শুক্রবার, ১৯ অগাস্ট ২০২২, ০২:২০ পূর্বাহ্ন

চামড়ার দরপতন: এই খাতে নির্ভরতা কমছে কওমি মাদরাসাগুলোর

রাকিবুল হাসান নাঈম:

কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করে অর্জিত অর্থ কওমি মাদ্রাসাগুলোর একটি আয়ের খাত। এই খাত থেকে সংগৃহীত অর্থ প্রত্যেকটি মাদ্রাসার লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে ব্যয় করা হয়। কোনো কোনো মাদ্রাসার গরিবদের তহবিলে বছরের তিন মাসের যোগান কোরবানির চামড়া থেকে হয়, কোনো কোনো মাদ্রাসায় দুই মাস, কোনো মাদ্রাসায় আবার এক মাস বা তারও কম সময়ের যোগান হয়। তবে এই খাতের উপর নির্ভরতা কমাতে চাচ্ছেন কওমি মাদ্রাসার দায়িত্বশীল আলেমগণ। ইতোমধ্যে অনেক মাদরাসা চামড়া কালেকশনের জন্য ছাত্রদের বাধ্য করা বন্ধ করে দিয়েছে। যারা মাদরাসায় চামড়া দিতে চায়, এমনিতেই দিয়ে যাচ্ছে। কওমি মাদ্রাসার দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

টাকা দিয়ে চামড়া কেনার প্রচলন শেষ

সাধারণত কোরবানির চামড়া সংগ্রহে তিন ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকরা। এই তিনটি পদ্ধতি হচ্ছে, বিনামূল্যে পুরো চামড়া সংগ্রহ, অর্ধেক দামে চামড়া কিনে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি এবং পুরো দামে চামড়া কিনে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি। মাদ্রাসাগুলোর প্রথম চেষ্টা থাকে কোরবানির পশুর পুরো চামড়াটি সংগ্রহ করা। প্রথমে পশু কোরবানি করে পুরো চামড়াটি সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। এতে কোরবানিওয়ালা সম্মতি না দিলে অর্ধেক মূল্যে ক্রয়ের চেষ্টা করা হয়। এতেও না হলে চামড়াটি কিনে নেওয়া হয় পুরোদামেই। পরে কিছু বাড়িয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। চামড়া কেনার জন্য মাদ্রাসার পক্ষ থেকেই লগ্নি করা হয়। এছাড়া কিছু প্রতিষ্ঠান পোস্টার ছাপিয়ে কোরবানির চামড়া সংগ্রহে সমর্থ মুসলিমদের প্রতি আহ্বান জানায়।

এরমধ্যে  অর্ধেক কিংবা পুরো দামে কেনার প্রচলনটি প্রায় উঠেই গেছে। এখন সব চামড়াই বিনামূল্যে সংগ্রহ করা হয়। কথা হয় বাঞ্ছারামপুর চরমানিকপুর মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা আশরাফুল হকের সঙ্গে। তিনি জানান, ‘আমরা টাকা দিয়ে কোনো চামড়া কিনি না। যারা দেয়, বিনামূল্যেই দিয়ে দেয়। চামড়াগুলো প্রথমে প্রত্যেক মসজিদে জমা হয়। আমরা মসজিদ থেকে সংগ্রহ করি।’

তবে চামড়ার দরপতনের কারণে অবস্থা খুব একটা ভালো না। চামড়া থেকে যে টাকা পাওয়া যায়, তা দিয়ে মাদরাসার একমাসের খোরাকিও হয়না বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, এই চামড়ার টাকা না হলেও দিব্যি চলে যাবে দিন। কারণ, এখন আয়ের খাত বেড়েছে মাদরাসার। যেমন যাকাত, ব্যক্তিগত দান, মাহফিল ইত্যাদী। ফলত চামড়া নির্ভরশীলতা নাই বললেই চলে।

চামড়া কালেকশনের পরিধি বিস্তৃত হলেও টাকা দিয়ে চামড়া কেনে না কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা জামিয়া ইমদাদিয়া। মাদরাসাটি রীতিমতই চামড়া কালেকশন করবে এবার। মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা শাব্বির আহমদ রশিদ ফাতেহকে বলেন, ‘আমাদের মাদরাসায় ১৮০০ ছাত্র। এরমধ্যে ২৫০-৩০০ ছাত্রকে রাখব চামড়া কালেকশনের জন্য। কালেকশনটা আমরা গ্রুপিং করে করি। একজন শিক্ষকের অধীনে থাকে ২০-৩০ জন ছাত্র। তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে চামড়াটা আনে। টাকা দিয়ে চামড়া কিনি না।’

