বৃহস্পতিবার, ৩০ Jun ২০২২, ০৭:৫০ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনামঃ

নেপালে ৩০ বছরে ২৭ বিমান দুর্ঘটনা, নিহত ৪৫০

বিমান দুর্ঘটনার কালো অধ্যায় রয়েছে নেপালের। এভিয়েশন সেফটি ডাটাবেস অনুযায়ী, ১৪৭,১৮১ বর্গ কিলোমিটারের এই দেশটিতে গত তিন দশকে ঘটেছে ২৭টি বিমান দুর্ঘটনা। আর তাতে ক্রুসহ মারা গেছেন সাড়ে চার শর বেশি আরোহী।

এসব দুর্ঘটনায় নেপালের তারা এয়ারলাইনসের বিমান বিধ্বস্ত হয় তিনবার। তাতে মারা যান ৬৫ জন। রবিবার বিধ্বস্ত হওয়া বিমানটিও তারা এয়ারলাইনসের।

এভিয়েশন সেফটি ডাটাবেসের তথ্য অনুযায়ী, নেপালে ১৯৯২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ২৭ বছরে ২৬টি বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে ক্রুসহ ৪২৮ জন। ২০১৯ সালের পর গত রবিবারের আগ পর্যন্ত আর কোনো বিমান দুর্ঘটনা ঘটেনি নেপালে। যদিও এ সময়কালে বেশির ভাগ সময় করোনা মহামারির কারণে বিমান চলাচল সীমিত ছিল।

সর্বশেষ রবিবার (২৯ মে) তারা এয়ারলাইনসের যে বিমানটি পোখরা থেকে জমসমের উদ্দেশে যাওয়ার সময় বিধ্বস্ত হয়, তাতে ২২ জন যাত্রী ছিলেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ২০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

মাত্র ১৩ বছরের যাত্রায় তারা এয়ারলাইনস এরই মধ্যে তিনবার দুর্ঘটনায় পড়ে। ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় দুর্ঘটনায় ২৩ জন মারা যান। সেই ফ্লাইটটিও পোখরা থেকে জমসমের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল।

তার আগে ২০১০ সালের ২২ ডিসেম্বর প্রথমবার তারা এয়ারলাইনসের বিমান বিধ্বস্ত হয়। তার কিছুদিন আগে একই বছরের মে মাসে, উড্ডয়নের মিনিট খানিক বাদে হঠাৎ বিমানের কেবিনের দরজা খুলে যাওয়ায় ২১ আরোহী নিয়ে জরুরি অবতরণ করে তারার বিমান।

নেপালের ফ্লাইট কেন ঝুঁকিপূর্ণ

গত তিন দশকের ২০টি দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে কিছু কারণ বের করা গেছে। এর মধ্যে রুক্ষ পার্বত্য অঞ্চল, নতুন বিমান ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগের অভাব এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এসব দুর্ঘটনার পেছনে দায়ী। এ ছাড়া নেপালের আকাশপথগুলো অধিকাংশই পাহাড়ি এলাকায দিয়ে গেছে। বৈরি আবহাওয়ায় হঠাৎ বাঁক নিতে হয় এসব রুট থেকে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

বিমান দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা হওয়ায় ২০১৩ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নেপালভিত্তিক সব বিমান সংস্থাকে দেশটির আকাশসীমায় উড়তে নিষেধ করেছিল। ২০২২ সালের মার্চ মাসে কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপাল সরকারের ব্যর্থতার কারণেই দেশের বিমান চলাচল ইইউর কালো তালিকাভুক্ত হয়েছে।

নেপালে সবচেয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটেছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৩৩৮ মিটার ওপরে অবস্থিত কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। চারপাশে উঁচু ও দীর্ঘ পর্বতবেষ্টিত বিমানবন্দরটি এমন এক উপত্যকায় অবস্থিত, যেখানে বিমানগুলোর কৌশলে যাতায়াতের জন্য জায়গা খুব কম। অধিকাংশ পাইলটের দাবি, হিমালয়ের উঁচু, খাড়া এবং সরু ল্যান্ডিং স্ট্রিপগুলো নেভিগেট করা প্রায় দুঃসাধ্য।

