বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:৫৫ অপরাহ্ন

এবারের বাজেটেও কওমি শিক্ষার্থীদের বরাদ্দ নেই

যুবকণ্ঠ ডেস্ক:

২০২২-২৩ অর্থবছরের আসন্ন বাজেটে কওমি মাদ্রাসাগুলোর সরাসরি কোনো বরাদ্দ নেই। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরেও একই ঘটনা ঘটে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররা সবসময় তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। পুষ্টিকর খাবারের অভাব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা, মাসিক স্বাস্থ্যবিধির অভাব ও আধুনিক শিক্ষার অভাবে চাকরির বাজারে প্রবেশেও তাদের জন্য প্রতিবন্ধক পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

যদিও কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারীদেরকে সাধারণ শিক্ষার স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমমান স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তাদের তৈরি করা যায়নি।

শিক্ষাবিদরা মনে করেন, সরকারের এমন ঘোষণার পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় আধুনিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত ছিল। আধুনিক জ্ঞান অর্জন করে যেন তারা প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে পারে।

একইসঙ্গে কওমি শিক্ষা ব্যবস্থাকেও আধুনিকায়ন করার দাবি জানানো হচ্ছে।

আসন্ন বাজেটেও ছাত্রদের এত বড় একটি অংশকে (কওমি) উপেক্ষা করা হয়েছে। বাজেটে তাদের জন্য সরাসরি কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। অনেকটা যেন কাটা গায়ে লবণ ছিটানোর মতো।

২০২১-২২ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতেও (এডিপি) কওমি শিক্ষার্থীদের জন্য সরাসরি কোন বরাদ্দ খুঁজে পাননি এ সংবাদদাতা। তবে ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৬১ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার প্রকল্প ও ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৮৫ হাজার ২৩৩ কোটি টাকার ৪৯৪ টি প্রকল্প বরাদ্দ হয়েছে।

সংবিধানে উল্লিখিত অধিকার থেকেও বঞ্চিত কওমি শিক্ষার্থীরা

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫, অনুচ্ছেদ ১৮ (এ), অনুচ্ছেদ ১৭, অনুচ্ছেদ ২৮, অনুচ্ছেদ ৩৮ এবং ৩৯ অনুচ্ছেদে বর্ণিত অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত কওমি শিশুরা। মূলত জাতীয় পাঠ্যক্রমের অধীনে পড়াশোনা না করায় অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কওমি শিশুরা। যা দেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বড় বাধা।

শিশু কল্যাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে জড়িত ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো হলো- প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, চিকিৎসা শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

এছাড়াও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, জননিরাপত্তা বিভাগ, তথ্য মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার বিভাগও শিশুদের অধিকার নিশ্চিতে কাজ করছে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএএনবিইআইএস) ডাটাবেস অনুসারে, ২০২২ সালে দেশে কওমি মাদ্রাসা ছিল ১৯ হাজার ১৯৯টি। ২০১০ সালেও যে সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৯০২টি।

জরিপ চলাকালীন সময়ে কওমি মাদ্রাসায় ২৪.২৮ শতাংশ মেয়েসহ মোট শিক্ষার্থী ছিল ১৩ লাখ ৯৮ হাজার ২৫২ জন।

এর আগে এ বিষয়ে গণমাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনি জানান, সারাদেশে এখন ১৭ লাখের বেশি শিশু-কিশোর কওমি পাঠ্যক্রমের অধীনে পড়াশোনা করছে।

এ বিষয়ে আল হাইআতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসান বলেছেন, আমাদের সন্তানদের জন্য সরকারি সংস্থা থেকে কোনো তহবিল নেই। মানসম্মত শিক্ষাসহ শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে চাই আমরা।

এ বিষয়ে লন্ডন থেকে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দ্য বিজনেস পোস্টকে বলেন, কওমি শিশুদের জন্য কোনো বাজেট নেই। তবে স্কুল-কলেজের শিশুদের জন্য অনেক কর্মসূচি রয়েছে। এই শিশুদের কীভাবে সরকারের অর্থায়নে আনা যায় সে বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ভালো বলতে পারবে।

“শিশুদের জন্য উপবৃত্তি, পুষ্টিকর বিস্কুট, বিনা খরচে অধ্যয়নের সুযোগ, উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থাসহ ভবন, এতিম শিশুদের জন্য বাড়ি, তাদের দক্ষতা অর্জনে প্রযুক্তিগত শিক্ষা ও সুবিধা এবং আইসিটি প্রোগ্রাম প্রদান করে সরকার,” যোগ করেন মান্নান।

প্রয়োজনের তুলনায় এ সংখ্যা খুবই কম উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, আমরা শিশুদের মধ্যে বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করছি।

সঠিক কোনও তথ্য নেই

এ বিষয়ে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী দ্য বিজনেস পোস্টকে বলেন, প্রথমে জাতীয় পাঠ্যক্রমের সঙ্গে কওমি কর্তৃপক্ষের একমত হতে হবে, তারপর সরকার জনসম্পদ ব্যয় করবে। কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত রাজি হয়নি।

শিক্ষা উপমন্ত্রী জানান, সেই শিশুদের অবশ্যই সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক শিক্ষা সম্বলিত প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ্যক্রম অনুসরণ করতে হবে, এরপরে তারা প্রাথমিক স্তরে বাজেটে বরাদ্দ পাবে।

