিকে ব্রাদারহুডের আদর্শপুষ্ট রশিদ ঘানুশির তিউনিসিয়া ছিল এরদোগান বা তুরস্কের ঘনিষ্ঠ মিত্র। লিবিয়ায় হাফতার বাহিনীর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ফ্রান্স ও আমিরাত। অন্যদিকে জিএনএ সরকারকে বিজয়ী শক্তি হিসেবে সামনে নিয়ে আসে তুরস্কের গেম চেঞ্জার বায়রাখতার ড্রোন। আলজেরিয়ার ঝোঁক পূর্ণ মাত্রায় তুরস্কের দিকে থাকলেও পার্শ্ববর্তী দেশ মরোক্কোর পথ ভিন্ন। সেই ভিন্নতা আরও সুদৃঢ় হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে (৮ সেপ্টেম্বর’২১) সে দেশের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুড পন্থী জাস্টিজ এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির সরকারের বিপুল ব্যাবধানে পরাজয়। এবার এ পার্টি মাত্র ১৩ টি আসনে জয় লাভ করে যা গত নির্বাচনের (২০১৬) চেয়ে ১১২ টি আসন কম। তুরস্কের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মরোক্কো ও তিউনিসিয়াতে পরাজয় ভূমধ্যসাগরীয় আধিপত্যে ফ্রান্সকে অনেকদূর এগিয়ে রাখবে।

এ বছরের ২৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে লিবিয়ার সাধারণ নির্বাচন। লিবিয়ায় জিএনএ সরকার বিজয়ী হলে জয়ী হবে তুরস্ক। এ নির্বাচনে খলিফা হাফতার জয়ী হলে বিলীন হয়ে যেতে পারে এরদোগানের ভূমধ্যসাগরীয় স্বপ্ন। এ অঞ্চলে রাষ্ট্রক্ষমতায় মুসলিম ব্রাদারহুড ও এর সমমনা দলের পরিসর যেভাবে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হচ্ছে এ ধারা যদি লিবিয়াতেও অব্যাহত থাকে তাহলে রাজনৈতিক দল হিসেবে মুসলিম ব্রাদারহুড যেমনি প্রশ্নবৃদ্ধ হবে তেমনি সারা দুনিয়ায় পলিটিক্যাল ইসলামও প্রশ্নবানে জর্জরিত হবে।

খলিফা হাফতারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ী হয় জিএনএ সরকার। এর মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন এসে মিলিত হয় ঘনিষ্ঠ মিত্র জিএনএ শাসিত লিবিয়ার এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের সাথে। যে কারনে মধ্য প্রাচ্যের কিছু দেশ তুরস্ক-লিবিয়ার বিপক্ষে অবস্থান করেও চাইলেই তারা অনেককিছুই করতে পারছেনা এখন। সিরিয়া, ইসরাইল ও মিসর সামুদ্রিক বানিজ্যে একটি ট্রাপে আটকা পড়ে আছে। এ সমস্ত দেশ এর আগে তুরস্ককে বাইপাস করে গ্রিসসহ ইউরোপীয় অন্যান্য দেশের সাথে বিভিন্ন চুক্তিতে আবদ্ধ হলেও কার্যত কোন ভূমিকা পালন করতে পারছে না এখন।

সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে উঠে পড়ে লেগেছে সিসির মিসর। মিসর কয়েকটি কারনে তুরস্কের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে চেষ্টা করছে। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কারন দুইটি। একটি হচ্ছে তুরস্ক ও লিবিয়া কর্তৃক ভূমধ্যসাগরে যে ফাঁদ পেতে রাখা হয়েছে সেখান থেকে নিজেদের পরিত্রাণ পাওয়া। এবং অপরটি হচ্ছে এ অঞ্চলে তুরস্ক কর্তৃক মুসলিম ব্রাদারহুড ও এদের অঙ্গ সংগঠনের প্রতি সহযোগিতা ও সহমর্মিতা বন্ধ করে দেয়া। কিন্তু এর মাধ্যমে মিসরের কাছে তুরস্ক কি আবদার করতে পারে? তুরস্কের আবদারের মধ্যে প্রথমেই থাকবে মিসর যেন খলিফা হাফতারের বাহিনীকে সকল ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়। কারন এর আগে ফ্রান্স ও আমিরাত মিসরকে ব্যাবহার করে খলিফা হাফতার ও তার বাহিনীকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছিল। যে কারনে বেশি বেগ পেতে হয়েছিল তুরস্ককে।

ইতোপূর্বে ভূমধ্যসাগরীয় তীরবর্তী উত্তর আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি দেশের মধ্যে কার্যত তিনটিই হাতছাড়া তুরস্কের। এরদোগানের হাতে রয়েছে আংশিক লিবিয়া ও আলজেরিয়া। আলজেরিয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও তুরস্কের নিকট এর গুরুত্ব বহাল থাকবে লিবিয়ায় আধিপত্যের মাধ্যমে। লিবিয়া হারালে হারিয়ে যেতে পারে আলজেরিয়াও। সেই সাথে হারিয়ে যেতে পারে ভূমধ্যসাগর কেন্দ্রীক এরদোগানের সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন।

শফিউল আলম শাহীন
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved ©2020 jubokantho24.com
Website maintained by Masum Billah