গত তিন দশকের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিমান দুর্ঘটনা

ফেব্রুয়ারি ২০১৯: একটি হেলিকপ্টারে করে নেপালের পর্যটনমন্ত্রী রবীন্দ্র অধিকারী এবং উদ্যোক্তা আং ছিরিং শেরপাসহ সাত যাত্রী কাঠমান্ডুতে ফিরে ফিরছিলেন। এ সময় হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে সবা মারা যান। বৈরী আবহাওয়ার কারণে এই এলাকার আকাশপথ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল না বলে দুর্ঘটনাটি ঘটে।

কিন্তু নেপাল সরকারের প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়, অপারেটিং পদ্ধতির লঙ্ঘন, জ্বালানি ট্যাঙ্কের ভুল অবস্থানের কারণে ওজনের ভারসাম্যহীনতা এবং যাত্রীদের বসার ভুল ব্যবস্থার জন্য দুর্ঘটনা ঘটে। কাঠমান্ডু পোস্টের রিপোর্ট বলছে, বৈরি আবহাওয়াতেও ভিআইপি যাত্রীদের নিয়ে যাওয়ার জন্য পাইলটের ওপর চাপ দেওয়া হয়েছিল।

মার্চ ২০১৮: ঢাকা থেকে ক্রুসহ ৭১ আরোহী নিয়ে যাওয়া ইউএস-বাংলার একটি বিমান কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হয়। এতে ৫১ জন মারা যান। নেপালের ইতিহাসে এটি ছিল তৃতীয় মারাত্মক বিমান দুর্ঘটনা।

ঘটনার পর বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা দাবি করেন, পাইলট কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশনা না মেনে ভুল দিক থেকে রানওয়েতে অবতরণ করেন। কিন্তু ইউএস-বাংলা এয়ারের সিইও ইমরান আসিফ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশই পাইলটকে বিভ্রান্ত করেছে।

২০১৯ সালে নেপালের কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রাক্তন সদস্য ও বিমানের ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত থাকার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। সেই সাথে জরুরি মুহূর্তে অবতরণের পদ্ধতি না মানার জন্য ক্রুদেরও দায়ী করা হয় প্রতিবেদনে।

সেপ্টেম্বর ২০১১: মাউন্ট এভারেস্ট দেখতে আসা পর্যটকদের নিয়ে পাহাড়ের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় বুদ্ধ এয়ারের একটি বিমানের। দুর্ঘটনায় ১০ ভারতীয়সহ ১৯ আরোহীর সকলে মারা যায়। ঘটনার সময় কাঠমুন্ডু বিমানবন্দর এবং এর আশেপাশের আকাশে বর্ষার ঘন মেঘ ছিল।

সেপ্টেম্বর ১৯৯২: নেপালে সবচেয়ে বড় বিমান দুর্ঘটনাটি ঘটে এদিন। পাকিস্তান এয়ারলাইন্সের একটি বিমান কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে অবতরণের সময় বিধ্বস্ত হয়ে ১৬৭ আরোহীর সবাই নিহত হয়। করাচির জিন্নাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আসা ফ্লাইটটি কাঠমান্ডু বিমানবন্দর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে পর্বতশৃঙ্গে ধাক্কা খায়। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী আশপাশের টপোগ্রাফির কারণে কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে পৌঁছানো খুবই কঠিন।

জুলাই ১৯৯২: কাঠমান্ডুতে এই দ্বিতীয় বড় দুর্ঘটনায় পড়ে থাই এয়ারওয়েজের একটি বিমান। এতে ৯৯ যাত্রী ও ১৪ ক্রুর সবাই মারা যান। বর্ষার ভারী বৃষ্টির সময় কাঠমান্ডু থেকে ৩৭ কিলোমিটার উত্তরে একটি পাহাড়ের সঙ্গে বিমানটির সংঘর্ষ হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈরী আবহাওয়াতে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যর্থতার কারণে পাইলট চাপের মধ্যে ছিলেন। নেপালের কর্তৃপক্ষ দাবি, কাঠমান্ডুর বৈরী পরিবেশে বিমান চালানোর মতো পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাইলটের ছিল না।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2019 LatestNews
Design & Developed BY ithostseba.com