“সাধারণ বা কারিগরি পাঠ্যক্রম অনুসরণ না করলে শিশুরা আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতা অর্জন করতে পারে না”, বলেও উল্লেখ করেন মহিবুল হাসান।

এই মন্ত্রণালয়ের কনিষ্ঠ এ সদস্য বলেন, আমরা কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাই, কিন্তু তারাই আগ্রহী নয়।

এদিকে সরকার কওমি মাদ্রাসার দাওরাহ ডিগ্রিকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমমান হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও এখনো স্বীকৃতি পায়নি কওমি মাদ্রাসার নিম্নস্তরের শিক্ষা।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, আমরা তাদেরকে যুক্ত করার চেষ্টা করছি। কিন্তু তারা মূলধারার শিক্ষার সাথে একীভূত হতে আগ্রহী নয়। এমনকি তাদের নিবন্ধনও এখনো করা যায়নি।

এমন অবস্থায় তারা কীভাবে বরাদ্দ পাবে, বলেও প্রশ্ন রাখেন প্রখ্যাত এ শিক্ষাবিদ।

তিনি আরও বলেন, যেহেতু আজকের শিশুরা চাকরির বাজারে প্রবেশ করবে, তাদের অবশ্যই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি কাঠামোর আওতায় আসতে হবে। এরপর সরকার বিনিয়োগ করতে পারে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এ উপদেষ্টা বলেন, খসড়া শিক্ষা আইন-২০২১ যদি কার্যকর হয় তাহলে সরকার তাদের বেসিক লেভেলে শিক্ষার একটি নির্দিষ্ট স্তরে এর পাঠ্যক্রম অনুসরণ করতে বাধ্য করতে পারে।

অধিকাংশ কওমি শিশুই প্রান্তিক পর্যায়ের

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট সহযোগী অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, কওমি মাদ্রাসার এই শিশুরা একদমই প্রান্তিক, তাদের মধ্যে অনেকে এতিমও। এত বড় একটি সংখ্যার মানুষকে সরকার বাজেট বরাদ্দের বাইরে রাখতে পারে না।

তিনি বলেন, মাদ্রাসা করিডোরে সরকারকে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, আইসিটি শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং আরবি ও ফারসি ভাষায় তাদের যে শিক্ষা আছে, সেটা প্রায়োগিক করতে হবে।

সরকার এগুলোর ওপর বিনিয়োগ করলে কওমি মাদ্রাসার দিক থেকে ইতিবাচক ফল আসবে। এসময় মাদ্রাসা এবং তাদের ছাত্রদের সংখ্যা রেকর্ড করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেস তৈরির পরামর্শও দেন তিনি।

গোপনে ফ্রিল্যান্স করেছেন এমন কয়েকজন কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় এ প্রতিবেদকের। যারা ইলাস্ট্রেশন এবং ওয়েব ডিজাইন, ক্যালিগ্রাফি ও লেখালেখিতে পারদর্শী। যদিও তাদের মাদ্রাসা থেকে এসব বিষয়ে বাধার সম্মুখীন হতে হয়।

অনেকেই কেবল একতলা বা দুই তলা ভাড়া নিয়ে কওমি মাদ্রাসা পরিচালনা করছে। যেখানে কেবল প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠদান করানো হয়। শিক্ষার্থীরা কোনো বোর্ড পরীক্ষায় অংশ না নিয়েই উপরের ক্লাসে উঠতে পারে।

কওমি মাদ্রাসার নিম্ন শ্রেণির স্বীকৃতি না পাওয়ায় এটি সহজেই পারা যায়। এইজন্য শিক্ষার্থী বা মাদ্রাসাগুলো নিবন্ধিত হয়নি।

কওমি শিক্ষা ব্যবস্থায় যে কেউ ‘জালালাইন বা মেশকাত’ – অনার্স স্তরে ভর্তি হতে পারেন, তিনি যদি ‘শরহে বেকায়া’ – উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত কোনও বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নাও করেন। কেবল সাধারণ কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করেই এটি করতে পারেন শিক্ষার্থীরা। ফলে প্রকৃত সংখ্যা এখনো সরকারের কাছে অজানা।

ছয়টি কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড নিয়ে গঠিত সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ আল হাইআতুল উল্যা লিল-জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ এর কাছে প্রকৃত শিক্ষার্থী ও মাদ্রাসার সংখ্যা এ কারণেই অজানা।

বেফাকের তথ্যমতে, এ বছর বোর্ডের পাঁচটি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ১ লাখ ২২ হাজার ৯০৪ জন মেয়ে শিক্ষার্থীসহ ২ লাখ ২৫ হাজার ৬৩১ জন এবং কেন্দ্রীয় বোর্ডের সূত্রমতে, এই পাঁচ স্তর ছাড়া কেবল ‘দাওরা বা তাকমিল’ পরীক্ষায় ৯ হাজার ৮৯৫ জন ছাত্রীসহ ২৪ হাজার ৯৩২ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে।

২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল গণভবনে কওমি মাদ্রাসার প্রায় ৩৫০ জন প্রতিনিধির সাথে এক বৈঠকের পর কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমর্যাদা ঘোষণা করে সরকার।

সৌজন্যে: দ্য বিজনেস পোস্ট

Please Share This Post in Your Social Media

All rights reserved © Jubokantho24.com