গতবছর দুই হাজারের অধিক চামড়া কালেকশন হয়েছিলো বলেও জানান তিনি। তবে তারা চামড়াগুলো কাঁচাই বিক্রি করেন, লবন লাগান না। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, লবনের বাজারে সিন্ডিকেট থাকে। লবন লাগানোর জন্য জনবল লাগে। চামড়া রাখার জন্য জায়গা লাগে। সব মিলিয়ে আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যায়। তাই লবন না লাগিয়েই বিক্রি করি।

এ বছর আরও বেশি চামড়া প্রত্যাশা করছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত বছর চামড়ার দাম ছিল একদম কম। অনেক জায়গায় চামড়া কিনতে কেউ আসেনি। তাই মাদরাসায় দিয়ে দিয়েছে সবাই। এবার কেমন হয় বলতে পারছি না এখনই। তবে বেশি ত প্রত্যাশা থাকবেই।

বাড়ছে আয়ের খাত, কমছে চামড়া-নির্ভরতা

একটা সময় চামড়া কালেকশনের জন্য ঈদের ছুটিতেও ছাত্রদেরকে মাদরাসায় থাকতে বাধ্য করা হতো। তারপর বিকল্প একটি পন্থা শুরু হয়। কাউকে বাধ্য না করে ছুটি দেয়া হতো এক শর্তে—নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কালেকশন করে এনে দিতে হবে। যেমন কোনো মাদরাসায় জনপ্রতি ৫০০, কোনো মাদরাসায় ১০০০। এই পন্থাটি বেশ ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়। আর ৫০০ টাকা জনপ্রতি সংগ্রহ করা তেমন কষ্টসাধ্য ব্যাপারও না। তবে এই পন্থায় লাভবান হতে পারে বড় মাদরাসাগুলো, যাদের ছাত্রসংখ্যা বেশী। এরমধ্যে রয়েছে দারুল উলুম মাদানীনগর মাদরাসা, জামিয়া মাদানিয়া যাত্রাবাড়ী, হাটহাজারী মাদরাসা সহ আরও অনেক মাদরাসা। এই পন্থাটি এখনো বলবৎ আছে। তাই চামড়া কালেকশনের উপর নির্ভরতা কমছে।

এবার সিমীত পরিসরে চামড়া কালেকশন করবে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা জামিয়া আরাবিয়া এমদাদুল উলুম ফরিদাবাদ মাদরাসা। মাদরাসাটিতে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা আড়াই হাজারের অধিক। কিন্তু কুরবানীর ঈদে গরু জবাই এবং চামড়া কালেকশনের জন্য রাখা হবে মাত্র ৩৫০ জন ছাত্র। মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা মুহাম্মদ যুবায়ের ফাতেহকে বলেন, ‘এবার ছাত্রদেরকে আমরা বাড়ি চলে যেতে উৎসাহিত করছি। যারা স্বেচ্ছায় থাকবে, তাদের মধ্য থেকে ৩০০-৩৫০ ছাত্র দিয়ে গরু জবাই এবং চামড়া কালেকশনের কাজটি করব। তবে খুব দূর দূরান্তে যাব না। মাদরাসার আশপাশেই কালেকশন করা হবে।’

একসময় মাদরাসায় চামড়া কালেকশনের জন্য ছাত্রদেরকে মাদরাসায় থাকতে বাধ্যতামূলক করা হতো। কিন্তু এখন দিন বদলেছে। অনেক মাদরাসায় বন্ধ হয়ে গেছে চামড়া কালেকশন। এর নেপথ্যে কারণ কী? মাওলানা মুহাম্মদ যুবায়ের বলেন, ‘সময় বদলায়, সভ্যতার উন্নতি ঘটে। একসময় মাদরাসার আয়ের অন্যতম একটি উৎস ছিল চামড়া কালেকশন। মাদরাসার শিক্ষকদের বেতন বকেয়া থাকতো বছরের পর বছর। এখন মাস শেষ হলেই বেতন পরিশোধ হয়ে যায়। বিশেষ করে শহরের মাদরাসাগুলোতে। মাদরাসার আয়ের খাত বেড়েছে। এখন শুধু চামড়া খাতের উপর কেউ নির্ভর করছে না। আয়ের খাত বাড়াটাই মূল নেয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।’

গতবছর ঈদুল আজহায় ফরিদাবাদ মাদরাসায় কাজ করেছিল মাত্র ১০০ ছাত্র। তখন চামড়া উঠেছিল ১৩ শতাধিক। এবার আরও বেশি চামড়া পাবার আশা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

