
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মস্কোতে সবচেয়ে বড় হামলা করেছে ইউক্রেন। প্রায় ২০০টি ড্রোন রাশিয়ার রাজধানীর আশপাশের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, যার ফলে আকাশে ঘন কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী উঠতে দেখা গেছে।
মস্কো অঞ্চলের গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিয়ভ বলেছেন, এই হামলায় ১৭ জন আহত হয়েছেন।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশজুড়ে প্রায় ১,০০০ ড্রোন এবং চারটি ইউক্রেনীয় ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় রোস্তভ অঞ্চলে একটি তেল ডিপোতেও আঘাত হানা হয়েছে, যেখানে একজন নিহত হয়েছেন।
ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, ‘এই যুদ্ধ শেষ করার সময় এসেছে, এবং রাশিয়াকে কূটনীতির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।’ তিনি জানান, গত সপ্তাহে কিয়েভে রাশিয়ার হামলার জবাবেই এই ব্যাপক ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে, যে হামলায় কিয়েভের একটি প্রধান ধর্মীয় স্থাপনা আগুনে পুড়ে গিয়েছিল। জেলেনস্কি আরও বলেন, ‘আমরা এই যুদ্ধ কখনো চাইনি। কিন্তু ইউক্রেন যদি আক্রান্ত হয়, তবে আপনাদের মস্কোও পুড়বে।’
দক্ষিণ-পূর্ব মস্কোর কাপোতনিয়া শোধনাগারে এক মাসের মধ্যে তৃতীয়বার এবং চলতি সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো আঘাত হানায় সেখানে আগুন ধরে যায়, যার ফলে আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। বেশ কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি বিস্ফোরণের তীব্রতায় বিশাল একটি তেল সংরক্ষণ ট্যাংকের ঢাকনা বাতাসে উড়ে গেছে।
নিকটবর্তী একটি শপিং সেন্টারও জ্বলছিল, জানা গেছে ড্রোন ধ্বংসাবশেষ ভবনের ওপর পড়ার পর এই অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এছাড়া বেশ কয়েকটি বহুতল আবাসিক ভবন খালি করা হয়েছে। মস্কোর চারটি বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং ৫০০টিরও বেশি ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হয়।
যদিও রাশিয়ার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ড্রোন হামলার পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতির ছবি বা ভিডিও প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, তবুও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডজন ডজন ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। সেগুলোতে দেখা গেছে, দিনের আলোতেই ড্রোনগুলো আকাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে এবং মস্কোর উপকণ্ঠে শিল্পাঞ্চলগুলোর ওপর বিস্ফোরণ ঘটছে।
মূল বিমান হামলা শুরু করার আগে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘনত্ব এবং দুর্বল এলাকাগুলো চিহ্নিত করতে বিপুল সংখ্যক নিরীক্ষক ডেকয় (প্রতারণামূলক) ড্রোন উৎক্ষেপণ করা ইউক্রেনের একটি নিয়মিত কৌশল।
ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার (৩১০ মাইল) দূরে অবস্থিত মস্কোতে ড্রোন হামলা আরও ঘন ঘন রূপ নিয়েছে, কারণ কিয়েভ তাদের দূরপাল্লার সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। ২০২৩ সালের বসন্তে ইউক্রেনের প্রথম সফল ড্রোন হামলা রাশিয়ার রাজধানীতে পৌঁছায়, যদিও সেগুলো ছিল বিক্ষিপ্ত এবং তাতে মাত্র কয়েকটি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল।
এরপর থেকে মস্কোর চারপাশে ব্যাপক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে—তবে ইউক্রেন কর্তৃক ব্যবহৃত ড্রোনের সংখ্যাও বহুগুণ বেড়েছে এবং কিছু ড্রোন সেই প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে।
কোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনাই উচ্চ প্রযুক্তির ড্রোনের ব্যাপক আক্রমণের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। যেগুলো প্রতিরক্ষা ভেদ করে চলে যায়, সেগুলোর সফলভাবে আঘাত হানার হার অত্যন্ত কম এবং এগুলোর কারণে অ্যান্টি-মিসাইল ধ্বংসাবশেষ মাটিতে আছড়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
তবে এই ধরনের বড় আকারের হামলা ঠেকানোর জানা জটিলতা সত্ত্বেও, বৃহস্পতিবারের এই ড্রোন হামলা মস্কোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোকে ঘিরে থাকা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য।
এদিকে কিয়েভ জানিয়েছে, রাশিয়াও রাতারাতি ইউক্রেনে ২০০টিরও বেশি ড্রোন এবং একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
ভ্লাদিমির পুতিন, যিনি মধ্যঞ্চলীয় শহর কাজানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নেতাদের নিয়ে একটি শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করছেন, রাশিয়ার রাজধানীতে এই বড় ধরনের হামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
