
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপে আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে দেশটির সরকারি জান্তা বাহিনী। যুদ্ধবিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ ও গোলাবর্ষণের বিকট শব্দে কেঁপে উঠছে টেকনাফ ও উখিয়ার সীমান্ত এলাকা। এমন পরিস্থিতিতে অনুপ্রবেশের আশঙ্কায় নাফ নদী ও সীমান্তজুড়ে টহল জোরদার করেছে বিজিবি ও কোস্টগার্ড। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও অতীতের মতো বড় পরিসরে রোহিঙ্গা ঢলের সম্ভাবনা আপাতত কম।
গত দেড় বছর ধরে বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা মিয়ানমারের রাখাইনের মংডু ও বুথিডং এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় নতুন করে মংডু ও আশপাশের এলাকায় বিমান হামলা চালাচ্ছে জান্তা বাহিনী। হামলা মিয়ানমারের ভেতরে হলেও বিস্ফোরণের তীব্রতায় নাফ নদীর এপারের ঘরবাড়িও কেঁপে উঠছে। এতে সীমান্তের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
সীমান্তের ওপারে টানা বিস্ফোরণের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হলেও এপারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি ও কোস্টগার্ড সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে সীমান্তজুড়ে টহল ও নজরদারি জোরদার করেছে। পাশাপাশি ড্রোনের মাধ্যমেও কঠোর পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের প্রভাব শুধু টেকনাফ সীমান্তেই নয়, কক্সবাজারের উখিয়া ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তেও পড়েছে। সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় এসব এলাকাতেও বিজিবি নজরদারি ও টহল আরও জোরদার করেছে। টেকনাফস্থ ২ বিজিবির উপ-অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট ফুয়াদ রহমান বলেন, সীমান্তে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পাশাপাশি টহলও জোরদার করা হয়েছে।
অতীতের সংঘাতের কারণে বাংলাদেশকে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে হয়েছে। তবে এবার তেমন বড় ধরনের ঢলের আশঙ্কা দেখছেন না অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সংঘর্ষ যদি সীমান্তের আরও কাছাকাছি চলে আসে, তাহলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।
সীমান্তের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘাত চলছে। এর ফলে সীমান্তের ওপার থেকে বিমান হামলা ও বিস্ফোরণের বিকট শব্দ ভেসে আসছে। নদীর এপার থেকেও আমরা সেই শব্দ শুনতে পাচ্ছি। এতে আমরা ভীষণ আতঙ্কের মধ্যে আছি। এমন বিস্ফোরণের কারণে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, সীমান্তের মানুষ চরম উদ্বেগ নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। অতীতেও এই সংঘাতের প্রভাব আমাদের ওপর পড়েছে। আমরা আর কোনোভাবেই তাদের সংঘাতের বলি হতে চাই না। নদীর এপারে বসবাসকারী মানুষের জীবন ও জীবিকা নিরাপদ রাখতে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া এবং কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা উচিত।
আরেক বাসিন্দা ইকবাল আজিজ বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিমান হামলার কারণে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ টেকনাফ সীমান্তেও কম্পন সৃষ্টি করছে। দীর্ঘদিন পর আবার একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শুনে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি। এসব শব্দে পুরো সীমান্ত এলাকা কেঁপে ওঠে। স্থানীয় মানুষ ভয়ের মধ্যেই দিন কাটাচ্ছে।
অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার করা। সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। অতীতেও দেখা গেছে, যখন সশস্ত্র সংঘাত বাংলাদেশের সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছেছে, তখন গোলাবর্ষণের ঘটনা বাংলাদেশের ভূখণ্ডেও ঘটেছে। এতে সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। তাই এ ধরনের পরিস্থিতি যেন আবার সৃষ্টি না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের সম্ভাবনা তৈরি হলে সে বিষয়ে সরকারের কাছে আগাম তথ্য থাকার কথা। বিশেষ করে গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বিত প্রস্তুতি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করবে—এমন সম্ভাবনা খুব বেশি নয়।
প্রশাসনের দাবি, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে বিজিবি ও কোস্টগার্ড সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পাশাপাশি আতঙ্কিত না হতে সীমান্তবাসীকেও আশ্বস্ত করা হয়েছে। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে মংডু ও বুথিডং টাউনশিপে গোলাবর্ষণ ও বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। রাতে ওপার থেকে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি ও কোস্টগার্ড সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে, যাতে কোনো ধরনের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ না ঘটে। বিস্ফোরণের শব্দে সীমান্তবর্তী এলাকার কিছু বাসিন্দা সাময়িকভাবে আতঙ্কিত হলেও বাংলাদেশে কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। সীমান্তবাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার জন্যও আশ্বস্ত করা হয়েছে।