চামড়ার টাকায় ১ মাসও চলে না

কিছু কিছু মাদরাসা পোস্টার ছাপিয়ে কোরবানির চামড়া সংগ্রহে সমর্থ মুসলিমদের প্রতি আহ্বান জানায়। পুরান ঢাকায় সরেজমিন ঘুরে এমনকিছু পোস্টার দেখা গেছে। এরমধ্যে রয়েছে—রোকনপুর তালিমুল কুরআন হাফিজিয়া মাদরাসা ও এতিমখানা, জামিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া তাঁতিবাজার মাদরাসা, মাদরাসা নূরুল কুরআন ইত্যাদি।

তাঁতিবাজার মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মাওলানা যুবায়ের আহমদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, এই মাদরাসায় পাঁচ শতাধিক ছাত্র রয়েছে। ঈদে চামড়া কালেকশনের জন্য ২৫০ ছাত্রই থাকবে। গতবছর এ মাদরাসায় চামড়া এসেছিল ৮ শতাধিক। চামড়াগুলো তারা সরাসরি সাভার ট্যানারিতে নিয়েই বিক্রি করেন। কিন্তু এর থেকে যে টাকা আসে, তা দিয়ে একমাসের বেশী খোরাকি হয় না। তিনি জানান, একমাসে আমাদের খরচ ৬ লাখ টাকা। চামড়া বিক্রি করে পেয়েছি ৪ লাখ টাকা। এই হিসেবের একমাসের খোরাকিও হয় না।

চামড়া কালেকশন হয় না

কেরাণীগঞ্জের মক্কীনগর মাদরাসায় কোনো চামড়া কালেকশন হয়না বলে জানান মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা আবদুল গাফফার। ফাতেহকে তিনি বলেন, ‘মক্কীনগর মাদরাসায় প্রথাগত কোনো চামড়া কালেকশন হয়না। ঈদের তিনদিন আগের মাদরাসার সব ছাত্রদের ছুটি দেয়া হয়। যারা মাদরাসায় চামড়া দিতে চান, তারা মাদরাসায় এনে দিয়ে যান।’ গতবছর মাদরাসায় শতাধিক চামড়া এসেছিলো বলে জানান তিনি।

ট্যানারি শিল্পে আসতে হবে আলেমরাও

এত চামড়া কালেকশন করেও একমাসের যোগান হচ্ছে না, এর পেছনে মূল ক্রিড়নক সিন্ডিকেট। এতে কেবল মাদরাসাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এমন না, এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাদরাসার বাইরের বিশাল এক দরিদ্র জনগোষ্ঠী। লেখক ও সম্পাদক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, কওমি মাদ্রাসার গোরাবা ফান্ড এখন আর কুরবানির চামড়ার উপর নির্ভরশীল নয়। তাই কোরবানির চামড়ার ইচ্ছাকৃত মূল্যহীনতা তৈরি করা নিয়ে শুধুমাত্র মাদ্রাসার গরীব ছাত্রদের সুবিধার চিন্তা করে কথা বলা এখানে মুখ্য নয়। চামড়ার এই অর্থ মাদ্রাসার সঙ্গে জড়িত নন, সমাজের এমন লাখো লাখো গরিব মানুষকেও উপকৃত করে। কোরবানির চামড়া বিক্রি লব্ধ অর্থ আসলে সমাজের সব পর্যায়ের গরীবের হক এবং গরীবের সুবিধার একটা উপলক্ষ ছিল। এখানেই হাত দিয়েছে উচ্চবিত্ত একশ্রেণীর ট্যানারি মালিক। যারা এই শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং নেতৃত্ব দিচ্ছে।

ট্যানারী মালিকদের দুর্বৃত্তায়ন ভাঙতে তরুণ আলেমদের এগিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ট্যানারি ওয়ালাদের সিন্ডিকেট ভাঙতেই হবে। অথবা চামড়া নিয়ে গরীব মানুষকে ঠকিয়ে নিজেদের ব্যবসা বিশাল করে তোলার স্বপ্নকে প্রতিরোধ করার প্রয়োজনে চামড়া নিয়ে অন্যরকম ভাবনা শুরু করতে হবে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে চামড়া কীভাবে ব্যবহার করা যায়, চামড়া খাওয়ার উপযোগী করা যায় কিনা কিংবা ট্যানারি ওয়ালাদেরকে এড়িয়ে লাখ লাখ চামড়া অন্যভাবে প্রসেস করে ব্যবসায়িক কোনো বিকল্প উদ্যোগ নেওয়া যায় কিনা, ধাপে ধাপে ঠান্ডা মাথায় এ বিষয়গুলো নিয়ে সক্রিয়ভাবে ভাবনা চিন্তা করা প্রবীণ ও তারুণ্যদীপ্ত আলেম নেতৃত্বের কাজ।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2019 LatestNews
Design & Developed BY ithostseba.com