
তদন্ত কর্মকর্তার সামনে বসে যখন জবানবন্দী দিচ্ছিলেন, তখনো জানতেন না এই বয়ানই হবে তার শেষ সাক্ষ্য। জুলাই গণহত্যার বিচার চেয়ে ট্রাইব্যুনালে দাঁড়ানোর কথা ছিল শরিফ ওসমান হাদির; কিন্তু আদালতের কাঠগড়ায় পৌঁছানোর আগেই শত্রুর বুলেটে নিভে গেছে তার প্রাণ। তবে মানুষটি শহীদ হলেও হারিয়ে যায়নি তার লড়াই। মৃত্যুর আগে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া হাদির সেই চাঞ্চল্যকর জবানবন্দীকেই এখন ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে অকাট্য সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। জবানবন্দীতে তিনি কেবল রাজপথের নৃশংসতার বর্ণনা দেননি, বরং তুলে ধরেছেন তাকে দেয়া ক্রমাগত প্রাণনাশের হুমকির আদ্যোপান্ত এবং গণহত্যায় জড়িত রাঘববোয়ালদের সুনির্দিষ্ট অপকর্মের খতিয়ান।
গতকাল বুধবার প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার বক্তব্যটি মঞ্জুর করা হয়।
এ মামলার সব আসামিই পলাতক রয়েছেন। কাদের ছাড়া অন্যরা হলেন- আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।
জবানবন্দীতে সাত আসামির দায় নিয়ে বিস্তর বর্ণনা করেছেন শরিফ ওসমান হাদি। তুলে ধরেছেন নিজের চোখে দেখা তাদের সব অপকর্মের কথা। আন্দোলনকারীদের ওপর কে, কখন, কোথায় হামলা কিংবা কারা গুলি চালিয়েছেন; সেসবের বিবরণও দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে। এমনকি নিজেকে অসংখ্য নম্বর থেকে হুমকি দেয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছিলেন।
তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দীতে হাদি বলেছিলেন, আমাকে অসংখ্য নম্বর থেকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। এ নিয়ে শাহবাগ থানায় জিডিও করেছি। অতি দ্রুত তাদের বিচার করতে না পারলে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ভবিষ্যতে কী পরিমাণ গণহত্যা চালাবে, তা অকল্পনীয়। তাদের বিচারের আওতায় না আনলে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, এ আন্দোলনে আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া অর্থাৎ বিভিন্ন দেশ থেকে বহু সাংবাদিক, লেখকসহ বিভিন্ন অ্যাক্টিভিস্টরা অবদান রেখেছেন। যেহেতু আমি আইএলটিএসে পড়াতাম, সেহেতু আমার অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে ভালো ভালো জায়গায় আছে, তাদের থেকেও আমি বিভিন্ন তথ্য পেতাম।
জড়িতদের বিচার চেয়ে হাদি বলেছিলেন, সারা দেশে আন্দোলন দমনের নামে সংঘটিত, পরিকল্পিত গণহত্যাকাণ্ডসহ বর্বরোচিত হামলার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ এ আরাফাত, পরশ, নিখিল, সাদ্দাম, ইনানসহ জড়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও আওয়ামী লীগ দলীয় ক্যাডারদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।
এ দিকে এ মামলায় ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক বিচার। প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেন শহীদ আসিফ ইকবালের বাবা এম এ রাজ্জাক।
এ প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে ছাত্র-জনতার মধ্যে অন্যতম সিপাহসালার ছিলেন শহীদ ওসমান হাদি। তিনি নিজে প্রত্যক্ষ করেছিলেন যে কিভাবে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। কিভাবে তাদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়েছে। জবানবন্দীতে এসবের বর্ণনা তিনি এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে দিয়েছিলেন। শহীদ হওয়ার কারণে ট্রাইব্যুনালে এসে তার সাক্ষ্য দেয়া আর সম্ভব নয়। এ জন্য আইনানুযায়ী তার জবানবন্দীটি সাক্ষ্য হিসেবে নিতে আদালতে আবেদন করেছি। শুনানি শেষে তা মঞ্জুর করেন আদালত।
তিনি বলেন, আমাদের আইনের একটি বিধান রাখা হয়েছে যে, যদি কোনো সাক্ষীর এমন বক্তব্য তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে দেয়া থাকে। কিন্তু পরবর্তীতে তার পক্ষে আর কখনো সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আদালতে উপস্থিত হওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে আদালত তার সেই বক্তব্যকে সত্য বক্তব্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। আর এ ধারার অধীনেই আমরা আজ আবেদনটি দিয়েছিলাম।




