বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১, ০৩:৫৪ পূর্বাহ্ন

দেশজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার মানচিত্র

যুবকন্ঠ ডেস্ক:

করোনা মহামারীতে দেশের তরুণ প্রজন্ম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। করোনা মহামারী শুরুর পর (৮ মার্চ ২০২০-৮ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত) সর্বমোট আত্মহত্যা করে ১৪ হাজার ৪৩৬ জন। এর মধ্যে ৩২২টি কেস স্টাডি করে দেখা যায়, আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে ৪৯ শতাংশই তরুণ-তরুণী। যাদের বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।

‘করোনায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মানসিক বিপর্যয় : একটি প্রায়োগিক জরিপ’-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে। বেসরকারি সংগঠন ‘আঁচল ফাউন্ডেশন’ এ জরিপ চালায়; সংগঠনটি তরুণদের মানসিক ভারসাম্য নিয়ে কাজ করে। তারা গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জরিপকালে দেশের ২ হাজার ৫৫২ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মতামত নেয়।

আঁচল ফাউন্ডেশনের জরিপে ঢাকা বিভাগ থেকে অংশগ্রহণকারীর হার সবচেয়ে বেশি। যা ১ হাজার ৪৮৪ জন (৫৮ দশমিক ২%)। দেখা যায়, মহামারীতে অধিকাংশ শিক্ষার্থী শহরেই অবস্থান করেন। এর মধ্যে ৭৭৪ জন গ্রামে আর বাকিরা শহরে ছিলেন। এ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২ হাজার ৩৮০ জন অবিবাহিত এবং ১৬২ জন বিবাহিত। ১০ জন তালাকপ্রাপ্ত। অংশগ্রহণকারীদের ৯৯৯ জন পুরুষ আর ১ হাজার ৫৫২ জন নারী। একজন তৃতীয় লিঙ্গের।

অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে উল্লেখসংখ্যক ২ হাজার ১২৫ জন ১৮ থেকে ২৩ বছর বয়সী। এর মধ্যে ১ হাজার ২৬ জন শিক্ষার্থী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৭৩৩ জন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানে আছেন ৫৮৭ জন। ৬২ জন মেডিকেল শিক্ষার্থী। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ১৩৬ জন। উচ্চ পর্যায়ের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৮ জন শিক্ষার্থী।

প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে, অংশগ্রহণকারীদের ২ হাজার ১৬০ জন (৮৪ দশমিক ৬%) মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হয়। ১৮ মাস ধরে চলা মহামারীতে ৯৮১ জন শিক্ষার্থী (৩৮ দশমিক ৪%) নিজে বা তার পরিবারের কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়। এ সময়ে করোনা আক্রান্ত ৮৮০ জন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হন। এ ছাড়া করোনায় আক্রান্ত না হয়েও ১২৮০ জন মানসিক সমস্যায় ভোগেন। মহামারীতে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবেই অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১ হাজার ৫৪১ জন শিক্ষার্থী অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে ছিলেন। এ ছাড়া একাকিত্বের কারণে ১ হাজার ৫৩৭ জন শিক্ষার্থী মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়েন। এদের মধ্যে ১ হাজার তিনজন শিক্ষার্থী লকডাউনে আশপাশের পরিস্থিতি ও থমথমে পরিবেশ এবং করোনা আক্রান্তের মৃত্যুর সংখ্যা জেনে মানসিক চাপে ছিলেন। ১ হাজার ৫৮ জন সেশনজটকে উদ্বেগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। ১ হাজার ২৮ জন টিউশনি চলে যাওয়া এবং আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অশান্তিতে ভোগেন। হীনমন্যতায় ভোগেন ৯৮৮ জন, করোনায় নিজে এবং পরিবার সংক্রমিত হওয়ার ভয়ে ছিলেন ৮৪৪ জন। এ ছাড়া পারিবারিক কলহের কারণে ৫০৭ জন, ক্লাস করার পর্যাপ্ত ডিভাইস না থাকায় ২৫৬ জন এবং পরিবার থেকে বিয়ের চাপের জন্য ২৫১ জনের মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে সম্প্রতি শিক্ষার্থী ও তরুণদের আত্মহত্যার পেছনে ওপরের কারণগুলো অন্যতম।

প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, মহামারীতে লেখাপড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন ১ হাজার ৯২৮ জন (৭৫ দশমিক ৫%) শিক্ষার্থী। এ সময় ১ হাজার ৩৬৫ জন শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষা নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।

এ সময় কর্মহীন ছিলেন ১ হাজার ৪১৮ জন শিক্ষার্থী। আবার কেউ কেউ টিউশনি, লেখালেখি, ব্যবসা, পার্টটাইম চাকরি, ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অর্ধেকের বেশি কর্মহীন ছিলেন। পড়ালেখার ক্ষেত্রে কোনো ব্যস্ততা না থাকায় শিক্ষার্থীরা অলস সময় কাটান, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী যথাসময়ে না ঘুমানোর ফলে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হন। ফলত তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বস্থ্যের ক্ষতি হয়। এ ছাড়া লকডাউনে ৩৬ দশমিক ৩% শিক্ষার্থী সাত-আট ঘণ্টার ওপর ভার্চুয়াল স্ক্রিনের সামনে থাকেন। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় সবাই দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে থাকায় মাথাব্যথা, মনোযোগ কমে যাওয়া, অনিদ্রার সমস্যার সম্মুখীন হন। এ কারণে ৫৬ দশমিক ৩%-এর মাথাব্যথা, ৫১% এর ঘুমের সমস্যা, ৩৩ দশমিক ১%-এর চোখের সমস্যা, ৩৮ দশমিক ২% এর অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, ঘাড়, হাত ও পিঠের ব্যথা ৩০ দশমিক ৪% এর, ৩০ দশমিক ৪ শতাংশের ওজন বৃদ্ধি, ২১ দশমিক ৭% এর পারিবারিক দূরত্ব বেড়ে যাওয়া, ৫৯ দশমিক ৭% এর মনোযোগ বা স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার সমস্যা হয়। মহামারীতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ২ হাজার ১৬০ জন মানসিক সমস্যায় ভোগেন। শহরে অবস্থানরত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক বেশি হারে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী সবচেয়ে বেশি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়েন। এ ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৯১ জন বা ৮০ দশমিক ৬ শতাংশ মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হন। এ সময় ১ হাজার ৪১৮ জন কর্মহীন শিক্ষার্থীর ১২১৮ জন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হয়। অর্থাৎ বেকারত্ব মানসিক সমস্যা বাড়িয়ে দেয়।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved ©2020 jubokantho24.com
Website maintained by Masum Billah