বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১, ০৩:৩৫ পূর্বাহ্ন

হিন্দু ডাক্তারকে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী রহিমাহুল্লাহুর ইসলামের দাওয়াত

একবিংশ শতাব্দীর আপোষহীন মনিষী আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী রহিমাহুল্লাহু। হাদীসের মসনদে তিনি ছিলেন একজন যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, ইসলাম বিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে ছিলেন রাজপথে ব্যাঘ্র কণ্ঠে হুংকার ছুঁড়া একজন বীর সিপাহসালার। লিখনীর ময়দানে কলম হাতে ছিলেন একজন তেজস্বী লেখক আর দাওয়াতের ময়দানে ছিলেন নিষ্ঠাবান একজন উম্মাহ দরদী দাঈ। দেশ ও জাতীর ক্লান্তিলগ্নে নানা ফিতনায় জর্জরিত দিশেহারা এ উম্মতের ব্যথায় সবসময় তিনি পেরেশান থাকতেন।

দীর্ঘদিন আল্লামা বাবুনগরী রহিমাহুল্লাহু সাহচর্যে থেকে আমি দেখেছি, তাঁর অন্তরে উম্মতের প্রতি আলাদা একটা জ্বলন ছিলো। সাধারণ মানুষও কিভাবে ইসলামের বিধান মতো, দ্বীনের উপর চলতে পারে তা নিয়ে তিনি ভাবতেন। দৈনিক শত শত মানুষ সাক্ষাৎ ও দুআ নিতে আসতো। আল্লামা বাবুনগরী (রহ.) প্রত্যেককে তার অবস্থা অনুযায়ী নসিহত করতেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, সুন্নতী লেবাস পোষাক পরিধান, দাঁড়ি রাখা, পরিবারের সদস্যদের দ্বীনের উপর পরিচালনা করা, সুদি লেনদেন থেকে বেঁচে থাকা ইত্যাদির সম্পর্কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলতেন।

অনেক সময় আমরা বলতাম যে, হযরত! দৈনিক এতো মানুষের সাথে কথা বললে আপনি তো অসুস্থ হয়ে যাবেন। উত্তরে আমাদেরকে বলতেন- দূরদূরান্ত থেকে আল্লাহর বান্দারা আমার কাছে আসে। এটা আমার জন্য সৌভাগ্য। এই সুযোগে যদি আমি তাদেরকে দ্বীনের কিছু কথাও বলতে না পারি তাহলে আল্লাহ তায়া’লার কাছে কি জবাব দেবো ?

শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে পুরো সপ্তাহ নিয়মিত ক্লাস করাতেন। আবার অবসর সময়ে মুসলিম উম্মাহর ঈমান আকিদা রক্ষায় ওয়াজ-নসিহত করে বেড়াতেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যেতেন। হযরতের শুভাকাঙ্খীরা প্রায় সময়ই বলতেন যে, হযরত! নিয়মিত সবক পড়ানো, মাদরাসার বিভিন্ন দায়িত্ব পালন, আগন্তুকদের সাথে সাক্ষাৎ ইত্যাদি ঝামেলার পর আবার রাতের ঘুম আর বিশ্রাম নষ্ট করে ওয়াজ নসিহতের এই লং সফরে তো আপনার শারীরিক দূর্বলতা দিনদিন আরো বেড়ে যাচ্ছে। জেলা শহর বা বিভাগীয় শহরগুলোতে কোন প্রোগ্রাম হলে আপনি সেটাতে যাবেন। থানা শহর বা গ্রামেগঞ্জের ছোটখাটো মাহফিলের প্রোগ্রামে আপনি না যাওয়াটা ভালো হবে। হযরত বলতেন, ছোট-বড় কোন কথা নয়। বর্তমান সময়ে ওয়াজ- মাহফিলগুলো দাওয়াতের অন্যতম একটি প্লাটফর্ম। এই ওয়াজ-মাহফিলগুলোতে একসাথে বহু মানুষের নিকট দ্বীনের দাওয়াত পৌছানো যায়। তাই দ্বীন প্রচারের জন্যই শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও কষ্ট করে মাহফিলগুলোতে উপস্থিত হই।

দাওরায়ে হাদীস সমাপনী ছাত্রদেরকে নসিহত করে হযরত (রহ.) প্রায় বলতেন, চুক্তি করে ওয়াজ করবেন না। ওয়াজের জন্য টাকা পয়সার কোন ডিমান্ড দেখাবেন না। কোথাও ওয়াজের দাওয়াত পেলে সেটাকে গণিমত মনে করবেন। বর্তমান সময়ে ওয়াজের এই প্ল্যাটফর্মকে দাওয়াতের উর্বর ময়দান মনে করবেন। ভালোভাবে কুরআন হাদীস অধ্যয়ন আর গবেষণা করে ইসলামের সঠিক মর্মকথাটা জনসাধারণের কাছে পৌছে দেবেন।

হাটহাজারী আলিফ হসপিটালের জনৈক হিন্দু ডাক্তার টুকটাক চিকিৎসার জন্য মাঝেমধ্যে মাদরাসায় আল্লামা বাবুনগরী রহিমাহুল্লাহুর রুমে আসতেন। হিন্দু হলেও সেই ডাক্তার আল্লামা বাবুনগরী রহিমাহুল্লাহুকে যারপরনাই সম্মান এবং মুহাব্বত করতেন। ঐ হিন্দু ডাক্তার চিকিৎসার জন্য যখনি আল্লামা বাবুনগরী রহিমাহুল্লাহুর রুমে আসতেন বাবুনগরী রহিমাহুল্লাহু তাকে বিভিন্নরকমের নাস্তা করাতেন। টাকা দিতেন এবং সর্বশেষ তার নাম ধরে বলতেন- মুসলমান হয়ে যাও, মুসলমান হয়ে যাও৷ কখন মুসলমান হবা বলো আমাকে। মুসলমান হলে তোমার পূর্বকৃত সকল গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। মুসলমান না হয়ে শুধু আমাকে মুহাব্বত করলে হবে না।কালিমা পড়ো, ঈমান আনো,মুসলমান হও। মুসলমান হলে পরকালে শান্তি পাবা। মুসলমান না হলে মৃত্যুর পর কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।

ঐ ডাক্তারও আল্লামা বাবুনগরী রহিমাহুল্লাহুকে বলতেন, হুজুর! আপনি আমার জন্য দুআ করবেন। আমি মুসলমান হয়ে যাবো।

মুসলমান বানানোর জন্য ঐ ডাক্তারের সাথে আল্লামা বাবুনগরী (রহ.) আলাদারকম আন্তরিকতা ও মুহাব্বত দেখাতেন। ঐ হিন্দু ডাক্তারকে মুসলমান বানানোর জন্য তার সাথে আল্লামা বাবুনগরী রহিমাহুল্লাহু এতটাই হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, আমার মনে হয় আল্লামা বাবুনগরী রহিমাহুল্লাহু আর কিছুদিন জীবিত থাকলে দু’দিন আগপিছ সেই হিন্দু ডাক্তার মুসলমান হয়ে যেতো।

আল্লাহ তায়া’লা ঐ হিন্দু ডাক্তারকে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় দান করুন এবং আল্লামা বাবুনগরী রহিমাহুল্লাহুকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন আমিন।

লেখক:
H.M.Zunaid (জুনাইদ আহমদ)
খাদেম,আল্লামা বাবুনগরী (রহ.)
শিক্ষার্থী: দারুল উলুম হাটহাজারী।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved ©2020 jubokantho24.com
Website maintained by Masum Billah