বৃহস্পতিবার, ৩০ Jun ২০২২, ০৬:৩৭ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনামঃ

ঘণ্টায় হাসপাতালে আসছেন ৬০ জন ডায়রিয়া রোগী

দেশে গত কিছু দিন যাবত ডায়রিয়ার প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ডায়রিয়া রোগীর চাপ সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)। প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৬০ জন রোগী ভর্তি হচ্ছেন বিশেষায়িত হাসপাতালটিতে।

শনিবার (৯ এপ্রিল) আইসিডিডিআর,বির গণসংযোগ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ৪৩ হাজারেরও বেশি ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হয়েছেন৷ এর মধ্যে মার্চ মাসে ভর্তি হয়েছেন ৩০ হাজার ৫০০৷ আর চলতি মাসে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ৩০০’র বেশি রোগী এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন৷ ৮ এপ্রিল ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৩৮২ জন৷ এখন প্রতি ঘণ্টায় ওই হাসপাতালে প্রায় ৬০ জন রোগী ভর্তি হচ্ছেন৷

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে, চলতি বছরে দেশে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তিন লাখেরও বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন৷ কতজন মারা গেছেন সেই তথ্য নেই সংস্থাটির কাছে। তবে মহাখালী কলেরা হাসপাতালেই ২৯ জন মারা গেছেন বলে জানা গেছে।

কলেরা হাসপাতালের প্রধান ডা. বাহারুল আলম সংবাদমাধ্যমকে জানান, ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর হাসপাতালের সামনে দুটি আলাদা তাঁবু করা হয়েছে৷ দুটি তাঁবুতে মোট শয্যা ১৫০টি৷ আর হাসপাতালে আছে ৪৫০টি৷ আরও কিছু রোগীকে অতিরিক্ত বেড করে জায়গা দেয়া হচ্ছে৷ এখন হাসপাতালে সার্বক্ষণিকভাবে কমপক্ষে ৬৫০ জন ডায়রিয়া রোগী ভর্তি থাকছেন৷

হাসপাতালের প্রধান বলেন, ‘প্রতি দিন এক হাজার ৩০০-এর বেশি রোগী এলেও সবাইকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন পড়ে না৷ ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আমরা অনেক রোগীকে ফ্লুইড দিয়ে ‘স্ট্যাবল’ করে ফেলি৷ এরপর চিকিৎসাপত্র দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দিই৷ আর যাদের হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়ে তারাও চার-পাঁচ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে যান৷ তবে এখন আমরা রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি৷’

আইসিডিডিআরবির তথ্য মতে, ৬০ বছর আগে ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরুর পর এত রোগীর চাপ আগে কখনও সামাল দিতে হয়নি। ২০০৭ সালে প্রথম সবচেয়ে বেশি ডায়রিয়া রোগী আসে এই হাসপাতালে। তখন প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক হাজার রোগী এসেছিল। এরপর ২০১৮ সালে ডায়রিয়ার প্রকোপ শুরু হলে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ৫৭ রোগী ভর্তি হয়।

বাইরের পানি-শরবতে বাড়ছে ঝুঁকি

এদিকে হঠাৎ ডায়রিয়ার এই প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার পেছনে বাইরের পানি ও শরবতকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টাদলের সদস্য ও জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আবু জামিল ফয়সাল ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বাইরের পানি পান একদম নিরাপদ না। ফুটানো বা ফিল্টার করা ছাড়া সাধারণ পানিতে অনেক ব্যাকটেরিয়া ও রোগ-জীবাণু থাকে। আর সেটাতে যখন চিনি ও লেবুর রস দিয়ে শরবত বানানো হয় তখন ব্যাকটেরিয়া ও রোগ-জীবাণুগুলো বহুগুণ দ্রুত বৃদ্ধি পায। এ ধরনের শরবত পান করা মারাত্মক ক্ষতিকর। এ ধরনের অনিরাপদ পানি ও শরবত পানের ফলে ডায়রিয়া, কলেরা, হেপাটাইটিস-এ বা জন্ডিস হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অনেকের বমি হয় এবং সে ব্যক্তি পানিশূন্যতায় ভুগতে থাকে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে পানিশূন্যতা মৃত্যুও ঘটাতে পারে। কেউ যদি নিয়মিত এসব পান করে তাহলে সে ব্যক্তি স্থায়ী পেটের পীড়া সমস্যায় ভুগতে পারেন।’

এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘বরফকলগুলো ঠিকমতো শোধিত পানি ব্যবহার করে না। অধিকাংশ বরফকল একদম সরাসরি ট্যাপের পানি ব্যবহার করে। বরফ তৈরির পর তা নোংরা পরিবেশে ফেলে রাখা হয়। এছাড়া পা দিয়ে ঠেলাসহ যে সকল পদ্ধতিতে বরফ পরিবহন করা হয় তা মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়। তাই বরফযুক্ত পানীয় ব্যবহারের বিষয়ে সকলকে সতর্ক হতে হবে।’

বাইরের শরবত ও পানির দোকানের সঙ্গে জীবিকা জড়িত উল্লেখ করে জামিল ফয়সাল বলেন, হুট করে দোকানগুলো বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব না। তবে তা যেনো নিরাপদ হয় সে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। যদি এসব শরবতে ফোঁটানো পানি ব্যবহার করা হয় এবং ঢাকনাযুক্ত পাত্রে রাখা হয়, মাছি না বসে তাহলে ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে আসবে। সরকারকে এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। খাবারের চেইনটা তদারকি করতে হবে। যদি তা করা হয় তাহলেই আমরা এই সমস্যা থেকে অনেকটাই মুক্তি পাব।

সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এবার ১২২ বছরের রেকর্ড তাপদাহ দেখা যাচ্ছে। ফলে মানুষ অধিক পরিমাণে বাইরের পানি ও শরবত পান করছে। এসব পানি নিরাপদ উৎস থেকে সংগৃহীত হচ্ছে না। ফলে ডায়েরিয়া ও কলেরার সংক্রমণ বেড়ে গেছে। নিরাপদ পানি ব্যবহার যদি নিশ্চিত করা না যায় তাহলে আমরা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরব।’

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2019 LatestNews
Design & Developed BY ithostseba.com